প্রকাশ : ০৮ এপ্রিল ২০২৪, ০০:০০
মিজানুর রহমান রানার মুক্তিযুদ্ধের ধারাবাহিক উপন্যাস
এই জনমে

পূর্ব কথা :
‘আজ আমাদের যেমন ব্যক্তিগত বাস্তবতার সমস্যার আমরা দেখতে পাচ্ছি, ঠিক তেমনি আমাদের দেশেরও কঠিন বাস্তবতাকে আমরা দেখেশুনে বুঝে দেশের শত্রুদের বিরুদ্ধে কাজ করার জন্যে ঐক্যবদ্ধ হয়েছি। আল্লাহ তায়ালা যাতে আমাদেরকে সকল বাস্তবতাকে উপলব্ধি করে সফল হওয়ার সুযোগ দান করেন।’
‘আল্লাহতায়ালা আমাদেরকে দেশের জন্যে কাজ করার জন্যে কবুল করুন।’ সমস্বরে বললো সবাই।
(পূর্ব প্রকাশিতের পর)
সাত.
রাজাকার বাহিনীর এখন প্রধান কাজ হচ্ছে পাক-বাহিনীকে সহায়তা করা। তাছাড়া হাঁস-মুরগি, খাসি মানুষের বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে পাক-বাহিনীকে দেওয়া, সাধারণ মানুষকে কুকুরের মতো হত্যা করা, নারী ধর্ষণ এসব কাজে ওরা অগ্রগামী।
রাজাকার, আল বদর, আল শামস বাহিনী পাক-বাহিনীকে সহায়তা করছে এবং তারা দেশের মানুষদেরকে ‘ভারতের চর’ বলে অভিহিত করে ধরে নিয়ে যাচ্ছে, নির্মম নির্যাতন করে মারছে। নদীতে লাশ ভাসিয়ে দিচ্ছে।
এমনই একজন কুখ্যাত রাজাকার, যে কিনা এলাকার সবার কাছে ‘মেহের জল্লাদ’ হিসেবে পরিচিত। তার বাবার নাম কবিরাজ ইয়াকুব আলী। মেহের জল্লাদ রাজাকার বাহিনীর কমান্ডার হবার পর একটি ‘কিপি স্কোয়াড’ গঠন করে। এলাকার গৌরদাস বাবুর বাড়ি দখল করে মেহের সেখানে মেয়েদের ধরে এনে ধর্ষণ করে। ধর্ষণ শেষে অকল্পনীয় নির্যাতন শেষে হত্যার পর লাশ ভাসিয়ে দেয় নদীর জলে।
মানুষ খুন করা তার নেশা। এম.এম. কলেজের ভিপি আসাদ, জেলা কৃষক সমিতির সম্পাদক শান্তি, বাম রাজনীতিক তোজো, ছাত্র ইউনিয়ন সভাপতি মানিক, আকরাম, আলী আহমদ, মূসা, গেরো, অহেদ, গৌরদাস, খোকা, মোসলেম, আমির, আনন্দ, তপন, কল্পনা, ফজলুসহ অসংখ্য দেশপ্রেমিক মানুষকে খুন করে মেহের জল্লাদ।
রক্তে তার হাত রঞ্জিত। কলিজাভরা খুনের নেশা। সে জানতে পারে এলাকায় একদল মুক্তিযোদ্ধা গোপনে কার্যক্রম চালাচ্ছে। এরা অন্য এলাকার। তার কাছে খবর আসে গ্রামের এক জঙ্গলের কিনারায় নয়জনের একটা টীম আস্তানা গেঁড়েছে।
মেহের জল্লাদের একজন চর, যার নাম হেকমত সে তাকে জানায়, এদের কমান্ডারের নাম আমির। এক সময় চলচ্চিত্রে অভিনয় করতো। ধরা পড়ে কয়েকমাস পাক আর্মির কাছে বন্দী ছিলো। এছাড়াও রয়েছে তাদের সাথে আরও তিন যুবক ও ৫জন নারী। একজনের নাম অনন্যা আর অন্যজনের নাম রূপালি। আর ৩জনের নাম অধরা, তিরণা আর ঈষাণবালা।
ঈষাণবালা, রূপালি নামগুলো শোনার পর থেকেই খোয়াব দেখা শুরু করে সে। এই বাহিনীকে ধরতে পারলে মেয়েগুলো তার হস্তগত হবে। এদেরকে ভোগ করে পাক কমান্ডারদেরকে দিলে তাকে বাহাবা দিবে, পদোন্নতি হবে। সুনাম হবে।
অট্টহাসি দিয়ে উঠলো রাজাকার মেহের জল্লাদ। হায় সুযোগ। তোমাকে গ্রহণ করতেই হবে। অনুচরদের ডেকে জিজ্ঞাসা করলো, ওদের বাহিনীতে কয়জন আছে?’
তারা জানালো, ‘ওরা নয়জন। আর এলাকার কিছু মুক্তিযোদ্ধা মিলে পনেরোজন হতে পারে।’
‘ব্যাপার না।’ বললো সে, ‘আমরা গোলাবারুদ আনছি। শুধুমাত্র ওই নারীদেরকে রেখে পুরো ক্যাম্প উড়িয়ে দিবো রাতের আঁধারে। ‘হ্যাঁ, আজ রাতেই অভিযান চলবে। সবাইকে তৈরি থাকার নির্দেশ দাও।’ প্রধান অনুচর হেকমত আলীকে বললো সে।
এই হেকমত আলী মেহের জল্লাদের অত্যন্ত বিশ্বস্ত। তাকে যে আদেশ দেওয়া হয়, অবলীলায় সে সেই আদেশ পালন করে। এমনকি নদীতে ঝাঁপ দিতে বললেও তা-ই করে দেখায়। হেকমত তার বাল্যবন্ধু। দুজনে একসাথে রাজাকার বাহিনীতে যোগ দিয়েছে, এরপর আর ফিরে তাকাবার সুযোগ নেই। টাকা-পয়সা আসছে জলের ¯্রােতের মতো। যখনই দরকার পড়ে, গ্রামের ধনী-গরিব সবার বাড়িতেই হানা দেয়। লুট করে অর্থসম্পদ। আর সুন্দরী নারী পেলে তো কথাই নেয়। প্রথমে ভোগ করে মেহের জল্লাদ। তারপর হেকমত আলী। ভোগ শেষ হলে তাকে পাঠিয়ে দেওয়া হয় পাকিস্তানি ক্যাম্পে। ওখানে পদস্থ অফিসাররা তাকে নিয়ে খেলে মজাদার খেলা। খেলা শেষ হলে পুটুস। মানে দু-চারটা গুলি বুকে চালিয়ে দিয়ে নদীতে ফেলে দেওয়া হয় লাশ। এরপর সেটা শিয়াল-কুকুরের খাবার হয়ে যায়।
এই নির্মমতায় তাদের মন টলে না। এটা তারা করছে দেশের জন্যে। দেশকে দুই ভাগ হওয়া থেকে রক্ষা করতেই তারা এটা করছে। তবে এটা তো তাদের মুখের কথা, জানে মেহের জল্লাদ। আসলে নিজেদের স্বার্থ সিদ্ধিই আসল লক্ষ্য। দেশ-টেশ কিছুই নয়, ওটা একটা বাহানা মাত্র।
দালালি না করলে মাল পাবে না। এটাকে তারা গণিমতের মাল মনে করে। তবুও তারা জানে এটা গণিমতের মাল কি-না সন্দেহ আছে। গণিমত হতে হলে ধর্মযুদ্ধ হতে হয়। ন্যায়ের যুদ্ধ হতে হয়। এটাকেও তারা ন্যায়ের যুদ্ধ মনে করে। বাংলাকে পাকিস্তান থেকে আলাদা না হতে দিয়ে তারা দু’টি মুসলিম প্রদেশকে রক্ষা করছে, এই তাদের অভিপ্রায়।
যুদ্ধ করতে গেলে কেউ না কেউ তো মরবেই। মনে মনে ভাবে মেহের জল্লাদ। মানুষ না মরলে স্বার্থ সিদ্ধি হবে কী করে। তাই তারা মানুষ মারতে দ্বিধাবোধ করে না।
আর নারীতো চিরকালই ভোগের বস্তু। এটাই হওয়া উচিত বলে মনে করে মেহের আলী।
আজ তাই সে খুশি। একটা সুন্দর ভোগের বস্তু পেতে যাচ্ছে সে। এভাবেই তার ভোগের বস্তু দিনের পর দিন আসবে। মাল আসবে। ধনী হবে। আর মানুষ মারবে।
‘আচ্ছা, মেহের ভাই। একটা কথা জিজ্ঞাসা করতে পারি?’ অনেক অনুনয়ের জল্লাদ মেহেরকে জিজ্ঞাসা করলো হেকমত।
হাসলো জল্লাদ মেহের। তারপর চোখণ্ডদাঁত কিড়মিড় করে তার দিকে তাকিয়ে বললো, হ্যাঁ, বল। কী বলবি?
ঢোক গিললো হেকমত। মনে মনে ভাবছে প্রশ্নটা করে আবার কোন্ বিপদে পড়ে। তারপরও সাহস করে প্রশ্নটা করেই ফেললো। ‘আচ্ছা বস, আমরা যে এই সমস্ত মেয়ে মানুষদের ইজ্জত হরণ করছি, হত্যা করছি, লুট করছি, হাস-মুরগি চুরি করছি, মানুষের খাবার কেড়ে নিয়ে খাচ্ছি, এটা কি পাপ হবে না?’
জল্লাদ মেহেরের মুখের হাসি উবে গেল। ক্রমেই তার চোয়াল শক্ত হয়ে এলো। এটা দেখে হেকমত ভয় পেয়ে গেলো। সে বললো, ওস্তাদ ভুল করে থাকলে ক্ষমা করে দিন।’
মেহের জল্লাদ ধীরে ধীরে হেকমতের আরো কাছে এলো। তারপর তার গলা চেপে ধরে বললো, ‘আরে হারামজাদা, কারে কী কস্?’
গলায় ধরে রাখায় মৃত্যুর তীব্র যন্ত্রণায় কঁকিয়ে উঠলো হেকমত। মেহের বলতে লাগলো, শোন, আমরা যা করছি একদিন আল্লায় আমাগোরে মাফ কইরা দিবো। আমরা তো দ্যাশের লাইগা করছি। শেখ মুজিব দেশটারে দুইভাগ করতে চায়। আর আমরা দেশটারে টিকাইয়া রাখতে চাই। এর লাইগাই তো আমরা এইসব করছি। শোন, যুদ্ধের সময় অনেক কিছু করতে হয়, এটা পাপ হয় নারে বোকা। পাপ হয় না। বুঝলি?’
গলা দিয়ে স্বর বের হচ্ছে না। তবুও অতি কষ্টে নাক দিয়ে নাকি স্বরে উত্তর দিলো হেকমত, ‘ওস্তাদ, ছাইড়া দ্যান, মইরা যামু ত।’
হেকমতের জিভ বেরিয়ে পড়েছে। মারা যায় যায় অবস্থা। যে কোনো সময় প্রাণবায়ু বেরিয়ে যেতে পারে। তারপরও জল্লাদ মেহের তার গলা ছাড়ছে না। এবার সত্যিই বেহুঁশ হয়ে হেকমত ধপাস করে পড়ে গেলো মাটিতে।
হেঁসে উঠলো জল্লাদ মেহের। অনুচরদের বললো, ওর চোখে মুখে পানির ছিটা দে। দেখ হারামজাদা বাঁইচ্চা আছে কিনা। আমারে জ্ঞান দেয়!’
হেকমতের অবস্থা দেখে মেহের হাসতে হাসতে মূর্ছা যাচ্ছে যেনো।
অনুচরদের একজনের নাম কায়েস। সে দ্রুত পানি নিয়ে এসে হেকমতের চোখেমুখে পানির ছিটা দিতেই জ্ঞান ফিরে পেলো সে। তারপর উঠে বসলো। চারদিকে তাকিয়ে জল্লাদ মেহেরের হাসি কানে যেতেই আবারও মাটিতে পড়ে গেলো সে।
মেহেরের হাসি ক্রমাগত বাড়ছে। সে এ অবস্থায়ই হেকমতের দিকে তাকিয়ে বলতে লাগলো, আমারে মানুষ এমনেই মেহের জল্লাদ কয় নারে! জল্লাদ কারে কয় দেইখ্যা নে। আমি কাউরে ছাড়ি না। পাইলে যমেরেও ছাড়ুম না। মানুষ তো আমার কাছে তুচ্ছ একটা ব্যাপার।’ হাসতে হাসতে মেহেরের লুঙ্গি খুলে পড়ার উপক্রম হলো।
হেকমত মাটিতে শুয়ে থাকলেও তার জ্ঞান ফিরেছে। সে ভাবছে, এটা তো আসলেই একটা মহা শয়তান। মানুষের বুক ছিরেও সে জাহান্নামের মাঝে শয়তানি হাসি দেয়। এ তো সাধারণ শয়তান না রে বাবা। ধুরন্ধর শয়তান। ঠিক যেনো শয়তানেরই একটা সাক্ষাৎ চরিত্র। নিজ অনুচরদেরকেই গলা চেপে ধরে, মরুক আর বাঁচুক তাতে তার কিছু যায় আসে না।
সে মনে মনে পরিকল্পনা করলো, সময় পেলে জল্লাদ মেহেরের গলায়ও ছুরি চালাবে সে। তার মৃত্যুর আগেই তাকে শেষ হাসিটা শুনিয়ে দিবে।
এরপর উঠে বসলো সে, তারপর মেহেরের দুই পায়ে ধরে বিনয়ের সাথে বললো, ওস্তাদ আপনারে একটু পরীক্ষা করছিলাম। দেখলাম আপনে ঠিক আছেন। ঠিক জল্লাদের মতোনই। আপনে ধন্য। আপনেই পারবেন সব মুক্তিযোদ্ধারে খতম করতে। কারণ আপনের মনে দয়া-মায়া বলতেই কিছুই নাই।’
মেহেরের হাসি আরও বাড়লো। সে হাসতে হাসতেই বললো, হ, ঠিক কইছস্। তুই ঠিকই কইছস্। আমি সব ক’টা মুক্তিযোদ্ধারে কাইট্টা কাইট্টা শরীলে মরিচ মাখায়া এরপর নদীর পানিতে ভাসাবো। আর মেয়েগুলারে আমার দাসী বানায়া ....।’ কথাটা শেষ না করেই অনুচরদের আদেশ দিলো, যা ভালা কইরা রেকি কইরা আয় ওগো চৌকিতে। তারা কোন পজিশনে আছে, কয়টা অস্ত্র আছে সব জাইনা আয়। ওগোরে মুরগির মতো জবা কইরা এরপর আমার শান্তি অইবো।’
দেরি করলো না অনুচরগণ। হেকমত, কায়েস সহ সবাই দ্রুত বেরিয়ে গেলো। (চলবে)