প্রকাশ : ২৫ মার্চ ২০২৪, ০০:০০
মিজানুর রহমান রানার মুক্তিযুদ্ধের ধারাবাহিক উপন্যাস
এই জনমে

পূর্ব কথা :
আগন্তুকদের দেখে হতচকিতভাবে আড়ষ্ট কণ্ঠে মেয়েটা বললো, ‘আমার নাম ঈষাণবালা’।
‘হ্যাঁ, তোমাকেই তো খুঁজছি আমরা।’ একযোগে বললো সবাই।
(পূর্ব প্রকাশিতের পর)
ছয়.
মুষলধারে বৃষ্টি হচ্ছে। সেই বৃষ্টির সাথে প্রচণ্ড বাতাস বইছে। পথধরে এগুচ্ছে আমির, অনন্যা ও রূপালি। লক্ষ্য কলকাতায় পৌঁছা। তিনদিন, তিন রাত পার করে অনেক কৌশল ও কষ্ট করে কলকাতায় পৌঁছলো তারা।
ফিল্মের শুটিংয়ের জন্যে এর আগেও কয়েকবার কলকাতায় গিয়েছে আমির। কিন্তু আজকের কলকাতায় কেমন যেনো অচেনা শহর আর অন্যরকম অনুভূতি মনে হলো।
তিনজন মিলে একটা খুব ভাঙ্গাচোরা হোটেলে উঠলো তারা। হোটেলের লোকজন জানতে পেরেছে এরা বাংলার লোক, খুব খাতির যত্ন করে তাদেরকে নাশতা খাওয়ালো।
নাশতা খেয়ে রফিকুল ইসলামের সাথে যোগাযোগ করলো আমির। তিনিও এখন কলকাতায় আছেন। আমিরকে ভালোভাবেই জানতেন ও চিনতেন রফিকুল ইসলাম। এর পূর্বে কয়েকবার কথাও হয়েছে।
রফিকুল ইসলাম আর্মির একজন মেজর ছিলেন। ভদ্রলোক কথায় অমায়িক, কাজে পরিশ্রমী। কর্তব্যে খুবই সাহসী। দেশপ্রেমিক এই মানুষটা আর্মিতে চাকুরি করতেন। পাক আর্মিরা বাঙালিদের ওপর নির্বিচারে হামলা করার পর তিনি চট্টগ্রামের হালিশহর ক্যাম্পে ফিরে না গিয়ে দেশের জন্যে যুদ্ধ শুরু করেছেন। কিছুদিন যুদ্ধ করে এরপর প্রয়োজনীয় রসদের জন্যে চলে এসেছেন কলকাতায়।
দুপুর দুটায় সেই প্রতীক্ষিত ক্ষণ এলো। কলকাতার বাংলাদেশ আর্মি হেড কোয়াটারে দেখা হলো তাদের। একটা কেদারায় বসে আছেন রফিকুল ইসলাম। তাঁর সামনে গিয়ে সালাম দিতেই কিছুক্ষণ আমিরের দিকে তাকিয়ে রইলেন তিনি। তারপর স্বভাবসুলভ হাসি উপহার দিয়ে তিনজনের দিকেই বসার ইঙ্গিত করে চায়ের কথা বললেন পাশে দাঁড়ানো একজনকে।
অনন্যাকে প্রশ্ন করলেন, কেমন আছেন আপনি?
অনন্যা সব খুলে বললো। কীভাবে পাক আর্মিরা তার বাড়িতে হামলা করেছে, কীভাবে সে এদের হাত থেকে পালিয়ে এসেছে সবই শুনলেন তিনি। এরপর আমিরের দিকে তাকাতেই অনেক কষ্টে সবকিছু খুলে বললো আমির।
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে রফিকুল ইসলাম বললেন, ‘আজ আমরা এক দুঃসময়ের মুখোমুখি। আমাদের এই বাংলায় আজ পাক আর্মিদের যে জুলুম নির্যাতন লুণ্ঠন ও রক্তের বন্যা বইছে তার অবসান হবে। বঙ্গবন্ধু সারাটি জীবন দেশের জন্যে সংগ্রাম করতে করতে আজ পাকিস্তানের কারাগারে বন্দি। আমরা দেশকে মুক্ত করবো, বঙ্গবন্ধুকে মুক্ত করবো। আর বাংলার সাধারণ মানুষকে এই পাকিস্তানী জঘন্য নরপিশাচদের কবল থেকে উদ্ধার করবো। তাই আমাদের প্রতিজ্ঞা হচ্ছে, ডু অর ডাই। হয়তো দেশকে এই রাজাকার ও পাকিস্তানীদের কবল থেকে রক্ষা করবো, অন্যথায় নিজেদের জীবন বিলিয়ে দেবো অন্যায়ের প্রতিকারে। তোমরা কি প্রস্তুত?’
সমস্বরে তিনজনই মুষ্টিবদ্ধ হাত তুললো। ধ্বনিত হলো, ‘জয় বাংলা’। বাতাসে সেই উচ্চারণ ছড়িয়ে পড়লো।
‘শোনো, তোমাদের মনোবল চাঙ্গা করার জন্যে একটা যুদ্ধের কথা বলি।’ বলে চললেন রফিকুল ইসলাম। এরপর তিনজনের আপাদমস্তক জরিপ করে বলতে লাগলেন, ঢাকা এবং অন্যান্য স্থানে নৃশংস অভিযানের প্রাথমিক সাফল্যে উৎফুল্ল ইয়াহিয়া তার বাহিনীকে গণহত্যার নির্দেশ দেয়। তাই পাকিস্তানি সৈন্যরা যাকেই পেয়েছে তাকেই হত্যা করেছে এবং তাদের অভিযানের এলাকায় ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছে অবলীলাক্রমে। মুক্তিযোদ্ধা তা সত্ত্বেও প্রাণপণ প্রতিরোধ গড়ে তোলে। তবে আমরা সচেতন ছিলাম যে, পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে এই প্রতিরোধ দীর্ঘদিন ধরে এভাবে চালিয়ে যাওয়া যাবে না। কারণ আমাদের ছিলো অল্পস্বল্প লোকবল এবং হালকা অস্ত্রশস্ত্র। অন্যদিকে পাকিস্তানিরা ব্যাপক আর্টিলারি শেলিং চালানোর কারণে তাদের আক্রমণ প্রতিহত করতে গিয়ে আমাদের অস্ত্র ও গোলাবারুদ দ্রুত শেষ হয়ে যাচ্ছিল। এক সময় পাকিস্তানি সৈন্যরা আমাকে লক্ষ্য করে গুলিবর্ষণ শুরু করে। একটা গুলি এসে আমার ডানহাতে ধরা স্টেনগানে লাগলে সেটি ছিটকে কোথায় উড়ে গেল। আমি মুহূর্তে দেয়ালের উপর লাফিয়ে উঠেই দারুণ বেগে পড়ে যাই ওপাশে। তারপর দ্রুত সেখান থেকে চলে গেলাম লাফিয়ে লাফিয়ে, ক্রল করে, কখনও দৌড়ে। এদিকে পাকিস্তানি সৈন্যরা এলোপাতাড়ি গুলিবর্ষণ করে চলছে। তাদের শিকার হাতছাড়া হয়ে যাওয়ায় তারা যেন উন্মাদ হয়ে উঠল। বাম উরুতে ব্যথা বোধ করছিলাম তখন, বেশ রক্ত ঝরছিল এবং পরনের ট্রাউজারের একটা অংশ ছিঁড়ে হাঁটুর কাছ পর্যন্ত ঝুলে পড়ছিল।’
এই বলে তিনি থামলেন, তারপর তিনজনের মুখের দিতে তাকিয়ে রইলেন। তিনি দেখলেন, তাদের মুখাবয়ব কঠিন হয়ে চোখ দিয়ে যেনো বিদ্যুতের ফুলকি বের হচ্ছে। চোখগুলো অনাগত নিশানা টার্গেট করছে পাকিস্তানি শকুনদের বুকে। তারা বাঙালির বুকের যে রক্ত ঝরাচ্ছে তার প্রতিশোধ আকাঙ্ক্ষা এদের চাহনিতে।
এরপর বললেন, ‘স্বাধীনতার যুদ্ধ কোনো সামরিক অভিযান নয়-স্বাধীনতার যুদ্ধ জনগণের যুদ্ধ। জনগণের অংশগ্রহণ ব্যতীত কোনো স্বাধীনতা সংগ্রাম হতে পারে না, মুুক্তির সশস্ত্র চূড়ান্ত যুদ্ধে বিজয় অর্জন সম্ভব হয় না।’
এরপর তিনি বললেন, তোমরা আজ বিশ্রাম নাও। আগামীকাল থেকে তোমাদের প্রশিক্ষণ শুরু হবে।’
কথাটা শোনার পর থেকে রূপালির মনে হতে লাগলো, এবার সে জীবনের প্রকৃত মানে পেয়েছে। এই বার জীবনকে সে কাজে লাগানোর সুযোগ পেয়েছে। তার দুচোখে ভেসে উঠলো, যুদ্ধ, গোলাগুলি আর আর্তচিৎকার। সেই চিৎকারগুলো রাজাকার আর পাক আর্মিদের, যারা এতোদিন তাকে নিষ্পেষণ করেছিলো তিলে তিলে। রূপালি মনে মনে প্রতিজ্ঞা করলো, আল্লাহর কসম, এই দেশ থেকে একটা পাক আর্মিকেও জীবন নিয়ে ফিরে যেতে দেবো না। ওদের রক্তের ওপর মাছি বসার সুযোগও পাবে না। তিলে তিলে ওদেরকে মারবো আমরা।
এ সময় বঙ্গবন্ধুর সেই কথাটি মনে হলো তার, ‘বাঙালি যখন মরতে শিখেছে, তখন তাদেরকে কেউ দাবায়ে রাখতে পারবো না।’
রফিকুল ইসলাম রূপালীর দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘কী ভাবছো তুমি? তুমি কি দেশের জন্যে নিজকে উৎসর্গ করতে চাও? যুদ্ধে যেতে চাও?’
‘জি¦। আমি যুদ্ধে যেতে চাই। আমি আমার দেশের জন্যে নিজকে বিলিয়ে দিতে চাই। আমার জীবনটাকে যারা তিলে তিলে ধ্বংসের পথে এগিয়ে দিয়েছে, তাদেরকে চরম শিক্ষা দিতে চাই’।
আমিরের চোখগুলো বড় বড় হয়ে গেলো। এই নারীকে সে এভাবে আর দেখেনি। যেনো একটি অগ্নিগর্ভা পাহাড়, যার বুক চিরে বের হচ্ছে গলিত লাভা।
রফিকুল ইসলাম বললেন, তোমরা একটু অপেক্ষা করো। আরো ক’জন যুবক-যুবতী আসবে এখনই। তাদের সাথে তোমাদের পরিচয় করিয়ে দিবো।
চা পর্ব শেষ হলে ধীরে ধীরে কামরায় প্রবেশ করলো ইমতিয়াজ, তুষার, ইরফান, অধরা, ঈশাণবালা, তিরণা। মেজর রফিক সবার সাথে সবার পরিচয় করিয়ে দিলেন। তারপর আমিরের দিকে তাকিয়ে বললেন, এরাও তোমাদের মতোই কঠিন শপথ নিয়ে এসেছে দেশকে শত্রুদের হাত থেকে রক্ষা করবে বলে। এখন তোমরা সবাই মিলে একটা দল তৈরি হয়েছো, যারা নিজের জীবন উৎসর্গ করতে প্রস্তুত। আমি তোমাদের নিয়ে গর্ববোধ করি। তোমাদের মতো অদম্য সাহসী ছেলেমেয়েরা থাকলে বাংলা মায়ের চিন্তার কোনো কারণ নেই। বাংলার জয় হবেই ইনশাল্লাহ।
কথাগুলো শোনার পর সবার মধ্যে একটা স্বর্গীয় খুশির বান চলে এলো। দেশকে শত্রুমুক্ত করে স্বাধীন করার অভিপ্রায়ে সবাই উদ্বেলিত হয়ে একসাথে হাতে হাত রেখে শপথ করলো।
রফিকুল ইসলাম বললেন, ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পশ্চিম পাকিস্তানি আধিপত্য মেনে নিতে বাধ্য করার জন্যে পাকিস্তান সেনাবাহিনী নিরস্ত্র বাঙালিদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। সেদিন রাত ৮টা ৪০ মিনিটে আমরা চট্টগ্রামে নিয়োজিত ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলের (ইপিআর) সশস্ত্র সৈন্যদের সংগঠিত করে সেখানে পাকিস্তানি সৈন্যদের বিরুদ্ধে প্রথম সশস্ত্র যুদ্ধ শুরু করেছিলাম। এর দুঘণ্টা পর, রাত সাড়ে ১০টায় পাকিস্তানি সৈন্যরা তাদের পরিকল্পনা অনুযায়ী ঢাকায় এবং পূর্ব পাকিস্তানের অন্যান্য স্থানে বাঙালিদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। শুরু হয় বাঙালি হত্যাযজ্ঞ।
এ কথাগুলো বলে সবারই মুখের দিকে তাকালেন তিনি। তারপর আরো কিছু কথা শেষে বলতে লাগলেন, আমাদের নেতা বঙ্গবন্ধু। যিনি সারাটি জীবন বাঙালির স্বাধিকার ও স্বাধীনতার জন্য আন্দোলন করে জেলে জেলেই কাটিয়েছেন। আজও তিনি পাকিস্তানের কারাগারে বন্দি। আমরা বাঙালিরা আজ আর ঘুমিয়ে থাকতে পারি না। তাই আমরা হয়তো বাঁচবো, না হয় বীরের মতো যুদ্ধক্ষেত্রে মরবো। কি ঠিক আছে?
সবাই হাত মুষ্টিবদ্ধ করলো। তারপর উপরের দিকে হাতগুলো রেখে বললো, হ্যাঁ, আমাদের নেতা বঙ্গবন্ধু। আমরা বঙ্গবন্ধুর পথেই চলবো, তার চালিত পথে থেকে আমরা এই দেশকে শত্রুমুক্ত করবো। আমাদের জীবন দেশের জন্যে উৎসর্গ করবো। এটাই আমাদের প্রতিজ্ঞা।’
রফিক সাহেবের মুখে আনন্দের ঝিলিক। তিনি বলতে লাগলেন, আমাদের এই স্বাধীনতাযুদ্ধে তোমাদের মতো পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষভাবে আজ পুরো বাঙালি জাতিই অংশ নিয়েছে। তবে কিছুসংখ্যক ব্যক্তি পাকিস্তান সেনাবাহিনীর দালালি করছে এবং মুক্তিযুদ্ধে আমাদের বিরুদ্ধে অংশ নিয়েছে। এই দালালরা এখন পরিচিত রাজাকার এবং শান্তি কমিটির সদস্য হিসেবে। হয়তো এদের মধ্যে অতি নগণ্য কেউ কেউ পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ভয়ে তাদের সাথে যোগ দিয়েছে। তাদের কয়েকজন হয়তো পাকিস্তান রাষ্ট্রের প্রতি তেমন অনুগতও ছিলো না। কিন্তু মৌলবাদী রাজনৈতিক দল জামাতে ইসলামীর সশস্ত্র অঙ্গ সংগঠন আল বদর ও আলশামস স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়েই পাকিস্তানিদের সহায়তা করে এবং বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগ, ধর্ষণ এবং হত্যাযজ্ঞ চালায়।’
‘শুকরিয়া মেজর সাহেব।’ বললো আমির। আপনার কথায় আমরা আসল শত্রুমিত্র বুঝতে পেরেছি এবং আমাদের যুদ্ধের দিকনির্দেশনা পেয়েছি। তবে এর আগে আমরা এভাবে এসব কথা উপলব্ধি করতে পারিনি। আজ আমরা বুঝতে পেরেছি, আমাদেরকে কী করতে হবে।’
মেজর সাহেব এবার ইরফানসহ তাদের সঙ্গীদের মুখের দিকে তাকালেন। তিনি দেখলেন, তাদের মুখের পেশাগুলো একটা টান টান উত্তেজনায় ভরপুর। তাদের উদাস চোখে কঠিন আলোর ঝলকানি। কী এক শক্ত শপথে তাদের হাতগুলো মুষ্টিবদ্ধ হয়ে আছে। তিনি একটা শান্তির পরশ পেলেন।
সবাইকে লক্ষ্য করে বললেন, আগামীকাল থেকে তোমাদের প্রশিক্ষণ শুরু হবে। প্রশিক্ষণ শেষ হলে তোমাদেরকে অস্ত্রশস্ত্রসহ পাঠানো হবে যুদ্ধের জন্যে। যাও, বিশ্রাম নাও।
সবাই একটা হোটেলের কক্ষে মিলিত হলো। ছোট্ট একটা রুমে থাকতে হবে নয়জনের। এখানে নারী আছেন ৫জন। আর ৪জন পুরুষ। প্রথমে কারো কারো মধ্যে একটা সঙ্কোচ ছিলো একসাথে থাকার বিষয়ে। কিন্তু পরে তাদের সেই সঙ্কোচ চলে যায় ইরফানের কথায়।
ইরফান সবার চোখের দিকে তাকিয়ে বললো, আমি জানি তোমাদের মধ্যে একটা সঙ্কোচ থাকতে পারে। কিন্তু এই পরিস্থিতিতে আমাদের সব ধরনের সঙ্কোচ দূর করে একসাথে থাকার অভ্যাস করতে হবে। কারণ যুদ্ধক্ষেত্রে আমাদেরকে আরো কঠিন অবস্থায়ও থাকতে হতে পারে। পাহাড়ে, জঙ্গলে ময়দানে এর চেয়ে কঠিন পরিস্থিতিতে খেয়ে, না খেয়ে শত্রুদের সাথে লড়াই করতে হবে। আর সেই লড়াইয়ে আমাদেরকে জিততেই হবে। আমাদের বিজয় মানেই বাংলা মায়ের বিজয়। আর আমাদের পরাজয় মানেই হচ্ছে বাংলার নির্যাতিত নিষ্পেষিত মানুষের পরাজয়।
অধরা এক পলকে ইরফানের কথাগুলো শুনছিলো। তার হৃদয়ে কেমন জানি কথাগুলো আন্দোলিত হতে লাগলো। সে তিরণার দিকে তাকিয়ে বললো, আসলে আমাদের ভাগ্য খুব ভালো যে, সেদিন আমরা রাত-বিরাতে বেরিয়ে পড়েছিলাম। আর সেই কারণেই আজ আমরা এই মহান যুদ্ধে শরীক হতে পেরেছিলাম। তা না হলে কোনোকালেই হয়তো তা সম্ভব হতো না।
এমন সময় অধরার চোখ পড়লো রূপালির দিকে। তাকে প্রশ্ন করলো, তুমি কীভাবে এই যুদ্ধে আসার সুযোগ পেলে?
রূপালি নির্বিকার। সে ভাবছে তার ভাগ্যই তাকে নিয়ে এসেছে এই অসম যুদ্ধে। যেখানে পাক আর্মিরা হাজার হাজার সৈন্য নিয়ে এই দেশটাকে আক্রমণ করে নারীদের লুটেপুটে ছোবড়া বানিয়ে হাজার হাজার মানুষকে হত্যা করছে, সেখানে বাঙালির প্রায় বিনা অস্ত্র ও ট্রেনিংয়ে শুধুমাত্র দেশের প্রতি ভালোবাসায় আজ সামনের পানে এগিয়ে যাওয়া।
সে অধরার কথার উত্তর না দিয়ে তাকালো ঈষাণবালার দিকে। মেয়েটি যে তার মতোই একজন নির্যাতিতা তা সে ভালোভাবেই বুঝতে পারলো। তাই সে ঈষাণবালার দিকে এগিয়ে গেলো।
তারপর তার অপলক চোখের দিকে তাকিয়ে বললো, আমি জানি তুমিও আমার মতোই একজন নির্যাতিতা নারী। আমাদের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে বলেই আজ আমরা সবাই এখানে এসেছি। আমরা হয় জিতবো, না হয় মরবো-- এটাই আমাদের প্রতিজ্ঞা।
হাততালি দিলো সবাই। এবার কথা বললো অনন্যা-হ্যাঁ, আমাদের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে। যুদ্ধ ছাড়া আমাদের আর কোনো পথ খোলা নেই। আমাদেরকে হয় জিততে হবে, না হয় মরতে হবে। এটাই আজ আমাদের শপথ।
চার নারী এবার পরস্পর পরস্পকে জড়িয়ে ধরলো। আর ইরফান, তুষার, ইমতিয়াজ এবং আমির সবাই সবার বুকে বুক মিলালো। তারপর হাউমাউ করে কাঁদতে শুরু করলো দেশের জন্যে যুদ্ধে সামিল হওয়ার খুশিতে।
নারীদের যুদ্ধ জয়ের নেশায় খুশির কান্নায় এই যুবকদের চোখেও আনন্দের ঝিলিক দেখা গেলো।
এরপর মুখ খুললো ইশাণবালার। সে আমিরের দিকে তাকিয়ে বললো, চেয়েছিলাম একটা সাধারণ জীবন। অভিনয় করবো, নায়িকা হবো--জীবন চলবে জীবনের পথে। কিন্তু আজ জীবন চলছে মুক্তিযুদ্ধের পথে, ন্যায়ের পথে। বাঙালির অধিকার আদায়ের পথে। আজ আমি বঙ্গবন্ধুকে স্যালুট জানাই। বঙ্গবন্ধুই বাঙালিকে সঠিক পথ দেখিয়েছেন, যে পথে আমাদের সত্যিই যেতে হবে বহুদূর। আমরা সেই কঠিন পথে জীবনের সঠিক সময়টা ব্যয় করে নিজকে সময়ের আঙিনায় রেখে যেতে চাই, যাতে আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম আমাদের কাজের স্মরণ করে তারাও সঠিক পথে থাকে। দেশের পথে থাকে। দেশকে রক্ষায় ব্রতী হয়। আজ আমার কোনো দুঃখ নেই। পাক আর্মিরা আমরা দেহটাকে নষ্ট করেছে, কিন্তু আমার পবিত্র মনটাকে নষ্ট করতে পারেনি। আমি ধন্য তোমাদের মতো সাহসী সূর্য সন্তানদেরকে আমার পাশে পেয়ে।’
এরপরই তার দুচোখ বেয়ে অশ্রুফোঁটা ঝরতে লাগলো। এই অশ্রু কি আনন্দের নাকি সতিত্ব হারানোর দুঃখের তা সঠিক কেউ বুঝতে পারলো না।
তুষার এসে হাতে ধরলো ঈশাণবালার। তারপর তার চোখে চোখ রেখে বললো, তোমার সতিত্ব কেউ নষ্ট করতে পারেনি ঈশাণবালা। আমি তুষার কথা দিচ্ছি, আজই সবাইকে নিয়ে তোমাকে বিয়ে করবো। তারপর তোমার একজন অভিভাবক হিসেবে সারাটি জীবন তোমার সাথে কাটিয়ে দিবো। তোমার মতো নারী, যে কিনা দেশের শত্রুদের দ্বারা নির্যাতিত হয়েছো, তোমাকে স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করে আমি তোমার প্রতি দেশের ঋণের বোঝা মাথায় তুলে নিতে চাই।’
তুষারের কথায় কিছুক্ষণের জন্যে অবাক সবাই। যখন তাদের জ্ঞান ফিরলো তখন সবাই তুষারকে জড়িয়ে ধরলো তার উদারতায়। তারপর অনানুষ্ঠানিকভাবে ওই রুমেই তাদের বিয়ে হয়ে গেলো।
উৎফুল্ল সবাই। হঠাৎ করে আমির এসে দুজনকে ফুল দিয়ে অভিনন্দন জানালো। তারপর হাসতে হাসতে তুষারকে বললো, আমার নায়িকাকে তুমি কিন্তু কেড়ে নিলে তুষার?
হাসির রোল পড়লো ছোট্ট এই রুমটাতে। এই প্রথম তারা যেনো বিষাদের মাঝেও আনন্দ খুঁজে পেয়েছে।
ইরফান সবার হাসি থামিয়ে বলতে লাগলো, ‘ভাইয়েরা ও বোনেরা। আজ আমরা এক কঠিন বাস্তবতার মাঝে নিজেদেরকে চিনতে পেরেছি। বাস্তবতা দুই প্রকার। একটি দৃশ্যমান বাস্তবতা আর অপরটি অদৃশ্যমান বাস্তবতা। দৃশ্যমান বাস্তবতা আমরা দেখতে পাই, আর অদৃশ্যমান বাস্তবতা আমরা চোখে দেখতে পাই না, যা অবশ্যই আছে এবং বাস্তব। তবে এর বাইরেও আরেকটি বাস্তবতা আছে। যেমন পর্দা। আমরা অপরের সামনের অংশটি দেখতে পাই, কিন্তু তার পেছনের অংশটি দেখতে পাই না। অথচ একজন সেটিসহ দৃশ্যমান, অদৃশ্যমান ও পর্দার পেছনের বাইরে সবকিছুই অনায়াসে দেখেন, তিনিই হচ্ছেন আল্লাহতায়ালা। আল্লাহতায়ালা আমাদের প্রতি অনেক মেহেরবান বলেই আজ আমরা দুটো বাস্তবতাই দেখতে পাচ্ছি। আমরা দেখতে পাচ্ছি একে অপরের কঠিন সমস্যাগুলো। তাই অন্যদেরকে সুখী করতে আমরা এগিয়ে এসেছি। আমরা শুধু আমাদের বাস্তবতাগুলোর জন্যেই কাজ করছি না বরং দেশেরও কঠিন বাস্তবতাকে সামনে রেখে কাজ করছি। আজ আমাদের যেমন ব্যক্তিগত বাস্তবতার সমস্যার আমরা দেখতে পাচ্ছি, ঠিক তেমনি আমাদের দেশেরও কঠিন বাস্তবতাকে আমরা দেখেশুনে বুঝে দেশের শত্রুদের বিরুদ্ধে কাজ করার জন্যে ঐক্যবদ্ধ হয়েছি। আল্লাহ তায়ালা যাতে আমাদেরকে সকল বাস্তবতাকে উপলব্ধি করে সফল হওয়ার সুযোগ দান করেন।’
‘আল্লাহতায়ালা আমাদেরকে দেশের জন্যে কাজ করার জন্যে কবুল করুন।’ সমস্বরে বললো সবাই। (চলবে)