বৃহস্পতিবার, ০৩ এপ্রিল, ২০২৫  |   ২৬ °সে
আজকের পত্রিকা জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয়
ব্রেকিং নিউজ
  •   হাইমচরে মাটি বোঝাই বাল্কহেডসহ আটক ৯
  •   কচুয়ায় কৃষিজমির মাটি বিক্রি করার দায়ে ড্রেজার, ভেকু ও ট্রাক্টর বিকল
  •   কচুয়ায় খেলতে গিয়ে আগুনে ঝলসে গেছে শিশু সামিয়া
  •   কচুয়ায় ধর্ষণের অভিযোগে যুবক শ্রীঘরে
  •   ১ হাজার ২৯৫ কেজি নিষিদ্ধ পলিথিন জব্দ করেছে কোস্ট গার্ড

প্রকাশ : ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ০০:০০

বিতর্কে চিহ্নিত ভুল ও তার প্রতিকার

ডাঃ পীযূষ কান্তি বড়ুয়া
বিতর্কে চিহ্নিত ভুল ও তার প্রতিকার

ভুল মানুষের স্বাভাবিক প্রবৃত্তি। নির্ভুল মানুষ জগতে বিরল। জীবিত মানুষের ভুলের তিনটি দ্বার। কায়-মন-বাক্য। বিতর্কে কায়া বা শরীরের অস্বাভাবিক এবং অশোভন সঞ্চালনা জয়ের জন্যে বড়ো প্রতিবন্ধকতা। দুটো হাত, দেহের ঊর্ধাংশ এবং মুখমণ্ডলের অনিয়ন্ত্রিত সঞ্চালনা বিতার্কিককে বেকায়দায় ফেলে দেয় এবং শ্রোতা ও বিজ্ঞ বিচারক মণ্ডলিকে বিব্রত করে তোলে। ফলে বিচারকার্যে তার গভীর প্রভাব পড়ে। কারও কারও দুটো হাত অধিক মারমুখি হয়ে উঠে, কারও কারও তর্জনী অধিক কর্তৃত্ববাদী হয়ে দাঁড়ায়। বিতর্কে এসব শারীরিক ভাষা নিয়ন্ত্রণ করা দরকার। দুটো হাতকে নিজের বুকের উচ্চতায় রেখে শালীনভাবে তা সঞ্চালনা করলে তা দ্বারা বক্তব্যকে পূর্ণতা দেওয়া যায়। বিতর্কে পেশি নয়, যুক্তিকেই শাণিত করতে হয়। কেউ কেউ গ্রীবাকে এতো বেশি ডানে-বাঁয়ে হেলায়, মনে হয় কোনো কত্থক নৃত্যশিল্পী মঞ্চে উঠেছেন। এসব ক্ষেত্রে ভালো যুক্তি দিয়ে যা অর্জিত হয়, অতিরিক্ত অঙ্গভঙ্গির কারণে তা নষ্ট হয়ে যায়।

বিতর্কে মন যার নিবিষ্ট থাকে না তার পক্ষে নিবিড় হয়ে চিন্তা করা যেমন অসম্ভব, তেমনি প্রতিপক্ষের বক্তব্যের প্রতি অখণ্ড মনোযোগ ধরে রাখাও কঠিন হয়ে যায়। বিতর্কের মঞ্চে চঞ্চল মন বক্তাকে বা শ্রোতাকে ভালো যুক্তি ভুলিয়ে দিতে পারে এবং দুর্বল যুক্তির প্রতি প্রলুব্ধ করতে পারে। মনকে যে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না, বিতর্কের মতো বুদ্ধিবৃত্তিক বাচিক শিল্পে তার টিকে থাকা কঠিন। প্রত্যুৎপন্নমতিত্ব এখানে দরকার, তবে তা ভেবেচিন্তে। মাথায় অবশ্যই থাকতে হবে, ইটটি মারলে পাটকেলটি খেতে হয়। তাই যতক্ষণ বিতর্ক চলবে ততক্ষণ যেন মন বিচ্যুত না হয়।

বিতর্কে অধিক ভুল হয় বাক্-মাধ্যমে। তথা কথার মধ্য দিয়ে। অহেতুক বাক্য দিয়ে নিজের বক্তব্যকে প্যাঁচানোর কোনো দরকার নেই। নিজের মুখ দিয়ে সেই বাক্য বের করা উচিত, যা সত্য যা বাস্তব। দ্বাদশ পাঞ্জেরী-চাঁদপুর কণ্ঠ বিতর্ক প্রতিযোগিতায় এ যাবৎ বেশি ভুল বা প্রমাদ লক্ষ্য করা গেছে বাক্যের মাধ্যমে সংঘটিত হতে। কোনো বিতর্কে সভাপ্রধান ছিলেন না। কিন্তু বিতার্কিকদের অধিকাংশই বায়বীয় সভাপ্রধানকে সম্বোধন করেছেন। কেউ কেউ প্রতিপক্ষের অনুপস্থিতিতে শ্রেষ্ঠ বক্তা নির্বাচন ও পয়েন্ট অর্জনের এক পাক্ষিক বিতর্ক করতে গিয়ে বার বার বিজ্ঞ প্রতিপক্ষ বলে সম্বোধন করেছেন। এটা উপস্থিত দর্শকদের কাছেও হাসির খোরাক হয়েছে। কলেজ পর্যায়ে কোনো কোনো দলের বিতার্কিক সনাতনী বিতর্ককে সংসদীয় বিতর্কের ঘ্রাণ লাগিয়ে নষ্ট করেছেন। তারা বার বার যেমন মাননীয় স্পিকার বলে সম্বোধন করেছেন, তেমনি অন্যদিকে বলেছেন, 'মাননীয় স্পিকার, আজকের প্রস্তাবটি যাতে এ সংসদে পাস না হয়।' এ কথা শোনার পর বিজ্ঞ বিচারকেরা দ্বিধান্বিত ছিলেন, আদৌ ব্যালটে রায় দিবেন নাকি বিতর্কে পয়েন্ট দিবেন।

প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বিতার্কিকরা খুবই ছোট, তাই তাদের ভুল-ত্রুটি নিয়ে খুব বেশি উচ্চবাচ্য করার পরিসর নেই। একটা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বিতার্কিকেরা ভালো বিতর্ক করলেও তাদের দলনেতা বিতর্কের বিষয়টিকে পেঁচিয়ে বিপক্ষ দলের পক্ষে তার যুক্তি দেখিয়ে গেছেন। এটা বিচারকদের কাছে দিনশেষে আফসোসের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের কয়েকটি বিতর্ক দেখে বুঝা গেছে, যেসব শিক্ষক বা মেন্টর তাদের তৈরি করেছেন, তাঁরা হয়তো ভুলে গেছেন, এই কোমলমতি শিশুরা এখনও শৈশব পার করেনি। কাজেই তাদের চার মিনিটের স্ক্রিপ্টে দশ মিনিটের বক্তব্য ঢুকিয়ে দিয়ে লাভ নেই। বরং এতে খুদে বিতার্কিকদের কষ্ট বেড়েছে। তারা চার মিনিটে দশ মিনিটের স্ক্রিপ্ট অনুযায়ী বক্তব্য রাখতে গিয়ে তাদের সময়ের সাথে যুঝতে হয়েছে এবং গড় গড় করে মেট্রোরেল চালিয়ে বক্তব্য শেষ করতে হয়েছে। এটা হয়তো অনেকের জানা নেই, পদার্থবিজ্ঞানে শ্রুতিরেশ বলে একটা কথা আছে। কেউ কোনো আওয়াজ করলে তা মস্তিষ্কে দশমিক এক সেকেন্ড (০.১) পর্যন্ত শ্রুতিরেশ রেখে দেয়। এই সময়ের মধ্যে অন্য কোনো শব্দ যদি শ্রোতার কানে আসে, তবে শ্রোতার পক্ষে আগের শব্দ আর পরের শব্দ পৃথক করা যায় না। এই কারণে বক্তব্যকে শ্রবণযোগ্য সীমায় রাখতে হলে তাতে পর্যাপ্ত বিরতি থাকতে হয়। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক এই যে, সবাই হড়হড় করে বলতে গিয়ে কোনো কিছুই মস্তিষ্কে দাগ কাটিয়ে তোলার যোগ্য হতে পারেনি।

অগ্রযাত্রা পর্বের একটা বড় ত্রুটি হলো সবাই কম-বেশি স্ক্রিপ্ট দেখে বক্তব্য পেশ করা। তাও আবার এতোবড়ো স্ক্রিপ্ট ছিলো যে তার কারণে বক্তার মুখ ঢেকে গিয়েছিলো। অনেকের বক্তব্যরত মুখ দেখা যায়নি। অথচ বিতর্ক হচ্ছে নিজের মতো করে নিজের যুক্তি পেশ করা। কারও মুখে ঝাল খাওয়া কিংবা অন্যের লিখিত বক্তব্য আরেকজন পাঠ করা কোনোমতেই বিতর্ক হতে পারে না। তবে পরবর্তী পর্যায়গুলো হতে স্ক্রিপ্ট দেখে দেখে বক্তব্য দিলে নম্বর কাটানোর শাস্তি আছে।

বিতর্কে স্ক্রিপ্ট মুখস্থ করা নয়, বরং ধারণা নেওয়ার জন্যেই তৈরি করা হয়। এটা করা হয় যাতে কোনো পয়েন্ট বাদ না যায়। অগ্রযাত্রা পর্যায়ে বাছাই করা বিতার্কিকেরা সুযোগ পেয়েছে। সুতরাং প্রান্তিক পর্যায়ে যে ভুলগুলো উপেক্ষা করা হয়েছে, অগ্রযাত্রা পর্যায়ে সে ভুলগুলোকে অণুবীক্ষণ যন্ত্রের নিচে রেখেই দেখা হবে। এ কথা আমরা বার বার বলি যে, বিতর্ক প্রতিযোগিতার মঞ্চে কুশলাদি বিনিময় করার সুযোগ যেমন নেই তেমনি কোনো দরকারও নেই। কুশলাদি বিনিময়ে যে তিরিশ বা পঁয়তাল্লিশ সেকেন্ড ব্যয়িত হয় তাতে একটা বা দেড়টা যুক্তি প্রদর্শনের সময় অপচয় হয়ে যায়।

বিতর্ক একটি স্বতঃস্ফূর্ত বাচিক শিল্প মাধ্যম। এখানে কারও শেখানো বুলির কোনো দাম নেই। বক্তা নিজে নিজের চিন্তা হতে স্বয়ং কী কী প্রকাশ করতে পারে তা-ই হলো বিচার্য বিষয়। কাজেই অগ্রযাত্রা পর্ব হতে বিতার্কিকদের যেমন আরও চিন্তাশীল হতে হবে, তেমনি আরও কুশলী এবং কৌশলী হতে হবে। বিচারকের আসনে বসে এটা বুঝা যায়, বিতার্কিকদের বড়ো ঘাটতি হলো উপযুক্ত বাড়ির কাজ না করা। তারা দল হিসেবে একসাথে পর্যাপ্ত সময় ধরে না বসা এবং যথার্থভাবে মেন্টরিং না হওয়ার কারণে দলগত সংহতিতে দুর্বলতা রয়ে যায়। ফলে তাদের বক্তব্য একটা দল হিসেবে প্রদর্শিত হয় না। তাদের বক্তব্য দলীয় বক্তব্য না হয়ে ব্যক্তিগত অভিমত হয়ে যায়। কাজেই পরবর্তী পর্যায়গুলোতে তিনজন বিতার্কিক মিলে যাতে একটা পরিপূর্ণ দল হয়ে উঠে সেদিকে মনোনিবেশ করা জরুরি। তবেই বিতর্ক স্মার্ট ও মনোজ্ঞ হয়ে উঠবে।

ডাঃ পীযূষ কান্তি বড়ুয়া : অধ্যক্ষ, চাঁদপুর বিতর্ক একাডেমি (সিডিএ); গ্রন্থকার : বিতর্ক সমগ্র, বিতর্ক বিধান ও বিতর্ক বীক্ষণ; সব্যসাচী লেখক।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়