শুক্রবার, ০৪ এপ্রিল, ২০২৫  |   ২৮ °সে
আজকের পত্রিকা জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয়
ব্রেকিং নিউজ
  •   হাইমচরে মাটি বোঝাই বাল্কহেডসহ আটক ৯
  •   কচুয়ায় কৃষিজমির মাটি বিক্রি করার দায়ে ড্রেজার, ভেকু ও ট্রাক্টর বিকল
  •   কচুয়ায় খেলতে গিয়ে আগুনে ঝলসে গেছে শিশু সামিয়া
  •   কচুয়ায় ধর্ষণের অভিযোগে যুবক শ্রীঘরে
  •   ১ হাজার ২৯৫ কেজি নিষিদ্ধ পলিথিন জব্দ করেছে কোস্ট গার্ড

প্রকাশ : ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ০০:০০

মুক্তচিন্তা বিনির্মাণে বিতর্কের ভূমিকা

ডাঃ পীযূষ কান্তি বড়ুয়া
মুক্তচিন্তা বিনির্মাণে বিতর্কের ভূমিকা

বলা হয়ে থাকে, মানুষ জন্মগতভাবেই স্বাধীন। এই স্বাধীনতা কেবল শিকলমুক্ত জীবনের জন্যে নয়, বরং মুক্তভাবে চিন্তা করার সক্ষমতার কারণেই মানুষ স্বাধীন। কারাগারের বদ্ধ প্রাচীর ঘেরা বন্দি জীবনেও মানুষ তার নিজস্ব চিন্তার কারণে স্বাধীনতা ভোগ করতে পারে। কাজী নজরুল ইসলামকে হুগলী জেলে বন্দি করা হলেও তাঁর চিন্তার স্বাধীনতার কারণে কারাগারে থেকেও তিনি রচনা করেছেন বিস্ফোরক কালজয়ী গ্রন্থ ‘রাজবন্দীর জবানবন্দী’। প্রাচীন গ্রিসে জ্ঞান-বিজ্ঞানের চর্চায় বিতর্কের ভূমিকা ছিল অপ্রতিম। দার্শনিক চিন্তনকে নির্মাণ ও অগ্রায়নে বিতর্ক একটি উৎকৃষ্ট মাধ্যম। নিজের চিন্তাকে বিনির্মাণে বিতর্কের চর্চা একটি উৎকৃষ্ট মাধ্যম। মুক্তচিন্তা ব্যতীত কোনো জ্ঞানই পরিশুদ্ধ নয়। যে জ্ঞানে সীমাবদ্ধতা আছে সে জ্ঞান যথার্থ জ্ঞান নয়। বিতর্কের মাধ্যমে জ্ঞানকে প্রজ্ঞায় পরিণত করা যায়। বিজ্ঞানী স্টিফেন হকিংস্ প্যারালাইসিসে আক্রান্ত হয়ে চলতে অক্ষম থাকলেও তাঁর মস্তিষ্ক ছিলো সচল এবং তাঁর চিন্তা ছিলো স্বাধীন তথা মুক্ত। ফলে তিনি তাঁর হুইল চেয়ারে বসেও মহাজাগতিক সত্যকে উন্মোচন করতে পেরেছেন। তিনি তাঁর আবিষ্কৃত সত্যকে অন্যান্য বিজ্ঞানী মহলে প্রকাশ করে বিতর্কে অবতারণা করতেন, যা থেকে চূড়ান্ত সময়ে সত্য প্রকটিত হতো। কাজেই মুক্ত চিন্তার প্রকাশ ও প্রসারে বিতর্কের চেয়ে আর কোনো উৎকৃষ্ট মাধ্যম নেই।

বিতর্কের মূল উদ্দেশ্যই হলো জ্ঞানকে প্রজ্ঞায় পরিণত করে সত্যকে অবমুক্ত করা এবং পরিশীলিত করা। সত্য হলো জগতে দ্বিবিধ। আপেক্ষিক সত্য এবং পরম সত্য। আপেক্ষিক সত্য হতে বিতর্কের মাধ্যমে মুক্ত চিন্তার প্রয়াসে পরম সত্যে উপনীত হওয়া যায়। বিতর্ক কেবলমাত্র জয়-পরাজয়ে আবদ্ধ থাকে না। বিতর্ক মূলত মানুষের চিন্তায় আলোকসম্পাত করে ব্যক্তির মননস্তরের অন্ধকার দূর করে দেয়। একজন সাধারণ মানুষ কোন তথ্যকে কেবলমাত্র তথ্য হিসেবেই বিবেচনা করে। কিন্তু একজন বিতার্কিক কোন তথ্যকে বিশ্লেষণের মাধ্যমে তাকে আরও দশজন মানুষের জন্যে মুক্ত চিন্তার খোরাক জুগিয়ে দেয়। বিতার্কিকের বিশ্লেষণী দক্ষতার কাছে সত্য নিজেকে লুকিয়ে রাখতে পারে না। কেউ একজন বলেছে বলেই কোনো বিবৃতি সত্য হবে তা কোনো বিতার্কিক সহজে মেনে নিতে অভ্যস্ত নয়, যতক্ষণ না পর্যন্ত সে নিজের যুক্তি ও বিশ্লেষণী দক্ষতায় সেটার সত্য কিংবা প্রকৃত রূপ উদ্ঘাটন করতে পারে।

বিতর্ক একাধারে একটা বিদ্যা এবং একটা শিল্প। শিল্পের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে বুদ্ধির মুক্তি। আর বিদ্যার বৈশিষ্ট্য হচ্ছে মুক্তচিন্তার বিকাশ। যে জাতি যতবেশি বুদ্ধির মুক্তির দিকে ধাবিত হয়, সে জাতি ততই সমৃদ্ধি ও উন্নতিকে বরণ করতে পারে। ভৌগোলিক কিংবা রাজনৈতিক পরাধীনতার শৃঙ্খলের চেয়ে বৌদ্ধিক পরাধীনতার মণিহার আরও বেশি কন্টকতুল্য, আরও বেশি নিবর্তনমূলক। চিন্তার অবরুদ্ধতায় ব্যক্তি বা জাতি কেউই সমৃদ্ধি অর্জন করতে পারে না। জাতিকে এগিয়ে নিতে হলে স্বাধীনভাবে চিন্তার প্রতিফলন ঘটাতে হবে এবং মুক্তবুদ্ধির বাস্তবায়ন ঘটাতে হবে। বিতর্ক আমাদের সেই মুক্তবুদ্ধির বিনির্মাণে সহায়তা করে। বিতর্ক যেমন একদিকে পরমত সহিষ্ণুতা তৈরি করে তেমনি আপন মতের জন্যে একটি শক্ত ভিত্তিও নির্মাণ করে। বিতর্ক প্রথমে ব্যক্তির অন্তর্দৃষ্টির উন্মোচন করে। অতঃপর সেই দৃষ্টিকে বিশ্লেষণী দক্ষতায় পূর্ণতা দান করে। বিতর্ক আনুগত্যের মধ্যে রেখে মুক্তি আনয়ন করে। বিতর্কের শৃঙ্খলায় ব্যক্তি নিজেকে এমনভাবে প্রকাশ করে যাতে পেশি শক্তির চেয়ে মস্তিষ্কের চিন্তন-শক্তি অধিকতর শক্তিশালী হয়ে রক্তপাতহীনভাবে মুক্তি আনয়ন করে।

আমরা একটা গল্পের অবতারণা করতে পারি। নিজ মায়ের অকাল মৃত্যুতে অবোধ শিশু সৎমায়ের কাছে আশাতিরিক্ত আদরে বড় হতে থাকে। সতীনের সন্তানকে অকর্মণ্য করে নিজের সন্তানকে সুদক্ষ করে গড়ে তোলার জন্যে চতুর নারী সতীনের পুত্রকে কাঁটা বেছে মাছ খাওয়ায়। সারাদিন কোলে কোলে রেখে হাঁটতে শিখতে দেয় না। পক্ষান্তরে নিজের ছেলেকে যথাকালে কাঁটা বেছে নিজহাতে মাছ খেতে শেখায়, হেঁটে বেড়াতে শেখায়। দূর হতে দেখা মানুষ ভাবে, সতীনের ছেলে হলেও কতই না আদরে রেখেছে সৎ মা। কিন্তু দিনশেষে দেখা যায়, নিজের ছেলে জীবনের দক্ষতায় বড়ো হয়ে উঠে আর সতীনের ছেলে অকর্মণ্য হয়ে পরমুখাপেক্ষী হয়ে বাঁচে। গল্পের যে অন্তর্নিহিত তাৎপর্য আমরা পাই, তাতে এটা বুঝা যায়, জীবনে যোগ্য হয়ে উঠতে গেলে অন্যের সর্বাত্মক সহযোগিতা ব্যতিরেকেই স্বাবলম্বী হয়ে উঠতে হয়। বিতর্ক ঠিক এই কাজটাই করে। বিতর্ক ব্যক্তিকে মুক্তচিন্তায় ও মুক্তবুদ্ধির প্রকাশে স্বাবলম্বী করে তোলে।

বিতর্কের প্রয়োজনে বিতার্কিককে তথ্য ও তত্ত্বের পেছনে ছুটতে হলেও সংগৃহীত তথ্য ও তত্ত্বগুলো তার মুক্তচিন্তার উপকরণরূপেই ব্যবহৃত হয়। বিতর্কে কে কখন কোন্ কথাকে যুক্তির শরে পরিণত করে তা বলা মুশকিল। বিতর্কের মঞ্চে কেউ কারও জন্যে চিন্তার ডালি নিয়ে বসে থাকে না। এখানে নিজেকেই চিন্তা করতে হয়, সেই চিন্তাকে প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে উপস্থাপনযোগ্য করে তুলতে হয়। কাজেই বিতর্কের চেয়ে বুদ্ধির মুক্তি ঘটানোর বড় কোনো চর্চা আর নেই। লাইব্রেরিতে বসে বইয়ের পাঠ নিলে জ্ঞানার্জন হয় বটে, কিন্তু সেই অর্জিত জ্ঞানকে পরিশীলিত করতে হলে প্রয়োজন হয় বিতর্ক চর্চার। বিতর্কের ভেতরে যে নিজেকে আত্মনিবেদন করতে পারে, তার পক্ষে বিতর্কের সৌন্দর্যে বিমোহিত হওয়া সম্ভব হয়। বিতর্কে আত্মনিবেদন মানেই হলো বিতর্কের মুক্ত চিন্তায় নিজেকে গড়ে তোলার ব্রতে সমর্পণ।

বিতর্ক একটি যাত্রা যেখানে আঁধার টানেল অতিক্রম করে আলোকবিন্দুর উৎসে পৌঁছাতে হয়। বিষয়বস্তুর মোড়কে জ্ঞান অন্বেষণের একটা যাত্রার সূচনা হয় বিতর্কের মাধ্যমে, যার সমাপ্তি ঘটে নিজের মতকে প্রতিষ্ঠিত করার মতো সত্যকে অবমুক্ত করার পর। বিদ্যমান চলকের তুল্যমূল্য বিচার শেষে বিতর্কই পৌঁছে দেয় নান্দনিক এক সিদ্ধান্তে। কাজেই ব্যক্তির বিশ্লেষণী দক্ষতার মোড়ক উন্মোচনে বিতর্কের গুরুত্ব যেমন অপরিসীম, তেমনি অপ্রতিমও বটে। নিউটনের আগে অনেকেই সূর্যের আলোকে দেখেছেন এবং গায়ে মেখেছেন। কিন্তু কেউই সেই সাদা রঙের সূর্যের আলোকে বিশ্লেষণ করার কথা চিন্তা করতে পারেননি। কিন্তু বিজ্ঞানী নিউটন তাঁর মুক্ত চিন্তার বদৌলতে সূর্যের সাদা আলোকে বিশ্লেষণ করে দেখাতে পেরেছিলেন বেনীআসহকলার বর্ণালীকে। নিউটনের পক্ষে এ কাজ সম্ভব হয়েছিলো কেবলমাত্র প্রচলিত ধারণার সাথে মুক্তবুদ্ধি দিয়ে দ্বিমত পোষণ করার পরিণামে। কাজেই মুক্তবুদ্ধির কারণেই ব্যক্তি দ্বিমত পোষণ করে উপযুক্ত প্রক্রিয়ায় সত্যোদ্ঘাটন করতে সফলকাম হয়।

মুক্তচিন্তার বিনির্মাণে বিতর্কের ভূমিকা মাতৃস্থানীয়া। বিতর্ক কেবল পরমতসহিষ্ণুতাই তৈরি করে না, বরং বিতর্ক বুদ্ধির মুক্তিতে এক বিপুল সম্ভাবনা সৃষ্টি করে। যে কখনো চিন্তাই করেনি প্রতিষ্ঠিত সত্যের বিরোধিতা করতে, বিতর্কের বদৌলতে সেই-ই মুক্ত চিন্তার শক্তিতে বলীয়ান হয়ে প্রতিষ্ঠিত সত্যের বিপরীতে গিয়ে নূতন সত্যকে প্রতিষ্ঠা করে। কাজেই পরিশেষে একথা বলতেই হয়, মুক্তচিন্তা বিনির্মাণে বিতর্ক এক নান্দনিক মহীরুহের অনন্য উপমা।

লেখক : অধ্যক্ষ, চাঁদপুর বিতর্ক একাডেমি (সিডিএ); গ্রন্থকার : বিতর্ক সমগ্র, বিতর্ক বিধান ও বিতর্ক বীক্ষণ; সব্যসাচী লেখক।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়