বৃহস্পতিবার, ০৩ এপ্রিল, ২০২৫  |   ২৬ °সে
আজকের পত্রিকা জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয়
ব্রেকিং নিউজ
  •   হাইমচরে মাটি বোঝাই বাল্কহেডসহ আটক ৯
  •   কচুয়ায় কৃষিজমির মাটি বিক্রি করার দায়ে ড্রেজার, ভেকু ও ট্রাক্টর বিকল
  •   কচুয়ায় খেলতে গিয়ে আগুনে ঝলসে গেছে শিশু সামিয়া
  •   কচুয়ায় ধর্ষণের অভিযোগে যুবক শ্রীঘরে
  •   ১ হাজার ২৯৫ কেজি নিষিদ্ধ পলিথিন জব্দ করেছে কোস্ট গার্ড

প্রকাশ : ০৭ অক্টোবর ২০২৩, ০০:০০

বিতর্কে বিশ্বজয় ও প্রান্তিক বিতর্ক চর্চা
মোঃ জাহিদ হাসান

বিতর্ক এক ধরনের শিল্প। একজন শিল্পী যেভাবে তার মনের কাঙ্ক্ষিত বিষয়কে চিত্রকর্মে ফুটিয়ে তোলেন, ঠিক তেমনি একজন বিতার্কিকও শিল্পীর ন্যায় কথার মালা সাজিয়ে তা অন্যের নিকট উপস্থাপন করেন। তবে তর্ক এবং বিতর্কের মধ্যে একটা মৌলিক পার্থক্য হলো--বিতর্কে যুক্তি থাকে, আর তর্কে যুক্তি থাকে না। আবার একজন যখন তর্কের মধ্যে অন্ধবিশ্বাস, একগুঁয়েমি ও আবেগের উপস্থিতিকে প্রাধান্য দেয়, একজন বিতার্কিক তখন অসাধারণ উপস্থাপনার মাধ্যমে যুক্তি, তর্ক ও তথ্যের সমন্বয় ঘটান। বিতর্কের যুক্তিনির্ভরতা যেমন করে একজনকে নিজের অযৌক্তিক অবস্থান থেকে যৌক্তিক অবস্থানে ফিরিয়ে আনতে পারে, ঠিক তেমনি সমাজের ভ্রান্ত ধারণা ও কুসংস্কারকেও দূরীভূত করতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত শিক্ষাবিদ নরমেন-এর মতে, “শিক্ষার প্রথম উদ্দেশ্যে হলো- স্পষ্টতা ও আত্মবিশ্বাসের সাথে কথা বলতে পারার সামর্থ্য অর্জন।" শিক্ষার উদ্দেশ্যে যদি তাই হয়, তবে আমাদের প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থায় এই যোগ্যতা অর্জনের কতটুকু ব্যবস্থা রাখা হয়েছে তা নির্ণয় করা না গেলেও, সঠিক বিতর্ক চর্চার মাধ্যমে উল্লেখিত যোগ্যতা অনায়াসে অর্জন করা সম্ভব। সর্বোপরি বিতর্ক হলো, নিজেকে আত্মবিশ্বাসের সাথে অন্যের নিকট তুলে ধরার একটি কার্যকর পন্থা। যার মাধ্যমে একজন নিজেকে পরিশুদ্ধ করার পাশাপাশি একটি যুক্তিনির্ভর সমাজ বিনির্মাণেও ভূমিকা রাখতে পারে।

সম্প্রতি বিতর্ক ক্ষেত্রে বাংলাদেশের একটি অবিস্মরণীয় বিজয় অর্জিত হয়েছে। ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটিজ চ্যাম্পিয়নশিপ (ডব্লিউইউডিসি)-২০২২-এ বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হয়েছে বাংলাদেশের ব্র্যাক ইউনির্ভাসিটি দল। দুই সদস্যের এই দলটিতে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেছেন সৌরদ্বীপ পাল ও সাজিদ আসবাত খন্দকার। তাদের এ বিজয় শুধুমাত্র বিতর্ক অঙ্গনকেই সমৃদ্ধ করেনি, বরং দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম কোনো দল হিসেবে এই চ্যাম্পিয়নশিপ অর্জন বাংলাদেশকে বিশ্ব দরবারে অনেক বেশি গৌরবান্বিত করেছে। তাদের এ বিশাল অর্জনটি ব্যাপকভাবে দেশবাসীর কাছে পৌঁছায়নি। কারণ, আমরা বাহু কিংবা পেশী শক্তির অর্জনগুলো নিয়ে যতটা না মাতোয়ারা থাকি, জ্ঞানভিত্তিক অর্জনগুলো নিয়ে ততটা মাতোয়ারা থাকি না। ফলে ক্রিকেট, ফুটবল কিংবা অন্য কোন বিষয়ের ছোট বড় অর্জনগুলো আমাদের আন্দোলিত করলেও বিতর্কের বিশ্বজয় ঠিক সেভাবে করতে পারেনি। অন্যদিকে, দেশের প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়াগুলো আমাদের এ অর্জনকে দেশবাসীর কাছে ব্যাপকভাবে তুলে ধরতে সক্ষম হয়নি। পাশাপাশি রাষ্ট্রীয়ভাবেও এ ধরনের অর্জনের স্বীকৃতিতেও রয়েছে কৃপণতা। তবুও থেমে নেই বিতর্কের পথচলা।

বিতর্কে বিশ্বজয়ী সদস্যদের সাক্ষাৎকারে জানা যায়, ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির এই দলটিই এ ধরনের আয়োজন থেকে একাধিকবার বাদ পড়লেও একনিষ্ঠ বিতর্ক চর্চার মধ্য দিয়ে তারা বিতর্কের বিশ্বকাপ খ্যাত বেলগ্রেড ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটিজ ডিবেটিং চ্যাম্পিয়নশিপ (ডব্লিউইউডিসি)-২০২২-এ বিশ্ববিখ্যাত হার্ভাড, অক্সফোর্ড, ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব সিঙ্গাপুর, আমেরিকান কুইন্সটন ইউনিভার্সিটি দলকে হারিয়ে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হয়। শুধু তাই নয়, বিশ্ব বিতর্কে সাজিদ আবসাত খন্দকার ইএসএল ক্যাটাগরিতে দ্বিতীয় সেরা, ওপেন ক্যাটাগরিতে দশম সেরা এবং সৌরদ্বীপ পাল ইএসএল ক্যাটাগরিতে দশম সেরা বিতার্কিক হিসেবে মনোনীত হন। এ থেকে সহজে অনুমেয় যে, আমাদের দেশের বিতার্কিকদের বিতর্কের মান, নিজেদের দক্ষতা ও যোগ্যতার কোনো কমতি নেই। বিতর্ক চর্চার সঠিক পরিবেশ, পরামর্শ ও দিকনির্দেশনা পেলে বিতর্কে বিশ্ব জয় করে নিজের ও দেশের সম্মান বৃদ্ধি করতে তারা যেন প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

বিতর্ক যেহেতু এক ধরনের শিল্প, সেহেতু অন্য সকল শিল্পের ন্যায় বিতর্কের সফলতাও এর যথাযথ চর্চার ওপর নির্ভর করে। বলে রাখা দরকার যে, সৌরদ্বীপ পাল ও সাজিদ আসবাত খন্দকারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হওয়ার বিষয়টি দেশের সামগ্রিক বিতর্ক চর্চার ক্ষেত্রটিকে সম্পূর্ণরূপে প্রতিনিধিত্ব করে না। দুঃখজনক হলেও সত্য যে, বিতর্ক চর্চার বিষয়টিকে রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে এখন পর্যন্ত প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়া সম্ভব হয়নি। বিতর্কের উল্লেখযোগ্য অর্জনগুলোকে যদি একপাশে রাখি, তবে অন্যপাশে দেখা যাবে বিতর্ক চর্চার পুরো বিষয়টি যেন কিছুটা খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে। বিতর্ক চর্চার বিষয়টি এমন যে, যিনি বা যে প্রতিষ্ঠান বিতর্ক চর্চা করছে শুধুমাত্র তারাই চর্চাটি করে যাচ্ছে। বিতর্কের গুরুত্ব বিবেচনায় কিংবা জ্ঞান আহরণের নিমিত্তে আরও অধিক পরিমাণে ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানে বিতর্ক চর্চা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তাটি বরাবরই উপেক্ষিত রয়ে গেছে। তবে উচ্চ শিক্ষায় কিংবা বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে বিতর্ক চর্চার বিষয়টি আশানুরূপ হলেও মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে বিতর্ক চর্চার বিষয়টি কাঙ্ক্ষিত পরিমাণে প্রসার লাভ করেনি। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সহপাঠক্রমিক কার্যক্রমে ক্রীড়া ও সংস্কৃতির প্রায় সব ধরনের বিষয়ের উপস্থিতি থাকলেও বিতর্কের আয়োজন খুবই সামান্য পরিমাণে পরিলক্ষিত হয়। যার মূল কারণ বিতর্ক চর্চার অভাব। সারা বছর ধরে সরকার, বিভিন্ন সংগঠন ও নিজ নিজ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান যতটুকু বিতর্ক প্রতিযোগিতার আয়োজন করে তা খুবই সামান্য। একজন শিক্ষার্থীর জ্ঞান আহরণের পরিপূর্ণতা দেওয়ার পাশাপাশি বিতর্ক বিষয়ে আগ্রহ তৈরি করতে আরও বেশি পরিমাণে বিতর্ক বিষয়ে ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা, উৎসাহ-উদ্দীপনা সৃষ্টি, বিতর্ক চর্চার পরিবেশ তৈরি, বেশি পরিমাণ বিতর্ক বিষয়ক প্রশিক্ষণ ও কর্মশালার ব্যবস্থা এবং বিতর্ক প্রতিযোগিতার আয়োজন করা আবশ্যকীয়। তবেই প্রান্তিক পর্যায় থেকে যোগ্যতা সম্পন্ন বিতার্কিক তৈরি হয়ে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিজেকে তুলে ধরার পাশাপাশি দেশের প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ পাবে।

দেশের বিতর্ক চর্চার প্রচার ও প্রসারের জন্য সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তর সমূহকে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। বিতর্ক চর্চার ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদেরকে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ প্রদান, উপকরণগত সহায়তা, সময়সূচি নির্ধারণ, জাতীয়ভাবে বিতর্ক প্রতিযোগিতার আয়োজন, স্থানীয় ও প্রতিষ্ঠান পর্যায়ে বিতর্ক প্রতিযোগিতার আয়োজনের মাধ্যমে সারা দেশে শিক্ষার্থীদের মাঝে বিতর্ক চর্চাকে খুব সহজেই প্রসারিত করা সম্ভব। বাংলাদেশ ডিবেট ফেডারেশন (বিডিএফ), ন্যাশনাল ডিবেট ফেডারেশন (এনডিএফ) বিতর্ক চর্চার ক্ষেত্রে কার্যকর ভূমিকা পালন করছে। সরকার এই দুটি সংগঠনকে প্রয়োজনীয় লোকবল, পৃষ্ঠপোষকতার মাধ্যমে বিতর্ক চর্চাকে প্রান্তিক পর্যায়ে প্রসারিত করার মাধ্যমে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হওয়ার এই ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে সক্ষম হবে।

মোঃ জাহিদ হাসান : টেলিভিশন বিতার্কিক, সাবেক সাধারণ সম্পাদক, চাঁদপুর ডিবেট মুভমেন্ট (সিডিএম)।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়