প্রকাশ : ২৬ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:২৭
খণ্ডে খণ্ডে অখণ্ড জীবন

(ষাটতম পর্ব)
গ্রামীণ নারীদের বিশেষ সংস্কৃতি
গ্রাম বা পল্লী হলো নানা সংস্কৃতির আঁতুড়ঘর। এসব সংস্কৃতিতে গ্রামীণ নারীদের ভূমিকাই প্রধান। মাটির ঘর লেপার সময় মহিষের শিং থেকে তৈরি চিরুনি দিয়ে আল্পনা আঁকা থেকে শুরু করে গরুর গোবরে জ্বালানি তৈরিতেও তারা শিল্পমননের পরিচয় ফুটিয়ে তোলেন। শৈশব-কৈশোরে গ্রামলগ্নতার কারণে এসব সংস্কৃতি আজও আমার চোখের ও মনের ক্যানভাসে ভেসে ওঠে। সাধারণ শিল্প বা সংস্কৃতির বাইরে কিছু কিছু বিশেষ সংস্কৃতিও লোকচক্ষুর আড়ালে পড়ে থাকে। অন্যান্য পল্লীর মতো আমার গ্রাম চরণদ্বীপ বৌদ্ধপল্লীতেও নারীদের এ রকম কিছু বিশেষ সংস্কৃতির প্রচলন আছে। এগুলোর কিছু কিছু অন্যান্য গ্রামেও প্রচলিত আছে। যেমন :
ক. মটো তৈরি : কিছু কিছু নীতিকথা কিংবা জনপ্রিয় বাণী কাপড়ের টুকরোয় পেন্সিলে লিখে তা পরে সুঁই-সুতো দিয়ে ফুটিয়ে তোলা হয়। তারপর তা বাঁধাই করে বসার ঘরে উঁচু স্থানে সাজিয়ে টাঙানো হয়। এতে ঘরের সৌন্দর্য যেমন বৃদ্ধি পায়, তেমনি শিল্পচেতনারও প্রকাশ ঘটে। সাধারণত বিবাহিতা তরুণী, অবিবাহিতা নারী ও কিশোরীরা এ মটোশিল্পে নিমগ্ন থাকে। আজকাল আর এ মটোশিল্পের চর্চা গ্রামীণ নারীদের মধ্যে দেখা যায় না। কয়েকটি মটোর বাণী ছিল এমন :
১. গরমকালে পরম পাখা, বাতাস করো মধুমাখা।
২. দুঃখে যাদের জীবন গড়া, তাদের আবার দুঃখ কী?
৩. নলেজ ইজ পাওয়ার।
৪. ডালিম পাকিলে পর নিজে ফেটে যায়,
ছোটলোক বড় হলে
বন্ধুরে কাঁদায়।
৫. ভাই বড় ধন রক্তের বাঁধন,
যদিও পৃথক হয়
নারীর কারণ।
ছোটবেলায় দিদিদের মটোতে এ রকম অনেক চিরচেনা বাণী আমি পেন্সিলে লিখে দিতাম তাঁদের সূচিকর্মের জন্য। আমার সেজদিদি কালো কাপড়ে 'দুঃখে যাদের জীবন গড়া, তাদের আবার দুঃখ কী?' এ বাণীটি সাদা সুতোয় ফুটিয়ে তুলেছিলেন। কালোর মাতৃকায় সাদার শুভ্রতা সহজেই নজর কাড়তো। এগুলো নানা ফোঁড়ে তাঁরা ফুটিয়ে তুলতেন। কখনো চেইন ফোঁড়, কখনো কাঁথা ফোঁড় ইত্যাদি নানা নামে ও কৌশলে বাণীগুলো সুতোবদ্ধ হতো। দুপুরের আহারের পর অলস সময়ে ভাতঘুম না দিয়ে তাঁরা এসব মটো তৈরি করতেন। তারপর একসময় তাঁদের সূচিকর্য সম্পন্ন হলে কাউকে দিয়ে বাজার থেকে বাঁধাই করে আনতেন।
খ. ঢেঁকিশাকের লতা থেকে দড়ি তৈরি : গ্রামগঞ্জে ঢেঁকিশাকের ছড়াছড়ি দেখা যায় এখানে-সেখানে। সবুজ ঢেঁকিশাক খাওয়া হয়। আর লালচে ঢেঁকিশাককে গ্রামে বলা হয় ঢেঁইয়ের লতা। ঢেঁইয়ের লতা থেকে মালপত্র বাঁধার দড়ি বানানো হতো সেসময়। সাপ্তাহিক হাটে-বাজারে এগুলোর খুব চাহিদা ছিলো একসময়। বনবাদাড় থেকে গ্রামের কিশোরী-তরুণী মেয়েরা নিজেদের ব্যক্তিগত খরচ মেটানোর জন্য ঢেঁইয়ের লতা সংগ্রহ করে এনে ঘরের চালে শুকাতে দিতো। শক্ত হয়ে গেলে তারপর সেগুলো ছেলেদের কাউকে দিয়ে হাটে পাঠাতো বিক্রির জন্য। বেশ ভালো দামে বিক্রি হতো শুকানো ঢেঁইয়ের লতা। এ টাকা দিয়ে মেয়েরা প্রসাধনসামগ্রী আর নিজেদের অন্যান্য শখের জিনিস কিনতো। আমাদের পাড়ায় পিসি-দিদিদের অনেকেই ঢেঁইয়ের লতা বানাতেন।
গ. ক-কথা, ল-কথা, ট-কথা : গ্রামীণ জীবনে কিশোরী ও তরুণী মেয়েরা নিজেদের মধ্যে সহজে যোগাযোগের জন্য একসময় নানা ইশারা ভাষার ব্যবহার করতে শিখতো। এর পাশাপাশি অনাকাঙ্ক্ষিত কারও সামনে নিজেদের ভাববিনিময়ের জন্য ল-কথা, ট-কথা, ক-কথা ইত্যাদি নানা কৌশল প্রয়োগ করতো। এর ফলে তারা নিজেরা নিজেদের ভাষা বুঝতো, কিন্তু তাদের বাইরে অন্য কাউকে সহজেই তারা ফাঁকি দিতে পারতো।
ট-কথার উদাহরণ যেমন :
'ইটামি তিটুমাকে ভিটালো বিটাসি।'
এখানে মূল শব্দের মাঝখানে 'ট'-ধ্বনি ঢুকিয়ে দেওয়া হয়। আর শব্দের আগে ই-কার বসানো হয়। অর্থাৎ, মূল কথা ছিল, 'আমি তোমাকে ভালোবাসি।' ট-কথায় এটাকে সাজালে হয়, 'ইটামি (আমি) তিটুমাকে (তোমাকে) ভিটালো (ভালো) বিটাসি (বাসি)।'
ল-কথার উদাহরণ :
তারে মার : তিলারে মিলার।
ট-কথা এবং ল-কথার বাইরে আরও এক ধরনের ভাবপ্রকাশের কোড কথা হলো ক-কথা। কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে যারা এ কোড কথার চর্চা করতেন, তারা কেউ আজ আর বেঁচে নেই। তাই এর কৌশল সম্পর্কে জানা গেল না। তবে প্রণিতা বড়ুয়া নামে চরণদ্বীপ বৌদ্ধপল্লীর এক নারী শৈশবে তার পাড়াতুতো জেঠিমা পঙ্খী বড়ুয়ার মুখে এ কথা শুনে শুনে একটি লাইন মনে রেখেছেন। লাইনটি হলো : 'ক কড়ি কদম কড়ি নি কড়ি মধ্যম।' এর অর্থের ব্যাখ্যা তিনি পূর্ণাঙ্গ দিতে পারেননি।
ঘ. ঘণ্ট রান্না : নানা পদের সবজি মিশিয়ে ঘণ্ট রান্না অনেকেই করেন। তবে চরণদ্বীপ বৌদ্ধপল্লীর নারীদের হাতে ঘণ্ট রন্ধনশিল্প একটু ভিন্ন মাত্রার। এর স্বাদে ভিন্নতা আছে। ঘণ্টের রসা তৈরিতে আধা ভাজা চালের গুঁড়ো ব্যবহার করা হয়। সবজির মিশ্রণে শুকনো শিমের বিচি ভেজে তার খোসাসহ ঘন্টে দেওয়া হয়। এতে ওই ঘন্টে একটা পোড়া পোড়া ফ্লেভার তৈরি হয়। ঘণ্টের পরিবেশন পদ্ধতিও গ্রামীণ সংস্কৃতির সাথে মানানসই। পংক্তি ভোজনের নেমন্তন্নে মাঝারি আকারের অ্যালুমিনিয়ামের বালতিতে ঘণ্ট নিয়ে কাপে করে কলাপাতার পাতের একপাশে পরিবেশন করা হয়। সাথে আর কেউ একটু লবণ আর দুটো কাঁচা মরিচ দিয়ে যায়। অবশ্য ঘণ্ট রান্না করার সময় তাতে আধা পোড়া আস্ত লাল লঙ্কা সংযোগ করা হয়। পল্লিবাসীদের মতে, ধোঁয়া ওঠা গরম ভাতের সাথে এই ঘণ্টের যুগলবন্দি গ্রামীণ উৎসবে বা অনুষ্ঠানে বেশ আবেদনযোগ্য ছিল।
ঙ. আটক্রি পূজা : এটি কোনো ধর্মীয় পূজা নয়। এটি একটি বিশেষ লোকসংস্কৃতি, যার মাধ্যমে ভবিষ্যৎ গণনা করা হতো। সাধারণত নারীরাই নিজেদের ভবিষ্যৎ জানতে এ পূজায় অংশগ্রহণ করতো বেশি। তারুণ্যে আটক্রি পূজা ক্রিয়াদি সম্পাদনকারী মিনতি বড়ুয়া জানান, এ পূজায় আট রকম উপাচার লাগে। আট পোয়া চাল লাগে। এ কারণেই একে আটক্রি পূজা বলে। একটা সমতল স্থানে পাটাবিহীন পুতাকে সেই চালের ওপর বসিয়ে তাতে উপযুক্তভাবে পূজা করা হতো। এরপর মনের ইচ্ছা মনে রেখে একে একে ওই পুতার ওপর দুই হাঁটু ভাজ করে দুই পায়ের পাতায় ভর করে বসতে হতো। যার মনোবাঞ্ছা পূরণ হবে বলে আভাস পাওয়া যেতো, তার ক্ষেত্রে পুতাটি তাকে সহ ঘুরে যেতো। আর যার ক্ষেত্রে পুতা ঘুরতো না, তার ক্ষেত্রে মনোবাঞ্ছা পূরণ হবে না বলে ধরে নেওয়া হতো। সত্তর-আশির দশকেও চরণদ্বীপ বৌদ্ধপল্লীতে এই লোকসংস্কৃতি চালু ছিলো। আজকাল আর এ আটক্রি পূজা কোনো ঘরে দেখা যায় না। (চলবে)






