প্রকাশ : ২৬ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:২৯
সে চলে গেছে বলে কি গো স্মৃতিও হায় যায় ভোলা
"তুমি সন্ধ্যার মেঘমালা, তুমি আমার সাধের সাধনা"—ভালোবাসাকে বলতে হয় না, তুমি বেঁচে থাকো আমার গহন মাজারে। অবিনশ্বর এক অনুভূতির নাম ভালোবাসা।
ভালোবাসার আওয়াজ শোনা যায় বাতাসে, মোলায়েম আলোয় ভরা জোছনায়, নদীর বয়ে চলা কলতানে, নির্জন মুখরিত পাখির কলরবে।
ভালোবাসাকে খুঁজি আমি ভ্রমণে,
দুরন্ত গ্রামের পথের বাঁকে,
নিঝুম সন্ধ্যায়।
আমি ভালোবাসাকে সবসময় খুঁজে চলেছি—
কর্মে খুঁজি,
মর্মে খুঁজি,
খুঁজি প্রার্থনায়, খুঁজে বেড়াই ব্যস্ত শহর-সমাগমের ভিড়ে। ভালোবাসার পথে আমি পথভোলা এক পথিক।
আমার প্রেম আমাকে কখনো শুধায় না, পৃথিবীতে ভালোবাসা নেই।
ভালোবাসা দিয়ে গড়া প্রতিটি মানুষের সংসার। ভালোবাসা কখনো চোখের জল, কখনো আনন্দের হাসি, কখনো প্রয়োজন, কখনো নিবেদন।
এক সমুদ্র চোখের জলেও ভালোবাসা পূর্ণতা পায় না, মান্যতা পায় না। ভালোবাসা এক অসীম ক্ষুধা! যেন এর শুরু আছে, শেষ নেই!
মরমী কবি রাধারমনের ভালোবাসা নিয়ে আকুতি—
"শ্যাম কালিয়া সোনা বন্ধু রে, নিরলে তোমারে পাইলাম না।"
বা জাতীয় কবি, প্রেমের কবি, দ্রোহের কবি কাজী নজরুলের—
"দাঁড়ায়ে দুয়ারে মোর কে তুমি ভিখারিনী।"
ভালোবাসা নিয়ে এমন অতৃপ্ত বাসনার কথা অসংখ্য বলা যায়, যা মেটে না সাধ—তাই বোধহয় ভালোবাসা।
যেমন—
"সে চলে গেছে বলে কি গো
স্মৃতিও হায় যায় ভোলা।"
সাধারণত আমার এমন হয়—কী যেন নেই, কিসের যেন শূন্যতা! এমনিতেও আমি একা মানুষ। মনের চঞ্চলতা কাটিয়ে উঠতে পারিনি কোনোদিন। তাই আমার ক্ষেত্রে এটা মানায় না যে, "প্রেম একবার এসেছিল নীরবে আমার দুয়ারপ্রান্তে।"
আমি আগেই বলছি, ভালোবাসাকে আমি খুঁজি ভ্রমণে, খুঁজি কর্মে, খুঁজি মর্মে, খুঁজি প্রার্থনায়। আমার না হয় নিঃসঙ্গতা আছে, অপূর্ণতা আছে; কিন্তু যার সাতকাহন সুখ আছে, যার শতদল সুখের রজনী, যারা দুহাত ভরে নিয়েছে প্রেমের সুধারস, তাদের মাঝেও দেখেছি—কী যেন নেই, কিসের যেন অপূর্ণতা!
প্রকৃতি লাবণ্য ফিরে পায় বসন্ত এলে, আর মানুষ খুঁজে বেড়ায় জীবনের বসন্ত।
কবি জীবনানন্দ দাশের একটি কবিতা আমার কাছে মনে হয়েছে, কেউ আজ পর্যন্ত অতিক্রম করে যেতে পারেনি—
"হাজার বছর ধরে আমি পথ হাঁটিতেছি পৃথিবীর পথে,
সিংহল-সমুদ্র থেকে নিশীথের অন্ধকারে মালয়-সাগরে
অনেক ঘুরেছি আমি; বিন্দুসার-অশোকের ধূসর জগতে
সেখানে ছিলাম আমি; আরও দূর অন্ধকারে বিদর্ভ নগরে;
আমি ক্লান্ত প্রাণ এক; চারিদিকে জীবনের সমুদ্র সফেন,
আমারে দুদণ্ড শান্তি দিয়েছিল
নাটোরের বনলতা সেন।"
আমি ব্যক্তিগতভাবে আন্তরিকতা ও ভালোবাসাকে মূল্যায়নে রাখি। ভালোবাসা অর্থের চেয়ে দামী। মনে হতে পারে এটা আবেগের কথা, কিন্তু এটাই যে সত্যি কথা—একজন নিঃসঙ্গ মানুষই তা ভালো জানে।
ভালোবাসার মানুষটির ভেতরে একটি আলো থাকে, জোছনা থাকে—আমি বলি স্নিগ্ধ আলো।
ভালোবাসার মানুষটির ভেতর একটি অপেক্ষা থাকে—আমি বলি, সে অপেক্ষা কোনোদিন পূরণ হওয়ার নয়। কাছে পেলেই তাকে সম্পূর্ণ পাওয়া বলে না; মনে হয়, আরও কিছু দেওয়ার আছে, আরও কিছু নেওয়ার আছে।
কবি কাজী নজরুল ইসলামের কথায় আবার বলতে হয়—
"আমার আপনার চেয়ে আপন যে জন
খুঁজি তারে আমি আপনায়।"কাকে খুঁজে চলেছি আমরা! বা কবি এখানে কাকে খুঁজে চলেছেন? "ভালোবাসা", "প্রেম"!
কেউ কেউ বলবেন, আমি ভালোবাসায় পরিপূর্ণ। আমি বলব, সে মানুষটি অনেক ভাগ্যবান বা ভাগ্যবতী।
বিবাহে আবদ্ধ প্রেম বা ভালোবাসা—মানে, চার হাত এক হওয়া, দুটি হৃদয় এক হওয়া। আসলে সবাই কি এক হতে পেরেছে? নাকি মানিয়ে চলতে শিখে গেছে? যদিও আমি এখানে স্বীকার করব, ভরসার হাত দুটো স্বামী-স্ত্রীরই হয়, আর দ্বিতীয় কোনো বিকল্প নেই। স্বামী-স্ত্রীর মাঝেই যে প্রকৃত ভালোবাসা নিহিত, তা অনস্বীকার্য।
কেউ হয়তো গুনগুন করে গেয়েও থাকেন—
"এ কী সোনার আলোয় জীবন ভরিয়ে দিলে
ওগো বন্ধু, থেকো থেকো কাছে।"
তবুও শূন্য হৃদয় কেন কাঁদে? কেন বলে—
"শূন্য এ-বুকে পাখি মোর আয়,
ফিরে আয় ফিরে আয়!
তোরে না হেরিয়া সকালের ফুল
অকালে ঝরিয়া যায়।"
এ মন অতৃপ্ত! আরও প্রেম চায়, আরও ভালোবাসা চায়।
কবি মহাদেব সাহা বলেছেন—
"এক কোটি বছর হয় তোমাকে দেখি না
একবার তোমায় দেখতে পাবো
এই নিশ্চিয়তাটুকু পেলে—
বিদ্যাসাগরের মতো
আমিও সাঁতরে পার হবো ভরা দামোদর
কয়েক হাজার বার পাড়ি দিবো ইংলিশ চ্যানেল।"
কী কথা!
কী মাহাত্ম্য!! কী প্রেম!!!
আসলে পৃথিবীতে প্রেম এক সমাদৃত শব্দ, গভীর আকাঙ্ক্ষা। আকাশে যেমন রঙধনু ওঠে, মনের আকাশেও তেমন প্রেমের রঙধনু ওঠে। বয়স-জাতপাত মানে না প্রেম, প্রেমের দ্বারাই পৃথিবীর সৃষ্টি, প্রেম আছে বলেই পৃথিবী এত সুন্দর।কবি নির্মলেন্দু গুণ তাঁর একটি লেখায় লিখেছেন—
"হাত বাড়িয়ে ছুঁই না তোকে
মন বাড়িয়ে ছুঁই,
দুইকে আমি এক করি না
এককে করি দুই।"
এমন অসংখ্য-অসংখ্য খ্যাতিমান লেখকের কলম থেকে প্রেম-ভালোবাসা নিয়ে কাব্যিক কথা, গল্প, উপন্যাস উঠে এসেছে। কবিগুরুর তো 'প্রেম পর্যায়' নামে ভিন্ন চ্যাপ্টার-ই আছে।
আমি এখানে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিখ্যাত উপন্যাস 'শেষের কবিতা'-র কয়েকটি লাইন টেনে শেষ করব, শুরুও করেছিলাম কবিগুরুর লাইন দিয়ে—
"ওগো বন্ধু,
সেই ধাবমান কাল
জড়ায়ে ধরিল মোরে ফেলি তার জাল—
তুলে নিল দ্রুত রথে,
দুঃসাহসী ভ্রমণের পথে
তোমা হতে বহু দূরে।
মনে হয়, অজস্র মৃত্যুরে
পার হয়ে আসিলাম।
আজি নব প্রভাতের শিখরচূড়ায়
রথের চঞ্চল বেগ হাওয়ায় উড়ায়
আমার পুরানো নাম।
ফিরিবার পথ নাহি;
দূর হতে দেখো যদি চাহি
পারিবে না চিনিতে আমায়।
হে বন্ধু, বিদায়।"বিদায় বলেই কি ভালোবাসা মন থেকে মুছে ফেলা যায়? যায় না তো। তাই কবি ভালোবাসা নিয়ে অন্য জায়গায় চরম তৃষ্ণা ও ক্ষুধার প্রকাশ করেছেন—
"তুমি রবে নীরবে,
হৃদয়ে মম,
নিবিড়, নিভৃত, পূর্ণিমা
নিশীথিনী সম।"
রচনাকাল : ১২.০৯.২০২৬।







