সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য

প্রকাশ : ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮:৫৬

খণ্ডে খণ্ডে অখণ্ড জীবন

পীযূষ কান্তি বড়ুয়া
খণ্ডে খণ্ডে অখণ্ড জীবন

(আটান্নতম পর্ব)

আড্ডায় আমি আমার আড্ডা

বিনোদনপ্রিয় মানুষের জীবনে আড্ডার গুরুত্ব অপরিসীম। আড্ডা একদিকে যেমন সময় কাটানোর ভালো উপায়, অন্যদিকে তেমনি আড্ডা নিজেকে সমৃদ্ধ করার এক অনন্য মাধ্যমও বটে। জ্ঞানচর্চা, তথ্য হালনাগাদকরণ এবং সম্পর্ক নির্মাণের ক্ষেত্রে আড্ডা এক অবিকল্প মাধ্যম। বাঙালিকে আড্ডাকাতর বললে তা নিছক ভুল হবে না মোটেও। বাঙালির মতো আড্ডাপ্রিয় এবং আড্ডারসিক আর দ্বিতীয়টি আছে কি না সন্দেহ! তবে বাঙালির আড্ডার একটা নেতিবাচক দিক আছে বলতেই হয়—তা হলো পরচর্চা ও পরনিন্দা। আড্ডার কোনো এক ফাঁকে এই দুই রাহুকেতু কীভাবে যে ঢুকে পড়ে, তা বলা যায় না। তবু আড্ডাই বাঙালির প্রাণ। কফি হাউজের আড্ডা আজও বাঙালিকে স্মৃতিভারাতুর করে তোলে।

শৈশবে ভরদুপুরে দখিনের কাঁঠাল গাছের ডালে বসে আমরা তিন চাচাতো-জেঠাতো ভাই মিলে আড্ডা দিতাম। তাতে ফুটে উঠত আমাদের অপরিণত বয়সের চাওয়া-পাওয়া। বালকের স্বপ্নগুলো সে আড্ডায় পাখা মেলত। কেউ হতে চাইতাম সুদূর আকাশের উড়ন্ত বলাকা, কেউ-বা পরিযায়ী মেঘ, আর কেউ নীল পটে আঁকা স্বয়ং আকাশ! সেই নিষ্পাপ আড্ডা আর তার স্বপ্নগুলো বয়স বাড়ার সাথে সাথে উবে গেছে জীবনের কঠিন ধারাপাতে। সে আড্ডার কনিষ্ঠজন রিটু আজ অনন্তলোকে পরিব্রাজক—শিক্ষকতা জীবনের দ্রুত ইতি টেনে সে আজ মনখুশির পাখি। আড্ডার জ্যেষ্ঠজন চিত্রসেন সৈনিক জীবনের শেষে এখন ক্যাঙ্গারুর দেশে অতিথি পাখি। আর মাঝের জন আমি—আতশ কাচের নিচে আজও সময়কে পরখ করে চলেছি।

সেন্ট প্ল্যাসিডস্ স্কুলে পড়াকালীন ক্লাসের ফাঁকে ফাঁকে আড্ডা দিতাম আমি, সৌরিণ আর ঋষি মিলে। ঋষি ছিল সুবোধ বালক, আর সৌরিণ ছিল অনেকটাই ‘সাত-পাঁচ চইদ্দ, দুই টেঁয়া নইদ্দ’ ধরনের চতুর কিশোর, যে ঋষিকে কয়েক হাটে বিক্রি করে তার চেয়ে বেশি হাটে কিনতে পারত! আর আমি সবসময় মধ্যপন্থী—না চতুর, না বোকা। তখনকার স্বৈরাচারবিরোধী মিছিলের সময় পিকেটিংয়ের কবলে পড়ত দোকানপাট। এ সময়ের অরাজকতা ছিল আমাদের আড্ডার এক মৌচাকের মতো। ঋষি বলত, হরতালের ভাঙচুরে সে ‘ইকবাল সুইটসে’র মিষ্টি ঘরে নিয়ে যাবে। সৌরিণ চাইত পুরো বাটার দোকানটাই ঘরে বয়ে নিয়ে যেতে। আর আমি চাইতাম জামান হোটেলের পরোটার স্তূপটা যেন আমার ঘরে যায়। একসময় সে হরতালের অবসান হতো আর আমাদের আড্ডাকৃত্য হাওয়ার কানে রেশ রেখে মিলিয়ে যেত সময়ের গর্ভে।

আরেকটু বড় হলে পরে, পি কে সেন সংলগ্ন মনোহরখালী বন্দরের মাঠে বৈকালিক ফুটবলের অপরিহার্য সভায় আমরা মেতে উঠতাম হযবরল আড্ডায়। তার কোনো নির্দিষ্ট বিষয় ছিল না। অনেকটাই আসরের আজান শেষে মাঠে ফুটবল গড়ানোর প্রতীক্ষা ছিল তা। ফলে মাগরিবের মুয়াজ্জিনের কণ্ঠ ধ্বনিত হওয়ার সাথে সাথেই সে আড্ডার বিষয়গুলো কর্পূরের মতো উবে যেত কর্ণফুলীর ঢেউয়ের ফেনায়। সে আড্ডায় স্বার্থ ছিল না, শঙ্কা ছিল না—ছিল শুধু নির্মল সখ্য। সরলসিধে মানসদা কিংবা ক্ষিপ্রগতির লিপন, কালী চক্রবর্তী কলোনির ফুটবল কুশীলব বলরাম মিত্র—এদের কলরবে আড্ডা হয়ে যেত হৃদয়ের কলতান।

কলেজিয়েট স্কুলের সতীর্থদের আড্ডা ছিল পুংটামিতে পরিপূর্ণ। লেজওয়ালা শাখামৃগদের এ ছিল এক জাতীয় উদ্যান! রক্ষিত স্যারের ছাত্রসুবাদে কী নাম, সুমন নন্দী এমজি দিয়ে পরীক্ষার হলে কী বোঝাতে চাইল কিংবা আমিনুল হক স্যার কেন সুদর্শন ছাত্রদের প্রতি অধিক স্নেহ বর্ষণ করতেন—এ ছিল এ আড্ডার অ্যাপিটাইজার। এ আড্ডা আসলে কেঁচো খুঁড়তে গিয়ে সাপ খুঁড়ে আনত। ফলে আড্ডাতেই একসময় ছাত্র-শিক্ষক একসাথে একই সিনেমা হলে দেখা হয়ে যেত, তাও আবার এক টিকিটে দুই ছবির ইংরেজি হলগুলোতে!

স্কুল ছেড়ে যখন কলেজে উঠলাম, তখন আড্ডার স্থল হয়ে উঠল বোটানি চত্বর। এখানে বসেই নিলাম হতো বসে থাকা বালিকাদের। কিংবা লোকাল রেলগাড়ির মতো ভঙ্গিতে ‘তুই থাক আমি যাই’ ছন্দে গজগামিনী বালিকারা আড্ডার মধ্যমণি হয়ে উঠত সাংকেতিক ভাষায়। এ আড্ডার রেশ ছড়িয়ে পড়ত তাহের স্যার কিংবা কলিমদাদ স্যারের পড়ার টেবিলে। আড্ডায় বিপ্লব থাকা মানেই ‘তু শায়ের হ্যায়, মেঁ তেরা শায়রি’ গানটা বারবার বেজে ওঠা।

কলেজ শেষে মেডিকেল ভর্তি কোচিংয়ে এসে আড্ডা জমে ওঠে ক্লাসিকে। বুয়েটের সালাউদ্দিন ভাই এ আড্ডার মধ্যমণি বটে। তাঁর উদ্ভাবিত ডার্টি জোকসে আমাদের তারুণ্য ঝলসে উঠত। ‘ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট’ হতে ‘আ’ কার বাদ দিয়ে বুয়েটের কোনো এক হলের একটা কক্ষে এরকম একটা গবেষণা প্রতিষ্ঠান তাঁরা প্রায় বানিয়ে ফেলেছিলেন রাত জেগে এসব আলোচনা করতে করতে! সে আড্ডায় ঢাকাইয়া কুট্টি অলি ভাইয়ের উপস্থিতি আমাদের বিনোদন আরও বাড়িয়ে দিত, বিশেষত যখন তিনি ল্যান্ডফোনে ঐ প্রান্তের প্রশ্নের জবাবে বলতেন, “আমি ঐ অলি ঐ!”

মেডিকেল কলেজের আড্ডা মানেই ‘করোনারি থ্রম্বসিস’ হতে ‘পরনারী থ্রম্বসিস’-এ উপনীত হওয়া। কে কার ওপর ম্যান্ডি চাপাল কিংবা কে কার কাছ থেকে ডেমো খেয়ে আইটেমে তাকে ছাড়িয়ে গেল—এ ছিল রোড ডিভাইডারের লোহার শিকে বসে আড্ডার মকশো করার ধরন। আসল আড্ডা জমে উঠত লাভ লেইনে কিংবা অডিটরিয়ামের চিপা-চাপায় নাগরিক আঁধারে। ক্যাফেটেরিয়ার আড্ডায় কখনও ওয়ার্ড ডিউটির নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনাগুলো প্রাণ ফিরে পেত। নবাগত শিক্ষার্থীদের আড্ডায় ‘লিভার সিরোসিস’ আর ‘ভেগাল পেইন’ কিছুটা একঘেয়েমির ভার কমাত।

মাথার জমাট ক্লান্তি বিদূরণের হালকা আড্ডা ছেড়ে বাসায় যেতে যেতে প্রত্যয় ক্লাবের ক্লাবঘরে আরিফ ভাই, পল্টুদা আর এমরান ভাইয়ের সাথে ট্রাম দুর্ঘটনায় অক্কা পাওয়া জীবনানন্দকে টেনে তুলতাম—তাঁর মিথের ব্যবহারের ব্যবচ্ছেদ করব বলে। শেখরদা তাতে শামিল হতেন ক্যারামের ইয়া বড় এক স্ট্রাইকার নিয়ে। সে আড্ডা দ্বিমতপূর্ণ, তবুও সৌহার্দ্যে ভরা। মাঝে মাঝে আড্ডায় খাঁটি বাংলা ভাষার কবি জীবনানন্দ দাশ ও খিচুড়ি ভাষার বর্তমানের কবিদের মধ্যে চুলোচুলি হতো। তবু দিনশেষে ‘চুল তার কবেকার অন্ধকার বিদিশার নিশা’-তেই আমরা জীবনানন্দগ্রস্ত হয়ে থাকতাম। আড্ডায় মাঝে মাঝে রবীন্দ্রনাথ বেকায়দায় চলে এলেও জীবনানন্দ কিন্তু মুখ্য আলোচিতের চেয়ার ছাড়তেন না। নব্বইয়ের তরুণ কবিদের ছুরি-কাঁচিতে জীবনানন্দের ক্ষতবিক্ষত হওয়ার আড্ডায় আমি ছিলাম কনিষ্ঠজন। তবু কেন জানি আমাকেই বেশি বাদানুবাদের আড্ডায় বিচারকের ভূমিকা নিতে হতো। অথচ তখন আমি মাত্র পাটি নকশার জীবনানন্দ সমগ্র কিনে নিজেকে ধনী মনে করার আত্মশ্লাঘার ঘোরে ছিলাম।

কাতালগঞ্জের হুমায়ূনদের বিল্ডিংয়ের দোতলার আড্ডায় মডেল জাকির আর মুনিয়া-রাজুর সঙ্গ আমার বেশ হৃদয় কেড়েছিল। কথায় কথায় একে অন্যকে শব্দবাণে পচিয়ে আনন্দ কুড়োনোর নিবর্তনমূলক উপায় আমাদের উজ্জীবিত রাখত। উল্লেখ্য, জাকির ভাই মডেলকে ইংরেজি উচ্চারণে ‘মাডেল’ বলতেন বিধায় তাঁর নামই হয়ে গেছে ‘মাডেল জাকির’।

কর্মজীবনে এসে আড্ডা জমেছে মেহেদীবাগ গোলপাহাড়ের মোড়ে এভারগ্রিন ক্লিনিকে। জলবিহীন সাগর, পানমুখো আবিদ ভাই আর শিক্ষকদের ভুলের বদৌলতে নাজিম হতে নিজাম হওয়া অ্যানেস্থেশিওলজিস্ট বড় ভাইয়ের স্নেহে এ আড্ডা হয়ে উঠত দারুণ অর্থযোগের। মাঝে মাঝে দু-একটা ওটি অ্যাসিস্ট করতাম আর আড্ডা মাতাতাম। কখনও কখনও শরীফ স্যার এসে আমার প্রথম কাব্যগ্রন্থের ভালোই বিজ্ঞাপন করতেন। এভারগ্রিনের সে আড্ডা মস্কো হয়ে এসে পৌঁছে মেঘনার তীরে মিডল্যান্ডে। বোরহান, রাজীব আর কখনও গৌতমের সমন্বয় আমাদের মৌন তাপস না বানাতে পারলেও উনত্রিশ গেমের কার্ডে ফোঁটা চিনতে শিখিয়েছিল।

মিডল্যান্ডের আড্ডা একসময় জোড় পুকুরপাড়ে এসে পরিণত হয় সাহিত্য আড্ডায়। তাতে বাঘ সিদ্দিক যেমন সরব ছিল, তেমনি ‘রসুন’ তাফুও নিজেকে ঋদ্ধ করে তুলেছিল। সে আড্ডার পথ ধরে আমি আজ ফুলের জলসায় নীরব কবিকে নিয়ে মনের ভেতর আড্ডায় বসি। আমার নিজের সবচেয়ে নান্দনিক আড্ডা হয় শব্দকে নিয়ে। অনেকের মধ্যে বসে থেকে আমার মনের বারান্দায় উঁকি মারা শব্দগুলো ধরে ধরে আমি আড্ডায় বসি। তারপর আড্ডাশেষে আমার মননশস্যগুলো বসে থাকে মলাটবন্দী হওয়ার অপেক্ষায়। এভাবেই জন্ম হয় সৃজনশস্যের, জন্ম হয় মনের মুক্তোর। (চলবে)

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়