শনিবার, ০৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য

প্রকাশ : ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:৩৬

নিয়ান্ডারথালদের অজানা ইতিহাস

এসএম বাশার
নিয়ান্ডারথালদের অজানা ইতিহাস

মানুষের আগে এই পৃথিবীতে ছিল আরেক বুদ্ধিমান মানবপ্রজাতি!

আজ আমি আপনাদের এমন এক হারিয়ে যাওয়া মানবপ্রজাতির গল্প শোনাব, যাদের সম্পর্কে আমাদের অধিকাংশ মানুষেরই খুব কম ধারণা আছে। অথচ একসময় তারা হাজার হাজার বছর ধরে এই পৃথিবীতে বিচরণ করেছে এবং মানুষের খুব কাছাকাছি জীবনযাপন করেছে।

আপনারা হয়তো জানেন, আধুনিক বিজ্ঞানের ধারণামতে পৃথিবীতে আধুনিক মানুষের (হোমো স্যাপিয়েন্স) আবির্ভাব প্রায় দুই লক্ষ বছর আগে। সেই থেকে মানুষ তার বুদ্ধিমত্তা, পরিশ্রম ও অভিযোজন ক্ষমতার মাধ্যমে পৃথিবীর সবচেয়ে প্রভাবশালী প্রাণীতে পরিণত হয়েছে।

কিন্তু প্রশ্ন হলো—মানুষ কি এই পৃথিবীর ইতিহাসে একমাত্র বুদ্ধিমান মানবপ্রজাতি ছিল?

এর উত্তর হলো, না।

মানুষের আগেও এবং মানুষের পাশাপাশি পৃথিবীতে বাস করত মানুষেরই অত্যন্ত নিকটাত্মীয় আরেক মানবপ্রজাতি—নিয়ান্ডারথাল।

প্রায় চার লক্ষ বছর আগে তাদের আবির্ভাব ঘটে। দীর্ঘ সময় ধরে তারা ইউরোপ ও পশ্চিম এশিয়ার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে বসবাস করেছে। যদিও আজ তারা বিলুপ্ত, তবুও তাদের ইতিহাস এখনও বিজ্ঞানীদের কাছে বিস্ময়ের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

নিয়ান্ডারথালদের দৈহিক গঠন অনেকটাই মানুষের মতো ছিল। তারা দুই পায়ে সোজা হয়ে হাঁটত, উচ্চতাও মানুষের কাছাকাছি ছিল এবং হাত-পায়ের গঠনেও ছিল আশ্চর্যজনক মিল।

তবে কিছু বৈশিষ্ট্য তাদের মানুষ থেকে আলাদা করত। তাদের কপাল ছিল তুলনামূলক নিচু, ভ্রুর ওপরের হাড় ছিল বেশি উঁচু, নাক ছিল বড় এবং মুখের সামনের অংশ কিছুটা সামনে বেরিয়ে ছিল। এই বৈশিষ্ট্যগুলোই তাদের পৃথক মানবপ্রজাতি হিসেবে চিহ্নিত করে।

কিন্তু নিয়ান্ডারথালদের প্রতি বিজ্ঞানীদের আগ্রহ শুধু তাদের চেহারার জন্য নয়।

গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষের মতোই তাদেরও আবেগ-অনুভূতি ছিল। তারা পরিবার গঠন করত, সন্তানদের যত্ন নিত, অসুস্থ সদস্যদের সেবা করত এবং বৃদ্ধদের দেখাশোনা করত।

এমনকি পরিবারের কেউ মারা গেলে তাকে সমাহিত করারও প্রমাণ পাওয়া গেছে, যা তাদের সামাজিক ও মানসিক বিকাশের একটি গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন।

প্রাচীন মানুষের মতো তারাও গুহায় পরিবার নিয়ে বসবাস করত। তবে মানুষ যেখানে বড় বড় দলে বাস করত, সেখানে নিয়ান্ডারথালরা সাধারণত ছোট ছোট দলে জীবন কাটাত। তাদের জীবনযাত্রা, শিকারের কৌশল এবং পারিবারিক বন্ধনের সঙ্গে প্রাচীন মানুষের জীবনের অনেক মিল খুঁজে পাওয়া যায়।

তাদের মস্তিষ্কের আকারও আধুনিক মানুষের কাছাকাছি ছিল। ডিএনএ বিশ্লেষণে দেখা গেছে, নিয়ান্ডারথালদের সঙ্গে আধুনিক মানুষের জিনগত সম্পর্ক অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। এই কারণেই বিজ্ঞানীরা তাদেরকে মানুষের সবচেয়ে কাছের বিলুপ্ত মানবপ্রজাতিগুলোর একটি হিসেবে বিবেচনা করেন।

তারাও দলবদ্ধভাবে শিকার করত এবং আগুন ব্যবহার করে খাদ্য রান্না করত। শিকার ধরার জন্য নিজেরাই পাথর ও কাঠ দিয়ে ধারালো অস্ত্র তৈরি করত। এসবই প্রমাণ করে, তারা কেবল শক্তিশালীই ছিল না, বরং পরিকল্পনা করে কাজ করার মতো বুদ্ধিমত্তাও তাদের ছিল।

এছাড়াও গুহার দেয়ালে চিত্র অঙ্কন, প্রাকৃতিক রঙের ব্যবহার এবং বিভিন্ন ধরনের অলংকার তৈরির প্রমাণ পাওয়া গেছে। এসব নিদর্শন থেকে বোঝা যায়, নিয়ান্ডারথালদের মধ্যেও সৌন্দর্যবোধ, সৃজনশীলতা এবং প্রতীকী চিন্তার বিকাশ ঘটেছিল।

এবার আসি নিয়ান্ডারথালদের সম্পর্কে সবচেয়ে বিস্ময়কর তথ্যটির দিকে।

একসময় ইউরোপ ও পশ্চিম এশিয়ার কিছু অঞ্চলে আধুনিক মানুষ এবং নিয়ান্ডারথালরা একই সময়ে পাশাপাশি বসবাস করত। হাজার হাজার বছর ধরে তাদের মধ্যে যোগাযোগ হয়েছিল, আর সেই যোগাযোগ শুধু সহাবস্থানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না।

আধুনিক জিনগত গবেষণায় নিশ্চিত হওয়া গেছে যে, মানুষ ও নিয়ান্ডারথালদের মধ্যে প্রজনন ঘটেছিল এবং তাদের মিলনে সন্তানও জন্ম নিয়েছিল। সেই সন্তানদের বংশধররাই প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে মানবসভ্যতার অংশ হয়ে টিকে আছে।

এ কারণেই আজও আফ্রিকার বাইরের অনেক মানুষের শরীরে প্রায় ১ থেকে ২ শতাংশ পর্যন্ত নিয়ান্ডারথাল-উৎপত্তির জিন পাওয়া যায়। অর্থাৎ, হাজার হাজার বছর আগে ঘটে যাওয়া সেই ঘটনাগুলোর একটি ক্ষুদ্র জিনগত স্মৃতি আজও আমাদের শরীরের মধ্যেই বহমান।

ভাবতে অবাক লাগে, প্রায় ৪০ হাজার বছর আগে পৃথিবী থেকে বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া একটি মানবপ্রজাতির উত্তরাধিকার আজও আধুনিক মানুষের শরীরে নীরবে বেঁচে আছে।

তবে প্রশ্ন হলো, নিয়ান্ডারথালরা কেন বিলুপ্ত হয়ে গেল?

এর সুনির্দিষ্ট উত্তর আজও বিজ্ঞান দিতে পারেনি। তবে গবেষকদের মতে, এর পেছনে একাধিক কারণ একসঙ্গে কাজ করেছে।

নিয়ান্ডারথালরা সাধারণত ছোট ছোট দলে বসবাস করত। ফলে কোনো বড় প্রাকৃতিক দুর্যোগ, জলবায়ুর পরিবর্তন, খাদ্যসংকট বা অন্যান্য বিপদের সময় তারা বড় জনগোষ্ঠীর মতো সহজে একে অপরের সহযোগিতা পেত না।

এদিকে পৃথিবীর পরিবেশও তখন বর্তমান সময়ের মতো নিরাপদ ছিল না। বরফ যুগের কঠিন আবহাওয়া, খাদ্যের অনিশ্চয়তা এবং ভয়ংকর শিকারি প্রাণীদের উপস্থিতি তাদের জীবনকে আরও কঠিন করে তুলেছিল।

অন্যদিকে আধুনিক মানুষ তুলনামূলক বড় সামাজিক দল গঠন করতে পেরেছিল, দূর-দূরান্তে যোগাযোগ স্থাপন করেছিল এবং পরিবেশের পরিবর্তনের সঙ্গে দ্রুত নিজেদের খাপ খাইয়ে নিয়েছিল। এই অভিযোজন ক্ষমতাই শেষ পর্যন্ত মানুষের টিকে থাকার অন্যতম বড় শক্তিতে পরিণত হয়।

ধারণা করা হয়, জলবায়ুর পরিবর্তন, ছোট জনসংখ্যা, আধুনিক মানুষের সঙ্গে প্রতিযোগিতা এবং দুই প্রজাতির মধ্যে প্রজনন—সব মিলিয়েই ধীরে ধীরে নিয়ান্ডারথালরা বিলুপ্ত হয়ে যায়।

কিন্তু ইতিহাসের এখানেই শেষ নয়।

আজ যখন আমরা নিজেদের পৃথিবীর একমাত্র মানবপ্রজাতি বলে ভাবি, তখন মনে রাখা উচিত—একসময় এই পৃথিবীতে আমাদের মতোই আরেকটি বুদ্ধিমান মানবপ্রজাতি বাস করত। তারা পরিবার গড়েছিল, শিকার করেছিল, শিল্প সৃষ্টি করেছিল, প্রিয়জনের মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছিল এবং হাজার হাজার বছর ধরে এই পৃথিবীরই অংশ ছিল।

তারা আজ আর নেই, কিন্তু তাদের গল্প হারিয়ে যায়নি। বরং আধুনিক মানুষের শরীরে বহন করা জিনের ক্ষুদ্র অংশে, প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনে এবং বিজ্ঞানের প্রতিটি নতুন আবিষ্কারে নিয়ান্ডারথালরা আজও নীরবে নিজেদের অস্তিত্বের সাক্ষ্য দিয়ে যাচ্ছে।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়