শনিবার, ২৩ মে, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য

প্রকাশ : ২৩ মে ২০২৬, ১৩:১৯

মায়ার কোরবানি

কবির হোসেন মিজি
মায়ার কোরবানি

ছোট্ট একটি গ্রাম। চারদিকে ধানক্ষেত, মাঝখানে সরু কাঁচা রাস্তা, আর রাস্তার একপাশে মফিজুল হকের টিনের ঘর। বয়স পঞ্চাশ পেরিয়েছে, চেহারায় রোদে পোড়া ক্লান্তি। বসত ঘরের পাশে ছোট্ট একটি ঘোয়ালঘর। গোয়ালঘরের দিকে তাকায় সে। গোয়ালঘরে বাঁধা ছিল একটা লাল-সাদা গরু।

নাম তার লালু। সাত বছর আগে একদিন বর্ষার সকালে গ্রামের হাট থেকে এই লাল-সাদা রঙের বাছুরটাকে কিনে এনেছিল মফিজুল। তখন বাচুরটা অনেক দুর্বল ঠিকমতো দাঁড়াতে পারতোনা, শরীর কাঁপতো। যারা বাচুরটাকে দেখেছিলো সেদিন সবাই বলেছিলÑএই বাছুরটা মনে হয় বাঁচবো না।

কিন্তু মফিজুল বুকে জড়িয়ে ধরে বাড়ি নিয়ে এসেছিলো। শীতের রাতে নিজের পুরোনো কম্বল জড়িয়ে দিয়েছে। ভাতের মাড় খাইয়েছে। জ্বর হলে কবিরাজ ডেকেছে। কখনো নিজের সন্তানের মতো মাথায় হাত বুলিয়েছে। তার স্ত্রী রাবেয়া মাঝেমধ্যে হাসত।

তুমি গরু না, আরেকটা ছেলে পালতেছো।

মফিজুলও হেসে বলত, আল্লাহর সৃষ্টি জীব। মায়া লাগবেই।

বছর গড়িয়েছে। ছোট্ট বাছুরটা ধীরে ধীরে আজ বিশাল ষাঁড়ে পরিণত হয়েছে। গ্রামের মানুষ দূর থেকে দেখতে আসে। কেউ বলে-এই গরুটা এবার ঈদের হাট কাঁপাইবো।

কেউ বলে কমপক্ষে পাঁচ লাখ দাম উঠবো।

কিন্তু মফিজুল এসব শুনে শুধু লালুর ঘাড়ে হাত রাখে।

গরুটা তার কণ্ঠ চিনত। দূর থেকে ডাক দিলেই হাম্বা করে উঠত।

এই বছর কোরবানীর আগে হঠাৎ মফিজুলের বড় মেয়ে নুসরাতের বিয়ের কথা পাকাপাকি হয়। ছেলেপক্ষ ভালো, কিন্তু কিছু খরচ তো আছেই। ঘরের চাল ভাঙা, ছোট ছেলের স্কুলের বেতন বাকি, উপরন্তু এনজিওর কিস্তি।

একদিন রাতে রাবেয়া চুপচাপ বলল-আমাদের লালুটারে এবার বিক্রি করা ছাড়া উপায় নাই গো।

মফিজুল কিছু বলল না।

শুধু বাইরে তাকিয়ে রইল।

গোয়ালঘরে তখন লালু শান্ত হয়ে খড় চিবোচ্ছে।

সেদিন রাতে মফিজুল ঘুমাতে পারেনি।

ভোরে উঠে গরুর শরীরে পানি ঢেলেছে। সাবান দিয়ে ধুয়ে গোসল করিয়ে নিজের পুরোনো গামছা দিয়ে শরীর মুছে দিয়েছে।

মনে হচ্ছিল, ছেলেকে বিদায় দেওয়ার আগে সাজিয়ে দিচ্ছে সে।

কোরবানির ঈদ ঘনিয়ে আসছে, চাঁদপুরের বড় পশুর হাট। চারদিকে মানুষের ভিড়। মাইকে ডাকাডাকি। গরুর হাম্বা, ছাগলের ডাক, দরদামের চিৎকার। পুরো হাট জুড়ে মানুষ আর পশুর কোলাহল।

মফিজুল লালুকে নিয়ে হাটের এক কোণে দাঁড়িয়ে আছে। কিছুক্ষণ পর পর গামছা দিয়ে তার শরীর মুছে দিচ্ছে।

লোকজন কাছে এসে ঘুরে ঘুরে গরুটি দেখছে, কেউ দাঁত দেখে, শরীর টিপে দেখে, দাম বলে চলে যায়।

দুই লাখ আশি, তিন লাখ, তিন লাখ বিশ।

কিন্তু মফিজুল মাথা নাড়েনা।

তার নিজের কাছেই বুঝতে কষ্ট হচ্ছিল, সে কি আসলে লালুকে বিক্রি করতে এসেছে, নাকি বিক্রি না করার অজুহাত খুঁজছে।

বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা হলো, হাট ভাঙতে শুরু করেছে।

এক ব্যবসায়ী এসে বলল চাচা, শেষ কথা বলেন।

মফিজুল গরুর দিকে তাকালো।

লালু শান্ত চোখে তার দিকে তাকিয়ে আছে।

হঠাৎ বুকের ভেতর মোচড় দিল।

সে দড়ি টেনে বলল, না ভাই, বিক্রি করুম না। মানুষ হাসাহাসি করল।

বিক্রি করবো না তাহলে আবার হাটে আনছে কেন!

কিন্তু মফিজুল কিছু শুনল না। রাতের অন্ধকারে সে গরু নিয়ে বাড়ি ফিরল।

সেই রাতে লালুকে অনেকক্ষণ জড়িয়ে ধরে বসে ছিল মফিজুল।

ঈদের আগে দ্বিতীয় পশুর হাট, এইবার সে চাঁদপুরের বাহিরের হাটে লালুকে নিয়ে যাবে।

স্ত্রী রাবেয়া কষ্টের গলায় বলেছিল এভাবে চললে মেয়ের বিয়েটা ভেঙে যাবে।

মফিজুল মাথা নিচু করে রইলো।

হাটে এবার লালুর দাম আরো বেশি উঠল।

তবুও শেষ মুহূর্তে সে ফিরে এল।

গ্রামের মানুষ বলতে লাগল মফিজুল পাগল হয়ে গেছে। সে গরুকে হাটে নিয়ে বিক্রি না করেই ফিরে আসে।

কেউ বুঝল না, একটা প্রাণীকে বছরের পর বছর বুকের ভেতর জায়গা দিলে, সেটা আর শুধু গরু থাকে না। সেটা সংসারের অংশ হয়ে যায়।

ঈদের আগে শেষ হাট। এদিন আকাশ অনেকটে মেঘলা হয়ে আছে। হাটের ভিড় আগের চেয়েও বেশি। মফিজুল আজ খুব চুপচাপ লালুকে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

সে জানে এবার বিক্রি না করলে আর উপায় নেই। দুপুরের দিকে এক ভদ্রলোক হাটে এলেন। সঙ্গে তার কলেজপড়ুয়া ছেলে। ছেলেটার বয়স কুড়ি কি একুশ বছর হবে। চোখে চশমা।

ভদ্রলোক গরু দেখে বললেন মাশাআল্লাহ। অনেক যত্ন করছেন বুঝি।

মফিজুল শুধু মাথা নেড়ে বলল সেই ছোট থেইকা পালছি এখন এত বড় হয়েছে।

ছেলেটা গরুর মাথায় হাত বুলিয়ে দিল। আশ্চর্যজনক ভাবে লালুও অনেকটা শান্ত হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।

ছেলেটা বললো আব্বু, এই গরুটা অন্যরকম। অনেক শান্ত।

ভদ্রলোক দাম জিজ্ঞাসা করলেন।

মফিজুল ৫ লাখ টাকা দাম চেয়ে চুপ হয়ে রইলো। ভদ্রলোক সাড়ে ৩ লাখ টাকা দাম বললেন। কিন্তু মফিজুল তখনো চুপচাপ।

তিনি আরো কিছু বাড়ালেন।

চারপাশের লোকজন বলল ভাই এই দামে গরুটা দিয়ে দেন। তাদের বলাবলির

অনেকক্ষণ পরে মফিজুল কাঁপা গলায় বলল-একটা কথা ছিল।

ভদ্রলোক বলেন জ্বি বলুন?

মফিজুল আবদারের সুরে নরম কণ্ঠে বললো গরুটারে কষ্ট দিয়া মারবেন না।

ভদ্রলোক থমকে গেলেন।

তিনি আস্তে করে বললেন, কোরবানী তো ইবাদত। কষ্ট দেওয়ার জন্য না।

এই কথাটা শুনে মফিজুলের বুক হঠাৎ ভারী হয়ে উঠল। তারপর ক্রেতার কাছ থেকে তিন লাখ পচাত্তর হাজার টাকা নিয়ে গনতে শুরু করলেন।

লালুর গলার দড়িটা ছেলেটার হাতে দেওয়ার সময় তার হাত কাঁপছিল।

লালু হঠাৎ দড়ি টান দিয়ে আবার মফিজুলের দিকে মুখ ফিরে তাঁকালো।

সেই মায়া ভরা চোখ। দুই চোখে যেনো পানি টলমল করছে। সাতটি বছরের পরিচিত মুখ আর মায়া ভরা চোখের দিকে তাঁকিয়ে মফিজুল আর ঠিক থাকতে পারল না।

হাটের মাঝখানে দাঁড়িয়ে মুখে গামছা চেপে ধরো শিশুর মতো হাউ মাউ করে কেঁদে উঠল। চারপাশের মানুষ থমকে গেল। কেউ ই হাসল না এবার।

কারণ সবাই বুঝতে পারছে মফিজুলের এই কান্না টাকার জন্য না। এই কান্না মায়া, ত্যাগ আর ভালোবাসার।

ছেলেটা ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে বলল, চাচা

মফিজুল চোখ মুছল।

ছেলেটা বলল আমার একটা অনুরোধ আছে।

কি বাবা বলো।

যদি অনুমতি দেন, ঈদের পর মাঝে মাঝে আপনাকে দেখতে আসবো।

মফিজুল অবাক হয়ে তাকাল।

ছেলেটা নিচু গলায় বললÑছোটবেলায় আমাদেরও একটা গরু ছিল। আব্বু বিক্রি করার পর আমি তিনদিন কেঁদেছিলাম। তখন বুঝিনি। আজ আপনাকে দেখে বুঝতে পারছি মায়াটা কি জিনিস।

ভদ্রলোক ক্রেতা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, কোরবানী শুধু পশুর না। মানুষের ভেতরের সবচেয়ে প্রিয় জিনিসের মায়া ত্যাগ করার নামই কোরবানী।

ঈদের আগের দিন রাতে শহরের এক বাসার উঠোনে লালুকে রাখা হয়েছে। গরুটার সাথে ছেলেটা খেলা করছিলো, তার নাম আরিয়ান, সকাল থেকে গরুর পাশে বসে আছে আর দেখছে গরুটির সাথে নানান কথা বলছে। পানি খাওয়াচ্ছে।

তার মা লালুর দিকে তাঁকিয়ে বললেন তুই এত চুপচাপ কেন?

আরিয়ান বলল, জানো মা, হাট থেকে যেদিন গরুটা আনতে গিয়েছি, তখন মনে হচ্ছিল, আমরা শুধু একটা পশু কিনে আনিনি, একজন মানুষের সাত বছরের মায়া কিনে এনেছি।

তার মা চুপ হয়ে গেলেন।

পরদিন কোরবানীর আগে আরিয়ান গরুর মাথায় হাত রেখে ফিসফিস করে বলল তোকে যারা ভালোবাসছে, আল্লাহ তাদের ভালো রাখুক।

তার চোখও পানিতে ভিজে উঠেছিল।

ঈদের দুইদিন পর মফিজুল বিকেলের দিকে উঠোনে বসে আছে। গোয়ালঘরটা কেমন খালি খালি হয়ে আছে।

খড় আছে, পানির বালতি আছে, শুধু লালু নেই। লালুর কথা মনে করে বড় একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো।

হঠাৎ উঠোনে একটা মোটরসাইকেল এসে থামল।

আরিয়ান আর তার বাবা।

তাদের হাতে কয়েকটা প্যাকেট।

আরিয়ান এগিয়ে এসে বললো চাচা, কোরবানীর মাংস আনছি।

মফিজুল উঠে দাঁড়াল।

আরিয়ান হাসল। আর একটা জিনিস।

সে পকেট থেকে মোবাইল বের করে মফিজুলকে একটি ভিডিও দেখাতে লাগলো।

কোরবানীর আগ মুর্হুতে লালুর মাথায় পানি ঢালা হচ্ছে, দোয়া পড়া হচ্ছে, খুব যত্ন করে রাখা হচ্ছে।

আরিয়ান বলল আপনি যেন চিন্তা না করেন সে জন্য ভিডিওটি করে রেখেছি।

ভিডিও দেখতে দেখতে মফিজুলের চোখ ভিজে গেল। আড়ালে গিয়ে বুকফাটা কান্নায় ভেঙ্গে পড়লো। গোয়ালঘরের সামনে দাঁড়িয়ে লালুকে স্মরণ করে মনে মনে বলল হে আল্লাহ, এই কষ্টটাই বুঝি আসল কোরবানী...

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়