শনিবার, ২৩ মে, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য

প্রকাশ : ২৩ মে ২০২৬, ১৩:১৭

ধারাবাহিক উপন্যাস-৪৩

নিকুঞ্জ নিকেতন

রাজীব কুমার দাস
নিকুঞ্জ নিকেতন

(পূর্ব প্রকাশের পর)

বিশাখাকে চশমাটা দিতে বললে সে যখন চশমা হাতে দিল তখন চশমা পড়ে ভালোভাবে চেয়ে দেখে। রাজীব দৌঁড়ে এসে তার বাবাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগে। নরেন্দ্রদা চোখ বন্ধ করে তাকে বুকে জড়িয়ে রাখলেন আর তার দু চোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে। বাবা ছেলের এই মিলনমেলায় আমরাও অশ্রুসিক্ত। তাদের দুজনকে একসাথে থাকতে দেওয়া উচিত তাই বাপ-ছেলেকে রেখে আমরা বাইরে চলে আসি।

‘আমি তোমাকে আর এখানে থাকতে দিব না বাপি তুমি আমার সাথে যাবে। তোমার উন্নত চিকিৎসা হবে তুমি আবার আগের মতো সুস্থ্য হয়ে যাবে।’

‘ওরে পাগল কোথায় নিবে আমায়। এই মাটি যে আমাকে যেতে দিবে না। তা আমার অসুস্থ্যতার কথা বুঝি বিশাখা জানিয়েছে?’

‘তুমি অসুস্থ আর এটা আমায় না জানানোর জন্য বলছ?’

‘ওরে আমার পাগল ছেলে, এখন তোমার যে অনেক কাজ অনেক দায়িত্ব সেগুলো ফেলে এসে কী বাপির কাছে বসে থেকে কোনো লাভ হবে?’

‘আমি লাভ-লস অত কিছু বুঝি না।’

‘বুকটা কেমন যেন চিনচিন ব্যথা করছে। তোমার জন্য একটা সারপ্রাইজ আছে। উফ অসহ্য লাগছে। বিশাখা মা ওদের একটু আসতে বল তো।

কথাটা বলার সাথে সাথে আমি উঠে দাঁড়াই আর ছুটে যাই বাইরে। কাকাবাবুর অস্থিরতা আগের মতো, এবার নতুন করে বলছে বুকে চিনচিন ব্যথা। কী করব, আগে তাদের বলব নাকি ডাক্তার ডাকব? কোনটা আগে করা উচিত ভেবে পাচ্ছি না। ছুটে যেতে দেখে সারোয়ার আংকেল আমার কাছে তড়িঘড়ি করে আসে আমি বলি-কাকাবাবু আপনাদের ডাকছেন আর উনার শরীরের অবস্থা আগের মতোই অস্থির করছে, আমি ডাক্তার ডেকে আনছি। সারোয়ার আংকেল আমাকে পাঠিয়ে দিয়ে নিজে গেলেন ডাক্তার আনতে।

‘বাবা তোমার কী খুব কষ্ট হচ্ছে?’

‘ওরা এখনো আসেনি কেন? আমায় একটু জল খাওয়াতে পারবে?’

‘আমি এখনই আনছি।’

‘আমায় একা রেখে যেও না রাজীব।’

‘আমি আছি তোমার কাছে কোথাও যাব না।’

‘জান, তোমার মা গতকাল আমার কাছে এসেছিল। এসেই আমার সাথে ঝগড়া শুরু করল আর বলেÑআর কত এখানে পড়ে থাকবে এবার এসো। আমি বললাম কোথায় যাব? সে বলে আমার সাথে এসো আমরা দুজনে বারান্দায় বসে বৃষ্টি দেখব। তারপর কোথায় যেন হারিয়ে গেল আর পাইনি তাকে। আমায় একটু জড়িয়ে ধরবে রাজীব।’

‘হ্যাঁ বাপি আমি তোমায় বুকে জড়িয়ে ধরছি তুমি শান্ত হও। বিশাখা জলের ব্যবস্থা কর বপি জল খাবে।’

বিশাখা এসেও আবার ফিরে যায় জল আনার জন্য। বাপি আমার বুকে মাথা রেখেছে। আমি কথা বলে যাচ্ছি আর বাপির নড়াচড়া অনুভব করছি। এরই মধ্যে উনারা সকলে এসে পাশে দাঁড়ালেন। আমাদের সকলের কথা বলা হচ্ছে বাপির সাথে বাপি নড়ছে কিন্তু বলছে না কিছুই। এদিকে আবারও জল খাওয়ার জন্য বললে পিটার আংকেল চিৎকার করে জল আনার জন্য বলে। কিছুক্ষণ পর ধীরে ধীরে শরীরটা শীথিল হয়ে যায় আর কোনো নড়াচড়া অনুভব করছি না। বাপিকে কয়েকবার ডাক দিচ্ছি কিন্তু সাড়া পাচ্ছি না। এদিকে অনিমেষ আংকেল অনবরত ডেকে যাচ্ছেন দাদা-দাদা বলে কিন্তু কোনো সাড়া নেই। বিশাখা জলের বোতল আনার সাথে সাথে গ্লাসে ঢেলে আমায় দেয় আমি হাতে তুলে নিয়ে কেমন যেন পাথরের মতো হয়ে আছি। বাপির দেহটা অনায়াসেই আমার বুক থেকে ঢলে পড়ল। তাকিয়ে আছি, কী হয়েছে তাতে কোনো জ্ঞান নেই। ডাক্তার এসে নার্ভ চেক করে তারপর বলেÑসরি। কেমন যেন শব্দটা কানে যাচ্ছে না। সকলে কাঁদছে আর আমার ভেতর সবকিছু ওলট-পালট মনে হচ্ছে। কী করতে যাচ্ছি বা কী করা উচিত সেটার কোনো ধারণা নেই। বিশাখা আমায় ঝাঁকিয়ে বলছেÑরাজীব কাকাবাবু বেঁচে নেই। আমি কাঁদছি না তবে চোখ ছল ছল করে চোখের পাশ বেয়ে অনায়াসে অশ্রু ঝড়ে পড়ছে। অসহায়ের মতো এদিক-ওদিক তাকাই, অবশেষে কেঁদে উঠলাম। বাপি আমার কাছে জল চেয়েছিলেন আর আমি সেটা পূরণ করতে পারিনি, নিজেকে বড় অপরাধী মনে হচ্ছে। পৃথিবীতে আমার মতো হতভাগ্য সন্তান বুঝি আর নেই যে তার বাবাকে অন্তীম যাত্রায় জলটুকু খাওয়াতে পারেনি। পিতৃত্বের ঋণ কিছুটা শোধ করার সুযোগ ছিল অথচ সেটাও অসম্পূর্ণ থেকে গেল। অবশেষে পৃথিবীর সবচেয়ে আপন মানুষটি আমার কাছ থেকে হারিয়ে গেল।

[পরের পর্ব আগামী সংখ্যায় ছাপা হবে]

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়