প্রকাশ : ২৩ মে ২০২৬, ১০:১০
সিলভার মার্কেটিং অর্থনীতির চাকা

বিশ্ব দ্রুত বদলে যাচ্ছে। মানুষের গড় আয়ু বাড়ছে, স্বাস্থ্যসেবার উন্নতি হচ্ছে এবং প্রবীণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যা ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। একসময় প্রবীণদের শুধু নির্ভরশীল জনগোষ্ঠী হিসেবে দেখা হলেও বর্তমানে বিশ্ব অর্থনীতি তাদের নতুন চোখে দেখতে শুরু করেছে। কারণ প্রবীণরা শুধু অভিজ্ঞতার ভাণ্ডার নন, তাঁরা একটি বড়ো ভোক্তা গোষ্ঠীও। এই প্রবীণ জনগোষ্ঠীকে কেন্দ্র করে যে অর্থনৈতিক কার্যক্রম গড়ে উঠছে, তাকে বলা হয় ‘সিলভার মার্কেটিং’। অনেক অর্থনীতিবিদ এখন মনে করেন, ভবিষ্যৎ অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি হবে এই সিলভার মার্কেটিং।
|আরো খবর
‘সিলভার’ শব্দটি এখানে প্রবীণদের ধূসর চুলের প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। আর সিলভার মার্কেটিং বলতে বোঝায়— প্রবীণদের প্রয়োজন, পছন্দ, সামর্থ্য ও জীবনধারা বিবেচনা করে পণ্য ও সেবা তৈরি এবং বাজারজাত করা। এটি শুধু ব্যবসার নতুন ধারণা নয়, বরং একটি নতুন সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা।
একসময় ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো প্রধানত তরুণদের লক্ষ্য করে বিজ্ঞাপন ও পণ্য তৈরি করতো। ধারণা ছিলো, তরুণরাই সবচেয়ে বড়ো ক্রেতা। কিন্তু বর্তমানে পরিস্থিতি বদলেছে। বিশ্বের বহু দেশে প্রবীণদের হাতে বিপুল সঞ্চয়, পেনশন ও সম্পদ রয়েছে। তাঁরা ভ্রমণ করেন, স্বাস্থ্যসেবা নেন, প্রযুক্তি ব্যবহার করেন, বিনোদনে অংশ নেন এবং নিজেদের জীবনকে উপভোগ করতে চান। ফলে ব্যবসায়ীরা বুঝতে শুরু করেছেন যে, প্রবীণদের উপেক্ষা করা মানে একটি বিশাল বাজার হারানো।
সিলভার মার্কেটিংয়ের সবচেয়ে বড়ো শক্তি হলো প্রবীণদের স্থিতিশীলতা। তরুণদের মতো তাঁরা হঠাৎ সিদ্ধান্ত বদল করেন না। যে পণ্য বা প্রতিষ্ঠানের ওপর আস্থা তৈরি হয়, সেখানে দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক গড়ে তোলেন। ফলে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো প্রবীণদের ‘বিশ্বস্ত গ্রাহক’ হিসেবে বিবেচনা করে।
বর্তমান বিশ্বে প্রবীণদের জন্যে বিশেষ স্বাস্থ্যপণ্য, সহজ প্রযুক্তি, আরামদায়ক বাসস্থান, নিরাপদ ব্যাংকিং সেবা, অবসর ভ্রমণ প্যাকেজ, প্রবীণবান্ধব পরিবহন, হোম কেয়ার সার্ভিস, এমনকি বিশেষ মোবাইল ফোন ও অ্যাপ তৈরি হচ্ছে। এসব খাতের পেছনে রয়েছে বিশাল অর্থনৈতিক সম্ভাবনা। স্বাস্থ্যসেবা, পর্যটন, রিয়েল এস্টেট, বিনোদন, খাদ্য শিল্প, প্রযুক্তি— প্রায় সব খাতেই সিলভার মার্কেটিং নতুন বাজার তৈরি করছে।
বাংলাদেশেও এই বাস্তবতা দ্রুত সামনে আসছে। দেশে প্রবীণ মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। কিন্তু আমাদের বাজার ব্যবস্থা এখনও মূলত তরুণকেন্দ্রিক। প্রবীণদের জন্যে আলাদা পরিকল্পনা খুব কম দেখা যায়। অথচ এই জনগোষ্ঠীর চাহিদা ও ব্যয় ক্ষমতাকে গুরুত্ব দিলে অর্থনীতিতে নতুন গতি আসতে পারে।
ধরা যাক, একজন প্রবীণ নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ জীবন পাচ্ছেন। তিনি নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করছেন, নতুন পোশাক কিনছেন, বই পড়ছেন, পরিবার নিয়ে বেড়াতে যাচ্ছেন, আরামদায়ক আসবাব ব্যবহার করছেন, ডিজিটাল ব্যাংকিং শিখছেন কিংবা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশ নিচ্ছেন। এসব কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে বাজারে অর্থ প্রবাহিত হচ্ছে। অর্থাৎ একজন সক্রিয় প্রবীণ শুধু নিজের জীবনকেই প্রাণবন্ত করেন না, অর্থনীতির চাকাও সচল রাখেন।
অন্যদিকে যদি প্রবীণরা ভয়, অবহেলা ও অনিরাপত্তার মধ্যে থাকেন, তাহলে তাঁরা ব্যয় কমিয়ে দেন। টাকা জমিয়ে রাখেন, নতুন কিছু কিনতে চান না, সামাজিক জীবন থেকে দূরে সরে যান। এতে বাজারে চাহিদা কমে যায়। তাই সিলভার মার্কেটিংয়ের অন্যতম শর্ত হলো—প্রবীণদের নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করা।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সিলভার মার্কেটিং মানে শুধু প্রবীণদের কাছে পণ্য বিক্রি নয়। এটি তাঁদের সম্মান, স্বাচ্ছন্দ্য ও আত্মমর্যাদাকে গুরুত্ব দেওয়ার একটি দৃষ্টিভঙ্গি। বিজ্ঞাপনে প্রবীণদের অসহায় নয়, বরং সক্রিয় ও অভিজ্ঞ মানুষ হিসেবে তুলে ধরা প্রয়োজন। কারণ ইতিবাচক উপস্থাপনাও বাজার আচরণকে প্রভাবিত করে।
বিশ্বের উন্নত দেশগুলো এখন ‘সিলভার ইকোনমি’ নিয়ে বড়ো পরিকল্পনা করছে। জাপান, জার্মানি, দক্ষিণ কোরিয়া কিংবা ইউরোপের অনেক দেশে প্রবীণদের কেন্দ্র করে নতুন শিল্প ও সেবা খাত গড়ে উঠেছে। বাংলাদেশও যদি এখন থেকেই প্রস্তুতি নেয়, তাহলে প্রবীণ জনগোষ্ঠীকে অর্থনীতির বোঝা নয়, বরং সম্পদ হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব হবে।
মনে রাখতে হবে, অর্থনীতির মূল শক্তি মানুষ। আর প্রবীণরাও সেই শক্তির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাঁদের অভিজ্ঞতা যেমন সমাজকে সমৃদ্ধ করে, তেমনি তাঁদের ভোগ ক্ষমতা ও বাজার অংশগ্রহণ অর্থনীতিকে গতিশীল করে। তাই সিলভার মার্কেটিং কেবল ব্যবসার নতুন কৌশল নয়, এটি ভবিষ্যৎ অর্থনীতির এক গুরুত্বপূর্ণ চাকা। প্রবীণবান্ধব সমাজ যত গড়ে উঠবে, অর্থনীতির গতিও তত শক্তিশালী হবে।




