প্রকাশ : ২৩ মে ২০২৬, ১৩:১৮
শব্দ ও শব্দের রূপকার
কে বেশি শক্তিশালী? শব্দ; না কি কাপড়ের বুননের মতো যিনি শব্দকে থরে থরে সাজিয়ে তৈরি করেন প্রাণ রসালো কথামালা; তিনি? এ দুইয়ের মাঝে লড়াই বহুকালের। দুই পরাশক্তি লড়ে চলেছে দিন রাত। শব্দ বা আওয়াজ যে দিক থেকে আসে, শ্রবণেন্দ্রিয় স্বতঃই সেদিকে চলে যায়। অতঃপর শব্দের কারিগর তার নিগুঢ় তত্ত্ব বলে যান। শব্দ তখন বুকের ছাতি ফুলিয়ে গর্ব করে; আমি আছি বলেই আমাকে নিয়ে কত আলোচনা, সমালোচনা।
শব্দের কারিগর তখন শব্দকে থামিয়ে দেয়। কারিগর না থাকলে তুমি শব্দের কি দাম? আমি তো তোমাকে আঙ্গিক মান বজায় রেখে যথাস্থানে উপস্থাপন করি। আমার উপস্থাপনার ছোঁয়া না পেলে, আমার শিল্পমান তৈরি না হলে, ছন্দ আর সুরের মিলন না ঘটলে তুমি শব্দ বুকের ছাতি ফুলাতে পারতে? আমি তোমাকে লিখেছি পোড়া মাটির চাঁকতিতে, গাছের বাঁকলে, পাহাড়ের গায়ে, পশুর হাড়ে, পশুর চামড়ায়, তালপাতায়, পেপিরাসে, আমি তোমাকে লিখে রেখেছি পার্চমেন্ট আর ভেলামে। তবেই না তুমি কালের গর্তে হারিয়ে যাওনি। যুগ থেকে যুগান্তরে তোমাকে চিনে চলেছে শব্দ সন্ধানী মানুষ।
শব্দ স্থীর হয়; গুরুগম্ভীর স্বরে আবার শুরু করে। শান্ত ভাবে রূপকারকে বুঝায়। এই তো সেদিন তুমি এক জম্পেস আড্ডায় মজে ছিলে। এমন সময় তোমাদের একজন মা বলে ডেকে উঠলো। তোমার মনে এক ধরনের শ্রদ্ধা জন্ম নিল। ভক্তির শীর আপনা আপনিই নত হয়ে গেল। মায়ের দিকে তাকিয়ে তোমার মনে রাজ্যের সুখ নেমে এলো। আরেক জন মেয়ে বলে ডেকে উঠলো। তোমার মন স্নেহের পরশে ভরে গেল। সন্তানের সুখ সমৃদ্ধির জন্য ভবিষ্যৎ রচনায় ব্যস্ত তুমি। আরেক জন স্ত্রী বলে ডেকে উঠলো। মনের কোণে জমে থাকা ভালোবাসার অনুরণ তৈরি হলো তোমার প্রতিটি শিরায় শিরায়। তুমি নিজেকে সুপুরুষ প্রমাণে উর্ধ্বঃশ্বাসে ঘোড়া দৌঁড়াতে ব্যস্ত। তোমার মনের দরজা খুলে রাখো অহর্নিশ ভালোবাসার গোলাপ ফুটানোর আশায়।
শব্দ দৃঢ় ভাবে কথা বলে। হে শব্দের কারিগর তুমি কি শুনতে পাচ্ছো? আমি এখানে আমার বিপুল ভান্ডার থেকে নারী চরিত্রের মাত্র একটি শব্দের সামান্য অংশ তুলে ধরলাম। এতেই কত ছন্দপতন! ভালো করে দেখ আমি শব্দ, আমার কত ক্ষমতা। আমি নিমিষেই উচ্চারিত হই, আর পরিবর্তন করে দেই মন মগজ দেশ মহাদেশের রূপ রঙ্গ।
গাছের পাতায় যখন বাতাসের ছোঁয়া লাগে তখন আমরা এক ধরনের শব্দ শুনতে পাই। আমি যখন পথিক হয়ে পথে হেঁেট যাই তখন পায়ের সাথে মাটির ঘর্ষণে এক ধরনের শব্দ তৈরি হয়। মেঘ বেয়ে বৃষ্টি ঝরে পড়ার সময় তৈরি হয় বৃষ্টির আওয়াজ। পাহাড়ের গা বেয়ে প্রবাহিত ঝর্ণাধারা তৈরি করে এক মোহনীয় শব্দের ঝংকার। পশু-পাখি, কীট পতঙ্গ নিজস্ব বলয়ে নিজেদের মাঝে তৈরি করে এক শব্দের জগৎ। এভাবে শব্দ তৈরি হয় পাখির আচরণে, নদীর কলতানে, সাগরের গর্জনে। শব্দ তৈরি হয় শিশুর কান্নায়। শব্দ তৈরি হয় সুউচ্চ মিনার হতে। শব্দ তৈরি হয় শান্তির আহ্বানে, প্রশান্তির হাসি থেকে। শব্দ তৈরি হয় জালিমের জুলুম থেকে মজলুমের আর্তনাদ থেকে।
কিছু শব্দ আবেগের; যা প্রাণকে উড়ন্ত পাখির মতো হাওয়ায় ভাসায়। কিছু শব্দ অনুভূতির; যা প্রাণের ভেতরের শক্তির উন্মেষ ঘটায়। কিছু শব্দ আনন্দের; যা প্রাণের কষ্ট ভুলাতে সহায়তা করে। কিছু শব্দ বেদনার; যা নোনাজলের গতি বাড়ায়। কিছু শব্দ ক্লান্তির; পরিশ্রমের পর যা স্বতঃই প্রকাশ পায়। কিছু শব্দ শ্রদ্ধার, কিছু শব্দ স্নেহের, কিছু শব্দ নমনীয়তার, কিছু শব্দ উগ্রতার, কিছু শব্দ গড়ে উঠার, কিছু শব্দ ধ্বংসের, কিছু শব্দ ভয়ের, কিছু শব্দ প্রাণের, কিছু শব্দ অহংকারের, কিছু শব্দ নম্রতার, কিছু শব্দ সাহসের, কিছু শব্দ কাপুরুষের, কিছু শব্দ উন্মাদের কিছু শব্দ সুস্থতার।
কিছু শব্দে মন জেগে উঠে, কিছু শব্দে মন মরে যায়, কিছু শব্দে ভালোবাসা জন্মায়, কিছু শব্দে ভালোবাসার মৃত্যু ঘটে, কিছু শব্দে শক্তি বাড়ে, কিছু শব্দে শক্তি কমে, কিছু শব্দে শিশু ঘুমিয়ে যায়, কিছু শব্দে জেগে উঠে শিশু, কিছু শব্দে জনপদ ঘুমিয়ে যায়, কিছু শব্দে জনপদ জেগে উঠে। আহা! শব্দের কত শত ব্যবহার।
উপত্যকায় দাঁড়িয়ে কথা বলি, শব্দ করে কিছু উচ্চারণ করি। সে উচ্চারণ পাহাড়ের গায়ে আছড়ে পড়ে; প্রতিধ্বনি হয়ে ফিরে আসে আমার নিকট। আমি অভিভূত হই, আন্দোলিত হই। ক্লান্তি ভুলে মিলিত হতে চাই মহাশব্দের পরশে।
শব্দে গতি থাকে। দৃশ্যমান বা অদৃশ্য অস্তিত্বের ভেতর দিয়ে অনায়াসে সে প্রবেশ করতে পারে। মুহূর্তেই তার অস্তিত্ব ছড়িয়ে পড়ে জনপদ থেকে জনপদে, গ্রাম থেকে শহরে, দেশ থেকে মহাদেশে। শব্দের গতি চলে আলোর পেছনে পেছনে, পানির পরতে পরতে মাটির গভীরে। শব্দ উড়ে চলে হাওয়ায় ভেসে ভেসে।
শব্দ এক শক্তিশালী অস্তিত্ব। শব্দের কারিগর সে অস্তিত্বের ব্যবস্থাপক। লড়াইয়ে কে জিতবে সে জন্য প্রতিযোগিতা হচ্ছে অনেক। তবে শব্দ তার জায়গায় স্বতন্ত্র শক্তির অধিকারী। তার ধ্বনীতে রয়েছে যাদুকরি শক্তির আধার। শব্দের যাদুতে পৃথিবীতে তৈরি হয়েছে ভালোবাসার কুটির, ছন্দ, সুর, আবাদ হয়েছে মরু প্রান্তর, বিরান বনভূমি। গড়ে উঠেছে সুরম্য ভবন, টেরাকোটা নকসা। শব্দের ইশারায় গড়ে উঠেছে সমাজ রাষ্ট্র সভ্যতা মহাকাব্য মহাকালের ইতিহাস।
শব্দের বিনাসী আঘাতে ভেঙ্গে গেছে কতশত স্বপ্নের বুনন। স্ব-যতনে লালন করা প্রেমের মহল। ধ্বংস হয়েছে নগর থেকে গ্রাম প্রাণের যত অস্তিত্ব। শব্দের বিনাসী আঘাত থেকে রক্ষা পায়নি নিরপরাধ পশু আর গাছপালাও। শব্দের কালো ইশারায় পৃথিবী দেখেছে বিশ্বযুদ্ধ। এখানে শব্দের বিচার হয় না; বিচার হয় ব্যবস্থাপকের। শব্দ ছাড়া ব্যবস্থাপক মূল্যহীন। ব্যবস্থাপক ছাড়া শব্দ ধুসর মরুভূমি।







