প্রকাশ : ১১ এপ্রিল ২০২৬, ১১:২৭
ধারাবাহিক উপন্যাস-৩৮
নিকুঞ্জ নিকেতন

(পূর্ব প্রকাশের পর)
ভদ্রতার খাতিরে আমরা সকলে উঠে চলে আসি পিটারকে রেখে। সারোয়ার বেশ বিরক্ত আমার কথায় তারপর বলেÑআপনি কেন উনাদের সুযোগ দিলেন। যে সন্তান জন্মদাতার সম্মান করতে পারে না তাকে আবার ভদ্রতা কীসের। আমি জানি কিন্তু ঘরে আসা মানুষটা অতিথি আর অতিথিকে অবজ্ঞা করা আমাদের কালচারের বাইরে। এজন্যই তো বলেÑঅতিথি দেব ভব: অর্থাৎ অতিথিকে দেবতা জ্ঞানে সমাদার কর। আমরা চলে আসার পর বেশ বিনয়ের সাথে তার ছেলে বাবার কাছে এসে বসে। ছেলের বউ তখনো দূরে দাঁড়ানো তবে তাদের চোখে-মুখে অসহায়ত্বের ছাপ পরিলক্ষিত।
‘বাবা তোমার এমন সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে কী আমাদের কথা একটি বারের জন্যও ভাবলে না? আমরা কোথায় যাব, কী করব এই সন্তানদের নিয়ে? আমাদের সন্তান তোমারও তো নাতি-নাতনি।’
‘যাক অবশেষে এটা মনে তো করতে পেরেছ এটাই যথেষ্ট। তা আজ হঠাৎ করে কেন মনে পড়ল আমাকে সেটা বল আগে।’
‘বাড়িটা বিক্রি করে আমাদের পথে বসিয়ে দিয়েছ। তোমার বাড়িতে আমাদেরও অংশ আছে সেটা কী ভুলে গেছ?’
‘বাড়িটা আমার নামে আর আইনি প্রক্রিয়ায় এটা বিক্রি করার অধিকার একমাত্র আমারই এখানে তোমাদের অধিকার আসে কোথা থেকে? আমি যদি মরে যেতাম তাহলে উত্তরাধিকারীর প্রশ্ন আসত।’
‘আমাদের উকিল বলেছিল মামলা করতে কিন্তু তা করিনি। তুমি আমাদের কথা মনে না রাখলেও আমরা ঠিকই আজও তোমায় বাবা মানি।’
‘তাই ... যখন তোমারই কাছ থেকে অবমাননা পেয়েছি তখন কী মেনেছ? দিনের পর দিন আমার মতো একটা ডায়াবেটিস রোগীকে সামর্থ থাকা স্বত্তেও খাবারের কষ্ট দিয়েছ তখন কী মেনেছিলে? আমার শ্রমে গড়া সম্পদ মরার আগে আমি নিজেই শেষ করেছি এটাতে তোমার আইন বা তুমি কিছুই বলতে পার না আর হ্যাঁ একটু টাকা খরচ করে যদি ভালো মানের উকিল ধরতে তাহলে এই বিষয়ে মামলার জন্য তোমায় বলত না। যাই হোক তোমাদের ব্যবস্থা তোমরা কীভাবে করবে সেটা তোমাদের বিষয় আমি যা করেছি বুঝে শুনেই করেছি এতে কারো কিছু বলার আছে বলে আমার মনে হয় না।’
‘তাহলে তোমার সাথে আমাদের আর কোনো সম্পর্ক রাখতে চাইছ না, নাকি?’
‘সম্পর্ক ছিল শুধু নামে বন্ধন তো সেই কবেই তোমরা ছিন্ন করেছিলে। ভেবে নাও আজ অফিসিয়ালি সেটার পরিসমাপ্তি ঘটল।’
‘আমাদের আর আপন ভাবছ না, তাই তো?’
‘আপনজন কাকে বলে বলতে পার? শুধু রক্তের সম্পর্ক থাকলেই কী দুটি মানুষ আপন হয়ে যায়! না, আপনজন একে বলে না। আপন হতে হয় মন-মানসিকতার দিক থেকে। সম্পর্কের দোহাই দিয়ে শুধু আনুষ্ঠানিকতা পালনকে আপন বলে না সম্পর্কের মাঝে শ্রদ্ধা, মান্যতা এবং ভালোবাসাও প্রয়োজন যেটা সন্তান হয়েও তোমাদের ছিল না। তোমরা ভয় পেও না আমার মৃত্যুর পর তোমাদের কষ্ট করে আসতে হবে না। কফিন নিয়ে অন্তিম যাত্রার জন্য এখন নিকুঞ্জ নিকেতন পরিবারই যথেষ্ট। রক্তের সম্পর্ক নাই তো কী হয়েছে মনের সম্পর্কেই এরা আমার আপনজন। তোমাদের আর কোনো কথা আছে বলে আমার মনে হয় না। যাওয়ার আগে চা-নাশতা শেষ করে যেও।’
পিটারের কথাগুলো শোনার পর সারোয়ার বেশ উৎফুল্ল। সে এমনটাই কিছু চেয়েছে যেন তার সন্তানেরা পরিতাপ করতে পারে। ওরা চলে গেলে আমরা সকলে এসে উপস্থিত হই। সারোয়ার এটা সেটা অনেক কিছুই বলছে আর বাহবা দিচ্ছে কিন্তু পিটারের সেদিকে কোনো খেয়াল নেই। আমি বুঝতে পারছি সে আমার উত্তরের অপেক্ষায় আছে। পরিস্থিতি একটু স্বাভাবিক দেখে পিটারকে নিয়ে বসি। এরই মধ্যে মনমোহন আমাদের আরও এককাপ করে চা দিয়ে গেল।
‘তাহলে এই ক’দিনের দৌঁড়-ঝাপ, অস্থিরতা সবই এই বাড়িটা বিক্রির জন্য! কেন করলে?’
‘কেন করলে মানেÑদাদা আপনি জানেন না ওরা পিটারের সাথে কতটুকু খারাপ আচরণ করেছিল?’
‘সারোয়ার উত্তরটা তোমার কাছে নেই পিটারের কাছে তাই তাকেই বলতে দাও।’
‘ওদের কাছে শুধু একটা প্রয়োজন ছিলাম দাদা আর কিছুই না। আমি সন্তান নামক বিষয়টায় হেরে যাওয়া মানুষ তাই নিজেকে নিজের মতো করে চালিয়ে নিতে চেষ্টা করলাম আর কী। গত বছর ওরা উকিল ধরেছিল বাড়ি বিক্রির জন্য ওদের ব্যবসায় টাকা প্রয়োজন। বাড়িটা ওরা বিক্রি করবে তারচেয়ে আমি নিজেই বিক্রি করেছি। দু পয়সা আয় করার যোগ্যতা নেই গড়া সম্পদ লুটিয়ে যাবে তাই নিজেই এ কাজটা করেছি। সন্তানের মোহে একসময় এতটাই উতলা ছিলাম যে তাদের বাস্তবিক হয়ে গড়ে তুলতে পারিনি। অভাবে পড়লে কতটুকু ঝামেলা পোহাতে হয় এটা ওদের বুঝতে হবে।’
‘সবই তো ঠিক আছে কিন্তু ওদের এভাবে নিঃস্ব করে তুমি কী শান্তি পাবে?’
‘আপনার কথাগুলো আমার মাথায় আসছে না দাদা। এই আপনিই আমাকে বাস্তবিক হতে বলছেন আবার আপনিই বলছেন অন্যটা।’
‘আমি বাস্তবিক হতে বলেছি নির্মম নয়। সন্তান যতই অন্যায় করুক বাবা-মা কখনো ফেলে দিতে পারে না পিটার। ওরা কষ্টে থাকলে তুমিও কী শান্তি পাবে?’
‘তা জানি আর সেজন্যই বাড়ি বিক্রির টাকাটা তিনভাগ করে নিয়েছি। দুভাগ ডিপোজিট করেছি নাতি আর নাতিনের নামে আর তৃতীয় ভাগটা আমাদের জন্য।’
‘আমাদের জন্য বলতে?’
‘আমাদের বলতে শুধু আমাদের। এই নিকুঞ্জ নিকেতন পরিবারের জন্য।’
‘পিটার আমাদের পরিবারের জন্য এই অর্থ লাগবে না যেখানে তোমার সন্তানের আকাক্সক্ষা জড়িত।’
‘কীসের আকাক্সক্ষা যেখানে পিতার পরিচয়ে সন্তানের পরিচয় গড়ে তার মাধ্যমে পায় উত্তরাধিকার সম্পদ, প্রতিপত্তি আর সেই পিতাই এই সম্পদের তুলনায় নগন্য।’
‘তারপরও আমাদের প্রয়োজন নেই।’
‘তাহলে নিকুঞ্জ নিকেতন পরিবারের একজন সদস্য হিসেবে আমি নিজেকে আর ভাবতে পারব না।’
‘পারবে না মানে!’
‘আপনারা কী চান আমি বাকি জীবনটা সংকোচ নিয়ে বাঁচি। আগে সন্তানদের ভরসায় ছিলাম আর এখন আপনার ভরসায়। তাহলে সে জীবন আর এই জীবনের মধ্যে ব্যবধান কতটা দাদা?’
‘তুমি এমনটা কেন ভাবছ। এখানে যারাই আছে সকলে নিজের মতো করে থাকছে। আজ একটা কথা তোমাদের সামনে আমি তুলে ধরছি। তোমাদের এখানে বসবাস করার পিছনে আমারও কিছুটা স্বার্থ রয়েছে। আমি অনিমেষের মতো হতাশায় ভুগতে চাইনি। একমাত্র ছেলে বিদেশ পাড়ি দেওয়ার পর আমি নিজেকে গভীর অন্ধকারে ডুব দিতে দেখেছি তাই নিজেকে বাঁচিয়ে রাখতেই তোমাদের সাথে বসবাস। এটাতে শুধু তোমরা তোমাদের দিক থেকে ভেব না আমারও কিছুটা প্রয়োজন তোমাদের ছিল।’
‘পিটার নরেন্দ্রদাকে অন্যভাবে ভেব না। আমি অনিমেষ মরে গিয়েও বেঁচে রয়েছি তোমাদের সান্নিধ্য পেয়ে। আমি বুঝি আপনজনদের কাছে না পেলে শেষ বয়স কতটা বিষাক্ত।’
‘অনিমেষ আমি নরেনদাকে অন্যভাবে ভাবছি না। তোমাদের মাঝে আমিও স্বনির্ভর হয়ে বাঁচতে চাই। এই যেমন তুমি পেনশনের টাকা খরচ করছ, সারোয়ার করছে, আশরাফের স্ত্রী রওশনও
করছে তাহলে আমি কেন নয়? আমাকে বারণ করবে না কেউ, প্লিজ। কিছুটা ফান্ড থাকুক না আমাদের জন্য। আমরা যে বয়সে আছি সেখানে কার কখন কোন প্রয়োজন পড়ে কে জানে। কোন বিপদ হলে তখন কী করে টাকা ম্যানেজ করবে তারচেয়ে এটা জমা থাকুক।’
পিটারের যুক্তির কাছে আমরা কেহই আর বেশি কিছু বলতে পারিনি। সত্যিই তো, আমাদের কারো কিছু হলে একসাথে টাকা পাব কোথায় তাছাড়া যেখানে আমরা কেহই সন্তানদের উপরও নির্ভরশীল হয়ে থাকছি না সেখানে পিটার কেন আমাদের পথ চেয়ে বসে থাকবে। পিটারের সিদ্ধান্ত কতটা যৌক্তিক ছিল সেটা জানা নেই তবে এটা বলতে পারি আমরা প্রত্যেকে স্বনির্ভর ও আত্মমর্যাদা নিয়ে বাঁচতে চাই। জীবন যদি আশীর্বাদ হয় তাহলে বার্ধক্য কেন হবে অভিশাপ।
[পরের পর্ব আগামী সংখ্যায় ছাপা হবে]








