শুক্রবার, ১০ এপ্রিল, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য

প্রকাশ : ১০ এপ্রিল ২০২৬, ১৫:৫০

শিশুর আচরণিক পরিবর্তন ও শিক্ষা

রাশেদা আতিক রোজী

প্রাথমিক শিক্ষা শিশুর জীবনের কেবল শুরু নয়, এটি তার সমগ্র সত্তার একটি ভিত্তি বা রূপান্তরকারী স্তর। শিশুর মস্তিষ্ক প্রাথমিক স্তরে সবচেয়ে বেশি নমনীয় থাকে। এই সময়ে শিক্ষা তাকে কেবল তথ্য দেয় না, বরং ‘কিভাবে চিন্তা করতে হয়’ তা শেখায়। বর্ণমালা ও সংখ্যার সাথে পরিচয়ের মাধ্যমে তার সামনে এক বিশাল পৃথিবী উন্মোচিত হয়, যা তার যুক্তিবোধ ও সৃজনশীলতাকে জাগিয়ে তোলে।

একটি শিশু যখন নিজের নাম লিখতে পারে বা একটি ছোট সমস্যার সমাধান নিজে করতে পারে, তখন তার মধ্যে যে আত্মতৃপ্তি তৈরি হয়, তা তার আত্মবিশ্বাস (ঝবষভ-বংঃববস) বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। এই আত্মবিশ্বাসই তাকে ভবিষ্যতে বড় চ্যালেঞ্জ নেওয়ার সাহস জোগায়।

শিক্ষার একটি ধ্রুপদী এবং বহুল প্রচলিত সংজ্ঞা হলো ‘আচরণের কাঙ্ক্ষিত ও স্থায়ী পরিবর্তন’। তবে বর্তমান সময়ে শিক্ষাবিদ এবং মনোবিজ্ঞানীদের মতে, এটি শিক্ষার একমাত্র পরিচয় যে যে তত্ত্ব যে যে তত্ত্ব তথ্য তথ্য যা যা যায়, বরং একটি বড় অংশ মাত্র।

আপনার পদমর্যাদা যাই হোক না কেন, ছোট-বড় নির্বিশেষে সবার সাথে মার্জিত ব্যবহার করা ব্যক্তিত্বের শ্রেষ্ঠত্ব প্রকাশ করে। কথায় ‘ধন্যবাদ’ বা ‘দুঃখিত’ বলার অভ্যাস অন্যের মনে আপনার সম্পর্কে উচ্চ ধারণা তৈরি করে। নেতিবাচক সমালোচনা না করে গঠনমূলক পরামর্শ দেওয়া এবং অন্যের ছোট অর্জনকেও বড় করে দেখা প্রভাব বিস্তারের অন্যতম মাধ্যম।

আচরণ যদি একদিন ভালো আর অন্যদিন খারাপ হয়, তবে তা প্রভাব ফেলতে পারে না। নিজের মেজাজ নিয়ন্ত্রণ করা এবং সব পরিস্থিতিতে ধৈর্যশীল থাকা একজন মানুষের ব্যক্তিত্বকে গাম্ভীর্যপূর্ণ ও অনুকরণীয় করে তোলে।

“মানুষ ভুলে যেতে পারে আপনি তাকে কী বলেছিলেন, কিন্তু সে কখনোই ভুলবে না আপনি তাকে কেমন অনুভব করিয়েছিলেন।”Ñ মায়া অ্যাঞ্জেলো।

আপনার কর্ম ও আচরণ যদি অন্যের জন্য কল্যাণকর এবং সম্মানজনক হয়, তবে আপনি স্বয়ংক্রিয়ভাবেই তাদের হৃদয়ে একটি স্থায়ী আসন করে নেবেন।

এই বিষয়টি কেন বিতর্কিত এবং কেন গুরুত্বপূর্ণ, তা কয়েকটি দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যেতে পারে :

১. কেন এটিকে আচরণের পরিবর্তন বলা হয়?

মনোবিজ্ঞানীদের মতে, কোনো কিছু শেখার পর যদি মানুষের কাজ বা ব্যবহারে তার প্রতিফলন না ঘটে, তবে তাকে প্রকৃত শিক্ষা বলা কঠিন।

প্রকাশ্য আচরণ: আপনি কোনো নতুন প্রযুক্তি ব্যবহার করতে শিখলেন, এটি আপনার কাজের ধরনে পরিবর্তন আনবে।

মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তন: কোনো নৈতিক পাঠ নেওয়ার পর আপনার দৃষ্টিভঙ্গি বা মানসিকতায় যে পরিবর্তন আসে, তাও আচরণের অন্তর্ভুক্ত।

২. ‘কাঙ্ক্ষিত’ শব্দটির গুরুত্ব

শিক্ষা মানেই কেবল যেকোনো পরিবর্তন নয়। কোনো নেতিবাচক অভ্যাস আয়ত্ত করাকেও আচরণগত পরিবর্তন বলা যায়, কিন্তু তাকে শিক্ষা বলা হয় না। শিক্ষা তখনই সার্থক হয় যখন সেই পরিবর্তনটি ইতিবাচক, গঠনমূলক এবং সমাজের জন্য কল্যাণকর হয়।

৩. শিক্ষার আধুনিক ও ব্যাপক দৃষ্টিভঙ্গিÑ

বর্তমানে শিক্ষাকে কেবল ‘আচরণের পরিবর্তন’ হিসেবে না দেখে আরও বিস্তৃতভাবে দেখা হয় :

সুপ্ত প্রতিভার বিকাশ : অ্যারিস্টটল বা প্লেটোর মতে, মানুষের ভেতরে থাকা সম্ভাবনাগুলোকে জাগিয়ে তোলাই শিক্ষা।

অভিযোজন ক্ষমতা: পরিবর্তিত পরিস্থিতির সাথে নিজেকে খাপ খাইয়ে নেওয়ার সক্ষমতা অর্জন করাই হলো শিক্ষা।

মূল্যবোধ ও দৃষ্টিভঙ্গি: অনেক সময় আচরণে তাৎক্ষণিক পরিবর্তন না এলেও মানুষের চিন্তা করার পদ্ধতিতে (গরহফংবঃ) পরিবর্তন আসে, যা শিক্ষার বড় অর্জন।

৪. সীমাবদ্ধতাÑ

সব পরিবর্তনই কি শিক্ষা? উত্তর হলো না।

পরিপক্কতা (গধঃঁৎরঃু) বা অসুস্থতার কারণে আচরণে পরিবর্তন আসতে পারে, কিন্তু তাকে শিক্ষা বলা যায় না।

শিক্ষা হতে হবে সচেতন প্রচেষ্টার মাধ্যমে অর্জিত এবং অপেক্ষাকৃত স্থায়ী। শিক্ষা অবশ্যই আচরণের কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন, তবে এটি কেবল ‘যান্ত্রিক’ কোনো পরিবর্তন নয়। এটি মূলত একজন মানুষের জ্ঞান, দক্ষতা এবং দৃষ্টিভঙ্গির একটি সামগ্রিক রূপান্তর। যদি আপনার শিক্ষা আপনার ব্যক্তিত্বে, কথা বলায় বা অন্যের সাথে আচরণে ইতিবাচক প্রভাব না ফেলে, তবে সেই শিক্ষা কেবল তথ্য আহরণেই সীমাবদ্ধ থেকে যায়, তা পূর্ণতা পায় না।

প্রচলিত অর্থে আমরা মনে করি ভালো ফলাফল, নামী প্রতিষ্ঠানের ডিগ্রি বা সার্টিফিকেটের স্তূপই হলো শিক্ষা। কিন্তু জীবনের দীর্ঘ পথ পরিক্রমায় দেখা যায়, শিক্ষা কোনো সনদ নয়, বরং শিক্ষা হলো মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি, ভাষা ও আচরণের এক শৈল্পিক বহিঃপ্রকাশ। একজন মানুষের পকেটে বড় ডিগ্রি থাকতে পারে, কিন্তু তার কথায় যদি অন্য কেউ আঘাত পায় বা তার আচরণে যদি অহংকার প্রকাশ পায়, তবে সেই ডিগ্রির কোনো নৈতিক মূল্য থাকে না। এখানে বাস্তব কিছু উদাহরণ দেওয়া হলোÑ

উদাহরণ ১. নেলসন ম্যান্ডেলা এবং সেই কারারক্ষী :

২৭ বছর জেল খাটার পর নেলসন ম্যান্ডেলা যখন দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট হলেন, তখন এক রাষ্ট্রীয় ভোজে তিনি তার সেই জেলখানার প্রধান কারারক্ষীকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন যে তাকে অমানুষিক নির্যাতন করত। ম্যান্ডেলা তাকে নিজের পাশের চেয়ারে বসিয়ে খাবার পরিবেশন করেন। ম্যান্ডেলা বলেছিলেন, “ঘৃণা নিয়ে চললে আমি আজও ওই কারাগারেই বন্দী থাকতাম।” এটিই হলো শিক্ষার শ্রেষ্ঠ ‘অ্যাটিটিউড’ বা দৃষ্টিভঙ্গিÑযা প্রতিশোধের বদলে ক্ষমা করতে শেখায়।

উদাহরণ ২. এ পি জে আব্দুল কালাম এবং পেছনের সারির কর্মী :

ভারতের ‘মিসাইল ম্যান’ ও সাবেক রাষ্ট্রপতি ড. কালাম একবার এক হাই-প্রোফাইল ডিনারে আমন্ত্রিত ছিলেন। সেখানে প্রটোকল ভেঙে তিনি তার জুতো পালিশ করা চর্মকার এবং যে ছোট হোটেলটিতে তিনি আগে খেতেন, সেই হোটেলের মালিককে অতিথি হিসেবে নিয়ে এসেছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, মানুষের পদমর্যাদা তার শিক্ষার পরিচয় নয়, বরং মানুষের সাথে তার সম্পর্কের গভীরতাই তার আসল পরিচয়। বড় ডিগ্রি থাকার চেয়েও মানুষের মর্যাদা দিতে জানাই হলো প্রকৃত শিক্ষা।

উদাহরণ ৩. রতন টাটা এবং সাধারণ কর্মচারীর প্রতি সহমর্মিতা :

২০০৮ সালে মুম্বাইয়ের তাজ হোটেলে যখন জঙ্গি হামলা হয়, তখন রতন টাটা কেবল ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ দিয়েই থেমে থাকেননি। তিনি ব্যক্তিগতভাবে প্রতিটি নিহতের বাড়িতে গিয়েছিলেন, এমনকি রাস্তার ধারের যে হকাররা ওই হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল, তাদের পাশেও দঁাড়িয়েছিলেন। তিনি প্রমাণ করেছেন যে, বড় শিল্পপতি হওয়ার চেয়েও বড় পরিচয় হলো একজন সহানুভূতিশীল মানুষ হওয়া। বিচক্ষণ ভাষা এবং আচরণের মাধ্যমে অন্যের দুঃখ অনুভব করতে পারাই শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য।

মূল শিক্ষা

এই মহান ব্যক্তিদের জীবন আমাদের শেখায় যেÑ

ডিগ্রি আপনাকে চাকরি দিতে পারে, কিন্তু ভদ্রতা আপনাকে মানুষের হৃদয়ে জায়গা দেয়।

জ্ঞান আপনাকে কথা বলতে শেখায়, কিন্তু শিক্ষা আপনাকে শেখায় কোথায় নীরব থাকতে হয়।

ক্ষমতা আপনাকে নিয়ন্ত্রণ করতে শেখায়, কিন্তু আচরণ আপনাকে শ্রদ্ধা অর্জন করতে শেখায়।

বর্তমান যুগে প্রাথমিক স্তরেই আইসিটি (ওঈঞ) এবং ডিজিটাল টুলসের সাথে পরিচয় শিশুকে আধুনিক বিশ্বের যোগ্য করে গড়ে তুলছে। এটি তার শেখার প্রক্রিয়াকে আরও আকর্ষণীয় এবং দ্রুততর করছে, যা গতানুগতিক শিক্ষার তুলনায় একটি বৈপ্লবিক পদক্ষেপ।

প্রাথমিক শিক্ষা কোনো নির্দিষ্ট বিষয় মুখস্থ করার নাম নয়; এটি হলো একটি শিশুর দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দেওয়ার প্রক্রিয়া। একটি চারাগাছকে শুরুতে যেমন যত্ন করলে তা বিশাল মহীরুহে পরিণত হয়, প্রাথমিক শিক্ষার সঠিক যত্নও একটি শিশুর জীবনকে তেমনি উজ্জ্বল ও অর্থবহ করে তোলে।

রাশেদা আতিক রোজী : ইন্সট্রাক্টর, উপজেলা প্রাইমারি এডুকেশন ট্রেনিং সেন্টার (ইউপিইটিসি), চঁাদপুর সদর, চঁাদপুর।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়