প্রকাশ : ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৯:০৩
অসম্পূর্ণ উপন্যাস

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই ২১ কি.মি. পাহাড়ি পথের বাঁকে বাঁকে এখনো বোধহয় রবি আর হিমির হাসির প্রতিধ্বনি জমা হয়ে আছে। চবি ক্যাম্পাসের শাটল ট্রেনের ঝিকঝিক আওয়াজটা তাদের কাছে ছিল কোনো এক অপার্থিব সিম্ফোনি।
রবি ছিল বাংলা সাহিত্যের সেই মলাটবদ্ধ ডায়েরির মতো, যার কলম ধরলেই শব্দগুলো জীবন্ত হয়ে উঠত। আর হিমি? হিমি ছিল সেই কবিতার একনিষ্ঠ শ্রোতা। রবি যখন কলাভবনের ঝাউতলায় বসে নিজের লেখা নতুন কোনো গল্পের পাণ্ডুলিপি পড়তো, হিমি মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকত। রবির চেয়ে চার বছরের ছোট হওয়ায় পড়াশোনার জটিল চ্যাপ্টারগুলো রবির কাছেই সহজ হয়ে ধরা দিত হিমির কাছে।
তাদের বিকেলের ঠিকানা ছিল জিরো পয়েন্ট অথবা কোনো নির্জন পাহাড়ের টিলা। রবি যখন উদাত্ত গলায় তার সদ্য লেখা কবিতাটা আবৃত্তি করতো : ‘তুমি আমার সেই অসম্পূর্ণ উপন্যাসের শেষ পাতা, যেখানে বিরহ নয়, কেবলই মিশে থাকে হাজারো নীরবতা।’ হিমি রবির কাঁধে মাথা রেখে বলত, ‘আমাদের গল্পটা কিন্তু কখনো অসম্পূর্ণ হবে না রবি’।
শাটল ট্রেনের জানালায় মাথা রেখে দুজনে কত সন্ধ্যা পার করেছে, কতবার ট্রেনের দুলুনিতে জীবনের হাজারো পরিকল্পনা বুনেছে। ক্যাম্পাসের গণ্ডি পেরিয়ে তারা ঘুরে বেড়িয়েছে দেশের এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্ত। পাহাড়ের মেঘ আর সমুদ্রের নোনা জল ছিল তাদের এই পবিত্র প্রণয়ের সাক্ষী।
গ্র্যাজুয়েশন শেষ হলো। বাস্তবতার রুক্ষ পৃথিবীতে দুজনেই নিজের জায়গা করে নিল, জুটে গেল সম্মানজনক চাকরিও। সবাই ভেবেছিল এবার হয়তো সেই দীর্ঘ প্রতীক্ষিত পরিণয় আসবে। কিন্তু বিধাতা তখন আড়ালে বসে অন্য এক চিত্রনাট্য লিখছিলেন।
বিয়ের কথা পাড়তেই আকাশ ভেঙে পড়ল দুজনের মাথায়। পারিবারিক সম্পর্কের সূক্ষ্ম সুতোয় টান পড়ল। জানা গেল, তারা একে অপরের দূর সম্পর্কের আত্মীয়। যে সম্পর্কের পবিত্রতা সমাজ মেনে নিতে পারলেও আমাদের সমাজ বাস্তবতার ‘রক্তের টান’ আর ‘নিকট আত্মীয়তার’ দেয়াল টপকাতে পারল না। যে পাহাড়ের টিলায় তারা সংসার গড়ার স্বপ্ন দেখেছিল, সেই পাহাড়ের চেয়েও ভারী হয়ে দাঁড়ালো তাদের পারিবারিক পরিচয়।
রবির যে হাতে গল্প জন্ম নিত, সেই হাত দিয়ে সে শেষবার হিমির অশ্রু মুছে দিতে পারল না। অদ্ভুত এক সামাজিক নিয়মের বেড়াজালে বন্দি হয়ে গেল তাদের বছরের পর বছর লালন করা প্রেম।
আজ রবি আর হিমি একই শহরের ধুলোবালি মাখলেও তারা যেন অন্য গ্রহের বাসিন্দা। মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে এক বিশাল নৈশব্দ। রবি হয়তো আজও গভীর রাতে ডায়েরি নিয়ে বসে, কিন্তু গল্পের শেষ পাতায় আর হিমির নামটা লেখা হয় না। আর হিমি? সে হয়তো এখনো কোনো ভিড় ঠেলে শাটল ট্রেনের সেই পরিচিত জানালার সিটটা খুঁজে বেড়ায়, যেখানে এককালে রবির কবিতার খাতাটা সযত্নে রাখা থাকত।
পাহাড়ের প্রতিধ্বনি আজও হয়তো রবির সেই কবিতার সুরটা মনে করিয়ে দেয়, কিন্তু সেই সুর শোনার মতো মানুষটি আজ আর নেই। এক অপার্থিব হাহাকার আর অতৃপ্ত বেদনা নিয়ে চবি ক্যাম্পাসের সেই ঝাউগাছগুলো আজও দাঁড়িয়ে আছে, ঠিক যেমনটা দাঁড়িয়ে আছে দুই বিচ্ছেদী আত্মার নীরব দীর্ঘশ্বাস।
[উৎসর্গ : প্রিয় মানবী মানসী অস্পরী অননকে।]







