সোমবার, ১৯ জানুয়ারি, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য

প্রকাশ : ১৯ জানুয়ারি ২০২৬, ০৯:৫১

খণ্ডে খণ্ডে অখণ্ড জীবন

পীযূষ কান্তি বড়ুয়া
খণ্ডে খণ্ডে অখণ্ড জীবন

(আটচল্লিশতম পর্ব)

কল্পতরু উৎসব : অনন্য স্মৃতিসুধা

খণ্ডে খণ্ডে অখণ্ড হওয়ার জীবনযাত্রায় অনেক উৎসবে শামিল হয়েছি। কোনো উৎসব খাদ্যের, কোনো উৎসব ফূর্তির। কোনো উৎসব স্মৃতি উৎখননের আর কোনো উৎসব সম্মিলনের। এতো উৎসবের ভিড়ে চাঁদপুর রামকৃষ্ণ আশ্রমের কল্পতরু উৎসব আমার কাছে ছিলো এক পবিত্র উৎসব। এ উৎসব হলো ‘যত মত তত পথের উৎসব।’ এ উৎসব হলো মহামিলনের উৎসব। বিভেদ নয়, বিরোধ নয়, বিসংবাদ নয়, আত্মকে সমষ্টির মাঝে মিলিয়ে নেওয়া এবং বিলিয়ে দেওয়াই হলো এ উৎসবের মূল লক্ষ্য। যত মত তত পথের কথা উল্লেখ থাকলেও দিনশেষে সবাই মানুষ; এ বোধটুকুই এ উৎসবের মূল উৎপাদ। চাঁদপুর অযাচক আশ্রমের তৎকালীন অধ্যক্ষ নরেশ মহারাজের অতল স্নেহে চাঁদপুর রামকৃষ্ণ আশ্রমের সাথে আমার পরিবারের সংযোগ ঘটে। নরেশ মহারাজ ছিলেন আমার ও আমার পত্নীর স্নেহধন্য গৌতম চন্দের মামা। গৌতম এক অতি নিরীহ ছেলে। পড়াশুনা বিশ্ববিদ্যালয় স্তরের না হলেও তার আচার-আচরণে শিষ্টতার ঘাটতি ছিলো না কোনো। কিছুটা জীবনশৃঙ্খলা ভেঙ্গে আপন মনের শৃঙ্খলায় চলতো বলেই অকালে বিকল হৃদয়ে পৃথিবীকে বিদায় জানাতে হলো। গৌতমের সুবাদে নরেশ মহারাজের কাছে আমরা হয়ে উঠলাম আপনার লোক। সে সময় আশ্রমে উৎপল ব্রহ্মচারী ছিলেন, যিনি পরে সেবাময়ানন্দ মহারাজরূপে দীক্ষা লাভে করে রামকৃষ্ণ দর্শনে নিজেকে শতভাগ নিমগ্ন করে তোলেন। তাদের উভয়ের প্রীতি ও প্রেমে রামকৃষ্ণ আশ্রম হয়ে উঠলো আমাদের অদ্বিতীয় দ্বিতীয় নিবাস। আমার কনিষ্ঠ শ্রীমানের জন্মপূর্বে তার জননী কোনো এক সূর্যগ্রহণের মহাজাগতিক সঙ্কটকালে আশ্রয় নিয়েছিলেন চাঁদপুর রামকৃষ্ণ আশ্রমে নরেশ মহারাজের স্নেহে ও পরিচর্যায়। সুহৃদ-স্বজনেরা তাকে সাবধান করে দিয়েছিলো যাতে গর্ভকালীন সূর্যগ্রহণের সময় কোনো কিছু না কাটে, না খায়। যথেষ্ট বিজ্ঞানমনস্ক ও আধুনিক হওয়া সত্ত্বেও পেটের সন্তানের মঙ্গল সুনিশ্চিতকল্পে তিনি কয়েক ঘন্টার জন্যে অধিষ্ঠান করলেন চাঁদপুর রামকৃষ্ণ আশ্রমে। মায়ের সাথে তিন বছরের বড়ো ছেলেও ছিলো সঙ্গী হিসেবে। আশ্রমের মাঠ ছিলো আমার বিমল ছেলেদের ক্রীড়াঙ্গন। দৌড়-ঝাঁপ-হৈ-হল্লা কিছুই বাকি ছিলো না। অন্তেবাসী শিক্ষার্থীরাও তাদের উৎসাহ দিতো, উস্কে দিতো দৌড়ঝাঁপে। আশ্রমের হেঁশেলে যে খাবার তৈরি হতো নিত্য, তার ভাগ আমরাও নিয়েছি অনেকদিন। আশ্রমের আহারে আমিষের নিষেধ ছিলো না কোনো। একবার কোলকাতা থেকে সাহিত্য ও সংস্কৃতি লালনকারী নারী-পুরুষের একটা দল বাংলাদেশ পরিব্রাজনের অংশ হিসেবে চাঁদপুরে আসলেন। তারা ছিলেন আমার পত্নী মুক্তা পীযূষের কলেজ-জীবনের শিক্ষকের ফেসবুক বন্ধু। তিনি ছাত্রীর ওপর পরম নির্ভরতায় এই সতের জন অতিথির সৎকারের ভার দিলেন। আমরা দুজনে তাদের আহারের বন্দোবস্ত করেছিলাম এই চাঁদপুর রামকৃষ্ণ আশ্রমের হেঁশেলে। স্বামী সেবাময়ানন্দ আমাদের তখন অকুণ্ঠ সহযোগিতা করেছিলেন। অতিথিরা আশ্রমের আহারে মনোতুষ্টি নিয়ে ঘুরে বেড়িয়েছেন।

এ আশ্রমে দুহাজার দশের কল্পতরু উৎসবে ফরিদপুরের কবিয়াল দল এসে মা কালীকে নিয়ে কবিগান পরিবেশন করে যায়। গুরু-শিষ্যের কবিগানে উপস্থিত দর্শকশ্রোতা বেশ আনন্দ লাভ করে। তখন জেলা প্রশাসক প্রিয়তোষ সাহা এ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে কবিগান উপভোগ করেন। মূলত এরপর থেকেই নরেশ মহারাজের অভিপ্রায়ে আমি কল্পতরু উৎসবের সাথে যুক্ত হয়ে পড়ি। ‘কল্পতরু’ বিষয়টি হিন্দু-বৌদ্ধ ও জৈন ধর্মে বেশ গুরুত্বপূর্ণ। জৈন তীর্থঙ্করের মূর্তির নিচে কল্পতরু বৃক্ষের প্রতিকৃতি আছে। বৌদ্ধ ধর্মে কল্পতরু এমন একটা বৃক্ষ যার কাছে যা চাওয়া যায় তা-ই পাওয়া যায়। কঠিন চীবর দান অনুষ্ঠানে উপাসক-উপাসিকা ও দায়ক-দায়িকারা ঘুড়ি বানানোর পাতলা কাগজ দিয়ে হাতে কল্পতরু বানায়। নান্দনিক এ কারুকার্যময় শিল্পবৃক্ষে সুতো দিয়ে টাকা, খাতা, কলম, পেন্সিল ইত্যাদি ঝুলিয়ে দেওয়া হয়। দানানুষ্ঠান শেষে এ বৃক্ষই ভিক্ষু সংঘের হাতে উৎসর্গ করে অর্পণ করা হয়। গৃহীর পক্ষ হতে পূজনীয় ভিক্ষুসংঘকে দানের এটা একটা শৈল্পিক উপায়। সনাতন ধর্মের পুরাণমতে সমুদ্র মন্থনকালে কামধেনুর সাথে কল্পতরু উদ্ধার করা হয় এবং ইন্দ্র স্বয়ং এ বৃক্ষটি সংগ্রহ করে অমরাবতীতে রোপণ করেন। কেউ কেউ পারিজাত বৃক্ষকে কল্পতরু বলে উল্লেখ করেন। আবার অনেকেই ন্যগ্রোধ বৃক্ষকে কল্পতরু হিসেবে চিন্তা করেন। আঠারোশ ছিয়াশি সালের এক জানুয়ারি কাশীপুর বাগানবাড়িতে এক আমগাছের নিচে বসে রামকৃষ্ণ নিজেকে কল্পতরু বলে ঘোষণা দেন। সে সময় তিনি গলার দুরারোগ্য ক্যান্সারে আক্রান্ত হন এবং শারীরিক অবস্থার যথেষ্ট অবনতি হয়। জানুয়ারি এক তারিখে কিছুটা ভালো বোধ করায় হাঁটতে বেরিয়েছিলেন। তাঁকে অনুসরণকারী আগারিক শিষ্যদের উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, ‘আমি আর কী বলব? তোমাদের চৈতন্য হোক।’ এরপর তিনি ধ্যান-সমাধিস্থ হয়ে কল্পতরুতে পরিণত হন।তিনিই এই দিনটিকে কল্পতরু দিবস নামকরণ করেন, যা পরে কল্পতরু উৎসব হিসেবে উদযাপিত হয়। চাঁদপুর রামকৃষ্ণ আশ্রমে জানুয়ারি এক তারিখ হতে চার তারিখ পর্যন্ত টানা চারদিন কল্পতরু উৎসব হিসেবে পালন করা হয়। করোনাকালে এ উদযাপনে কিছুটা ব্যত্যয় ঘটে। অনুষ্ঠানপঞ্জিতে প্রতিবছর জানুয়ারি দুই তারিখে কল্পতরু উৎসবের অংশ হিসেবে সকালের পর্বে রামকৃষ্ণের সর্বধর্ম সমন্বয়বাদ নিয়ে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। দুহাজার বারো সাল থেকে আমি একটানা এর সাথে দুহাজার চব্বিশ সাল অবধি সংশ্লিষ্ট ছিলাম।

কল্পতরু উৎসবে মাতৃমণ্ডলির সসম্ভ্রম উপস্থিতি লক্ষ্যণীয়। পুরুষদের উপস্থিতি তুলামূলক কম থাকে। কারণ সকালের সময়টা অনেকেরই চাকরি-বাকরির তাগাদা থাকে। তাই সঙ্গত কারণে মা-বোনেরাই সংখ্যায় অধিক উপস্থিত থাকতেন। এ আলোচনা সভায় চারটি প্রধান ধর্মের চারজন আলোচক থাকেন। আশ্রম পরিচালনা পরিষদের পক্ষ থেকে একজন স্বাগত ভাষণ দেন। একজন থাকেন সভাপ্রধান, যিনি স্বভাবতই মহারাজ গোত্রীয় হয়ে থাকেন। একজন প্রধান অতিথি থাকেন যিনি সমাজে বা রাষ্ট্রে বরেণ্য ব্যক্তিত্ব হিসেবে স্বীকৃত। চারধর্মের চার আলোচকের আলোচনার বিষয়বস্তু মূলত নিজ ধর্মের সাথে রামকৃষ্ণের যত পথ তত মতের সমন্বয় সাধন৷। দুহাজার বারো সালের আগে কুমিল্লা নব শালবন বিহারের পূজনীয় অধ্যক্ষ ভদন্ত ধর্মরক্ষিত মহাথেরো আসতেন বৌদ্ধ ধর্ম ও রামকৃষ্ণ বিষয়ের ওপর আলোচক হিসেবে। বেশ কয়েকবার তিনি এসেছেন। ফোনে ভান্তেও আমাকে বলেছেন এ কথা। এরপর তিনি শারীরিক অসুস্থতা ও ব্যস্ততাজনিত কারণে আসতে অনীহা প্রকাশ করেন। ফলে দুহাজার বারো সাল হতে সেই শূন্যস্থান পূরণে আমি অন্তর্ভুক্ত হই। আমার এ অন্তর্ভুক্তি একান্তই নরেশ মহারাজের অভিপ্রায়। চাঁদপুরে এর আগে কেউ আমাকে ধর্মীয় বক্তা হিসেবে শ্রুত ছিলেন না। এমনিতেই ধর্ম বিষয়ে বলতে গেলে আমার স্বাচ্ছন্দ্য আসে না। কারণ এতে অনেক বিধিনিষেধ মেনে চলতে হয়। সম্বোধন করতে হয় একটা সুনির্দিষ্ট কাঠামোতে। চাঁদপুরে যেহেতু দিনের বেলায় চেম্বার, তাই চেম্বার বাদ দিয়ে বক্তব্য দিতে যেতেও মায়া লাগে। কারণ দূর-দূরান্ত হতে অনেক টাকা ভাড়া দিয়ে আসা রোগীরা ফেরত যেতে হলে কষ্ট পাবে। তাই উৎপল মহারাজের সাথে কথা ঠিক হয়, সভা শুরু হওয়ার ঠিক আগে আগে তিনি আমাকে ফোন দেবেন। তাতে আমি চেম্বার থেকে একঘন্টা ছুটি নিলেই হয়ে যায়। কখনও কখনও দেড়ঘন্টা লেগে যেতো। এভাবেই কর্মস্থল আর সামাজিক-সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলের সাথে সমন্বয় সাধন করতে হতো।

কল্পতরু উৎসবে কোনো সময় বুদ্ধের মৈত্রীর ওপর বলেছি। কখনও বৌদ্ধ ধর্মে নারীদের অবস্থান ও অবদান নিয়ে বলেছি। এগুলো বলতে গিয়ে ঠাকুর রামকৃষ্ণের দর্শনের সাথে তুলনা করেছি। আলোচক হিসেবে একই মঞ্চে কখনও কাজী শাহাদাত ভাই থাকতেন, কখনও পেয়েছি ফরিদপুরের ইদ্রিস সাহেবকে। আর কখনও ছিলেন ডিএন স্কুলের প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ হোসেন। খ্রিস্টধর্মের আলোচক হিসেবে থাকতেন প্রয়াত মণীন্দ্র বর্মণ। এভাবে একই মঞ্চে বসে সর্ব ধর্ম সমন্বয়বাদ নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে মনে যে মহামিলনের মহাস্রোত বয়ে যেতো তা সত্যিই অসাধারণ। আলোচনা শেষে ভোজনপর্বে নানাপদ দিয়ে আহারে নিজেকে শাশ্বত বাঙালি বলে নিশ্চিত করে ধন্য হতাম। কোনো এক কল্পতরু উৎসবে মঞ্চে প্রধান অতিথি ছিলেন ডা. দীপু মনি এমপি। তিনি পাশে বসে কল্পতরু উৎসব সম্পর্কে কিছু তথ্য আমার কাছ থেকে ঝালাই করে নিলেন। তারপর তাঁর বক্তব্যে নিজস্ব ভঙ্গিতে তা উপস্থাপন করে সবাইকে মন্ত্রমুগ্ধ করে রাখলেন।

চাঁদপুর রামকৃষ্ণ আশ্রমের কল্পতরু উৎসব এক অনন্য সম্প্রীতির নিদর্শন। সমাজ যদি সত্যিকার অর্থেই সর্ব ধর্ম সমন্বয়বাদে চলতে পারতো তাহলে আজকের এই হানাহানি হতো না। কারণ যা জল তাই-ই পানি, তাই-ই ওয়াটার, তাই-ই উদক। সুতরাং জলের ন্যায় একই স্রষ্টাকে ভিন্ন নামে ডেকে নিজেদের মধ্যে দূরত্ব তৈরি করলে দিনশেষে মানবতারই অপমান হয়। (চলবে)

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়