প্রকাশ : ১২ এপ্রিল ২০২৬, ১২:৩৪
স্বাস্থ্য ও ঔষধ নীতির জন্যে ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর অবদান অবিস্মরণীয়

জাতির বিবেকের বাতিঘর, আমৃত্যু সৎ সাহসী, সত্যবাদী, নিবেদিত দেশপ্রেমিক, মজলুমের প্রাণপুরুষ ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর অবদান স্বাস্থ্য ও ঔষধ নীতির জন্যে অবিস্মরণীয়।
|আরো খবর
ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর ৩য় মৃত্যুবার্ষিকীতে শ্রদ্ধাঞ্জলি, শোকাহত স্বজন ও গুণগ্রাহীদের প্রতি গভীর সমবেদনা জ্ঞাপন করছি।
স্বার্থপরতা, মিথ্যাচার, উশৃঙ্খলতা পরিহার করে দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার চেষ্টা, মুক্ত গণতন্ত্র চর্চা, ন্যায় ও ইনসাফের বাংলাদেশ গড়ার চেষ্টা, স্বাধীন রাজনৈতিক মতপ্রকাশের লড়াই করার দৃষ্টান্ত চির স্মরণীয় হয়ে থাকবে। বৃহত্তর জাতীয় ঐক্যের মাধ্যমে সুশাসন, নৈতিক, মানবিক ও কল্যাণ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় তাঁর দর্শন চিন্তায় জনমনে প্রভাব ফেলেছিলেন।
সাদাসিধে জীবনে অভ্যস্ত ছিলেন গরিবের ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী। তিনি দীর্ঘ ৩৫ বছর ধরে একটা শার্ট-প্যান্ট পরেছেন। আর পায়ে দিতেন ২০০ টাকার প্লাস্টিকের স্যান্ডেল।
তিনি প্রায়ই বলতেন, ‘দেশের মানুষ পেট ভরে খেতে পায় না, সবাই জামা-কাপড় পরতে পারে না। আমরা তো মুক্তিযুদ্ধ করেছি মানুষের খাওয়া-পরার সমস্যা না থাকার জন্যে। এখানে আমরা ব্যর্থ হয়েছি। তাই আমাকে বিলাসিতা মানায় না।
ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী ১৯৪১ সালের ২৭ ডিসেম্বর চট্টগ্রামের রাউজানের কর্ণফুলী নদীর তীরবর্তী কোয়েপাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা হুমায়ুন মোর্শেদ চৌধুরী ছিলেন পুলিশ কর্মকর্তা। মা হাছিনা বেগম চৌধুরী ছিলেন গৃহিণী। তিনি ছিলেন বাবা মায়ের প্রথম সন্তান। তাঁর বাবার শিক্ষক ছিলেন বিপ্লবী মাস্টারদা সূর্যসেন। পিতামাতার দশজন সন্তানের মধ্যে তিনি সবার বড়। তিনি পুরান ঢাকার নবকুমার ইনস্টিটিউশন থেকে মেট্রিকুলেশন এবং ঢাকা কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট পাস করার পর ঢাকা মেডিকেল কলেজে ভর্তি হন। তিনি ১৯৬২-৬৩ সালে ছাত্র ইউনিয়নের পক্ষে ঢাকা মেডিকেল কলেজ ছাত্র সংসদের জিএস নির্বাচিত হন। ১৯৬৪ সালে তিনি এমবিবিএস ডিগ্রি অর্জন করেন। এরপর এফআরসিএস পড়ার জন্যে তিনি লন্ডনে যান। ১৯৬৭ সালে বিলেতের রয়্যাল কলেজ অব সার্জনস থেকে এফআরসিএস প্রাইমারি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। চতুর্থ বর্ষে পড়াশোনা শেষে যখন চূড়ান্ত পরীক্ষায় অংশ নেবেন, ঠিক তখনই মুক্তিযুদ্ধের সূচনা হয়। পরীক্ষায় অবতীর্ণ না হয়ে তিনি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করার কারণে তাঁর উচ্চশিক্ষার ইতি ঘটে।
জাফরুল্লাহ চৌধুরী ছিলেন একজন বিরল ধরনের; এক অর্থে অদ্ভূত মানুষ। ঢিলেঢালা শার্ট-প্যান্ট। পুরোনা বাসা, আসবাবপত্র পুরোনো। গাড়িটাও পুরোনো। আমৃত্যু নিজের জন্য কিছু চাননি। দেশ ও জাতির জন্যে তাঁর অবদান বলে শেষ করা যাবে না।
জাফরুল্লাহ ভাইকে উন্নত চিকিৎসার জন্যে অনেকে বিদেশে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি বরাবরই বলেছেন, ‘আমি দেশের মানুষের জন্যে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করেছি। সেই আমি বিদেশে চিকিৎসা নেবো! তা কী করে সম্ভব! আমি এই দেশে চিকিৎসা নিয়ে মরতে চাই।’
সমাজসেবার স্বীকৃতি হিসেবে জীবনে অসংখ্য পুরস্কার পেয়েছেন এই গুণী ব্যক্তি। জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে অনন্য অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ তিনি ১৯৭৭ সালে স্বাধীনতা পুরস্কার লাভ করেন। ১৯৮৫ সালে ফিলিপাইন থেকে রমেন ম্যাগসাইসাই পুরস্কার, ১৯৯২ সালে সুইডেন থেকে বিকল্প নোবেল হিসাবে পরিচিত রাইট লাভলিহুড পুরস্কার, ২০০২ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বার্কলি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ‘ইন্টারন্যাশনাল হেলথ হিরো’ এবং মানবতার সেবার জন্যে কানাডা থেকে সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রি পেয়েছেন। ২০২১ সালে আহমদ শরীফ স্মারক পুরস্কার পান।
১৯৭১ সালে বিলেতে তাঁর জীবনযাপনের ধরণ ছিলো বিলাসবহুল। প্রাইভেট জেট চালানোর ও পানির নিচে সাঁতারের প্রশিক্ষকের লাইসেন্সও ছিলো তাঁর। ছিলো দুনিয়ার সবচেয়ে বিলাসবহুল গাড়ি কেনার বাতিক। সেই সময়েই তিনি বিলাসবহুল বিশেষ মডেলের মার্সিডিজ বেঞ্জ ব্যবহার করতেন। তাও আবার বিশেষ টায়ারের অ্যারো ডায়নামিক সিটের প্রথম গাড়ি। প্রিন্স চার্লস যে দর্জি থেকে স্যুট বানাতেন, তিনিও একই দর্জি দিয়ে নিজের স্যুট বানাতেন।
২৪ মার্চ হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে বিদেশি সাংবাদিকদের সাক্ষাৎকার দিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু। সেই সাক্ষাৎকার আইটিএন নিউজের মাধ্যমে বিলেতে বসেই দেখলেন জাফরুল্লাহ চৌধুরী। সাক্ষাৎকারের এক পর্যায়ে এক বিদেশি সাংবাদিক বঙ্গবন্ধুকে প্রশ্ন করলেন, 'তোমরা কি ভয় পাচ্ছ না যে, পাকিস্তানিরা তোমাদের হত্যা করতে পারে?'। জবাবে বঙ্গবন্ধু বললেন, '৭৭ মিলিয়ন বাংলাদেশিকে হত্যার জন্যে কি তাদের কাছে যথেষ্ট বুলেট আছে?'
বঙ্গবন্ধুর মুখে পূর্ব পাকিস্তানের বদলে বাংলাদেশি শুনতে পেয়ে জাফরুল্লাহ চৌধুরী বিলাসবহুল জীবনযাপন ত্যাগ করে প্রিয় মাতৃভূমির টানে ব্রিটেনে কর্মরত সব পরিচিত বাঙালি চিকিৎসকদের টেলিফোন করে বললেন, 'এটি এখন প্রমাণিত যে পাকিস্তান দেশ এখন মৃত। আমরা এখন সবাই বাংলাদেশি।' এরপরই বাঙালি চিকিৎসকদের নিয়ে তিনি গঠন করলেন 'বাংলাদেশে মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন ইউকে'। বলে রাখা ভালো, এই সংগঠনটি ছিলো 'বাংলাদেশ' নাম দিয়ে গঠিত প্রথম সংগঠন।
বাংলাদেশে মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন ইউকে'র কমিটিতে সাধারণ সম্পাদক ছিলেন ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী। সভাপতি ও সহ-সভাপতি ছিলেন যথাক্রমে ডা. আবু হেনা সাইদুর রহমান ও ডা. হাকিম। কমিটিতে আরও ছিলেন ডা. আলতাফুর রহমান খান এবং স্কটল্যান্ডে জেনারেল ও কার্ডিয়াক সার্জারিতে এফআরসিএস দ্বিতীয় পর্বে প্রশিক্ষণরত ডা. এম এ মবিন। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের একমাত্র কার্ডিয়াক সার্জন ছিলেন ডা. মবিন।
ব্রিটেনে তখন সাড়ে চারশ' বাংলাদেশি চিকিৎসক ছিলেন। সিদ্ধান্ত হলো, প্রত্যেক সদস্য বাংলাদেশে সহায়তার জন্যে প্রতি মাসে ১০ পাউন্ড করে চাঁদা দেবেন। কিন্তু ব্রিটেনে তখন বাংলাদেশিদের মধ্যে নানান মতপার্থক্য থাকায় জাফরুল্লাহ চৌধুরী ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন গড়ে তোলার জন্যে বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরীর শরণাপন্ন হয়ে তাঁকে নেতৃত্বদানের অনুরোধ জানান।
মুক্তিযুদ্ধের শুরু থেকেই ব্রিটেনের বিভিন্ন স্থানে প্রবাসী বাংলাদেশিদের মাধ্যমে প্রতিবাদ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হচ্ছিলো। এপ্রিলে লন্ডনের হাইড পার্কে তেমনই এক পাকিস্তান-বিরোধী প্রতিবাদ সমাবেশে ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী ও ডা. এম এ মবিন প্রকাশ্যে সাংবাদিকদের সামনে নিজেদের পাকিস্তানি পাসপোর্ট পুড়িয়ে ফেলে বললেন, 'আমরা নিজেদের আর পূর্ব পাকিস্তানের নাগরিক হিসেবে মনে করি না।' এরপরই তাঁরা দুজনেই মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। তখন জাফরুল্লাহ চৌধুরী মজলুম জননেতা মওলানা ভাসানীর সঙ্গে পরামর্শ করে মুজিবনগর সরকারের জন্যে তহবিল সংগ্রহ এবং মুক্তিযুদ্ধে সহায়তাদানে গঠিত বিভিন্ন অ্যাকশন কমিটির প্রতি লন্ডনের জনগণ ও ব্রিটিশ আইন প্রণেতাদের সমর্থন-সহানুভূতি লাভে অবিস্মরণীয় ভূমিকা পালন করেন।
১৯৭১ সালের মে মাসের শুরুতে ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী ও ডা. মবিন উড়োজাহাজে করে দিল্লি হয়ে কলকাতা যাওয়ার পরিকল্পনা করলেন। যখন তাঁরা ভারতীয় দূতাবাসে ভিসার আবেদন করলেন, তখন তাঁদের পাসপোর্ট চাওয়া হয়। জাফরুল্লাহ চৌধুরী বললেন, 'আমরা তো আমাদের পাসপোর্ট পুড়িয়ে ফেলেছি।' তখন ভারতীয় দূতাবাস তাঁদের বিকল্প জোগাড়ের পরামর্শ দেয়। জাফরুল্লাহ চৌধুরী বললেন, 'আমরা এখন রাষ্ট্রহীন নাগরিক।' তখন তাঁদের স্টেটলেস সনদ বের করার পরামর্শ দেওয়া হয়। সেই সনদ জমা দিলে তবেই দিল্লির ভিসা পান তাঁরা। এরপর দামেস্ক হয়ে দিল্লি যাওয়ার জন্যে সিরিয়া এয়ারলাইনসের ফ্লাইটের টিকিট কাটলেন ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী। ভারতীয় দূতাবাস জানালো, তাঁদের নিরাপত্তাঝুঁকি তৈরি হয়ে গেছে। পাকিস্তানি গোয়েন্দারা ইতোমধ্যেই তাঁদের বিষয়ে সমস্ত খবরাখবর সংগ্রহ করেছে।
মুক্তিযুদ্ধ শুরুর পর বাংলাদেশ থেকে যাওয়া সামরিক ও বেসামরিক নেতাদের যাচাই-বাছাই করছিলো ভারতীয় গোয়েন্দারা। বাংলাদেশ থেকে ভারতে আশ্রয় নেওয়া স্বাভাবিক হলেও তারা ঘুণাক্ষরেও ভাবতে পারেননি ব্রিটেন থেকে দুজন প্রতিষ্ঠিত চিকিৎসক স্বাধীনতা যুদ্ধে যোগ দেওয়ার জন্য ভারতে আসতে পারেন।
যাত্রাপথে সিরিয়ান এয়ারলাইনসের লন্ডন থেকে দিল্লিগামী ফ্লাইটটি সিরিয়ার দামেস্কে জ্বালানি নেওয়ার জন্য যাত্রাবিরতি নিয়েছিলো। জ্বালানি নেওয়ার সময় সব যাত্রীকেই যেহেতু উড়োজাহাজ থেকে নামতে হয়, সেহেতু সিরিয়ার সঙ্গে সুসম্পর্ককে কাজে লাগিয়ে সিরিয়ায় পাকিস্তানি দূতাবাস ও গোয়েন্দারা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী ও ডা. মবিনকে আটক করার জন্যে প্রস্তুত ছিলো। বিষয়টি টের পেয়ে উড়োজাহাজ থেকেই নামেননি তাঁরা দুজন।
সেসময় পাকিস্তানি দূতাবাসে কর্মরত কর্নেল পদমর্যাদার এক কর্মকর্তা পাইলটকে তাঁদের দুজনকে নামানোর জন্যে চাপ দিচ্ছিলেন। কিন্তু পাইলট ছিলেন অটল। পাকিস্তানিদের যুক্তি এরা দুজন পলাতক পাকিস্তানি, সুতরাং আমরা তাঁদের আটক করতে পারি। অন্যদিকে পাইলটের যুক্তি, যেহেতু বিমান এখন রানওয়েতে, সুতরাং তাঁদের জন্যে কোনো দেশের আইনই প্রযোজ্য হবে না। দুপক্ষের মধ্যে টানা ৫ ঘণ্টা কথা-কাটাকাটির পরও পাইলটের দৃঢ় মনোবলের কারণে দামেস্ক বিমানবন্দর শেষ পর্যন্ত বিমানটিকে ছাড়পত্র দেয়।
পরদিন ভোরে দিল্লি পৌঁছানোর পর তাঁদের স্বাগত জানালেন অল ইন্ডিয়া রিলিফ কমিটির চেয়ারপারসন পদ্মজা নাইড়ু। তিনি জাফরুল্লাহ চৌধুরীকে বললেন, 'প্রচুর শরণার্থী এখন ভারতে আশ্রয় নিচ্ছে। তাদের আশ্রয়, চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে সরকার হিমশিম খাচ্ছে। আপনাদের দুজনের এখন উচিত শরণার্থীদের জন্য খাদ্য, আশ্রয় ও চিকিৎসাসামগ্রী জোগাড়ে আত্মনিয়োগ করা।'
এর পরপরই এক অদৃশ্য কারণে ভারত সরকার জাফরুল্লাহ চৌধুরীকে জানিয়ে দিলো, সন্ধ্যার ফ্লাইটেই তাঁদের লন্ডন ফিরে যেতে হবে। বিষয়টি জানতে পেরে সেদিন দুপুরেই তাঁরা দুজনে ভারতীয় গোয়েন্দাদের চোখ এড়িয়ে হোটেল থেকে পালিয়ে গোপনে দিল্লি থেকে বিকেলের ফ্লাইটে কলকাতা যান।
কলকাতায় সাংবাদিক সাদেক খানসহ বেশ কয়েকজন নেতার সঙ্গে দেখা হলো জাফরুল্লাহ চৌধুরীর। তাঁরা তাঁকে আগরতলা চলে যাওয়ার পরামর্শ দেন। সাদেক খান নিজে দু নম্বর সেক্টরের কমান্ডার মেজর খালেদ মোশাররফ বরাবর একটি চিঠি লিখলেন। সেই চিঠি নিয়ে আগরতলায় যান ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী ও ডা. মবিন। আগরতলার মেলাঘরে প্রশিক্ষণ কেন্দ্র থেকে গেরিলা প্রশিক্ষণ নেন ডা. জাফরুল্লাহ।
আগরতলা টিচার্স ট্রেনিং কলেজে ক্যাপ্টেন ডা. আখতার আহমেদের সঙ্গে দেখা হয় জাফরুল্লাহ চৌধুরীদের। ডা. আখতার ও ডা. নাজিমুদ্দিন ততদিনে মেলাঘরের দারোগা বাগিচায় অস্থায়ীভাবে বাংলাদেশ ফিল্ড হাসপাতাল গড়ে তুলেছেন। এরপর ডা. জাফরুল্লাহ ডা. এম এ মবিনের সাথে মিলে সেখানেই ৪৮০ শয্যাবিশিষ্ট 'বাংলাদেশ ফিল্ড হাসপাতাল' প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনা করেন। তিনি সেই স্বল্প সময়ের মধ্যে অনেক নারীকে প্রাথমিক স্বাস্থ্য জ্ঞান দান করেন যা দিয়ে তাঁরা রোগীদের সেবা করতেন এবং তাঁর এই অভূতপূর্ব সেবাপদ্ধতি পরে বিশ্ববিখ্যাত জার্নাল পেপার 'ল্যানসেট'-এ প্রকাশিত হয়।
ডা. জাফরুল্লাহরা যখন মেলাঘরে এসেছিলেন, তখন যুদ্ধে হতাহতদের সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে বাড়তে থাকায় ফিল্ড হাসপাতালের সম্প্রসারণের পরিকল্পনা চলছিলো।
পরিকল্পনা অনুযায়ী ডা. আখতার ও ডা. নাজিম পাঁচ হাজার টাকার একটি বাজেট মেজর খালেদ মোশারফের কাছে উপস্থাপন করলেন। তখন বাংলাদেশ হাসপাতালের সঙ্গে পুরোদমে যুক্ত হয়ে পড়লেন ডা. জাফরুল্লাহ ও ডা. মবিন।
ডা. জাফরুল্লাহ হাসপাতাল নির্মাণের জন্যে বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন ইউকে শাখাকেও সংযুক্ত করলেন। ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী দেখলেন পাঁচ হাজার টাকায় তেমন কিছু করা সম্ভব হবে না। তাই তিনি প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমেদ ও জেনারেল ওসমানীর সঙ্গে অনানুষ্ঠানিকভাবে দেখা করে ৫০ হাজার টাকার বাজেট পাস করাতে সক্ষম হলেন।তখন বহু খোঁজাখুঁজির পর বিশ্রামগঞ্জে হাবুল ব্যানার্জির লিচু বাগানকে লিচুগাছ না কাটার শর্তে হাসপাতাল নির্মাণের জন্যে নির্বাচিত করা হয়। এ হাসপাতালে দুটি ওয়ার্ড রাখা হয়েছিলো—সার্জিকেল ও মেডিকেল। এছাড়া ছিলো ক্যাজুয়ালটি, ইমার্জেন্সি, প্যাথলজি, অপারেশন থিয়েটার, পোস্ট অপারেটিভ ওয়ার্ড, রিক্রিয়েশন এরিয়া, ইনফেকশাস ওয়ার্ডসহ বিভিন্ন কক্ষ।
২৬ আগস্ট মেলাঘরের দারোগা বাগিচা থেকে বিশ্রামগঞ্জে স্থানান্তরিত হয় বাংলাদেশ হাসপাতাল। এরপরই শুরু হয় বাংলাদেশ হাসপাতালের সবচেয়ে সফলতম অধ্যায়। যখনই হাসপাতালে চিকিৎসা সরঞ্জামাদি ও কোনো জিনিসের প্রয়োজন হতো, তখনই জাফরুল্লাহ চৌধুরী ছিলেন সদা প্রস্তুত। তিনি বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন ইউকেতে চিঠি পাঠাতেন। কেবল তাই নয়, মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন তিনি নিজে একাধিকবার ব্রিটেনে গিয়ে হাসপাতালের জন্যে চিকিৎসা সরঞ্জামাদি ও ঔষধের ব্যবস্থা করেছিলেন।
বাংলাদেশ হাসপাতালের সঙ্গে সর্বক্ষণ জড়িত থাকলেও সেখানে বেশিদিন থাকতে পারেননি জাফরুল্লাহ চৌধুরী। কারণ পুরো যুদ্ধকালীন তাঁকে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মহলের মাধ্যমে অর্থ, ত্রাণ ও মেডিকেল সরঞ্জামাদি জোগাড়, পরিকল্পনা ও তথ্য প্রদানের কাজে নিয়োজিত থাকতে হয়েছিলো। যে কারণে তাঁকে নিয়মিতই কলকাতা এবং ব্রিটেনে ছুটতে হতো। এছাড়া তাজউদ্দীন আহমেদ ও জেনারেল ওসমানীর সঙ্গে প্রায়ই বৈঠক করতে হতো।
জুলাইয়ে একবার জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কিছু তথ্য সংগ্রহের জন্যে আগরতলা থেকে ঢাকায় এসেছিলেন জাফরুল্লাহ চৌধুরী। কাজের ফাঁকে এক পরিচিত জাহাজ মালিকের কাছে তেলের ট্যাংকারের যাতায়াতের বিষয়ে খোঁজ নেন। পরবর্তীতে তাঁর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতেই একটি তেলের ট্যাংকার ডুবিয়ে দিয়েছিলো মুক্তিবাহিনী।
মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন জাফরুল্লাহ চৌধুরীকে আইরিশ রিপাবলিকান আর্মির সঙ্গে যোগাযোগ করতে বললেন মেজর খালেদ মোশাররফ। ডা. জাফরুল্লাহ ব্রিটেনে গিয়ে আইরিশ রিপাবলিকান আর্মির সঙ্গে যোগাযোগ করে অস্ত্র সহায়তা চান। জবাবে তারা এই মর্মে প্রতিশ্রুতি দেয়, যদি যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হয়, তবে তারা মুক্তিযোদ্ধাদের অস্ত্র তৈরির প্রশিক্ষণ দেবে।
মুক্তিযুদ্ধে সব চিকিৎসক, নার্স ও স্বেচ্ছাসেবকেরা বাংলাদেশ সরকার থেকে বেতন নিলেও ব্যতিক্রম ছিলেন ডাঃ জাফরুল্লাহ চৌধুরী এবং ডা. মবিন। তাঁরা স্বেচ্ছায় কোনো ধরনের বেতন গ্রহণ না করে বরং নিজেদের অর্থেই ব্যয় মিটিয়েছেন।
১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর জেনারেল ওসমানীর সঙ্গে কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টে ছিলেন জাফরুল্লাহ চৌধুরীও। সেই সময়ে তিনি সাক্ষ্য হয়েছেন এক অনন্য ঘটনার।
১৬ ডিসেম্বর রেসকোর্সে পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে মহান মুক্তিযুদ্ধের সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান সেনাপতি জেনারেল এম এ জি ওসমানীকে গভীর ষড়যন্ত্র করে আসতে বাধা প্রদান করা হয। নশ্বর পৃথিবীর এই চক্রান্তের কষ্টে জেনারেল ওসমানী বাবা-মায়ের কবর জিয়ারতের উদ্দেশ্যে একটি ছোট এমএইট উড়োজাহাজে করে সিলেটের উদ্দেশে রওনা দিলেন। তাঁর সঙ্গে ছিলেন এডিসি শেখ কামাল, সেকেন্ড-ইন-কমান্ড কর্নেল আবদুর রব, ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী, ভারতীয় ব্রিগেডিয়ার উজ্জ্বল গুপ্তা ও একজন সাংবাদিক।
যাত্রার আগে ব্রিগেডিয়ার গুপ্তা বললেন, আকাশপথ সম্পূর্ণ মুক্ত। পথিমধ্যে উড্ডয়ন অবস্থাতেই একটি ভারতীয় প্লেন থেকে তাদের উড়োজাহাজে গুলিবর্ষণ করা হয়। গুলিতে তেলের ট্যাংকার ফুটো হয়ে যায়। তখন ভারতীয় পাইলট ব্রিগেডিয়ার গুপ্তার উদ্দেশে বললেন, 'স্যার আমার হাতে মাত্র ১০ মিনিট সময় বাকি আছে। আমি কোথায় অবতরণ করবো।' বিষয়টি বুঝতে পেরে জেনারেল ওসমানী ও জাফরুল্লাহ চৌধুরী নিজেদের জ্যাকেট খুলে হেলিকপ্টারের তেলের ট্যাংকারের চারপাশ মুড়িয়ে দিলেন যেনো গুলি না লাগে। এমন সময়েই একটি গুলি এসে লাগলো কর্নেল রবের পায়ে। ভীষণ রক্তপাত হচ্ছিলো। জাফরুল্লাহ চৌধুরী দ্রুত কর্নেল রবকে শুইয়ে দিয়ে মাউথ টু মাউথ ব্রিদিং ও কার্ডিয়াক ম্যাসেজ দিতে লাগলেন। সেই সময় শেখ কামালের হাতেও গুলি লাগে। যদিও শেষ পর্যন্ত পাইলট উড়োজাহাজটিকে বিচক্ষণতার সঙ্গে অবতরণ করাতে সক্ষম হয়েছিলো। তাঁরা উড়োজাহাজ থেকে লাফ দিয়ে নামার কিছুক্ষণের মধ্যেই সেটি পুরোপুরি পুড়ে যায়।
১৬ ডিসেম্বর মুক্তিযুদ্ধ আনুষ্ঠানিকভাবে সমাপ্ত হলেও শেষ হয়নি ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর চিকিৎসাযুদ্ধ। কারণ কেবল মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়েই থেমে যাননি জাফরুল্লাহ চৌধুরী। বরং মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে তিনি শামিল হয়েছেন নতুন এক মহান চিকিৎসা যুদ্ধে। যে যুদ্ধে তিনি গড়ে তুলেছিলেন গণমানুষের চিকিৎসার চিরকালীন স্বাস্থ্য ঠিকানা 'গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র'।
মুক্তিযুদ্ধে বিজয় অর্জনের পর অসহায় মানুষের স্বাস্থ্যসেবার মহান ব্রত নিয়ে ঢাকার অদূরে সাভারে জাফরুল্লাহ চৌধুরী প্রতিষ্ঠা করেন ‘গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র'। সরকার কর্তৃক অধিগ্রহণ করা ২৩ একর জমি ও জোহরা বেগম, এম এ রব, ডা. লুৎফর রহমানদের পারিবারিক সম্পত্তি থেকে দান করা পাঁচ একর জমিসহ মোট ২৮ একর জমিতে ১৯৭২ সালে যাত্রা শুরু করে 'গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র'।
সেদিনের সেই ছোট পরিসরে যাত্রা শুরু করে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের বর্তমানে সারাদেশে ৪০টি মেডিকেল সেন্টার রয়েছে। গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের অধীনে আছে সাতটি হাসপাতাল, ডেন্টাল কলেজ, গণ-বিশ্ববিদ্যালয়, প্রিন্টিং অ্যান্ড পাবলিকেশন্স, মাসিক গণস্বাস্থ্য ম্যাগাজিন, বেসিক কেমিক্যাল কারখানা (দেশের সবচেয়ে বড় প্যারাসিটামল কাঁচামাল উৎপাদক প্রতিষ্ঠান), গণস্বাস্থ্য ফার্মাসিউটিক্যালস ও অ্যান্টিবায়োটিকের কাঁচামালের ফ্যাক্টরি।
দেশের মানুষের আর্থসামাজিক অবস্থার কথা চিন্তা করে জাফরুল্লাহ চৌধুরীর নেতৃত্বে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রে গড়ে তোলা হয়েছে দেশের সর্ববৃহৎ কিডনি ডায়ালাইসিস সেন্টার। সেখানে দরিদ্র মানুষেরাও সবচেয়ে কম খরচে কিডনির চিকিৎসা করাতে পারেন।
সামরিক শাসকদের সময়েই স্বাস্থ্যনীতি, ওষুধনীতি ও নারী শিক্ষা, এমনকি সে সময়ে সহজে দেশের মানুষের জন্যে পাসপোর্টের ব্যবস্থা করতে সরকারকে রাজি করানো এবং প্রশাসনের বিকেন্দ্রীকরণে সরকারকে প্রভাবিত করতে তাঁর ভূমিকা অনস্বীকার্য।
স্বাস্থ্যখাতে জাফরুল্লাহ চৌধুরীর অন্যতম বড়ো ভূমিকা ছিলো আশির দশকে জাতীয় ওষুধ নীতি প্রবর্তন। এ নীতির আগে দেশের ওষুধ উৎপাদন খাত ছিলো পুরোপুরি বিদেশিদের হাতে। জাফরুল্লাহ চৌধুরীর হাত ধরে ওষুধ নীতির মাধ্যমে দেশের ওষুধ শিল্পের এক বিপ্লব ঘটে। যেখানে আগে দেশের ওষুধ খাত প্রায় পুরোপুরিই বিদেশিদের হাতেই সীমাবদ্ধ ছিলো, সেখানে এখন দেশীয় উৎপাদকেরাই দেশের ৯৫ শতাংশ ওষুধ উৎপাদন করেন। বর্তমানে বাংলাদেশে উৎপাদিত ওষুধ শতাধিক দেশে রপ্তানিও করেন দেশীয় উৎপাদকেরা।
সদ্যস্বাধীন দেশের অজস্র প্রতিকূলতাকে সামলে নিয়ে জাফরুল্লাহ চৌধুরী যেভাবে দেশের স্বাস্থ্যখাত বিনির্মাণের দায়িত্ব নিয়েছিলেন, তা অবিস্মরণীয়। চিকিৎসাসেবাকে সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার এই মূল কারিগর ও দেশের মজলুম জনগণের প্রকৃত বন্ধু তিন বছর আগে স্ত্রী শিরিন হক, ছেলে বারিশ হাসান চৌধুরী, মেয়ে বৃষ্টি চৌধুরীকে রেখে ১১ এপ্রিল ২০২৩ মঙ্গলবার রাতে ৮১ বছর বয়সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। সাভার গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র ক্যাম্পাসে তাঁকে সমাহিত করা হয়।
শারীরিকভাবে তিনি চলে গেলেও রেখে গেছেন ন্যায় ও সত্য কথা বলার অবিস্মরণীয় ইতিহাস। নৈতিক-মানবিক চিকিৎসা কর্মযজ্ঞের ক্ষেত্র, যা তাঁকে বাঁচিয়ে রাখবে অনন্তকাল।
সারোয়ার ওয়াদুদ চৌধুরী : গবেষক ও সংগঠক।








