প্রকাশ : ১২ এপ্রিল ২০২৬, ০৩:৪২
লাঙলের ফলা থেকে স্মার্টফোনের স্ক্রিন: এক হারানো সভ্যতার মহাকাব্য!

নব্বইয়ের দশকের সেই ধূসর পাণ্ডুলিপি আজ যেন এক জীবন্ত মহাকাব্য হয়ে ধরা দিয়েছে আমাদের স্মৃতির আয়নায়। আধুনিকতার তীব্র ঝিলিক আর ডিজিটাল পর্দার মায়াজালের আড়ালে ঢাকা পড়ে যাওয়া সেই ফেলে আসা দিনগুলো যখন কোনো সাদাকালো চিত্রে ভেসে ওঠে, তখন হৃদয়ের গহীনে কড়া নাড়ে এক যান্ত্রিকতাহীন পরম শান্তির পৃথিবী। আজ তিন দশক পর ইতিহাসের বাঁকে দাঁড়িয়ে যখন আমরা পেছন ফিরে তাকাই, তখন দেখা যায়—আমরা কেবল সময় পার করিনি, বরং এক অকৃত্রিম সভ্যতাকে বিসর্জন দিয়ে যান্ত্রিক এক কৃত্রিমতার আলিঙ্গনে ধরা দিয়েছি।
|আরো খবর
চিরকালীন ভোরের সেই ধ্রুপদী রূপ
নব্বইয়ের দশকের একটি গ্রামীণ সকাল ছিল প্রকৃতির সাথে মানুষের এক আধ্যাত্মিক মিতালি। তখন ভোরের আলো ফুটতে না ফুটতেই পাখির কলকাকলির সাথে সুর মেলাত কৃষকের লাঙল-জোয়ালের সেই ছন্দবদ্ধ শব্দ। যান্ত্রিক সভ্যতার করাল গ্রাস তখনো পল্লীবাংলার বুক চিরে রক্তক্ষরণ ঘটায়নি। কুয়াশার চাদর সরিয়ে যখন একজোড়া বলদ আর কাঠের লাঙল নিয়ে কৃষক মেঠো পথে পা বাড়াত, তখন থেকেই শুরু হতো এক নিবিড় সৃষ্টিসুখ. সেই সময়ে কৃষিকাজ মানে কেবল অন্ন সংস্থান ছিল না, তা ছিল এক পরম সাধনা।
ফসলের মৌসুমে মাঠ থেকে যখন ধানের আঁটি কাঁধে নিয়ে আইল ধরে কৃষকেরা সারিবদ্ধভাবে হেঁটে যেত, তখন দূর থেকে তাদের মনে হতো এক একটি জীবন্ত ভাস্কর্য। খড়ের গাদায় শিশুদের লুকোচুরি খেলা আর উঠানে ধান মাড়াইয়ের সেই ধুপধাপ শব্দ ছিল গ্রামবাংলার এক অবিচ্ছেদ্য লোকজ উৎসব। সকালবেলা গৃহবধূর নিপুণ হাতে গরু দোয়ানো আর উঠানে রোদে দেওয়া ধানের পাহারায় থাকা—সব মিলিয়ে এক কর্মচঞ্চল অথচ শান্তিময় পরিবেশ। পশুপালন তখন কেবল সচ্ছলতা ছিল না, তা ছিল পরিবারের সদস্যদের সাথে এক গভীর আত্মিক বন্ধন।
সামাজিক সংহতি: যেখানে প্রাণের মেলা বসে
নব্বইয়ের দশকের গ্রামীণ জীবনের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল মানুষের মধ্যকার অকৃত্রিম সহমর্মিতা। পাড়ার প্রশস্ত উঠানে চলত বয়োজ্যেষ্ঠদের আড্ডা, যেখানে রাজনীতির চেয়ে বেশি গুরুত্ব পেত পাড়া-পড়শির সুখ-দুঃখের গল্প। মাটির ব্যাংকে তিল তিল করে জমানো পয়সা নিয়ে হাটে গিয়ে জিলাপি কিংবা কদমা কেনার যে তৃপ্তি, তা আজকের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত সুপারশপে হাজার টাকার কেনাকাটাতেও খুঁজে পাওয়া দুষ্কর।
যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম ছিল ডাকঘর আর সেই চিঠিপত্র। যাতায়াত ছিল মন্থর, হয়তো পায়ে হাঁটা বা রিকশা-ভ্যানে মাইলের পর মাইল পাড়ি দেওয়া, কিন্তু মানুষের মনে ছিল অগাধ ধৈর্য আর একে অপরের প্রতি প্রশ্নাতীত বিশ্বাস। নদীর বুকে পাল তোলা নৌকায় চড়ে এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রামে যাওয়ার সেই নিস্তরঙ্গ যাত্রা আজ কেবলি স্মৃতি।
শৈশবের উন্মুক্ত আকাশ ও হারানো বিনোদন
বর্তমান প্রজন্মের হাতে যখন স্মার্টফোন বা ট্যাবের রঙিন স্ক্রিন, নব্বইয়ের দশকের শৈশব তখন ছিল ধুলোমাখা মাঠ আর বর্ষার কর্দমাক্ত জলাশয়ে। বিকেল হলেই গ্রামের ছেলেরা মেতে উঠত কাদাজলে মাছ ধরার উৎসবে। বর্ষার থইথই পানিতে কচুরিপানার মাঝে কিশোরদের দাপাদাপি কিংবা ডোবা-নালায় হাত দিয়ে শিং-মাগুর ধরার সেই যে রোমাঞ্চ, তা আজকের কৃত্রিম ভিডিও গেমের ভার্চুয়াল জগতে রূপকথার মতো শোনায়।
অপরাধ প্রবণতার বিবর্তন: সনাতনী থেকে ডিজিটাল জালিয়াতি
সময়ের পরিক্রমায় জীবনযাত্রার মান যেমন ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে, তেমনি অপরাধের ধরণ ও অপরাধী মনস্তত্ত্বে এসেছে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন। নব্বইয়ের দশকে অপরাধ ছিল মূলত ভৌগোলিক ও শারীরিক সীমা দ্বারা আবদ্ধ। চুরি, সিঁধ কাটা বা ডাকাতি ছিল প্রধান অপরাধ, যেখানে অপরাধীকে সশরীরে উপস্থিত থাকতে হতো। লক্ষ্য ছিল প্রত্যক্ষ সম্পদ।
কিন্তু বর্তমানের অপরাধ জগত এক অদৃশ্য মায়াজাল। অপরাধীরা এখন আর আঁধার রাতে সিঁধ কাটে না, বরং প্রকাশ্য দিবালোকে স্মার্টফোনের স্ক্রিন ছুঁয়ে আপনার ব্যাংক অ্যাকাউন্ট শূন্য করে দিচ্ছে। সাইবার ক্রাইম আজ এক বৈশ্বিক মহামারি। আর্থিক জালিয়াতি, হ্যাকিং, সোশ্যাল মিডিয়ায় কুরুচিপূর্ণ অপপ্রচার এবং ডিজিটাল প্রতারণা এখনকার অপরাধের প্রধান অস্ত্র। আগে একটি অপরাধ কেবল একটি পরিবারকে ক্ষতিগ্রস্ত করত, এখন একটি প্রযুক্তিনির্ভর অপরাধ পুরো একটি রাষ্ট্র বা সমাজকে অস্থিতিশীল করার ক্ষমতা রাখে।
ভোগবাদ ও আধুনিকতার মূল্য
সমাজতাত্ত্বিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রাচুর্য বাড়ার সাথে সাথে মানুষের মধ্যে আপেক্ষিক বঞ্চনা বেড়েছে। নব্বইয়ের দশকে মানুষের জীবনযাত্রা ছিল মিতব্যয়ী, ফলে মানুষের মধ্যে আকাশচুম্বী চাহিদা ছিল না. কিন্তু বর্তমানের অতি-ভোগবাদী মানসিকতা তরুণ প্রজন্মকে দ্রুত অর্থ উপার্জনের অন্ধকার পথে ঠেলে দিচ্ছে। পারিবারিক কাঠামো যখন যৌথ থেকে একক হলো, তখন হারিয়ে গেল শিশুদের ওপর সেই সামাজিক মুরুব্বিয়ানা ও নৈতিক শাসনের আবেশ। বাবা-মায়ের কর্মব্যস্ততা আর শিশুদের হাতে প্রযুক্তির অবাধ বিচরণ তাদের এক নিঃসঙ্গ পৃথিবীতে বন্দি করে ফেলেছে।
উপসংহার: শেকড়ই যেখানে শেষ আশ্রয়
নব্বইয়ের দশকের সেই গ্রামীণ জীবন আমাদের শিখিয়েছিল অল্পে তুষ্ট থাকার এক মহান দর্শন। আজ আমরা ডিজিটাল মহাসড়কের যাত্রী, আমাদের পকেটে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খেলা করে, কিন্তু জীবনের গূঢ় শান্তি আজ কর্পূরের মতো উবে গেছে। সেই চিরচেনা গ্রামীণ রূপগুলো আজ আমাদের বারবার সতর্ক করে—উন্নতির অর্থ যদি হয় শেকড়বিচ্ছিন্ন হওয়া, তবে সেই উন্নতি অন্তঃসারশূন্য।
প্রযুক্তির আশীর্বাদকে আমাদের বরণ করতে হবে ঠিকই, কিন্তু তা যেন সেই অকৃত্রিম ভ্রাতৃত্ব, নৈতিকতা এবং মূল্যবোধের কফিনে শেষ পেরেক না ঠুকে দেয়। আমাদের মেঠো পথগুলো আজ পিচঢালা হয়েছে ঠিকই, কিন্তু সেই পথে হাঁটা মানুষগুলোর মনের দূরত্ব এখন অনেক বেশি। সাদাকালো স্মৃতির এই নির্যাসগুলো যেন আমাদের প্রজন্মের জন্য এক চিরন্তন বার্তা—যান্ত্রিকতাকে নয়, মানুষকে ভালোবাসুন; কৃত্রিমতাকে নয়, প্রকৃতিকে লালন করুন। শেকড়ের মাটির গন্ধ আর মানুষের হাতের ছোঁয়াই হোক আমাদের ভবিষ্যৎ পৃথিবীর প্রকৃত পরিচয়।
লেখক :তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক, চাঁদপুর জেলা বিএনপি।
বিশেষ প্রতিবেদক ও সিনিয়র সাব এডিটর, কলামিস্ট, দৈনিক চাঁদপুর কন্ঠ।
ডিসিকে/ এমজেডএইচ






