প্রকাশ : ১৮ আগস্ট ২০২৬, ০২:০২
৭৪ বছরের ঐতিহ্যবাহী 'হাজী আউয়াল সুইটস'
ফরিদগঞ্জের এই মিষ্টির সুনাম ছড়িয়ে পড়েছে সারাদেশে

মিষ্টির সঙ্গে বাঙালির আবেগ ও ঐতিহ্যের সম্পর্ক বহু পুরোনো। আর সেই ঐতিহ্যকে ধারণ করে ৭৪ বছর ধরে সুনামের সঙ্গে মিষ্টি তৈরি ও বিক্রি করে আসছে ফরিদগঞ্জ উপজেলার ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠান 'হাজী আউয়াল সুইটস'। গুণগত মান, স্বাদ ও ঐতিহ্যের কারণে কেবল চাঁদপুর অঞ্চলেই নয়, দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়েছে এই প্রতিষ্ঠানের মিষ্টির পরিচিতি। দীর্ঘ পথচলায় প্রতিষ্ঠানটি যেন চাঁদপুরের মিষ্টির ঐতিহ্যেরই এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে।
১৯৫২ সালে ফরিদগঞ্জের কৃতী সন্তান হাজী আব্দুল আউয়াল ফরিদগঞ্জ বাজারে প্রতিষ্ঠানটি স্থাপন করেন। সেই থেকেই এর যাত্রা শুরু। সময়ের পরিক্রমায় ৭৪ বছর পেরিয়ে গেলেও ঐতিহ্য ও গুণগত মান ধরে রেখেছে প্রতিষ্ঠানটি। বর্তমানে পারিবারিকভাবেই এটি পরিচালিত হচ্ছে।
হাজী আউয়াল সুইটসের বর্তমান পরিচালক মো. আব্দুল আখের জানান, সৃষ্টিকর্তার রহমত ও মানুষের ভালোবাসাই তাদের দীর্ঘ পথচলার মূল শক্তি। সর্বোচ্চ মানের দুধসহ সেরা উপকরণ ব্যবহার করে তাঁরা মিষ্টি তৈরি করেন। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে ফরিদগঞ্জে আসা মানুষও এখান থেকে মিষ্টি কিনে নিয়ে যান। আবার অনেকেই দূর-দূরান্তে থাকা স্বজনদের জন্যে এখানকার মিষ্টি উপহার হিসেবে পাঠান।
তিনি বলেন, বর্তমানে তাঁদের প্রতিষ্ঠানে রসগোল্লা, মালাইকারি, রসমালাই, ল্যাংচা, বালুশাই, কালো মিষ্টি, সাদা মিষ্টি ও নিমকিসহ বিভিন্ন ধরনের মিষ্টি তৈরি হয়। প্রতিদিন কয়েক শ' কেজি মিষ্টি উৎপাদন ও বিক্রি হয়। সকাল থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত খোলা থাকে তাঁদের দোকান। পরিবারের সদস্যদের আন্তরিকতা, কর্মীদের পরিশ্রম এবং এলাকাবাসীর ভালোবাসা ও দোয়ায় প্রতিষ্ঠানটি আজ সারা দেশে সুপরিচিতি পেয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটিতে গিয়ে দেখা যায়, সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ক্রেতাদের ব্যস্ততা লেগেই আছে। ফরিদগঞ্জসহ আশপাশের বিভিন্ন এলাকা এবং দেশের অন্যান্য জেলা থেকে আসা মিষ্টিপ্রেমীরা এখানে ভিড় জমায়। কারও হাতে পারিবারিক অনুষ্ঠানের জন্যে মিষ্টির প্যাকেট, কেউবা আবার প্রিয়জনের জন্যে নিয়ে যাচ্ছেন রসমালাই কিংবা রসগোল্লা। সব মিলিয়ে দোকানজুড়ে যেন ব্যস্ততার শেষ নেই।
প্রতিষ্ঠানের কিছু মিষ্টি আধুনিক যন্ত্রের সাহায্যে তৈরি করা হয়। এতে মিষ্টির আকার, পরিমাণ ও মানে সামঞ্জস্য বজায় রাখা সহজ হয়। তবে ঐতিহ্যবাহী স্বাদ ও নিজস্ব বৈশিষ্ট্য ধরে রাখার বিষয়টিতেই তাঁরা সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেন।
হাজী আউয়াল সুইটস থেকে মিষ্টি কিনতে আসা ফরিদগঞ্জের হার্ডওয়্যার ব্যবসায়ী ও লাক্সমেট ইলেকট্রিক ব্র্যান্ডের ডিস্ট্রিবিউটর মো. মিজানুর রহমান বলেন, দীর্ঘদিন ধরে তিনি বিভিন্ন দাওয়াত ও পারিবারিক অনুষ্ঠানের জন্যে এখান থেকে মিষ্টি কেনেন। বাড়িতে মিষ্টির প্রয়োজন হলেও তিনি এই প্রতিষ্ঠানকেই বেছে নেন। কারণ এখানকার মিষ্টির স্বাদ, মান ও পরিচিতি অনন্য। তিনি জানান, আজকেও তিনি এই দোকান থেকে চার ধরনের মিষ্টি খেয়েছেন। প্রতিটির স্বাদ ও বৈশিষ্ট্য আলাদা এবং গুণগত মানও বেশ ভালো বলে তিনি উল্লেখ করেন।
স্থানীয়দের মতে, ৭৪ বছরের পুরোনো এই প্রতিষ্ঠান কেবল একটি মিষ্টির দোকান নয়, এটি ফরিদগঞ্জের একটি ঐতিহ্য। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে মানুষ এখানকার মিষ্টির স্বাদ উপভোগ করে আসছে। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা চাঁদপুরের মানুষ যখনই ফরিদগঞ্জে আসেন, অনেকেরই পছন্দের তালিকায় থাকে হাজী আউয়াল সুইটসের মিষ্টি।
ব্যবসার চরম প্রতিযোগিতার যুগেও ঐতিহ্য, স্বাদ ও মান ধরে রেখে টিকে থাকা সহজ নয়। কিন্তু হাজী আউয়াল সুইটস সেই কঠিন পথ পাড়ি দিয়ে আজ ৭৪ বছর পার করছে। ১৯৫২ সালে প্রতিষ্ঠাতার হাতে যে যাত্রার সূচনা হয়েছিল, তা আজও নতুন প্রজন্মের হাত ধরে সগৌরবে এগিয়ে চলেছে।
ঐতিহ্যের স্বাদ, মানের নিশ্চয়তা আর মানুষের ভালোবাসায় হাজী আউয়াল সুইটস যেন ফরিদগঞ্জের মাটির সঙ্গে মিশে থাকা এক দীর্ঘ মিষ্টি-ইতিহাস।
ডিসিকে /এমজেডএইচ








