মঙ্গলবার, ১৮ আগস্ট, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য
ব্রেকিং নিউজ

প্রকাশ : ১৮ আগস্ট ২০২৬, ০৯:৩৭

২১ বছর ক্রীড়াঙ্গনে আলো ছড়িয়ে আজ একাকী বিছানায় হাজীগঞ্জের শাহজাহান

কামরুজ্জামান টুটুল
২১ বছর ক্রীড়াঙ্গনে আলো ছড়িয়ে আজ একাকী বিছানায় হাজীগঞ্জের শাহজাহান

খেলাধুলার যখন স্বর্ণযুগ ছিলো, তখন উপজেলা ক্রীড়া সংস্থার সাধারণ সম্পাদকের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে টানা ২১ বছর দায়িত্ব পালন করেন। দায়িত্ব পালনকালে শত শত খেলার সফল আয়োজনকারী হাজীগঞ্জের শাহজাহান তালুকদার সাহার পা হারিয়ে এখন সময় কাটে বিছানায় শুয়ে-বসে। সৎ জীবনযাপন করে জীবনতরী পার করে শেষ বয়সে এসে এতোটা নিগৃহীত হবেন ভাবতে পারেননি। তাঁর খোঁজ এখন কেউ রাখে না, সবাই সবাইকে নিয়ে ব্যস্ত। খেলাধুলা করতে গিয়ে পেয়েছেন শত শত ক্রেস্ট আর সার্টিফিকেট, যা শোকেসে সাজিয়ে রাখা ছাড়া কোনো উপকারে আসছে না।

শাহজাহান তালুকদার সাহা হাজীগঞ্জ পৌরসভার টোরাগড় গ্রামের ঐতিহ্যবাহী তালুকদার বাড়ির সন্তান। তাঁদের সকল ভাই স্ব-স্ব ক্ষেত্রে চাকরি করে জীবিকা নির্বাহ করলেও সবাই মাঠদাপানো খেলোয়াড় ছিলেন। খেলার প্রতি ঝোঁক আর বাড়ির নিকটে হাজীগঞ্জ সরকারি পাইলট হাই স্কুল অ্যান্ড কলেজের সুবিশাল খেলার মাঠ থাকার কারণে নিজেকে সবসময় জড়িয়ে রেখেছেন খেলাধুলার জগতে।

সরেজমিনে শাহজাহান তালুকদারের বাড়িতে গেলে কথা হয় তাঁর সাথে। বাম পায়ের হাঁটুর নিচে কাটা, পাশে কৃত্রিম পা দেখিয়ে বলেন, “এটাই আমার সঙ্গী।” বিছানা দেখিয়ে বলেন, “এই বিছানায় শুয়ে-বসে আমার দিন-রাত কাটে।” এমনকি তাঁর একটি স্মার্টফোন নেই, তিনি বাটন ফোন ব্যবহার করেন।

নানান প্রসঙ্গে শাহজাহান তালুকদার সাহা জানান, “পায়ের আঙুলে সমস্যা দেখা দিলে ডাক্তার দেখাই। বহু চিকিৎসকের কাছে চিকিৎসা করানোর পর পা কাটতে হয়েছে। যে কারণে আমি নিজ ঘরেই বন্দি হয়ে পড়েছি।”

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, একসময় হাজীগঞ্জ, হাজীগঞ্জ ডিঙিয়ে জেলা আর জেলা ডিঙিয়ে জাতীয় পর্যায়ে খেলায় ডাক পাওয়া ফুটবলার, ক্রীড়া ব্যক্তিত্ব ও ক্রীড়া সংগঠক ছিলেন শাহজাহান তালুকদার সাহা। তাঁদের বাবা কলকাতার মাঠে খেলতেন আর সে কারণে জেনেটিকভাবেই তাঁরা পাঁচ ভাইয়ের সবাই খেলাধুলার সাথে জড়িত ছিলেন বলে পরিবারটিকে ‘ক্রীড়া পরিবার’ হিসেবে সবাই চেনে। তাঁর বাবা মরহুম আলী আহম্মদ তালুকদার ষাটের দশকে কলকাতা টাটার হয়ে কলকাতার মাঠে খেলতেন। এরপরেই তিনি সপরিবারে হাজীগঞ্জের টোরাগড়ে চলে আসেন। এখানে আসার পর ক্রীড়া জগতে বিচরণ করেছেন সমানতালে। নিজে ভালো ফুটবল খেলোয়াড় ও রেফারি হওয়ার কারণে মরহুম আলী আহম্মদের ৯ সন্তানের মধ্যে পুত্রসন্তান ৫ জনের সবারই ক্রীড়াঙ্গনে ছিলো সমান বিচরণ। ফুটবল খেলার পাশাপাশি পরে এসে নামকরা রেফারি হয়ে ওঠেন শাহজাহান তালুকদার। শেষ বয়সে এসে একজন প্রশিক্ষক হয়ে যান নিজের শ্রম আর ঘামে। এমনকি ফুটবলে ও অ্যাথলেটিক্সে জাতীয় পর্যায়ে ডাক পড়ে তাঁর। টানা ২১ বছর উপজেলা ক্রীড়া সংস্থার সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি ক্রীড়া জগতের সাথে তিনি ৫৫ বছর ধরে জড়িত ছিলেন।

হাজীগঞ্জ উপজেলা ক্রীড়া সংস্থা প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৬৪ সালে, যার প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক ছিলেন সাবেক সংসদ সদস্য এম এ মতিন। সেই মতিন স্যারের ডাকে ২০০২ সালে হাজীগঞ্জ উপজেলা ক্রীড়া সংস্থার সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পান শাহজাহান তালুকদার সাহা, যে দায়িত্ব তিনি পালন করেছেন টানা ২০২২ সাল পর্যন্ত। পরে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের কারণে তাঁকে সরিয়ে দেওয়া হয়। মূলত তারপর থেকেই নিজেকে গুটিয়ে নেন ক্রীড়া জগৎ থেকে।

এক প্রতিক্রিয়ায় শাহজাহান তালুকদার সাহা বলেন, “আমার নিজের তৈরি করা অনেক খেলোয়াড় বিকেএসপি, সিলেট বিকেএসপি ও সাঁতারে ভালো করেছে। উপজেলা ও জেলায় ক্রীড়া বিষয়ে এতো কাজ করার পরও আমার খবর কেউ রাখেনি। দু-একজন বা একটি-দুটি সংগঠন অবশ্য এসেছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, কত দিন আর কে কার খোঁজ রাখে! যে প্রতিষ্ঠানে ২১ বছর জীবন-যৌবন শেষ করেছি, সেই উপজেলা ক্রীড়া সংস্থাই খবর রাখে না, বাকি কার কথা আর বলবো?”

তিনি বলেন, “বর্তমান প্রজন্ম খেলায় পিছিয়ে পড়ছে, যার মূল কারণ ট্রেইনার না পাওয়া। খেলায় নতুন প্রজন্ম আগ্রহী হলেও এখনো ক্রিকেট ও ফুটবলে ভালো খেলোয়াড় তৈরি হতো, যদি কোনো প্রতিষ্ঠান দায়িত্ব নিয়ে ভালো ট্রেইনার রাখতে পারতো। জাতীয় মানের ট্রেইনার পেলে হাজীগঞ্জ থেকে ভালো প্লেয়ার তৈরি করা সম্ভব।”

সুধীজনদের মতে, দুঃস্থ ক্রীড়াবিদ হিসেবে শাহজাহান তালুকদার সাহা সরকারি সকল সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার দাবি রাখে। এ ব্যাপারে হাজীগঞ্জ উপজেলা ক্রীড়া সংস্থা স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে উদ্যোগ নিয়ে তাঁর পাশে দাঁড়াতে পারে। এ ব্যাপারে স্থানীয় সংসদ সদস্য ইঞ্জিনিয়ার মমিনুল হকের সুদৃষ্টি কামনা করেছেন সকলে।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়