মঙ্গলবার, ০৫ মে, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য

প্রকাশ : ০৪ মে ২০২৬, ২৩:০৩

মোবাইল আসক্তি শুধু সময়কেই কিল করে না, মানসিকভাবে প্যারালাইসড করে ফেলে

-----মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর হোসাইন

নুরুল ইসলাম ফরহাদ
মোবাইল আসক্তি শুধু সময়কেই কিল করে না, মানসিকভাবে প্যারালাইসড করে ফেলে

মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর হোসাইন, প্রধান শিক্ষক, কালিরবাজার মিজানুর রহমান উচ্চ বিদ্যালয়। ছাত্রজীবন থেকেই তিনি বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ও ক্রীড়া সংগঠনের সাথে জড়িত ছিলেন। চাঁদপুরের বিখ্যাত নাট্য সংগঠন বর্ণচোরা নাট্য গোষ্ঠীর সদস্য ছিলেন এবং চাঁদপুর থিয়েটারের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছেন। ফরিদগঞ্জ লেখক ফোরামেরও সদস্য। বর্তমানে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘সোসাইটি ফর বিউটিফুল চররামপুর’ এবং গ্রাম উন্নয়ন ফোরামের উপদেষ্টা। এই সংগঠনগুলো গ্রাম থেকে মাদক সমস্যা দূরীকরণ, বেকার সমস্যা দূরীকরণ এবং আর্ত-মানবতার সেবায় সব সময় কাজ করে আসছে। গ্রামের শিশু-কিশোরদেরকে স্কুলমুখী করা এবং খেলাধুলায় অংশগ্রহণ করিয়ে শারীরিক ও মানসিক বিকাশে এই সংগঠনগুলো যথেষ্ট ভূমিকা রাখছে। তাঁর বিদ্যালয়ের কিশোর কিশোরী ক্লাব, ইংলিশ ল্যাঙ্গুয়েজ ক্লাব, কম্পিউটার ক্লাব, গ্রিন স্কুল, ক্লিন স্কুল এবং শ্রেণিভিত্তিক হাউজ তৈরি করে আন্তঃস্কুল ক্রীড়া প্রতিযোগিতার আয়োজন করেন। চেষ্টা করে যাচ্ছেন যাতে করে শিশু-কিশোরদের পড়ালেখার সাথে মানসিক ও শারীরিক বিকাশ যথাযথভাবে হয়। তিনি মুখোমুখি হয়েছেন দৈনিক চাঁদপুর কণ্ঠের পাক্ষিক আয়োজন ক্রীড়াকণ্ঠ বিভাগের।

ক্রীড়াকণ্ঠ : শিক্ষার পাশাপাশি ক্রীড়াকে আপনি প্রতিষ্ঠান প্রধান হিসেবে কতোটা গুরুত্ব দেন? দিয়ে থাকলে কেন?

জাহাঙ্গীর হোসাইন : খেলাধুলা বা ক্রীড়া শিক্ষারই একটি অংশ। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন- ‘যে শিক্ষার মধ্যে আনন্দ নেই সেই শিক্ষা সত্যিকার অর্থে শিক্ষা হতে পারে না।’ প্রতিষ্ঠান প্রধান হিসেবে আমি খেলাধুলাকে যথেষ্ট গুরুত্ব দেই। আমাদের বিশাল একটি খেলার মাঠ রয়েছে। সেখানে আমরা বিভিন্ন ধরনের খেলাধুলার আয়োজন করি। শিক্ষার্থীদের মধ্য থেকে একঘেঁয়েমি দূর করার জন্যে খেলাধুলা নিয়ামক হিসেবে কাজ করে।

ক্রীড়াকণ্ঠ : আপনার বিদ্যালয়ের যেমন বড়ো মাঠ আছে, শিক্ষার্থীদের খেলাধুলার তেমন বড়ো আয়োজন হয় কি? বার্ষিক ক্রীড়া ছাড়া আন্তঃশ্রেণী ক্রিকেট ও ফুটবল হয় কি?

জাহাঙ্গীর হোসাইন : হ্যাঁ, আমাদের বড়ো একটি মাঠ রয়েছে। সেখানে আমরা বার্ষিক ক্রীড়াসহ বিভিন্ন সিজনে বিভিন্ন শ্রেণির শিক্ষার্থীদের নিয়ে খেলাধুলার আয়োজন করি। অভ্যন্তরীণ টিম গঠন করে এবং শিক্ষকদের কোর্স হিসেবে নিয়োগ দিয়ে আন্তঃশ্রেণী ক্রিকেট এবং ফুটবল খেলার আয়োজন করি।

ক্রীড়াকণ্ঠ : জেলা শিক্ষা অফিসারের নির্দেশনা মোতাবেক আপনারা ক্লাবভিত্তিক, হাউজভিত্তিক ক্রীড়াচর্চায় শিক্ষার্থীদের ব্যাপৃত রাখেন কিনা?

জাহাঙ্গীর হোসাইন : আমরা জেলা শিক্ষা অফিসারের নির্দেশনা মোতাবেকই ক্রীড়াচর্চা করি। এটাতে আমরা ইতিবাচক সাড়া পাই।

ক্রীড়াকণ্ঠ : আপনার বিদ্যালয়ে ক্রীড়া শিক্ষক আছে কিনা? তাঁর নাম কী? তিনি বিপিএডের সনদে চাকুরি পেয়েছেন, না শিক্ষাজীবনে ভালো খেলোয়াড় হবার গুণে চাকুরি পেয়েছেন? কীভাবে চাকুরি পেয়েছেন, সেটা জানার বিষয় নয়, তিনি ক্রীড়া শিক্ষক হিসেবে কতোটুকু দায়িত্ব পালন করছেন, সেটা জানার বিষয়। জানাবেন কি?

জাহাঙ্গীর হোসাইন : আমার বিদ্যালয়ে ক্রীড়া শিক্ষক আছে। তার নাম মিরাজ হোসেন। তিনি বিপিএড সনদধারী। উনি ব্যক্তি জীবনে ভালো একজন খেলোয়াড়। খেলাধুলা ভালো পারেন। আমাদের বিদ্যালয়ের বাহিরেও তিনি বিভিন্ন টিমের কোচের দায়িত্ব পালন করেন। কখনো কখনো রেফারির দায়িত্বও পালন করেন।

ক্রীড়াকণ্ঠ : আপনার বিদ্যালয়ে ইনডোর গেমসের ব্যবস্থা আছে কি? এ গেমসে মেয়েরা বেশি আগ্রহী, না ছেলেরা?

জাহাঙ্গীর হোসাইন : আমার বিদ্যালয়ে ইনডোর গেমসের ব্যবস্থা আছে। বিদ্যালয়ে অনেক খেলার সামগ্রী রয়েছে। দাবা, ক্যারাম, লুডু, টেবিল টেনিসসহ বহু ইনডোর গেমসের উপকরণ রয়েছে। জানুয়ারির প্রথম দিকে এবং ক্লাসের মধ্য বিরতিতে এসব খেলাধুলা হয়ে থাকে। জানুয়ারির শুরুতে বেশি হওয়ার কারণ হলো, এ সময় পুরো বই আসতে কিছুটা সময় লাগে। সেই সুযোগে আমরা ইনডোর গেমস-এর আয়োজন করি।

ক্রীড়াকণ্ঠ : ক্রীড়াচর্চায় ঘাটতির ক্ষেত্রে মোবাইল আসক্তিকে আপনি কতোটা দায়ী করেন?

জাহাঙ্গীর হোসাইন : খুব চমৎকার একটা প্রশ্ন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে আমরা দিন দিন অসামাজিক হয়ে যাচ্ছি। আমাদের ছোট বেলায় আমরা পড়ালেখার পাশাপাশি খেলাধুলার দিকে বেশি ঝোঁক ছিলো। বার্ষিক পরীক্ষার পর চাঁদনী রাতে গভীর রাত পর্যন্ত ঘরের বাইরে অর্থাৎ উঠানে, মাঠে খেলায় মগ্ন থাকতাম। কিন্তু বর্তমানের চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। বর্তমানের শিক্ষার্থীরা মোবাইলের প্রতি আসক্তিতে ভুগছে। আমাদের সেই খেলাধুলার চর্চার ঘাটতি রয়েছে। সেটা চলে গেছে মোবাইলের দিকে। মোবাইল আসক্তির কারণে সেই চর্চাটি আর হয় না। আমি মনে করি এটার জন্য অভিভাবকরা দায়ী। কারণ মা-বাবা যদি মোবাইলে আসক্ত হয়, তাহলে সন্তানদের কীভাবে নিষেধ করবে? ফরিদগঞ্জের অনেক মানুষ প্রবাসী। প্রবাসে গিয়ে তাদের প্রথম কাজ হলো বাড়িতে একটা দামী মোবাইল পাঠাবে। এই মোবাইল তাদের বিপথে যাওয়ার প্রধান কারণ।

ক্রীড়াকণ্ঠ : শিক্ষার পাশাপাশি ক্রীড়াসহ সকল সহপাঠক্রমিক কার্যক্রম জোরদার করলে কি মোবাইল আসক্তি দূর করা সম্ভব? এ সকল কার্যক্রম চালুতে আপনি প্রতিষ্ঠান প্রধান হিসেবে কোনো প্রতিবন্ধকতা অনুভব করেন কি? সেটা কি আর্থিক, উপকরণগত না অন্য কিছু?

জাহাঙ্গীর হোসাইন : লেখাপড়ার পাশাপাশি যদি শিক্ষার্থীদের ক্রীড়ার সাথে সম্পৃক্ত করা যায় তাহলে তারা মোবাইল আসক্তি থেকে বেরিয়ে আসতে পারবে। শিক্ষার্থীরা কখন মোবাইল ব্যবহার করে? যখন সে স্কুলের বাইরে থাকে। বাড়িতে যখন সে থাকে, অভিভাবকের উচিত সন্তানদের খেলাধুলায় মনোনিবেশ করানো। খেলাকে যদি আকর্ষণীয় এবং আনন্দদায়ক করা যায় তাহলে তাদেরকে মোবাইল থেকে দূরে রাখা যাবে। মোবাইল আসক্তি যে শুধু সময়কে কিল করে তা নয়, তাদেরকে শারীরিকভাবে, মানসিকভাবে একেবারে প্যারালাইসড করে ফেলে। এটা থেকে শুধুমাত্র খেলাধুলার মাধ্যমে পরিত্রাণ পাওয়া সম্ভব।

ক্রীড়াকণ্ঠ : ‘সুস্থ দেহে সুস্থ মন’ এ প্রবাদের যথার্থতায় ক্রীড়ার ভূমিকা কী?

জাহাঙ্গীর হোসাইন : এটা প্রাচীন একটা প্রবাদ প্রবচন। ‘এ সাউন্ড মাইন্ড ইন এ সাউন্ড বডি’ এটা কিন্তু আমরা সবাই জানি। দেহ যদি সুস্থ না থাকে তাহলে মনও ভালো থাকে না। আর মন ভালো না থাকলে কিছুই ভালো লাগে না। এ জন্যে সবার আগে দেহকে সুস্থ রাখতে হবে। শিক্ষার্থীদের যদি আমরা শারীরিক পরিশ্রম না করাই, খেলাধুলা না করাই--তাহলে শরীর নামক যে যন্ত্রটা আছে এটার মধ্যে কিন্তু বিভিন্ন ধরনের জটিলতা সৃষ্টি হবে।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়