প্রকাশ : ১৭ আগস্ট ২০২৪, ০০:০০
হারিয়ে গেলো এক নিভৃতচারী গুণী ব্যক্তি

গত ১৫ আগস্ট ২০২৪ বৃহস্পতিবার দীর্ঘ কোনো রোগভোগ নয়, একেবারে আকস্মিকভাবে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে চিরতরে হারিয়ে গেলেন সাহাবউদ্দিন মজুমদার। অনেক বড়ো গুণী মানুষ ছিলেন তিনি। চলন বলনে ছিলেন সাদামাটা। কিন্তু কাজ করতেন অসাধারণ। তিনি আলোকচিত্রী ছিলেন না, তবে আলোকচিত্র প্রদর্শন ছিলো তাঁর নেশা। ইতিহাসের স্মারক আলোকচিত্রসমূহ নানাভাবে সংগ্রহ করে তিনি এমন ফ্রেমে সাজাতেন, দর্শক মাত্রেরই সেটা মন কেড়ে নিতো। যান্ত্রিকতায় আক্রান্ত অধিকাংশ মানুষ বই পড়ে না কিংবা বই পড়তে চায় না। এমন মানুষদের কোনো হলে জড়ো করে ছবির মাধ্যমে ইতিহাস সম্পর্কে জানান দেয়াই ছিলো তাঁর উদ্দেশ্য। তাঁর এই উদ্দেশ্য সফল হওয়ায় তিনি দেশ-বিদেশে সহস্রাধিক প্রদর্শনী করতে সক্ষম হয়েছিলেন। সত্তর বছরের জীবদ্দশায় তিনি এতোটা করেছিলেন। দীর্ঘজীবী হলে তিনি হয়তো প্রদর্শনীর সংখ্যা এতোটা বাড়াতে পারতেন, যে কারণে তিনি রেকর্ডের পাতায় বিরল অবস্থানে যেতে পারতেন।
সাহাবউদ্দিন মজুমদার চট্টগ্রামে বসবাস করলেও তিনি চাঁদপুর জেলার কৃতী সন্তান। তিনি হাজীগঞ্জের কালচোঁ উত্তর ইউনিয়নের খিলপাড়া মজুমদার বাড়ির মরহুম আব্দুল হান্নান মজুমদারের ঔরসে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন। তবে গ্রহণ করেন নি মুক্তিযোদ্ধার সনদপত্র। তাঁর তিন কন্যা সন্তান পিতার যোগ্যতা বা কোনো সনদের আনুকূল্যে নয়, নিজেদের যোগ্যতায় দেশ-বিদেশে লেখাপড়া করে সর্বোচ্চ ডিগ্রি নিয়ে ভালো চাকুরি পেয়েছেন। তারা যথাক্রমে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, বাংলাদেশ টেলিভিশনের কর্মকর্তা এবং জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থা (এনএসআই)-এর কর্মকর্তা।
নিরহঙ্কার একজন মানুষ ছিলেন সাহাবউদ্দিন মজুমদার। তিনি দেশকে ভীষণ ভালোবাসতেন। সেজন্যে 'দেশ-একটি সম্মিলিত উচ্চারণ' নামে সংগঠন প্রতিষ্ঠা করে এর আওতায় 'ইতিহাস কথা কয়' শিরোনামে আলোকচিত্র প্রদর্শনী, বই প্রকাশনা, গবেষণা, লেখালেখি, পাঠাগার প্রতিষ্ঠা, বহুবিধ সামাজিক কাজ, সভা-সেমিনার ইত্যাদি পরিচালনা করতেন। অবস্থাটা ছিলো তাঁর অনেকটা 'নিজের খেয়ে বনের মোষ' তাড়ানোর মতো। আজকাল সমাজে এমন মানুষ বিলুপ্তপ্রায় প্রজাতির প্রাণীর ন্যায় বিরল। সেজন্যে তিনি দেশের জন্যে, সমাজের জন্যে যে কাজ করতেন, সে কাজ করার মতো লোক সৃষ্টি হওয়া এবং তাঁর শূন্যস্থান পূরণ হওয়া অনেকটা কল্পনার মতোই।
সাহাবউদ্দিন মজুমদার তাঁর অসাধারণ প্রদর্শনীর জন্যে রাষ্ট্রীয় বা বড়ো ধরনের পুরস্কার পাওয়ার মতো যোগ্যতা রাখতেন বলে মন্তব্য করেছেন দেশী-বিদেশী অনেক বোদ্ধাই। কিন্তু সেটি তাঁর জীবনের পরিধি আরেকটু বৃদ্ধি না হওয়ার কারণেই হয়তো হয়নি। তবে চাঁদপুরবাসী আত্মশ্লাঘা বোধ করতে পারে এজন্যে যে, চাঁদপুরের প্রসিদ্ধ সমাজসেবামূলক সংগঠন চাঁদপুর রোটারী ক্লাব ২০২০ সালে তাদের ৫০ বছরপূর্তিতে মাত্র যে দুজনকে জেলার গুণীজন হিসেবে সংবর্ধনা দিয়েছে, সাহাবউদ্দিন মজুমদার তার অন্যতম। এছাড়া চতুরঙ্গ আয়োজিত জাতীয় ইলিশ উৎসবেও তাঁকে দেয়া হয়েছে অনুরূপ সংবর্ধনা।
আমরা বরেণ্য আলোকচিত্র সংগ্রাহক সাহাবউদ্দিন মজুমদারের মৃত্যুতে চাঁদপুর জেলাবাসীর পক্ষে গভীর শোক প্রকাশ করছি, তাঁর বিদেহী আত্মার মাগফেরাত কামনা করছি এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি আন্তরিক সমবেদনা জানাচ্ছি। আমরা তাঁর দেশপ্রেমমূলক ভালো কাজগুলো বর্তমান ও উত্তর প্রজন্মে সঞ্চারিত করার জন্যে ছোট-বড় যে কোনো উদ্যোগ তাঁর গড়ে যাওয়া সংগঠন, তাঁর সন্তান ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের কাছ থেকে প্রত্যাশা করছি।