প্রকাশ : ১০ জুলাই ২০২৬, ১২:১৬
নৈতিক অবক্ষয়ের কারণ ও প্রতিকার

মানবসভ্যতার শ্রেষ্ঠত্ব, স্থায়িত্ব এবং সৌন্দর্যের মূল ভিত্তি হলো নৈতিকতা ও সচ্চরিত্র। একটি অট্টালিকা যেমন মজবুত ভিত্তির ওপর দঁাড়িয়ে থাকে, ঠিক তেমনি একটি আদর্শ সমাজ বা রাষ্ট্র কাঠামোর স্থায়িত্ব নির্ভর করে তার নাগরিকদের নৈতিক চরিত্রের ওপর। ইসলামের দৃষ্টিতে মানবজীবনের মূল চালিকাশক্তিই হলো উত্তম চরিত্র (আখলাকে হাসানা)। চরিত্রহীন মানুষ পশুর চেয়েও অধম, কারণ পশু তার সহজাত প্রবৃত্তি দিয়ে চলে, কিন্তু মানুষ বিবেক ও বুদ্ধির অধিকারী হয়েও যখন নৈতিকভাবে স্খলিত হয়, তখন সে সমাজের জন্য চরম বিপজ্জনক ও ক্ষতিকারক হয়ে ওঠে।
বর্তমান একবিংশ শতাব্দীর আধুনিক সভ্যতায় বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার, প্রযুক্তির উৎকর্ষ আর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি চোখে পড়ার মতো। আকাশচুম্বী দালানকোঠা আর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে বাহ্যিক চাকচিক্য বাড়লেও মানুষের ভেতরের ‘মানুষ’টি ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছে। বর্তমান সমাজব্যবস্থার দিকে তাকালে এক ভয়াবহ ও অন্ধকার চিত্র ফুটে ওঠে। অন্যায়, অবিচার, সুদ, ঘুষ, দুর্নীতি, খুন, ধর্ষণ, মাদকাসক্তি, কিশোর গ্যাং কালচার, মা-বাবার প্রতি অবাধ্যতা, জ্যেষ্ঠদের প্রতি অসম্মান এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের অভাব আজ চরম আকার ধারণ করেছে। এই সামগ্রিক অধঃপতনকে এককথায় বলা হয় ‘নৈতিক অবক্ষয়’।
ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান (কমপ্লিট কোড অব লাইফ) হিসেবে কেবল এই অবক্ষয়ের বিবরণ দিয়েই ক্ষান্ত হয়নি, বরং এর পেছনের মনস্তাত্ত্বিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত কারণগুলো নিখুঁতভাবে চিহ্নিত করেছে। একই সাথে এর থেকে পরিত্রাণের জন্য সুনির্দিষ্ট ও বাস্তবসম্মত অমোঘ প্রতিকারও বাতলে দিয়েছে।
নৈতিকতা ও ইসলাম: একটি মৌলিক ধারণা
আলোচনার গভীরে যাওয়ার আগে নৈতিকতা বলতে ইসলাম কী বোঝায় তা স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। পরিভাষায় একে বলা হয় ‘আল-আখলাক’। মানব মনের যেসব স্থায়ী গুণাবলীর কারণে মানুষ কোনো গভীর চিন্তা-ভাবনা বা দ্বিধা ছাড়াই অনায়াসে ভালো বা মন্দ কাজ সম্পাদন করতে পারে, তাকেই চরিত্র বা আখলাক বলা হয়। ইসলামে নৈতিকতার উৎস কোনো মানুষের তৈরি দর্শন, সামাজিক চুক্তি কিংবা কোনো বিশেষ যুগের মানুষের চিন্তাভাবনা নয়; বরং এর মূল উৎস হলো মহান আল্লাহর কিতাব পবিত্র কুরআন এবং রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহ।
পাশ্চাত্য দর্শনে নৈতিকতা আপেক্ষিক (জবষধঃরাব)। সেখানে যা এক যুগে বা এক সমাজে বৈধ, অন্য যুগে বা অন্য সমাজে তা অবৈধ হতে পারে। কিন্তু ইসলামে নৈতিকতার মানদণ্ড চিরন্তন, সার্বজনীন এবং ধ্রুব। যা দেড় হাজার বছর আগে অন্যায় ও পাপাচার ছিল (যেমন: মিথ্যা, জিনা, চুরি, জুলুম, বিশ্বাসঘাতকতা), তা আজও অন্যায় এবং কিয়ামত পর্যন্ত অন্যায়ই থাকবে। ইসলাম মানুষের আত্মিক ও বাহ্যিক উভয় প্রকার পবিত্রতার ওপর জোর দেয়। যখন একজন মানুষের ভেতর ও বাহির আল্লাহর বিধান অনুযায়ী পরিচালিত হয়, তখনই তার মধ্যে প্রকৃত নৈতিকতার জন্ম হয়। ইসলাম মানুষকে কেবল আইন মেনে চলার নির্দেশ দেয় না, বরং মানুষের বিবেককে জাগ্রত করে চরিত্রকে পবিত্র করার দীক্ষা দেয়।
নৈতিক অবক্ষয়ের প্রধান ও অন্তর্নিহিত কারণসমূহ
সমাজবিজ্ঞানী, গবেষক এবং চিন্তাবিদরা নৈতিক অবক্ষয়ের পেছনে অনেকগুলো বাহ্যিক ও পরিবেশগত কারণ উল্লেখ করলেও, ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে এর মূল কারণগুলো মানুষের অন্তরের ব্যাধি এবং দ্বীনি চেতনা থেকে দূরে সরে যাওয়ার সাথে গভীরভাবে সম্পর্কিত। নিচে এর প্রধান কারণগুলো বিস্তারিতভাবে বিশ্লেষণ করা হলো:
১. আল্লাহভীতি ও পরকালীন জবাবদিহিতার অনুভূতি বিলীন হওয়া : নৈতিক পতনের সবচেয়ে বড় এবং মূল কারণ হলো মানুষের অন্তর থেকে আল্লাহভীতি বা ‘তাকওয়া’ এবং আখিরাতে জবাবদিহিতার অনুভূতি বিলীন হয়ে যাওয়া। মানুষ যখন এই বিশ্বাস হারিয়ে ফেলে যে-তার প্রতিটি পদক্ষেপ, প্রতিটি গোপন ও প্রকাশ্য কর্ম একজন সর্বদ্রষ্টা সত্তা সার্বক্ষণিক দেখছেন এবং মৃত্যুর পর এর জন্য তাকে বিচারের কাঠগড়ায় দঁাড়াতে হবে; তখন তার বিবেক মরে যায়। পরকালের ভয়হীন মানুষ নিজের সাময়িক স্বার্থ বা লালসা চরিতার্থ করার জন্য যেকোনো জঘন্যতম অপরাধ করতে দ্বিধা করে না। বর্তমান সমাজে বাহ্যিক আইনের ভয় থাকলেও আল্লাহর ভয় না থাকায় মানুষ সিসিটিভি ক্যামেরা বা পুলিশের চোখ ফঁাকি দিয়ে অপরাধের নিত্যনতুন অভিনব পথ আবিষ্কার করছে।
২. সঠিক ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষার চরম দূরীকৃত অবস্থা : আমাদের বর্তমান প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যবস্থার একটি বড় ত্রুটি হলো, এটি মানুষকে জীবিকা নির্বাহের যোগ্য করে তুললেও জীবন পরিচালনার সঠিক আদর্শ শেখাতে পারছে না। আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে একজন মানুষ বড় ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, বিজ্ঞানী বা উচ্চপদস্থ আমলা হচ্ছে ঠিকই, কিন্তু সততা, আমানতদারী ও মানবিকতার মতো মৌলিক গুণগুলো অর্জন করতে পারছে না। জাগতিক শিক্ষার জোয়ারে ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষাকে চরমভাবে উপেক্ষা বা খাটো করা হচ্ছে। ফলে, সার্টিফিকেটধারী উচ্চশিক্ষিতদের একটি বড় অংশ আজ বড় বড় আর্থিক কেলেঙ্কারি, দুর্নীতি, ঘুষের আদান-প্রদান ও অর্থ পাচারের সাথে জড়িয়ে পড়ছে। ধর্মীয় অনুশাসন ও রাসূল (সা.)-এর সীরাত সম্পর্কে অজ্ঞতাই এই নৈতিক দেউলিয়াত্বের অন্যতম প্রধান কারণ।
৩. পারিবারিক দায়িত্বহীনতা ও ত্রুটিপূর্ণ তরবিয়ত : পরিবার হলো একটি শিশুর নৈতিকতা ও মূল্যবোধ শেখার প্রথম এবং প্রধান পাঠশালা। মা-বাবার কোল থেকেই শিশু সততা, দয়া, পরোপকার ও শিষ্টাচারের প্রাথমিক পাঠ নেয়। কিন্তু বর্তমান পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থায় মা-বাবা উভয়েই অর্থ উপার্জন, সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধি এবং ক্যারিয়ার গঠনে এতটাই ব্যস্ত যে, সন্তানদের পর্যাপ্ত সময় দেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন না। সন্তানকে দামি পোশাক, দামি গ্যাজেট, বিলাসবহুল জীবন বা নামী স্কুলে পড়াশোনা করানোই আজ মা-বাবার প্রধান লক্ষ্য হয়ে দঁাড়িয়েছে; কিন্তু সন্তান মানুষের মতো মানুষ হচ্ছে কি না। সেই খেঁাজ নেওয়ার সময় কারো নেই। পরিবারে দ্বীনি পরিবেশের অভাব, মা-বাবার নিজেদের মধ্যকার কলহ এবং সন্তানদের ইসলামি শিষ্টাচার (আদব) না শেখানোর ফলে তরুণ প্রজন্ম চরম অবক্ষয়ের শিকার হচ্ছে।
৪. আকাশ সংস্কৃতি, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও প্রযুক্তির অপব্যবহার : বর্তমান যুগে নৈতিক অবক্ষয়ের অন্যতম বড় অনুঘটক হলো প্রযুক্তির অনিয়ন্ত্রিত ও অপব্যবহার। স্যাটেলাইট চ্যানেল, ইন্টারনেট, ওটিটি প্ল্যাটফর্ম এবং বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম (যেমন- ফেসবুক, ইউটিউব, টিকটক, ইনস্টাগ্রাম) আজ তরুণ সমাজের শোবার ঘরে অশ্লীলতা ও নগ্নতা পেঁৗছে দিয়েছে। পশ্চিমা ও ভিনদেশী সংস্কৃতির অন্ধ অনুকরণ করতে গিয়ে এদেশের যুবসমাজ নিজেদের ধর্মীয়, সামাজিক ও ঐতিহ্যগত মূল্যবোধ হারিয়ে ফেলছে। পর্নোগ্রাফির সহজলভ্যতা তরুণদের মনস্তত্ত্বকে মারাত্মকভাবে বিকৃত করে দিচ্ছে, যার চূড়ান্ত পরিণতি হিসেবে সমাজে জিনা, ব্যভিচার ও ধর্ষণের মতো পৈশাচিক অপরাধ জ্যামিতিক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এছাড়া সস্তা জনপ্রিয়তার লোভে কিশোর-কিশোরীরা মারাত্মক সব নৈতিক স্খলনে লিপ্ত হচ্ছে।
৫. মাদকাসক্তি ও কিশোর গ্যাং কালচার : মাদক হলো সমস্ত পাপের চাবিকাঠি এবং নৈতিকতা ধ্বংসের প্রধান তরল উপাদান। বর্তমান সমাজে মাদকদ্রব্যের অবাধ লভ্যতা ও চোরাচালান তরুণ সমাজকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়েছে। বিভিন্ন মারাত্মক মাদক গ্রহণ করে যুবসমাজ তাদের বিবেক-বুদ্ধি, চিন্তাশক্তি ও শারীরিক সক্ষমতা হারিয়ে ফেলছে। মাদকের টাকা জোগাড় করতে গিয়ে তারা চুরি, ছিনতাই, ডাকাতি এমনকি নিজের জন্মদাত্রী মা-বাবাকে খুন করতেও দ্বিধাবোধ করছে না। এর সাথে যুক্ত হয়েছে ‘কিশোর গ্যাং’ কালচার। এলাকার বড় ভাই ও রাজনৈতিক অপশক্তির ছত্রছায়ায় কিশোররা দলবদ্ধ হয়ে ইভটিজিং, মারামারি, চঁাদাবাজি এবং খুনের মতো জঘন্য অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে, যা তাদের নৈতিকতাকে সম্পূর্ণ ধূলিসাৎ করে দিচ্ছে।
৬. অসৎ সঙ্গ ও সামাজিক পরিবেশের নেতিবাচক প্রভাব : মানুষ সামাজিক জীব এবং সে তার চারপাশের পরিবেশ ও বন্ধুদের দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত হয়। একজন মানুষ ব্যক্তিগতভাবে যতই ভালো হোক না কেন, সে যদি অবক্ষয়গ্রস্ত ও চরিত্রহীন বন্ধুদের সাথে চলাফেরা করে, তবে ধীরে ধীরে তার মধ্যেও সেই মন্দ স্বভাবগুলো সংক্রমিত হতে শুরু করে। বর্তমান সমাজে ভালো ও সৎ বন্ধুর বড় অভাব। চারপাশের পরিবেশ আজ এমন হয়ে গেছে যেখানে সত্য বলাকে বোকামি, সততাকে দুর্বলতা এবং অন্যায়-দুর্নীতি করে বড়লোক হওয়াকে ‘স্মার্টনেস’ বা সফলতা মনে করা হয়। এই সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি তরুণদের অন্যায়ের দিকে প্ররোচিত করে।
৭. হালাল-হারামের ভেদাভেদ ভুলে যাওয়া এবং অর্থলিপ্সা : অর্থলিপ্সা ও লোভ মানুষকে অন্ধ করে দেয়। বর্তমান সমাজে যেকোনো উপায়ে ধনী হওয়ার এক উন্মাদ প্রতিযোগিতা চলছে। মানুষ এখন আর পরোয়া করে না যে তার উপার্জনের উৎসটি হালাল নাকি হারাম। সুদ, ঘুষ, এতিমের মাল আত্মসাৎ, ওজনে কম দেওয়া, মাপে কারচুপি এবং খাদ্যে ভেজালের মাধ্যমে মানুষ সম্পদের পাহাড় গড়ছে। ইসলাম বলে, হারাম উপার্জনে যে শরীর গঠিত হয়, তা জাহান্নামের আগুনে দগ্ধ হওয়ার উপযোগী। হারাম খাদ্য মানুষের ভেতর থেকে ইবাদতের স্বাদ এবং ভালো কাজের প্রেরণা কেড়ে নেয় এবং পাপাচারের প্রতি আসক্তি বাড়িয়ে দেয়।
৮. সুস্থ বিনোদনের অভাব ও অলসতা : তরুণ সমাজের মেধা ও শক্তিকে কাজে লাগানোর জন্য পর্যাপ্ত সুস্থ বিনোদন, খেলাধুলা ও গঠনমূলক কাজের সুযোগের অভাব রয়েছে। মাঠের অভাব এবং প্রযুক্তির অতি-নির্ভরতার কারণে তরুণরা অলস সময় কাটাচ্ছে। আর অলস মস্তিষ্ক শয়তানের কারখানা। এই অলসতা তাদের অবক্ষয়মূলক চিন্তা ও অনৈতিক কাজের দিকে ধাবিত করে।
কুরআন ও হাদিসের আলোকে নৈতিক অবক্ষয়ের ভয়াবহতা
পবিত্র কুরআন এবং রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর অসংখ্য হাদিসে নৈতিক অবক্ষয়, চরিত্রহীনতা এবং এর দুনিয়াবী ও পরকালীন মারাত্মক পরিণতি সম্পর্কে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করা হয়েছে।
১. দুনিয়া ও আখিরাতে জবাবদিহিতা : পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা মানুষকে বারবার স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন যে, তার প্রতিটি ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র কাজের হিসাব নিখুঁতভাবে সংরক্ষণ করা হচ্ছে। সূরা যিলযালের ৭ ও ৮ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ ইরশাদ করেন: ”অতএব, কেউ অণু পরিমাণ সৎকাজ করলে সে তা দেখবে এবং কেউ অণু পরিমাণ অসৎকাজ করলে তাও সে দেখবে।”চরিত্রহীন মানুষ যতই নিজেকে দুনিয়ার মানুষের চোখ থেকে লুকিয়ে রাখুক না কেন, আল্লাহর দরবারে তাকে দঁাড়াতেই হবে। সূরা কাফ-এর ১৮ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে: ”মানুষ যে কথাই উচ্চারণ করে, তা সংরক্ষণের জন্য একজন সদাপ্রস্তুত পর্যবেক্ষক (ফেরেশতা) তার সাথেই রয়েছে।”
২. মানবচরিত্রের উৎকর্ষ সাধনে রাসূল (সা.)-এর আগমন : মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-কে এই পৃথিবীতে পাঠানোর অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্যই ছিল মানুষের নৈতিক চরিত্রের সংশোধন ও উন্নয়ন। রাসূলুল্লাহ (সা.) নিজেই নিজের জীবনের মিশন সম্পর্কে ঘোষণা করে বলেছেন: ”নিশ্চয়ই আমি সর্বোত্তম চারিত্রিক গুণাবলীর পূর্ণতা সাধনের জন্যই প্রেরিত হয়েছি।” (মুসনাদে আহমাদ)
অর্থাৎ, নামাজ, রোজা, হজ, যাকাতের মতো মৌলিক ইবাদতগুলোর অন্যতম লক্ষ্য হলো মানুষের ভেতর উত্তম চরিত্র বা নৈতিকতার বিকাশ ঘটানো। যার চরিত্রে নৈতিকতা নেই, তার বাহ্যিক ইবাদত আল্লাহর দরবারে মূল্যায়িত হয় না।
৩. সুন্দর চরিত্রই ঈমানের পরিমাপক : ইসলামে একজন মানুষের ঈমানের গভীরতা মাপা হয় তার চরিত্রের সৌন্দর্য দিয়ে। যার চরিত্র যত সুন্দর, আল্লাহর কাছে সে তত বেশি প্রিয়। হাদিস শরীফে এসেছে: নবী করীম (সা.) বলেন, “ঈমানের দিক থেকে মুমিনদের মধ্যে সেই ব্যক্তিই সবচেয়ে পরিপূর্ণ, যার চরিত্র সবচেয়ে সুন্দর।” (সুনানে তিরমিজি)।
অন্য এক হাদিসে রাসূলুল্লাহ (সা.) কিয়ামতের দিন মিজানের পাল্লায় সুন্দর চরিত্রের ওজনের কথা উল্লেখ করে বলেন: ”কিয়ামতের দিন মুমিনের মিজানের (আমলনামার পাল্লায়) সুন্দর চরিত্রের চেয়ে ভারী আর কোনো জিনিস হবে না।” (সুনানে তিরমিজি)
৪. সমাজব্যাপী অবক্ষয়ের কুফল ও আল্লাহর গজব : যখন কোনো সমাজে সমষ্টিগতভাবে নৈতিক অবক্ষয় দেখা দেয়, মানুষ যখন প্রকাশ্যে পাপাচারে লিপ্ত হয় এবং সমাজের অন্য লোকেরা তা দেখেও প্রতিবাদ করে না বা বাধা দেয় না, তখন সেখানে আল্লাহর সাধারণ আজাব বা গজব নাজিল হয়। সূরা রূমের ৪১ নম্বর আয়াতে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা ইরশাদ করেন: ”মানুষের কৃতকর্মের দরুন স্থলে ও জলে বিপর্যয় ছড়িয়ে পড়েছে, যার ফলে আল্লাহ তাদেরকে তাদের কোনো কোনো কর্মের শাস্তি আস্বাদন করান, যাতে তারা (সৎপথে) ফিরে আসে।”
অশ্লীলতা ও ব্যভিচারের সামাজিক পরিণতি সম্পর্কে সতর্ক করে আল্লাহর রাসূল (সা.) বলেছেন : ”যখন কোনো সম্প্রদায়ের মধ্যে প্রকাশ্যে অশ্লীলতা (জিনা-ব্যভিচার) ছড়িয়ে পড়ে, তখন তাদের মধ্যে এমন মহামারী ও রোগব্যাধি ছড়িয়ে পড়ে, যা তাদের পূর্বপুরুষদের যুগে কখনো ছিল না।” (সুনানে ইবনে মাজাহ)
নৈতিক অবক্ষয় রোধে কার্যকর প্রতিকার ও সমাজ সংস্কারের উপায়
নৈতিক অবক্ষয় কোনো সাধারণ সমস্যা নয় যে শুধু উপরিউক্ত আলোচনা বা সেমিনার করে এর সমাধান করা যাবে। এটি একটি গভীর আত্মিক ও সামাজিক ব্যাধি। এর প্রতিকারের জন্য প্রয়োজন সামগ্রিক, বহুমুখী ও সমন্বিত প্রচেষ্টা। ইসলাম এ বিষয়ে যে সুনির্দিষ্ট ও দূরদর্শী রূপরেখা দিয়েছে, তা নিচে বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো:
১. তাকওয়া বা আল্লাহভীতি জাগ্রত করা : নৈতিক অবক্ষয় রোধের প্রথম এবং প্রধানতম প্রতিষেধক হলো মানুষের অন্তরে তাকওয়া বা আল্লাহভীতি পুনরুজ্জীবিত করা। কেবল আইন বা পুলিশ পাহারা দিয়ে মানুষকে সাময়িকভাবে অপরাধ থেকে দূরে রাখা গেলেও স্থায়ীভাবে ভালো ও সৎ বানানো যায় না। কিন্তু মানুষের মনে যখন এই গভীর বিশ্বাস জন্মাবে যে-”আমি যেখানেই থাকি, যে অবস্থাতেই থাকি, আমার আল্লাহ আমাকে দেখছেন এবং আমার অন্তরের খবরও তিনি জানেন”, তখন সে নির্জন অন্ধকারেও কোনো পাপ কাজ করার সাহস পাবে না। এই গুণটিকে ইসলামে ‘ইহসান’ বলা হয়েছে। সমাজ সংস্কারের জন্য প্রতিটি নাগরিকের হৃদয়ে এই ইহসানের চেতনা জাগ্রত করতে হবে।
২. শিক্ষাব্যবস্থার আমূল সংস্কার ও ধর্মীয় শিক্ষার সংমিশ্রণ : বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থাকে কেবল ‘অর্থ উপার্জনের হাতিয়ার’ বানানোর সেক্যুলার মানসিকতা থেকে বের হয়ে আসতে হবে। শিক্ষাব্যবস্থায় জাগতিক আধুনিক জ্ঞানের পাশাপাশি নৈতিক ও ধর্মীয় শিক্ষাকে সুদৃঢ় ভিত্তি হিসেবে জুড়ে দিতে হবে।
প্রাথমিক স্তর: প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকেই শিশুদেরকে সততা, সত্যবাদিতা, বড়দের শ্রদ্ধা করা, ছোটদের স্নেহ করা, আমানত রক্ষা করা এবং পরোপকারের মতো মানবিক গুণগুলো হাতে-কলমে শেখাতে হবে।
সিলেবাসের পরিবর্তন: পাঠ্যপুস্তকে রাসূলুল্লাহ (সা.), সাহাবায়ে কেরাম এবং সুফি-মনীষীদের জীবনী বিস্তারিতভাবে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে, যাতে শিক্ষার্থীরা তঁাদেরকে নিজেদের জীবনের রোল মডেল (আদর্শ) হিসেবে গ্রহণ করতে পারে।
মূল্যায়ন পদ্ধতি: কেবল মুখস্থ বিদ্যা ও জিপিএ-৫ এর পেছনে না ছুটে শিক্ষার্থীর চারিত্রিক উন্নয়ন ও আচরণকে মূল্যায়নের অন্যতম মানদণ্ড করা উচিত।
৩. পারিবারিক সচেতনতা ও দ্বীনি তরবিয়ত নিশ্চিত করা : পারিবারিক ব্যবস্থার সংস্কার ছাড়া সমাজ সংস্কার করা সম্পূর্ণ অসম্ভব। মা-বাবাকে তাদের মূল দায়িত্বে ফিরে আসতে হবে। সন্তানদের পেছনে পর্যাপ্ত সময় দিতে হবে।
হালাল-হারাম শিক্ষা: শৈশব থেকেই সন্তানকে হালাল ও হারামের পার্থক্য প্র্যাক্টিক্যালি শেখাতে হবে।
পারিবারিক পরিবেশ: পরিবারের মধ্যে নিয়মিত কুরআন তিলাওয়াত, জামাতে নামাজ আদায় এবং দ্বীনি আলোচনার পরিবেশ তৈরি করতে হবে। মা-বাবাকে নিজেদের আচরণ উন্নত করতে হবে, কারণ সন্তানরা মা-বাবাকে দেখেই শেখে।
জবাবদিহিতা: রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সেই বিখ্যাত বাণীটি সর্বদা মনে রাখতে হবে: “তোমাদের প্রত্যেকেই রাখাল বা দ্বায়িত্বশীল এবং প্রত্যেককেই তার অধীনস্থদের (পরিবার-পরিজন) সম্পর্কে আল্লাহর কাছে জবাবদিহি করতে হবে।” (সহীহ বুখারী)
নজরদারি: সন্তান যেন কোনো অপরাধী বা খারাপ চক্রের সাথে জড়িয়ে না পড়ে, সেজন্য তাদের বন্ধু-বান্ধবদের ওপর গভীর কিন্তু বন্ধুসুলভ নজরদারি রাখতে হবে।
৪. সুস্থ সংস্কৃতি চর্চা ও প্রযুক্তির নিয়ন্ত্রিত ব্যবহার : অপসংস্কৃতির সয়লাব বন্ধ করতে হলে তার বিপরীতে সুস্থ, গঠনমূলক ও ইসলামি সংস্কৃতির বিকাশ ঘটাতে হবে। তরুণ প্রজন্মের বিনোদনের জন্য স্বাস্থ্যকর পরিবেশ সৃষ্টি করা অত্যন্ত জরুরি।
ডিজিটাল প্যারেন্টিং: ইন্টারনেট ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অপব্যবহার রোধে মা-বাবাকে সচেতন হতে হবে। ছোট বাচ্চাদের হাতে স্মার্টফোন তুলে দেওয়া বন্ধ করতে হবে এবং কিশোরদের ইন্টারনেট ব্যবহারের ওপর প্যারেন্টাল কন্ট্রোল (চধৎবহঃধষ ঈড়হঃৎড়ষ) ব্যবস্থা রাখতে হবে।
রাষ্ট্রীয় সেন্সরশিপ: সোশ্যাল মিডিয়ায় অশ্লীল, নগ্ন, সহিংস ও দেশীয় সংস্কৃতি-বিরোধী কনটেন্ট প্রচার বন্ধে রাষ্ট্রকে কঠোর ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ নিতে হবে।
বিকল্প বিনোদন: যুবসমাজকে বই পড়ার প্রতি আকৃষ্ট করতে প্রতিটি এলাকায় সমৃদ্ধ লাইব্রেরি বা পাঠাগার গড়ে তুলতে হবে এবং খেলাধুলার জন্য পর্যাপ্ত মাঠের ব্যবস্থা করতে হবে।
৫. সৎ সঙ্গের গুরুত্ব ও পরিবেশের পরিবর্তন : তরুণদেরকে ধ্বংসের হাত থেকে বঁাচাতে হলে ভালো ও সৎ বন্ধুদের সাহচর্য নিশ্চিত করতে হবে। ইসলাম বন্ধু নির্বাচনের ক্ষেত্রে অত্যন্ত সতর্কতা অবলম্বন করতে বলেছে। হাদিস শরীফে এসেছে:
নবী করীম (সা.) বলেছেন, “মানুষ তার বন্ধুর দ্বীনের (আদর্শের) ওপর পরিচালিত হয়। সুতরাং তোমাদের প্রত্যেকেই যেন লক্ষ্য করে যে সে কার সাথে বন্ধুত্ব করছে।” (সুনানে আবু দাউদ)
সমাজকে অবক্ষয়মুক্ত করতে হলে সৎ, চরিত্রবান ও নামাজী যুবকদের নিয়ে বিভিন্ন সামাজিক, পরিবেশগত ও সেবামূলক সংগঠন গড়ে তুলতে হবে, যা অলস বসে থাকা তরুণদের ভালো কাজে ব্যস্ত রাখবে এবং তাদের নেতৃত্বের বিকাশ ঘটাবে।
৬. মাদক নির্মূল ও আইনি ব্যবস্থার কঠোর প্রয়োগ : নৈতিক অবক্ষয়ের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি মাদককে সমাজ থেকে চিরতরে উপড়ে ফেলতে হবে।
জিরো টলারেন্স: মাদক উৎপাদন, চোরাচালান, সিন্ডিকেট এবং বিক্রির সাথে জড়িত অপরাধীদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্র ও প্রশাসনকে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ করতে হবে।
নিরপেক্ষ আইন: আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে কোনো প্রকার রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক বা সামাজিক প্রভাবের ঊর্ধ্বে উঠে অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
সামাজিক প্রতিরোধ: কিশোর গ্যাং কালচার বন্ধে পুলিশি টহল বাড়ানোর পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে জনপ্রতিনিধি, শিক্ষক ও আলেম সমাজকে সাথে নিয়ে এলাকাভিত্তিক সচেতনতা ও প্রতিরোধমূলক স্কোয়াড গঠন করতে হবে।
৭. সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধের সামাজিক আন্দোলন : একটি সমাজ তখনই ভালো থাকে যখন সমাজের মানুষ একে অপরের কল্যাণকামী হয় এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে একতাবদ্ধ থাকে। সমাজে কোনো অন্যায় হতে দেখলে সামাজিকভাবে তার প্রতিবাদ করতে হবে। ইসলাম এই দায়িত্বকে অবশ্য পালনীয় কর্তব্য করেছে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন:
”তোমরাই সর্বোত্তম উম্মত, মানবজাতির কল্যাণের জন্য যাদের উত্থান ঘটানো হয়েছে। তোমরা সৎ কাজের আদেশ দেবে এবং অসৎ কাজ থেকে নিষেধ করবে।” (সূরা আলে ইমরান)
সমাজ থেকে যদি এই পারস্পরিক সংশোধনের ব্যবস্থা উঠে যায়, তবে পুরো সমাজ পাপে নিমজ্জিত হয়ে ধ্বংস হয়ে যাবে। তাই আলেম, খতিব, শিক্ষক এবং সমাজের গণ্যমান্য ব্যক্তিদের নিজ নিজ অবস্থান থেকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে হবে। জুমার খুতবায় সামাজিক ব্যাধিগুলোর বিরুদ্ধে নিয়মিত সচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে।
৮. যুবসমাজের কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক সমতা : বেকারত্ব নৈতিক অবক্ষয়ের অন্যতম বড় কারণ। কাজ না থাকায় অনেক যুবক হতাশ হয়ে অপরাধ ও মাদকের দিকে ঝুঁকে পড়ে। তাই রাষ্ট্র ও বেসরকারি পর্যায়ে যুবকদের জন্য ব্যাপক কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। কারিগরি শিক্ষার প্রসার ঘটিয়ে তাদেরকে স্বাবলম্বী করে তুলতে হবে। এছাড়া সমাজে অর্থনৈতিক বৈষম্য কমাতে হবে এবং যাকাত ও সাদাকাহ ব্যবস্থার সঠিক বাস্তবায়নের মাধ্যমে দরিদ্র তরুণদের পুনর্বাসন করতে হবে।
সমাজ সংস্কারে আলেম সমাজের ভূমিকা
নৈতিক অবক্ষয় রোধে উলামায়ে কেরাম ও মুফতিদের ভূমিকা অপরিসীম। আলেম সমাজ হলেন আম্বিয়া আলাইহিমুস সালামের ওয়ারিশ বা উত্তরসূরি। সাধারণ মানুষের ওপর তঁাদের ধর্মীয় ও মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব সবচেয়ে বেশি।
সচেতনতা বৃদ্ধি: মসজিদের মিম্বার থেকে শুধু ইবাদতের মাসআলা নয়, বরং মাদক, ইভটিজিং, দুর্নীতি, মা-বাবার অবাধ্যতা, টিকটকের কুফল এবং পারিবারিক দায়িত্বের মতো সামাজিক বিষয়ে কুরআন ও হাদিসের নির্দেশনা তুলে ধরতে হবে।
যুবকদের কাছে টানা: আলেমদের উচিত তরুণদের সাথে দূরত্ব কমিয়ে আনা। ফতোয়ার কঠোরতার পাশাপাশি মমত্ববোধ ও ভালোবাসা দিয়ে যুবকদের দ্বীনের পথে আহ্বান করতে হবে।
কাউন্সেলিং সেন্টার: প্রতিটি বড় মসজিদে বা ইসলামি সেন্টারে পারিবারিক ও মনস্তাত্ত্বিক সমস্যা সমাধানের জন্য ‘ইসলামি কাউন্সেলিং’ (পরামর্শ) সেল গঠন করা যেতে পারে, যেখানে তরুণরা তাদের মানসিক সমস্যার নৈতিক ও দ্বীনি সমাধান পাবে।
পরিশেষে বলব, নৈতিক অবক্ষয় কোনো একক ব্যক্তি বা একটি নির্দিষ্ট পরিবারের সাময়িক বিপর্যয় নয়; এটি একটি পুরো জাতির মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়ার মতো নীরব কিন্তু অত্যন্ত কার্যকর ঘাতক। আজ আমরা যদি আমাদের সন্তানদের কেবল বৈষয়িক ও বৈষয়িক শিক্ষায় শিক্ষিত করে নৈতিকতার দিক থেকে অবহেলা করি, তবে অদূর ভবিষ্যতে এমন এক রোবোটিক সমাজ তৈরি হবে যেখানে মেধা থাকবে কিন্তু বিবেক থাকবে না, ক্ষমতা থাকবে কিন্তু দয়া থাকবে না, সম্পদ থাকবে কিন্তু শান্তি থাকবে না।
ইসলাম আমাদেরকে যে সোনালী সমাজ ও সভ্যতার পথ দেখিয়েছে, তার মূল ভিত্তিই ছিল নৈতিকতা। মক্কার বর্বর আইয়ামে জাহিলিয়াতের মানুষ—যারা কন্যা সন্তানকে জীবন্ত কবর দিত, জুয়া-মদ আর যুদ্ধবিগ্রহে লিপ্ত থাকত—তারা যখন রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ছেঁায়ায় এবং কুরআনের আদর্শে দীক্ষিত হয়েছিল, তখন তারা পৃথিবীর ইতিহাসের শ্রেষ্ঠতম, সবচেয়ে সুসভ্য ও আদর্শ জাতিতে পরিণত হয়েছিল।
আজকেও যদি আমরা আমাদের প্রিয় জন্মভূমি ও সমাজকে অবক্ষয়ের এই করাল গ্রাস থেকে মুক্ত করতে চাই, তবে আমাদের ব্যক্তিজীবন থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় জীবনের প্রতিটি স্তরে কুরআন এবং সুন্নাহর সুমহান আদর্শকে পুনরুজ্জীবিত করতে হবে। আইন, শিক্ষা, পরিবার ও ধর্মের এক অপূর্ব সমন্বয়ের মাধ্যমেই কেবল এই অন্ধকার দূর করা সম্ভব। আল্লাহ তাআলা আমাদের দেশের যুবসমাজকে রক্ষা করুন, আমাদের পরিবারগুলোকে দ্বীনের আলোয় আলোকিত করুন এবং আমাদের সবাইকে উত্তম চরিত্রের অধিকারী হয়ে একটি শান্তিময়, নিরাপদ ও নৈতিকতাসম্পন্ন সমাজ বিনির্মাণ করার তাওফিক দান করুন।
ছবি : ২৯
পবিত্র কাবা শরীফে প্রবেশকারী প্রথম বিশ্বজয়ী হাফেজ চঁাদপুরের কৃতী সন্তান হাফেজ ক্বারী শায়খ আব্দুল হক
হাফেজ ক্বারী শায়খ আব্দুল হক হলেন বাংলাদেশের একজন বরেণ্য ও অত্যন্ত প্রসিদ্ধ কুরআন গবেষক, ক্বারী এবং বিশ্বজয়ী হাফেজদের উস্তাদ। বিগত প্রায় চার দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি বাংলাদেশে পবিত্র কুরআনের হিফজ ও তাজভীদের খেদমতে অনন্য অবদান রেখে চলেছেন। তিনি চঁাদপুর জেলার কচুয়া উপজেলার আকিয়ারা গ্রামের কৃতী সন্তান।
আন্তর্জাতিক অর্জন ও সম্মাননা : প্রথম বিশ্বজয়ী হাফেজ : তিনি ১৯৯০ সালে ইরানে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক হিফজুল কুরআন প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের হয়ে প্রথম স্থান অর্জন করে রাষ্ট্রীয় সম্মাননা লাভ করেন।
কাবা শরিফে প্রবেশ : ১৯৯৩ সালে সৌদি আরবে আন্তর্জাতিক কুরআন প্রতিযোগিতায় বিশেষ কৃতিত্ব অর্জনের পর, সৌদি আরব সরকার তঁাকে পবিত্র কাবাঘরের অভ্যন্তরে প্রবেশের বিরল সুযোগ দিয়ে সম্মানিত করেন।
ইমামতি ও শিক্ষকতা : তিনি সৌদি আরবে দীর্ঘ দু বছর ইমামতি ও পবিত্র কুরআনের শিক্ষক হিসেবে নিয়োজিত ছিলেন।
শিক্ষকতা ও কুরআনের খেদমত উস্তাযুল হুফফাজ : তিনি ‘বিশ্বজয়ী হাফেজদের উস্তাদ’ বা ‘উস্তাযুল হুফফাজ’ নামে পরিচিত। বাংলাদেশ থেকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিজয়ী হওয়া অনেক নামকরা হাফেজ ও ক্বারী সরাসরি তার ছাত্র।
বিচারকের দায়িত্ব : ১৯৮০-এর দশক থেকে শুরু করে বর্তমান সময় পর্যন্ত তিনি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ের বিভিন্ন হিফজুল কুরআন প্রতিযোগিতার প্রধান বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছেন।
সাংগঠনিক ও প্রশিক্ষণমূলক কার্যক্রমে শায়খ আব্দুল হক ফাউন্ডেশন : কুরআন শিক্ষার ব্যাপক প্রসারের লক্ষ্যে তিনি শায়খ আব্দুল হক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করেন। এই ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে তিনি দেশব্যাপী ও অনলাইনে মাস্ক, তাজভীদ এবং হুফফাজ মুয়াল্লিম (শিক্ষক প্রশিক্ষণ) কোর্স পরিচালনা করেন।
রচিত বইসমূহ : সহজে কুরআন ও হিফজ শেখার জন্যে তিনি বেশ কিছু গাইড বই লিখেছেন। এর মধ্যে রকমারি ডট কম ও ওয়াফি লাইফ-এ পাওয়া যাওয়া ‘হিফযুল কুরআন শিক্ষক সহায়িকা’, ‘তাজভীদসহ রঙিন তাহফীযুল কুরআন’ এবং ‘সহজ হাফেজী কুরআন’ অন্যতম।
সূত্র : মামুনুর রশিদের ফেসবুক পেইজ।








