প্রকাশ : ২৫ জুন ২০২৬, ১১:১১
রাষ্ট্রের ১৮ কোটি মানুষের নিরাপত্তা আগে

বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীর জন্ম ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে, যা জাতির স্বাধীনতা, আত্মত্যাগ এবং অস্তিত্ব রক্ষার এক ঐতিহাসিক অধ্যায়। স্বাধীনতার পর থেকে এই বাহিনী শুধু সীমান্ত রক্ষার দায়িত্বই পালন করেনি, বরং বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, দুর্যোগ, উদ্ধার কার্যক্রম, ত্রাণ বিতরণ এবং অবকাঠামো পুনর্গঠনের মতো বহু জাতীয় সংকটে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। এসব কর্মকাণ্ড জনগণের মধ্যে সেনাবাহিনীর প্রতি আস্থা ও শ্রদ্ধা আরও গভীর করেছে। তবে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এমন কিছু সময়ও ছিলো, যখন সামরিক বাহিনীর অংশবিশেষ রাজনৈতিক প্রভাব বা নির্বাচন প্রক্রিয়াকে ঘিরে বিতর্কের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। সেই অভিজ্ঞতা আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়। একটি জাতীয় বাহিনীর প্রকৃত মর্যাদা তখনই সুদৃঢ় হয়, যখন তারা দলীয় রাজনীতির ঊর্ধ্বে থেকে জনগণের কল্যাণে নিবেদিত থাকে।
বর্তমানে বাংলাদেশ একটি বহুমাত্রিক কাঠামোগত সংকটের মুখোমুখি। কৃষিক্ষেত্রে শ্রমিক সংকট বাড়ছে, দ্রুত নগরায়ণ গ্রামকে দুর্বল করছে, আর রাজধানী ঢাকা অস্বাভাবিক জনসংখ্যার চাপে ধীরে ধীরে একটি অসহনীয় নগর বাস্তবতায় পরিণত হচ্ছে। শিক্ষা, চিকিৎসা, কর্মসংস্থান, ব্যবসা এবং প্রশাসনিক কেন্দ্রীকরণের ফলে দেশের প্রায় সব অভ্যন্তরীণ অভিবাসন ঢাকামুখী হয়ে পড়েছে।
ফলে একদিকে গ্রাম হারাচ্ছে তার তরুণ শ্রমশক্তি, অন্যদিকে ঢাকা পরিণত হচ্ছে বায়ুদূষণ, যানজট, শব্দদূষণ, বর্জ্য সংকট এবং অতিরিক্ত জনসংখ্যার চাপে আক্রান্ত এক ভারসাম্যহীন মেগাসিটিতে। এই বাস্তবতা শুধু নগর ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতা নয়, এটি রাষ্ট্রের সামগ্রিক উন্নয়ন কাঠামোর একটি গভীর সংকেত।
এই সংকটগুলোর সবচেয়ে মানবিক দিকটি দেখা যায় গ্রামবাংলার মাঠে। দেশের অসংখ্য প্রবীণ কৃষক আজও বার্ধক্য ও শারীরিক দুর্বলতা সত্ত্বেও কঠোর পরিশ্রম করতে বাধ্য হচ্ছেন, কারণ পরিবারের তরুণ সদস্যরা জীবিকার সন্ধানে শহর বা বিদেশে চলে গেছে। এটি শুধু অর্থনৈতিক সংকট নয়, একটি সামাজিক ও পারিবারিক বিচ্ছিন্নতার বাস্তবতাও।
এই প্রেক্ষাপটে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে। রাষ্ট্রের সবচেয়ে সংগঠিত, শৃঙ্খলাবদ্ধ এবং দক্ষ মানবসম্পদকে কি সীমিত ও সহায়কভাবে কৃষি, গ্রামীণ উন্নয়ন এবং উৎপাদনমুখী কাজে সম্পৃক্ত করা যায় না?
এখানে সেনাবাহিনীকে বাণিজ্যিক শ্রমশক্তি হিসেবে ব্যবহারের কথা বলা হচ্ছে না। বরং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, কৃষি সহায়তা, গ্রামীণ অবকাঠামো, কারিগরি প্রশিক্ষণ এবং জাতীয় উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির মতো সীমিত ও পরিকল্পিত সহায়ক ভূমিকার কথা বলা হচ্ছে। এতে খাদ্য নিরাপত্তা শক্তিশালী হতে পারে, গ্রামীণ অর্থনীতি পুনর্জীবিত হতে পারে এবং নগরমুখী চাপও ধীরে ধীরে কিছুটা ভারসাম্যে ফিরতে পারে।
একই সঙ্গে দেশের বিপুলসংখ্যক বেকার ও উদ্দেশ্যহীন তরুণদের উৎপাদনশীল কাজে সম্পৃক্ত করাও আজ জরুরি। কর্মসংস্থানের অভাব, সামাজিক অবক্ষয় এবং রাজনৈতিক অপব্যবহারের কারণে অনেক তরুণ সহিংসতা, মাদক, চাঁদাবাজি বা অনুৎপাদনশীল কর্মকাণ্ডের দিকে ঝুঁকে পড়ছে। রাষ্ট্র যদি প্রশিক্ষণ, শৃঙ্খলা এবং উৎপাদনমুখী কর্মসূচির মাধ্যমে এই যুবশক্তিকে কৃষি ও গ্রামীণ উন্নয়নের সঙ্গে যুক্ত করতে পারে, তবে তা সামাজিক স্থিতিশীলতা এবং জাতীয় উৎপাদনশীলতা উভয়ই বাড়াবে।
এই দৃষ্টিকোণ থেকে জাতীয় নিরাপত্তার ধারণাটিকেও নতুনভাবে ভাবতে হবে। নিরাপত্তা শুধু সীমান্ত রক্ষার প্রশ্ন নয়। খাদ্য নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান, দারিদ্র্য, পরিবেশ, সামাজিক স্থিতিশীলতা এবং মানুষের দৈনন্দিন নিরাপদ জীবনও একটি রাষ্ট্রের নিরাপত্তার অংশ।
একটি রাষ্ট্র তখনই সত্যিকার অর্থে নিরাপদ হয়, যখন তার শহরগুলো বসবাসযোগ্য থাকে এবং তার গ্রামগুলো টেকসই থাকে।
বাংলাদেশ আজ এমন এক বাস্তবতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যেখানে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তাবোধ ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ছে। দিনের আলোতে শিশু নির্যাতন, সন্ত্রাস, মাদক, চাঁদাবাজি, ছিনতাই, সহিংসতা এবং সামাজিক অস্থিরতা মানুষের মনে গভীর অনিশ্চয়তা তৈরি করছে। মানুষ অনেক সময় আইনের চেয়ে অপরাধীকেই বেশি ভয় পাচ্ছে। এটি একটি রাষ্ট্রের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক সংকেত।
এই বাস্তবতায় জনগণের স্বাভাবিক প্রশ্ন হলো, রাষ্ট্রের সবচেয়ে প্রশিক্ষিত এবং সক্ষম প্রতিষ্ঠানগুলো কীভাবে জনগণের জীবন ও স্থিতিশীলতার বৃহত্তর সুরক্ষায় আরও কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
একটি দরিদ্র ও অতিরিক্ত জনসংখ্যাবহুল দেশে জনগণ কর দেবে, রাষ্ট্র পরিচালনা করবে, অথচ তাদের মৌলিক নিরাপত্তা, স্থিতিশীলতা এবং মর্যাদাপূর্ণ জীবন নিশ্চিত হবে না, এটি দীর্ঘমেয়াদে কোনো সুস্থ বাস্তবতা হতে পারে না। জনগণের অর্থে পরিচালিত প্রতিটি প্রতিষ্ঠান শেষ পর্যন্ত জনগণের কাছেই নৈতিকভাবে জবাবদিহি।
বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনী এই জাতির গর্ব। কিন্তু সেই গর্বের পূর্ণ মর্যাদা তখনই আরও গভীরভাবে প্রতিষ্ঠিত হবে, যখন সাধারণ মানুষ অনুভব করবে যে এই বাহিনী শুধু সীমান্তের নয়, জাতীয় স্থিতিশীলতা, মানবিক নিরাপত্তা এবং জনগণের আস্থারও প্রতীক।
কারণ একটি রাষ্ট্রে নাগরিকের নিরাপত্তার চেয়ে বড়ো জাতীয় স্বার্থ আর কিছু হতে পারে না।
আজ সময় এসেছে নিরাপত্তার ধারণাকে আরও বিস্তৃতভাবে দেখার। রাষ্ট্র শুধু ভৌগোলিক সীমান্তের কাঠামো নয়, এটি একটি জীবন্ত সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং মানবিক ব্যবস্থা। খাদ্য, কর্মসংস্থান, গ্রাম, নগর, পরিবেশ এবং মানুষের নিরাপদ জীবন একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত।
বাংলাদেশ এখন এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে সিদ্ধান্ত নিতে হবে রাষ্ট্র আসলে কাদের জন্য। শুধু ক্ষমতাকেন্দ্রিক নিরাপত্তার জন্য, নাকি ১৮ কোটি মানুষের নিরাপদ, স্থিতিশীল এবং মর্যাদাপূর্ণ জীবনের জন্য।
ইতিহাস শেষ পর্যন্ত সেই রাষ্ট্রকেই সম্মান করে, যে রাষ্ট্র তার মানুষকে ভয় নয়, নিরাপত্তা দেয়।
রহমান মৃধা : গবেষক ও লেখক; সাবেক পরিচালক, ফাইজার, সুইডেন।







