সোমবার, ১৩ এপ্রিল, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য

প্রকাশ : ১৩ এপ্রিল ২০২৬, ০৯:৫৩

বীর মুক্তিযোদ্ধা সন্তোষ মজুমদারের অন্তিম যাত্রা

হাসান আলী
বীর মুক্তিযোদ্ধা সন্তোষ মজুমদারের অন্তিম যাত্রা

শুভ্র ভোরের আলো ফোটার আগেই নিভে গেলো আরেকটি দীপ্তিমান জীবনপ্রদীপ। বীর মুক্তিযোদ্ধা সন্তোষ মজুমদার আজ (রোববার) আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন না ফেরার দেশে। চাঁদপুর জেলার হাইমচর উপজেলার এই সাহসী সন্তান শুধু একটি নামই ছিলেন না, তিনি ছিলেন এক ইতিহাস, এক আত্মত্যাগের প্রতীক, এক জীবন্ত প্রেরণা।

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ—এই শব্দ দুটি উচ্চারণ করলেই যে অমিত সাহস, রক্তঝরা সংগ্রাম আর আত্মোৎসর্গের চিত্র আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে, সন্তোষ মজুমদার ছিলেন সেই মহাকাব্যের একজন নীরব কিন্তু দৃঢ়চেতা নায়ক। যখন দেশের আকাশে নেমে এসেছিলো দুঃসময়ের কালো ছায়া, তখন তিনি দ্বিধাহীন চিত্তে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন মুক্তির সংগ্রামে। জীবনের মায়া তুচ্ছ করে দেশমাতৃকার স্বাধীনতার জন্যে তিনি মরণপণ লড়াইয়ে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছিলেন। সেই সময়ের প্রতিটি মুহূর্ত, প্রতিটি পদক্ষেপ ছিলো একেকটি বীরত্বগাথা।

স্বাধীনতার পরও তিনি থেমে থাকেননি। মুক্তিযোদ্ধা সংসদ হাইমচর উপজেলা কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করে তিনি তাঁর সহযোদ্ধাদের পাশে দাঁড়িয়েছেন, নতুন প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ করেছেন। তাঁর জীবন ছিলো দেশপ্রেমের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত—নিঃস্বার্থ, নির্লোভ এবং নিবেদিত।

ব্যক্তিগতভাবে তাঁর সাথে আমার ঘনিষ্ঠতার স্মৃতিগুলো আজ হৃদয়ের কোণে অশ্রুসজল হয়ে ধরা দিচ্ছে। তাঁর স্নেহময় আচরণ, সহজ-সরল কথাবার্তা এবং গভীর মানবিকতা আমাকে বারবার মুগ্ধ করেছে। তিনি কখনো নিজের বীরত্ব নিয়ে গর্ব করেননি, বরং বিনয়ের আড়ালে লুকিয়ে রেখেছিলেন তাঁর অসামান্য অবদান। তাঁর মুখে শোনা মুক্তিযুদ্ধের গল্পগুলো ছিলো ইতিহাসের জীবন্ত পাঠ, যা শুধু তথ্য নয়, অনুভূতির গভীরে স্পর্শ করতো।

আজ যখন তিনি আমাদের ছেড়ে চিরবিদায় নিলেন, তখন মনে হচ্ছে আমাদের হৃদয়ের এক বিশাল শূন্যতা তৈরি হলো। আমরা হারালাম একজন বীর সন্তানকে, একজন অভিভাবককে, একজন পথপ্রদর্শককে। তাঁর চলে যাওয়া যেন আমাদের মনে করিয়ে দেয়—মুক্তিযুদ্ধের সেই অগ্নিঝরা দিনগুলোর সাক্ষীরা একে একে অনন্ত যাত্রায় সামিল হচ্ছেন। তাঁদের সঙ্গে হারিয়ে যাচ্ছে অনেক অজানা গল্প, অনেক না বলা কষ্ট আর গৌরবের স্মৃতি। তবে মৃত্যু কখনো শেষ নয়, বিশেষ করে এমন একজন মানুষের জন্যে, যিনি নিজের জীবন উৎসর্গ করেছেন দেশের জন্যে। সন্তোষ মজুমদার বেঁচে থাকবেন আমাদের হৃদয়ে, আমাদের চেতনায়, আমাদের ইতিহাসে। তাঁর ত্যাগ ও সাহসিকতা ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে পথ দেখাবে, দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করবে।

আজ তাঁর অন্তিম যাত্রায় আমরা গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা নিয়ে তাঁকে বিদায় জানাই। তাঁর আত্মার সদগতি কামনা করি এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি জানাই আন্তরিক সমবেদনা। এই বেদনার মুহূর্তে আমরা প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হই—তাঁর আদর্শ, তাঁর দেশপ্রেম, তাঁর আত্মত্যাগকে আমরা কখনো ভুলবো না।

বীর মুক্তিযোদ্ধা সন্তোষ মজুমদার—আপনার এই অন্তিম যাত্রা আমাদের জন্যে নয় বিদায়ের, বরং এক চিরন্তন প্রেরণার সূচনা। আপনার আত্মা শান্তিতে থাকুক। ১২ এপ্রিল-২০২৬

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়