প্রকাশ : ১৪ জানুয়ারি ২০২৬, ০৯:১৪
জেলা, সদর ও হাইমচরের মৎস্য বিভাগ এবং নৌপুলিশ প্রশ্নবিদ্ধ

‘মৎস্য দপ্তরের বিশেষ কম্বিং অপারেশন চলমান সত্ত্বেও পদ্মা-মেঘনায় চলছে নির্বিচারে মাছের পোনা নিধন’-এটি চাঁদপুর কণ্ঠে গতকাল প্রকাশিত একটি শীর্ষ সংবাদের শিরোনাম। এ সংবাদটিতে শিরোনামের অনুকূলে নাতিদীর্ঘ বিবরণ তুলে ধরা হয়েছে। এ সংবাদটির প্রথমাংশ হচ্ছে এমন : মৎস্য সম্পদ ধ্বংসকারী বেহুন্দি, বাঁধা ও অন্যান্য ক্ষতিকর অবৈধ জাল (চরঘেরা মশারী জাল, টং জাল, কারেন্ট জাল, পাই জাল ইত্যাদি), জাগ এবং পাঙ্গাস চাঁই অপসারণে বিশেষ কম্বিং অপারেশন ২০২৬ চলছে। এর মাঝেও চলছে নির্বিচারে দেশীয় বিভিন্ন প্রজাতির মাছের পোনা নিধন। অসাধু মৎস্য শিকারীরা এসব কোনো কিছুই মানছে না। তারা বেপরোয়া। ফলে বিলীন হয়ে যাচ্ছে দেশীয় মাছ। ইতোমধ্যে দেশীয় অনেক মাছ বিলুপ্ত হয়ে গেছে। মৎস্য অধিদপ্তর, চাঁদপুর-এর উদ্যোগে চলছে বিশেষ এ কম্বিং অপারেশন (চিরুনি অভিযান)। অথচ থেমে নেই চাঁদপুরের পদ্মা-মেঘনায় বিভিন্ন প্রজাতির মাছের পোনা নিধন। রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মী পরিচয়ে এলাকাভিত্তিক বিভিন্ন প্রভাবশালী ব্যক্তি দিন-রাত নিষিদ্ধ জাল দিয়ে বাইলা, চিংড়ি, শিলং, রিটা, আইড়সহ নানা প্রজাতির পোনা ধরছে অসাধু জেলেদের দিয়ে। আর নিধন করা পোনা প্রতিদিন গ্রামেগঞ্জে এমনকি শহরের অলিগলিতে বিক্রি হচ্ছে। জানা যায়, নদীতে অধিকাংশ মাছই শীত মৌসুমের আগে ডিম ছাড়ে। শীত মৌসুমে ইলিশ, চিংড়ি, পাঙ্গাস, আইড়, রিটা, পাবদা, পোয়া, চেউয়া, টেংরাসহ প্রায় ৩৫ প্রজাতির মাছের পোনায় ভরপুর থাকে নদীগুলো। কিন্তু কিছু অসাধু জেলে বিভিন্ন ধরনের নিষিদ্ধ জাল ব্যবহার করে নদী ছেঁকে ফেলছে এবং নির্বিচারে নিধন করছে এসব মাছের পোনা। চাঁদপুর শহর সংলগ্ন নদীতে লিটন গাজী, কাঞ্চন, মানিক, হান্নান, কাসিম ছৈয়াল, বাদল, আরশাদ এদের নেতৃত্বে চলে পোনা নিধন কার্যক্রম। এরা প্রকাশ্যে বলে, নৌ পুলিশ ও মৎস্য অফিসকে ম্যানেজ করে তারা এ কাজ করছে। এভাবে নির্বিচারে পোনা নিধন করার কারণে নদ-নদীতে হ্রাস পাচ্ছে বিভিন্ন প্রজাতির মাছের উৎপাদন। এখনই কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে ভবিষ্যতে নদীগুলো মাছশূন্য হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
চাঁদপুর কণ্ঠে গতকাল আরেকটি শীর্ষ সংবাদ হয়েছে, যার শিরোনাম ‘অবৈধভাবে জাটকা ধরা ও বিতরণ : প্রশাসনিক গাফিলতির অভিযোগ’। এ সংবাদটিতে মৎস্য বিভাগের প্রশাসনিক গাফিলতি নিয়ে বিচার বিভাগের পর্যবেক্ষণ ও মন্তব্য তুলে ধরা হয়েছে। সংবাদটির বিবরণীতে এসেছে, চাঁদপুর সদর উপজেলায় মেঘনা নদীতে অবৈধভাবে জাটকা আহরণ ও বিতরণের ঘটনায় প্রশাসনিক গাফিলতির গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। দৈনিক চাঁদপুর দর্পণ পত্রিকার প্রথম পৃষ্ঠায় প্রকাশিত এক প্রতিবেদনের ভিত্তিতে বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, বরিশাল থেকে ছেড়ে আসা ঢাকাগামী যাত্রীবাহী লঞ্চ ‘এমভি কক্সবাজার’ থেকে প্রায় ৭ মেট্রিক টন (৭ হাজার কেজি) জাটকা জব্দ করা হয়। পরবর্তীতে মৎস্য বিভাগ, চাঁদপুর ও কোস্টগার্ডের যৌথ অভিযানে লঞ্চটি থেকে বিপুল পরিমাণ জাটকা উদ্ধার করা হয়। তবে অভিযোগ রয়েছে, উদ্ধারকৃত জাটকাগুলো আইন অনুযায়ী সংরক্ষণ, পরিবহন ও নিষ্পত্তির পরিবর্তে বিভিন্ন মাদ্রাসা, এতিমখানা, শিশু পরিবার ও গরিব মানুষের মাঝে বিতরণ করা হয়। এতে মৎস্য সংরক্ষণ ও সংরক্ষণ আইন, ১৯৫০ লঙ্ঘিত হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়। আইনে স্পষ্টভাবে বলা আছে, জাটকা ধরা, বহন, বিক্রয় ও হেফাজতে রাখা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। আরও অভিযোগ করা হয়, জাটকা যে ট্রলার থেকে ধরা হয়েছে, সেই ট্রলারের মালিক বা সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কোনো আইনগত ব্যবস্থাগ্রহণ করা হয়নি। এমনকি জব্দকৃত জাটকা কোনো আইনানুগ প্রক্রিয়া ছাড়াই নিষ্পত্তি করা হয়েছে, যা সরকারি রাজস্ব ক্ষতির কারণ হয়েছে। এতে সরকারের আনুমানিক ২৫ লাখ টাকার রাজস্ব ক্ষতি হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। নথিতে আরও বলা হয়, মৎস্য সংরক্ষণ আইন যথাযথভাবে প্রয়োগ না করায় এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের অবহেলার কারণে এ ধরনের ঘটনা ঘটেছে। ফলে আইনের শাসন ব্যাহত হচ্ছে এবং জাটকা সংরক্ষণের জাতীয় উদ্যোগ প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে। মেঘনা নদীতে যাত্রীবাহী লঞ্চ থেকে গত বুধবার দিবাগত রাতে সদর উপজেলা মৎস্য বিভাগ এবং কোস্ট গার্ডের নেতৃত্বে ৭ হাজার কেজি জাটকা ইলিশ আটকের ঘটনায় কোনো মামলা দায়ের করা হয়নি। আটককৃত বিপুল পরিমাণ জাটকা ইলিশ নিলামে বিক্রয় না করে বেআইনিভাবে বিতরণ করে রাষ্ট্রের আর্থিক ক্ষতি সাধন করা হয়েছে। জাটকা পরিবহনে ব্যবহৃত লঞ্চটি আটক এবং জাটকার প্রকৃত মালিকের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের না করায় উষ্মা প্রকাশ করেছেন চাঁদপুরের চীফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত। বৃহস্পতিবার চাঁদপুর দর্পণ পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদ আমলে নিয়ে নিষিদ্ধ জাটকা পরিবহনে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়ার সুবিধার্থে নৌ থানার ওসিকে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত করে ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দিয়েছেন চীফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মুজাহিদুর রহমান। এ বিষয়ে আদেশের অনুলিপি মৎস্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক এবং বাংলাদেশ কোস্টগার্ডের মহাপরিচালকের কাছে প্রেরণ করা হয়েছে।
একইদিনে চাঁদপুর কণ্ঠে প্রকাশিত দুটি শীর্ষ সংবাদ পড়ে চাঁদপুর জেলা, চাঁদপুর সদর ও হাইমচর উপজেলা মৎস্য বিভাগ এবং নৌপুলিশ মৎস্য সম্পদ রক্ষায় কতোটুকু সক্রিয় বা নিষ্ক্রিয় সেটা আন্দাজ করতে কোনো পাঠকের কষ্ট হয় না। দেখার বিষয়, এ বিষয়টি চাঁদপুরের জেলা প্রশাসন এবং মৎস্য বিভাগ ও নৌপুলিশ কতোটুকু আন্দাজ বা অনুধাবন করতে পারে। নির্বাচনী ব্যস্ততার কারণে মৎস্য সম্পদ রক্ষার বিষয়টি যদি গুরুত্বহীন ও গৌণ হয়ে পড়ে, তাহলে মেঘনা-ডাকাতিয়ার মৎস্য সম্পদের এবার বারোটা বাজবে। কথা হলো, বিশেষ কম্বিং অপারেশন চলাকালে মতলব উত্তর উপজেলায় যদি নির্বাচনী ব্যস্ততা সত্ত্বেও সেখানকার উপজেলা প্রশাসন ও মৎস্য বিভাগ এবং নৌপুলিশ মৎস্য সম্পদ রক্ষায় সক্রিয় থাকতে পারে, তাহলে চাঁদপুর জেলা, সদর ও হাইমচর উপজেলায় এমন সক্রিয়তা দেখা যায় না কেন? তাহলে পোনা নিধন চক্রের হোতাদের মুখে উচ্চারিত ‘নৌপুলিশ ও মৎস্য অফিসকে ম্যানেজ করা’র প্রকাশ্য দাবিই সত্য?




