সোমবার, ১২ জানুয়ারি, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য

প্রকাশ : ১১ জানুয়ারি ২০২৬, ০৯:১৩

রাবেয়া হোক গ্রামীণ মেয়েদের অনুপ্ররণা

অনলাইন ডেস্ক
রাবেয়া হোক গ্রামীণ মেয়েদের অনুপ্ররণা

‘স্কটল্যান্ডের গ্লাসগো সিটি কাউন্সিলের প্রযুক্তিবিদ চাঁদপুরের রাবেয়া’ শিরোনামের সংবাদটি গতকাল নিশ্চয়ই চাঁদপুর কণ্ঠের পাঠকদের আলোড়িত করেছে। সংবাদটিতে লিখা হয়েছে, নিজ দেশে ‘পরিবেশ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায়’ পাঠ চুকিয়ে বিদেশ থেকে নিয়েছেন নগর জলবায়ু ও টেকসই উন্নয়ন বিষয়ে উচ্চশিক্ষা। এ বিষয়েই এখন তিনি স্কটল্যান্ডের গ্লাসগো সিটি কাউন্সিলের টেকনিশিয়ান বা প্রযুক্তিবিদ। চাঁদপুরের মেয়ে রাবেয়া বেগম ইউরোপের এই নগরী বদলে দিতে কাজ করছেন। গ্লাসগো সিটি কাউন্সিল কার্যালয়ে রুদ্ধদ্বার বৈঠক চলছে। নগরবাসীর ভ্রমণকালীন আচরণ পরিবর্তনে পরবর্তী বছরে কী কী প্রকল্প নেয়া যায়, তা নিয়েই আলোচনা। স্থানীয় দাতব্য সংস্থা অনেক প্রস্তাব করে থাকে। ২০২৩ সালে যেমন ২০টির মতো প্রস্তাব এসেছে, সেগুলো নিয়েই দীর্ঘ আলোচনা চলছিলো। পক্ষে-বিপক্ষে উপস্থাপন করা হচ্ছিলো যুক্তিতর্ক। কিন্তু কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছা যাচ্ছিলো না। শেষে সভার প্রধান সিটি কাউন্সিলের টেকসই পরিবহন বিভাগের গ্রুপ ম্যানেজার ঘোষণা দিলেন, ‘আগামী দু দিনের মধ্যে ১০টি প্রস্তাব চূড়ান্ত করে উপস্থাপন করবেন রাবেয়া বেগম। সেটাই সিটি কাউন্সিল বাস্তবায়ন করবে।’ দুদিন পর ঠিকই সময়োপযোগী, স্বল্প সময়ে বাস্তবায়নযোগ্য এবং শহরের অধিবাসীদের জন্যে কল্যাণকর ১০টি প্রস্তাব উপস্থাপিত হলো। অনুমোদিত হলো বড়ো ও ছোটদের সাইকেল চালানো শেখানো, সাইকেল মেরামত প্রশিক্ষণ, অনুপযুক্ত সাইকেল ঠিকঠাক করে ব্যবহারের উপযোগী করে তোলার মতো কিছু প্রকল্প। আর এ প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়ন করার নেতৃত্ব পেলেন বাংলাদেশের রাবেয়া বেগম। নতুন দায়িত্ব পেয়ে জোরেশোরে কাজে নেমে পড়লেন রাবেয়া। এই দায়িত্বপ্রাপ্তির মাস কয়েক আগেই গ্লাসগো সিটি কাউন্সিলে টেকনিশিয়ান বা প্রযুক্তিবিদ হিসেবে যোগ দেন রাবেয়া বেগম।

চাঁদপুরের কৃতী সন্তান রাবেয়া। বিদ্যুৎবিহীন ছোট একটা গ্রামে বেড়ে ওঠা। গ্রামের স্কুল থেকে জিপিএ-৫ পেয়ে এসএসসি পাস করেন। এরপর ঢাকার একটি কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক শেষে এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেনে ভর্তি হন পরিবেশ বিজ্ঞানে। পূর্ণ বৃত্তি নিয়ে স্নাতকোত্তর করেন রাবেয়া। এরপর কয়েক বছর একটি বহুজাতিক কোম্পানিতে চাকরি করেন। দেশের বাইরে উচ্চশিক্ষার আকাঙ্ক্ষা থেকেই ইরাসমাস মুন্ডাস স্কলারশিপ প্রোগ্রামে আবেদন করেন। তাঁর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয় এই বৃত্তি। এর আওতাতেই তিনি গ্লাসগো যান। পরে স্কটল্যান্ডের গ্লাসগো ক্যালেডোনিয়ান ইউনিভার্সিটি, ফিনল্যান্ডের ল্যাব ইউনিভার্সিটি অব অ্যাপ্লায়েড সায়েন্স এবং স্পেনের ইউনিভার্সিটি অব হোয়েলভা থেকে আরবান ক্লাইমেট অ্যান্ড সাসটেইনেবিলিটি বিষয়ে স্নাতকোত্তর করেন। এরপরই যোগ দেন গ্লাসগো সিটি কাউন্সিলে। রাবেয়ার প্রকল্পগুলোর কল্যাণে নগরবাসীর ভ্রমণবিষয়ক আচরণগত পরিবর্তন হচ্ছে। গ্লাসগো সিটি কাউন্সিলের লক্ষ্য হাঁটা এবং সাইক্লিং কার্যক্রম বাড়ানো। এতে শহরে বায়ুদূষণ, যানজট ও দুর্ঘটনা কমার পাশাপাশি সক্রিয় ভ্রমণের কারণে মানুষের স্বাস্থ্যেরও উন্নতি হবে। এ লক্ষ্য অর্জনে রাবেয়ার প্রকল্পগুলো অনেক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। রাবেয়ার আরেকটি প্রকল্প হচ্ছে নগরবাসীর জন্যে সুরক্ষিত সাইকেল স্টোরেজের ব্যবস্থা। পাশাপাশি সাইকেল চালানোর উপযুক্ত রাস্তাগুলোকে চিহ্নিত করে জিআইএসের (ভৌগোলিক তথ্যব্যবস্থা) মাধ্যমে একটি ম্যাপ তৈরি, যাতে সাইকেল চালানোর জন্যে নিরাপদ রাস্তা চিহ্নিত করতে পারে নগরবাসী।

আমাদের দেশে অনেক সামর্থ্যবান অভিভাবক নিজ এলাকার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রেখে জেলা শহর, বিভাগীয় শহর ও রাজধানীর শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নিজ সন্তানকে পড়ানোর জন্যে কতোটা ব্যাকুলতা দেখান। নিজ গ্রাম বা ছোট্ট শহরের বাড়ি ছেড়ে সন্তানের লেখাপড়ার প্রয়োজনে বড়ো শহরে অনেক টাকা ব্যয়ে বাসা ভাড়া করে কতোটা কষ্ট করেন। কিন্তু সে সকল সন্তানের সবাই কাঙ্ক্ষিত সকল সুযোগ-সুবিধা পেয়েও খুব ভালো ফলাফল অর্জন করে না। তার বিপরীতে বিদ্যুৎবিহীন চাঁদপুরের অজপাড়াগাঁয়ের বাসিন্দা রাবেয়া বেগম গ্রামীণ বিদ্যালয়ে লেখাপড়া করে ভালো ফলাফল অর্জন করে রাজধানীর কলেজে ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে বিদেশি স্কলারশিপ পেয়ে পেশাগতভাবে নিজের যে অধিষ্ঠান নিশ্চিত করেছে, সেটা নিঃসন্দেহে অসামান্য ও গৌরবজনক। মেধা থাকলে গ্রামীণ মেয়েরা যে কতো উঁচুতে পৌঁছে যেতে পারে, রাবেয়া তার জ্বলন্ত উদাহরণ। সে হতে পারে গ্রামীণ মেয়েদের জন্যে অনেক অনুপ্রেরণাদায়ক। আমরা তাঁর উত্তরোত্তর সাফল্য কামনা করছি।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়