শনিবার, ২৯ নভেম্বর, ২০২৫
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য

প্রকাশ : ২৯ নভেম্বর ২০২৫, ০৮:২৩

তাঁর অভাব সহজে পূরণ হবার নয়

অনলাইন ডেস্ক
তাঁর অভাব সহজে পূরণ হবার নয়

চাঁদপুরের সংস্কৃতি অঙ্গনের বহুল পরিচিত মুখ, সংগীতগুরু এবং চাঁদপুর সংগীত নিকেতনের অধ্যক্ষ স্বপন সেনগুপ্ত (৭৪) আর বেঁচে নেই। বৃহস্পতিবার (২৭ নভেম্বর ২০২৫) বিকেল ৩টা ২০ মিনিটে ঢাকার মিরপুরস্থ ডেলটা প্রাইভেট হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর মৃত্যুতে পরিবার ও চাঁদপুরের সংস্কৃতিপ্রেমী মানুষের মাঝে নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া। পরিবার সূত্রে জানা যায়, গত সোমবার (২৪ নভেম্বর) ঢাকায় তাঁর ছেলের বাসায় থাকাকালীন তিনি ব্রেন স্ট্রোকে আক্রান্ত হলে তাঁকে তাৎক্ষণিক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। গত বুধবার থেকে তিনি নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (আইসিইউ)তে ছিলেন।

স্বপন সেনগুপ্ত তাঁর সুদীর্ঘ জীবনে প্রায় ৫৩ বছর ধরে চাঁদপুরের ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ‘চাঁদপুর সংগীত নিকেতনে’ অধ্যক্ষের গুরুদায়িত্ব পালন করে এসেছেন, যা শুরু হয়েছিল ১৯৭২ সাল থেকে। তাঁর হাতেই বহু প্রতিভাবান শিল্পী সংগীত জগতে পরিচিতি লাভ করেছেন। চাঁদপুর শহরের কদমতলা নিবাসী এই গুণী ব্যক্তিত্বের পিতার নাম ছিল মৃত রসিক রঞ্জন সেনগুপ্ত এবং মাতার নাম ছিল বরুনা বালা সেনগুপ্ত। তিনি কণ্ঠশিল্পী মীরা সেনগুপ্তের স্বামী। তাঁদের দু ছেলে রয়েছে। বড়ো ছেলে ডা. কৌশিক সেনগুপ্ত এবং ছোট ছেলে কল্লোল সেনগুপ্ত, যিনি নিটল টাটা গ্রুপে কর্মরত। বৃহস্পতিবার রাতে ঢাকা থেকে তাঁর মরদেহ চাঁদপুর শহরের কদমতলায় নিজ বাসভবনে আনা হয়। এরপর মরদেহ কোড়ালিয়া সংগীত নিকেতন প্রাঙ্গণে নেওয়া হয়। সবশেষে রাত ১২টায় চাঁদপুর মহাশ্মশানে তাঁর অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পন্ন হয়। স্বপন সেনগুপ্তের মৃত্যুতে চাঁদপুরের বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ও নাট্য সংগঠনের নেতৃবৃন্দ গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। তাঁরা বলেন, চাঁদপুর সংগীত নিকেতনের অধ্যক্ষ স্বপন সেনগুপ্তের মহাপ্রয়াণে আমরা গভীরভাবে শোকাহত। তাঁর জীবনব্যাপী সংগীত সাধনা এবং প্রায় ৫৩ বছর ধরে শিক্ষকতার মাধ্যমে অসংখ্য শিল্পী সৃষ্টি করার কাজটি তাঁকে চিরস্মরণীয় করে রাখবে। তাঁর এই শূন্যতা পূরণ হওয়ার নয়। আমরা তাঁর শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানাই এবং তাঁর আত্মার চিরশান্তি কামনা করি।

চাঁদপুরের সবচে’ প্রাচীন সাংস্কৃতিক সংগঠন সংগীত নিকেতনে ৫৩ বছর ধরে অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করতে পারার সৌভাগ্য স্বপন সেনগুপ্তেরই রয়েছে। সে কারণে তিনি কিংবদন্তিতে পরিণত হয়েছিলেন। তিনি এ পদে তাঁর বড়োভাই শ্যামল সেনগুপ্তের স্থলাভিষিক্ত হয়ে প্রভূত সুনাম ও সম্মান অর্জন করেছেন। কিন্তু তিনি এতোটা আকস্মিকভাবে চিরপ্রস্থান করবেন সেটা কেউ ঘুণাক্ষরেও ভাবেনি। এ সংগঠনের সুদীর্ঘকালের সাধারণ সম্পাদক, প্রখ্যাত সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব জীবন কানাই চক্রবর্তী যখন জটিল রোগভোগের পর বর্তমানে অনেকটাই আরোগ্য লাভের পথে, তখন সুস্থ ভেবে নেওয়া স্বপন সেনগুপ্তের মৃত্যুর আকস্মিকতায় সবাই ভীষণ ধাক্কা খেয়েছে। মন ভেঙ্গে গেছে সকলের। সবাই হতাশায় মুষড়ে পড়েছে।

স্বপন সেনগুপ্ত শুদ্ধ সংগীত চর্চার ধারক-বাহক হিসেবে সংস্কৃতি অঙ্গনে সংগীত নিকেতনের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করে রেখেছিলেন। তিনি এ সংগঠনের অধ্যক্ষ হিসেবে পেশাদার ছিলেন না মোটেও। তিনি পেশাগতভাবে ছিলেন একজন দক্ষ ব্যাংকার। দেশের প্রধান রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক সোনালী ব্যাংকের সিনিয়র প্রিন্সিপাল অফিসার হিসেবে তিনি অবসরগ্রহণ করেন। ভদ্র, বিনয়ী এ মানুষটি সাদামাটা জীবনযাপন করতেন। পারিবারিকভাবে সফল পিতা যেমন ছিলেন, সামাজিকভাবে ছিলেন সকল দলমতের কাছে অনেক গ্রহণযোগ্য। আর শিক্ষার্থীদের কাছে এমনই শ্রদ্ধেয় গুরু ছিলেন, যিনি শুদ্ধ সংগীতচর্চাকে নিয়েছিলেন ব্রত হিসেবে। গড্ডালিকা প্রবাহে গা ভাসাতে গিয়ে তিনি সংগীতের ঐতিহ্য ও শুদ্ধতা থেকে বিন্দু পরিমাণ বিচ্যুত হননি। নিজের একটা আদর্শিক অবয়ব নির্মাণ করতে সক্ষম হয়েছিলেন তিনি। তিনি ব্যতিক্রম ও বিরল। তাঁর আকস্মিক মৃত্যুতে চাঁদপুরের সংস্কৃতি অঙ্গন অনেক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, নিজের সংগঠন তো বটেই। চাঁদপুরের সংস্কৃতি অঙ্গনে তাঁর অবদানকে অনতিক্রম্য বলা ছাড়া অন্য কিছু বলার সুযোগ নেই। তাঁর শূন্যতা সহজে পূরণ হবার নয়। তিনি চাঁদপুরের সংস্কৃতির আকাশে ধ্রুবতারা হয়েই জ্বলজ্বল করে জ্বলবেন। আমরা তাঁর বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করছি এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি আন্তরিক সমবেদনা জ্ঞাপন করছি।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়