প্রকাশ : ২৮ নভেম্বর ২০২৫, ২৩:১৬
ভূমিকম্প কেউই থামাতে পারবে না, তবে এর প্রভাব প্রশমন করা যাবে !

ভূমিকম্প পৃথিবীর ভূত্বকের অভ্যন্তরীণ গতিশীলতার একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। ভূত্বকের লিথোস্ফিয়ার মোটামুটি ১৪টি প্রধান প্লেটে বিভক্ত, যেগুলো প্রতি সেকেন্ডে কয়েক সেন্টিমিটার গতিতে নড়াচড়া করে। এই নড়াচড়া শান্তিপূর্ণ হলেও কখনো অসম চাপের ফলে বা পারস্পরিক সংঘর্ষে বা বিচ্ছিন্নতায় সেখানে তাপ বা শক্তি সঞ্চয় করে। এই তাপ ও শক্তির প্রবাহ টেকটোনিক প্লেটে গতির সৃষ্টি করে, যা পৃথিবীর ভূ-পৃষ্ঠে বিভিন্ন রূপে প্রতিফলিত হয়। ভূমিকম্পের এই প্রভাব কখনো ক্ষুদ্র কাঁপুনি পর্যন্ত সীমাবদ্ধ থাকে, আবার কখনো ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
|আরো খবর
বিজ্ঞানীদের মতে, টেকটোনিক প্লেটের পারস্পরিক সংঘর্ষ, সরে যাওয়া বা তির্যক গতির ফলেই অধিকাংশ ভূমিকম্প ঘটে। দুটি প্লেট মুখোমুখি সংঘর্ষ হলে প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি হয়। হিমালয় অঞ্চলের ভূমিকম্প এ ধরনের সংঘর্ষের ফল। আবার প্লেটগুলো পরস্পর থেকে দূরে সরে গেলে ম্যাগমা উঠে আসে, ফলে আগ্নেয় ভূমিকম্প ঘটতে পারে। তাছাড়া এক প্লেট অন্যটির পাশ দিয়ে অনুভূমিকভাবে সরে গেলে ফাটল সৃষ্টি হয়। ফলে ভূমিকম্প-প্রবণ অঞ্চল তৈরি করে। ক্যালিফোর্নিয়ার সান আন্দ্রেয়াস ফল্ট এর উদাহরণ। আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের আগে-পরে ম্যাগমার চাপ সঞ্চারের কারণে ভূকম্পন দেখা দেয়, যা সাধারণত আগ্নেয়গিরিমুখী অঞ্চলে ঘটে।
আধুনিক ভূতাত্ত্বিক গবেষণায় দেখা যায়, মানুষের কার্যক্রম থেকেও ক্ষুদ্র ভূকম্পন সৃষ্টি হতে পারে। যেমন—বৃহৎ বাঁধ ও জলাধারে পানির চাপ বৃদ্ধি, খনি বিস্ফোরণ, ভূগর্ভস্থ পানি অতিরিক্ত উত্তোলন, গ্যাস উত্তোলনের 'হাইড্রোলিক ফ্র্যাকচারিং'। এগুলো সাধারণত ছোট মাত্রার হলেও দীর্ঘমেয়াদে ভূতাত্ত্বিক অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করতে পারে।
ভূমিকম্পের তীব্রতা সাধারণত রিখটার স্কেল বা মোমেন্ট ম্যাগনিচ্যুড স্কেল (Mw) দ্বারা পরিমাপ করা হয়। বিশ্ব ইতিহাসের কয়েকটি বড়ো ভূমিকম্প মানব সভ্যতাকে বদলে দিয়েছে। যেমন-১৯৬০ সালের চিলির ভ্যালডিভিয়া ভূমিকম্প (Mw 9.5)-এটি পৃথিবীর ইতিহাসে রেকর্ডকৃত সবচেয়ে শক্তিশালী ভূমিকম্প। এর ফলে প্রশান্ত মহাসাগরে সৃষ্ট সুনামিতে জাপান, হাওয়াইসহ বহু উপকূলীয় অঞ্চলে ব্যাপক ধ্বংস হয়েছে। এই ভূমিকম্প টেকটোনিক প্লেটে সংঘর্ষের বিধ্বংসী ক্ষমতার একটি উদাহরণ। ২০০৪ সালের ভারত মহাসাগরীয় সুনামি (Mw 9.1–9.3), যা ইন্দোনেশিয়ার সুমাত্রার পশ্চিম উপকূলে উৎপত্তি হয়েছিল। ফলে ১৪টি দেশে প্রায় ২ লাখ ৩০ হাজার মানুষ মারা যায়। ২০১১ সালের জাপানের তোহোকু ভূমিকম্প (Mw 9.0), যে ভূমিকম্পে সৃষ্ট সুনামি ফুকুশিমা পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত করে। ভূমিকম্প-সহনশীল অবকাঠামো থাকা সত্ত্বেও জাপান মারাত্মক ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হয়। ২০১৫ সালের নেপাল ভূমিকম্প (Mw 7.8)- নেপাল, ভারত ও বাংলাদেশের কিছু অংশে ব্যাপক ক্ষতি হয়। এ ঘটনায় প্রায় ৯ হাজার মানুষ মারা যায় এবং কাঠমান্ডুর বহু ঐতিহাসিক স্থাপনা ধ্বংস হয়ে যায়। ১৯১৮ ও ১৯৫০ সালে আসাম ও তিব্বত অঞ্চলে ভারতীয় প্লেট ও ইউরেশীয় প্লেটের সংঘর্ষে উৎপন্ন ভূমিকম্প দক্ষিণ এশিয়ার ভূকম্পন ঝুঁকির গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত। ভারতীয় প্লেটের সঞ্চারণের ফলে বাংলাদেশ এখন একটি উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ ভূকম্পন অঞ্চল। বিশেষত, সিলেট অঞ্চলের ডাউকি ফল্ট এবং চট্টগ্রাম-ত্রিপুরা এলাকার সীমানা অত্যন্ত সক্রিয়। বাংলাদেশে ১৮৯৭ সালের গ্রেট আসাম ভূমিকম্প ও ১৯১৮ সালের সিলেটের ভূমিকম্প উল্লেখযোগ্য। দেশের ভূগর্ভস্থ তিনটি বড়ো ফল্ট, ঢাকা ফল্ট, ডাউকি ফল্ট, চট্টগ্রাম-ত্রিপুরা সীমানা-উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ বলে বিবেচিত।
ভূমিকম্পের ফলে মানবজীবন, অবকাঠামো, অর্থনীতি ও পরিবেশ ব্যাপকভাবে প্রভাবিত হয়। যেমন-ভেঙ্গে পড়া ভবন, সেতু ও স্থাপনার নিচে চাপা পড়ে মানুষ মারা যায়। রাস্তা, ব্রিজ, হাসপাতাল, যোগাযোগ ব্যবস্থা, গ্যাসলাইন, বিদ্যুৎকেন্দ্র ধ্বংস হয়ে যায়, যার ফলে উদ্ধার কার্যক্রম বিলম্বিত হয়। সমুদ্র তলদেশে ভূমিকম্প হলে বিশাল তরঙ্গ সৃষ্টি হয়ে উপকূলীয় অঞ্চল প্লাবিত হতে পারে। ২০০৪ সালের সুনামি এর উদাহরণ। ভূমিধস, ভূমির উচ্চতা পরিবর্তন, নদীর গতিপথ বদলে যাওয়া ইত্যাদি দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশগত পরিবর্তন ঘটে। কলকারখানা, ব্যবসা-বাণিজ্য, পর্যটন খাত, কৃষিজমি ইত্যাদি ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির সৃষ্টি হয়। অনেক সময় পুনর্গঠনে দশকের পর দশক লেগে যায়। ভূমিকম্প-উত্তর পরিস্থিতিতে মানুষের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি ভয়, দুশ্চিন্তা দেখা দিতে পারে, যা সামাজিক জীবনে প্রভাব ফেলে।
নিম্নোক্ত কৌশলগুলো অনুসরণ করলে ভূমিকম্পের ঝুঁকি কিছুটা হ্রাস করা সম্ভব– ভূমিকম্প-সহনশীল ভবন নির্মাণ : দুর্যোগ-প্রবণ দেশে নতুন ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে ভূমিকম্প সহনশীল ডিজাইন বাধ্যতামূলক করা উচিত। ঝুঁকিপূর্ণ ভবন চিহ্নিতকরণ :
পুরোনো ও দুর্বল ভবন সংস্কার বা ভেঙে নতুনভাবে নির্মাণ করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়, স্কুল, হাসপাতালের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাসমূহ শক্তিশালী করতে হবে।
জনসচেতনতা বৃদ্ধি : ভূমিকম্পের সময় করণীয় বিষয়ে মানুষকে নিয়মিত প্রশিক্ষণ দিতে হবে। ভূকম্পন মনিটরিং ব্যবস্থা উন্নয়ন : রিয়েল-টাইম সিসমিক নেটওয়ার্ক, জিপিএস-ভিত্তিক ক্রাস্টাল ডিফরমেশন মনিটরিং বাড়ালে আগাম সতর্কবার্তা দেওয়া সম্ভব হবে। প্রশিক্ষণ : ফায়ার সার্ভিস, সিভিল ডিফেন্স, রেড ক্রিসেন্ট ও সেনাবাহিনীর সদস্যদের উদ্ধার প্রযুক্তিতে প্রশিক্ষিত করে তোলা। কর্মস্থলে নিয়মিত ভূমিকম্প মহড়া : নিয়মিত ড্রিল করার ফলে মানুষের মধ্যে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা বাড়ে, যা জীবনহানি কমাতে সহায়ক। শহর ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা : জনবসতি বিস্তার, ঘনবসতি নিয়ন্ত্রণ, পর্যাপ্ত খোলা স্থান সংরক্ষণ ও নিরাপদ দূরত্বে সড়ক নির্মাণ ঝুঁকি কমায়। গবেষণা : ভূতাত্ত্বিক গবেষণা, স্থানীয় ফল্টলাইন বিশ্লেষণ, ঝুঁকিনির্ণয় ম্যাপ তৈরি, বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সমন্বিত কার্যক্রম দরকার।
ভূমিকম্পকে সম্পূর্ণরূপে প্রতিরোধ করা সম্ভব না হলেও বৈজ্ঞানিক প্রস্তুতি, জনসচেতনতা বৃদ্ধি, নির্মাণ নীতিমালা এবং কার্যকর মনিটরিং ব্যবস্থার মাধ্যমে এর ক্ষতি ব্যাপকভাবে কমানো সম্ভব। বাংলাদেশ ভূমিকম্প ঝুঁকির দিক থেকে অত্যন্ত সংবেদনশীল অঞ্চল। তাই এখনই সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করা জরুরি। টেকসই উন্নয়ন ও জননিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সরকারের পাশাপাশি জনগণের সক্রিয় ভূমিকা অপরিহার্য।
লেখক : শিক্ষাবিদ, গবেষক ও সাবেক মহাপরিচালক, নায়েম।



