বৃহস্পতিবার, ০২ জুলাই, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য
ব্রেকিং নিউজ

প্রকাশ : ০২ জুলাই ২০২৬, ১৪:১৫

সাজানো চুরির মামলায় তছনছ শ্রবণপ্রতিবন্ধী এক অটো চালকের স্বপ্ন

স্টাফ রিপোর্টার

প্রবাস থেকে খালি হাতে ফেরা স্ত্রী ও দু সন্তান নিয়ে স্বল্প আয় দিয়েই চলছিলো জাহিদুর রহমান নামে এক

অটোবাইক চালকের সংসার। কিন্তু তাড়াহুড়া করে নামতে গিয়ে এক গৃহবধূর ফেলে যাওয়া একটি ভ্যানিটি ব্যাগ তার জীবনের কাল হয়ে দাঁড়ালো। সাজানো চুরির মামলার আসামি হয়ে এখন জেলের ঘানি টানছেন। অন্যদিকে পরিবারের একমাত্র আয়ের উৎস বন্ধ হয়ে যাওয়ায় দু সন্তান নিয়ে দিশেহারা অটোবাইক চালক জাহিদুর রহমানের স্ত্রী শারমিন আক্তার। এর সাথে যোগ হয়েছে পূর্ব থেকে বিরোধে থাকা এলাকার একটি চক্রের ষড়যন্ত্র। রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে নানাভাবে হয়রানি করার চেষ্টা করছে ওই চক্র। ঘটনাটি ফরিদগঞ্জের।

মামলার আর্জি ও তথ্য সংগ্রহে জানা গেছে, ২০২৬ সালের ঈদুল আযহার দু দিন আগে অর্থাৎ ২৬ মে সন্ধ্যায় উপজেলার চরবড়ালি গ্রামের আব্দুল মালেকের ছেলে অটোবাইক চালক জাহিদুর রহমানের

গাড়িযোগে ফরিদগঞ্জ পৌর এলাকা থেকে পাইকপাড়া উত্তর ইউনিয়নের পালতালুক গ্রামের স্বামীর বাড়িতে যান এক প্রবাসী নজরুল ইসলাম মিজির স্ত্রী রাবেয়া বেগম। কিন্তু গাড়ি থেকে নেমে যাওয়ার সময় ভ্যানিটি ব্যাগটি অটোবাইকে ফেলে যান। ব্যাগটির ভেতরে তার নগদ অর্থ, মুঠোফোন ও অন্যান্য জিনিস ছিলো। কিছুক্ষণ পর তার ব্যাগটির কথা মনে পড়লে দ্রুত তিনি রাস্তায় আসলেও ততক্ষণে অটোবাইকটি চলে যায় । এবার তিনি

অটোবাইকটির খোঁজ নেয়া শুরু করেন। এক পর্যায়ে গাজীপুর এলাকার রাস্তার পাশের একটি বেকারির সিসি টিভি ফুটেজ সংগ্রহ করে অটোবাইকটির চালক ও বাইকটি চিহ্নিত করেন।

এই ঘটনার ক'দিন পর অর্থাৎ গত ১ জুন দুপুরে রাবেয়া বেগম তার লোকজন নিয়ে

অটোবাইক চালককে খোঁজ করার এক পর্যায়ে বাসস্ট্যান্ড এলাকায় অটোবাইক চালককে দেখতে পেয়ে তাকে জিজ্ঞাসা করলে তিনি তাৎক্ষণিক গাড়িতে ব্যাগ পাওয়ার কথা স্বীকার করেন এবং তার বাড়িতে রয়েছে বলে জানান। দ্রুত তাদেরকে নিয়ে বাড়িতে গিয়ে ব্যাগ ও তার ভেতরে থাকা মালামাল বুঝিয়ে দেন। কিন্তু বাধ সাদে একটি স্বর্ণের চেইন নিয়ে। ওই গৃহবধূর দাবি, ব্যাগে স্বর্ণের চেইন ছিলো। কিন্তু অটোবাইক চালকের দাবি, তিনি যা পেয়েছেন, সবই এখানে। এক পর্যায়ে তাকে ধরে নিয়ে অটোসহ থানায় সোপর্দ করেন এবং ওই অটো চালকের বিরুদ্ধে চুরির মামলা দেন গৃহবধূ। পুলিশ ওই মামলায় এক দিনের রিমান্ডে নিয়ে আসলেও চুরির ঘটনার কোনো তথ্য উদঘাটন করতে পারেন নি। ওই মামলায় নিরীহ ওই

অটোবাইক চালক জাহিদ এখন পর্যন্ত জেলহাজত ভোগ করছেন। অন্যদিকে অটো চালকের স্ত্রী দু সন্তান নিয়ে রয়েছেন চরম বিপদে। জাহিদের স্ত্রী শারমিন আক্তার বলেন, আমার স্বামী প্রবাস থেকে খালি হাতে ফেরার পর গত দেড় বছর ধরে কিস্তি দিয়ে কেনা অটোবাইক চালিয়ে সংসার চালান। তিনি কানে কম শুনেন, আমরা তার মোবাইল ফোনে কল করলে তিনি লাউড স্পিকার দিয়ে কথা না বললে শুনেন না। আমার স্বামী ধার্মিক মানুষ। তিনি কখনো কোনো অন্যায়ের সাথে জড়িত নন।

শারমিন বলেন, সেই দিন ২৬মে রাতে তিনি বাড়ি ফিরে ভ্যানিটি ব্যাগটি নিজের হাতে আলমিরাতে রেখে দেন। এ সময় তাকে জিজ্ঞাসা করলে তিনি জানান, আজকে তার গাড়িতে ওঠা কোনো যাত্রী তা ফেলে গিয়েছে। প্রথমে তিনি টের পাননি, রাত প্রায় ১০ টার দিকে কড়ৈতলী বাজারে এক নারী যাত্রী গাড়ি থেকে নেমে যাওয়ার সময় গাড়িতে একটি ব্যাগ পড়ে থাকার কথা জানান। পরে তিনি তা দেখেন এবং ব্যাগের ভেতরে নগদ ১৯ হাজার টাকা, একটি মোবাইল ফোন, একটি চাবির রিং ও ভ্যাসলিন দেখতে পান। ঈদের সময় বলে কার ব্যাগ সেটি নিশ্চিত হতে না পেরে নিজে বাড়িতে নিয়ে এসে ব্যাগটি রেখে দেন।

এ সময় তার স্বামী তাকে বলেন, কোনো সময়ে কেউ জিজ্ঞাসা করলে তিনি তা ফেরত দেবেন। তাই যেভাবে ব্যাগ পেয়েছেন, সেভাবেই আলমিরাতে রেখেছেন। গত ১ জুন দুপুরে ওই নারী তার স্বামীসহ কিছু লোকজন নিয়ে তার বাড়িতে আসেন। এ সময় তার কাছ থেকে আলমিরার চাবি নিয়ে ওই লোকজনকে ভ্যানিটি ব্যাগ এবং ব্যাগের ভেতরে থাকা নগদ ১৯ হাজার টাকা ও মোবাইল ফোনসহ ভ্যানিটি ব্যাগটি বুঝিয়ে দেন। এই সময়ে এক নারী ভিডিও করছিলেন। আমি জিজ্ঞাসা করলে তিনি বলেন, আপনার স্বামী ব্যাগ পাইছে, বুঝিয়ে দিচ্ছে, তার প্রমাণ রাখলাম। এরপর আমার স্বামীকে চা খাওয়ার নাম করে ফরিদগঞ্জে নিয়ে যায়। এক পর্যায়ে ব্যাগের ভেতরে স্বর্ণের চেইন ছিলো দাবি করে আমার স্বামীর কাছে ৩ লক্ষ টাকা দাবি করে। পরে আমার স্বামীকে অটোবাইকসহ থানায় সোর্পদ করে এবং চুরির সাজানো মামলা দেয়। তিনি যদি চুরিই করতেন, তাহলে ব্যাগটি সযতনে আলমিরায় না রেখে ব্যাগটি ফেলে দিতেন। ওই মহিলাসহ লোকজনদের নিয়ে বাড়িতে আসতেন না এবং সকলের সামনে টাকাসহ ব্যাগ বুঝিয়ে দিতেন না। মূলত এটি একটি সাজানো মামলা। আমার স্বামীকে পুলিশ ওই মামলায় (জি আর ২৪২/২৬) রিমান্ডেও এনেছে। কিন্তু কোনো কিছুই পায়নি। তিনি যদি অপরাধী হতেন তাহলে রিমান্ডে অবশ্যই পুলিশ তার কাছ থেকে স্বর্ণের কথা বের করে নিয়ে আসতো। তাছাড়া ওই নারী নিজের ভুলে গাড়িতে ব্যাগ ফেলে রেখে যাওয়া যদি চুরি হয়, তাহলে এরকম অনেক ঘটনাই ঘটে। এজন্যেই কি গাড়ি চালকরা চোর হবে?

শারমিনের মা ফাতেমা বেগম জানান, আমার একমাত্র মেয়ে তার স্বামী ও দু সন্তান নিয়ে সুখেই ছিলো। জামাতা জাহিদ বিদেশ থেকে খালি হাতে ফেরার পর আমি কিস্তি উঠিয়ে দেই গাড়ি কেনার জন্যে। সে গাড়ি চালিয়ে যা আয় করতো, তা দিয়েই তাদের সংসার চলতো। এখন সাজানো চুরির ঘটনায় সে জেল খাটছে। আমার এলাকার একটি চক্র এখন আমার মেয়েকেও মামলায় জড়িয়ে দেয়ার হুমকি দিচ্ছে। রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে তারা আমার মেয়ে, তার সন্তানদের এবং জামাতার স্বপ্ন ধ্বংস করে দিচ্ছে। আমি আদালতের কাছে ন্যায়বিচার কামনা করছি।

জাহিদকে চেনেন এমন অটোবাইক চালক পারভেজ ও জয়নাল জানান, জাহিদ একজন নামাজি মানুষ। সে কানে কম শুনতো, ভালো মানুষ। আমার মতে সে চুরি করতে পারে না। ওই মহিলা নিজে ভুলে ব্যাগ ফেলে গিয়ে পরে সাজানো চুরির মামলা দিয়েছে বলে তারা মনে করেন। এভাবে কেউ মালামাল ফেলে গেলে আমরাও কি চোর হবো?

এ ব্যাপারে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ফরিদগঞ্জ থানার এসআই শফিকুল ইসলাম বলেন, চুরির মামলার ঘটনায় আসামিকে রিমান্ডশেষে আদালতে পাঠানো হয়েছে। তবে অভিযুক্ত জাহিদুর রহমান পূর্বে কোনো ধরনের অপরাধের সাথে জড়িত রয়েছে বলে জানা যায়নি। মামলার তদন্ত চলছে।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়