সোমবার, ১০ আগস্ট, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য

প্রকাশ : ১০ আগস্ট ২০২৬, ০৮:৩৫

জন্মগত ত্রুটি লুকিয়ে নয়, সমাধান চিকিৎসকের কাছেই

অনলাইন ডেস্ক
জন্মগত ত্রুটি লুকিয়ে নয়, সমাধান চিকিৎসকের কাছেই

দগ্ধ রোগীর চিকিৎসা, দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত অঙ্গ পুনর্গঠন, জন্মগত ত্রুটি সংশোধন থেকে ডায়াবেটিক ফুটে অঙ্গ সংরক্ষণ প্লাস্টিক সার্জারির নানা দিক নিয়ে দৈনিক চাঁদপুর কণ্ঠের পাক্ষিক বিশেষ আয়োজন ‘চিকিৎসাঙ্গন’ বিভাগে সম্প্রতি কথা বলেছেন চাঁদপুরের সন্তান জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠান (নিটোর)-এর প্লাস্টিক সার্জারি বিভাগের রেজিস্ট্রার ডা. শাহ মো. ইফতে খায়রুল আলম। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আলআমিন হোসাইন।

প্রথমেই জানতে চাই, বর্তমানে আপনার কর্মব্যস্ততা ও দায়িত্ব সম্পর্কে।

ডা. শাহ মো. ইফতে খায়রুল আলম: বর্তমানে আমি জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠান (নিটোর), যা জাতীয় পঙ্গু হাসপাতাল নামে বেশি পরিচিত, সেখানে প্লাস্টিক সার্জারি বিভাগের রেজিস্ট্রার হিসেবে কর্মরত আছি।

আপনি তো চাঁদপুরের সন্তান। আপনার শৈশব কোথায় কেটেছে?

ডা. শাহ মো. ইফতে খায়রুল আলম: আমার জন্ম চাঁদপুরে। বেড়ে ওঠেছি শহরের জোড়পুকুরপাড় এলাকায়। আমাদের বাড়ি সদর উপজেলার বিষ্ণুপুর ইউনিয়নে মনোহরখাদী গ্রাম। প্রাথমিক শিক্ষা উদয়ন শিশু বিদ্যালয়ে। এরপর হাসান আলী সরকারি উচ্চবিদ্যালয়ে পড়েছি। পরে পুরানবাজার ডিগ্রি কলেজ থেকে এইচএসসি সম্পন্ন করি।

শিক্ষাজীবনের গুরুত্বপূর্ণ ধাপগুলো সম্পর্কে বলুন।

ডা. শাহ মো. ইফতে খায়রুল আলম: ১৯৯৯ সালে এসএসসি এবং ২০০২ সালে এইচএসসি পাস করি। ২০০৩ সালে গণস্বাস্থ্য সমাজভিত্তিক মেডিকেল কলেজে এমবিবিএসে ভর্তি হই। সেখান থেকেই এমবিবিএস ও ইন্টার্নশিপ সম্পন্ন করি।

সরকারি চাকরিতে যোগদান কীভাবে?

ডা. শাহ মো. ইফতে খায়রুল আলম: ইন্টার্নশিপ শেষ করার ছয় মাস পর বিশেষ নিয়োগের মাধ্যমে সরকারি চাকরিতে যোগ দিই। ২০১০ সালে আমার প্রথম কর্মস্থল ছিল মতলব দক্ষিণ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। সেখানে মেডিকেল অফিসার হিসেবে প্রায় দুই বছর দায়িত্ব পালন করি।

প্লাস্টিক সার্জারিতে আসার গল্পটা শুনতে চাই।

ডা. শাহ মো. ইফতে খায়রুল আলম: সরকারি চাকরির পাশাপাশি পোস্টগ্র্যাজুয়েশন পরীক্ষায় অংশ নিই। এমএস ইন প্লাস্টিক সার্জারিতে সুযোগ পাই। তখন এ বিষয়ে সরকারি আসন খুবই সীমিত ছিল। প্রথমে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজে এক বছর জেনারেল সার্জারির প্রশিক্ষণ নিই। পরে চাঁদপুর ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালেও কিছু সময় প্রশিক্ষণ করি। এরপর ঢাকা মেডিকেল কলেজে ফিরে কোর্সের বাকি ধাপগুলো সম্পন্ন করি।

পড়াশোনার সময় করোনার প্রভাব কতটা ছিল?

ডা. শাহ মো. ইফতে খায়রুল আলম: করোনার সময় প্রায় দুই বছর নিয়মিত দায়িত্ব পালন করেছি। সে সময় পরীক্ষাও পিছিয়ে যায়। ব্যক্তিগত জীবনেও কঠিন সময় পার করেছি। আমার মা করোনায় আক্রান্ত হয়ে প্রায় একমাস আইসিইউতে ছিলেন। এরপর আবার পড়াশোনা শুরু করি। থিসিস সম্পন্ন করে এমএস ডিগ্রি অর্জন করি।

বর্তমানে চাঁদপুরেও রোগী দেখছেন?

ডা. শাহ মো. ইফতে খায়রুল আলম: হ্যাঁ। আগে চাঁদপুরে চেম্বার করতাম না। তাই অনেকেই আমাকে চিনলেও চিকিৎসা নেওয়ার সুযোগ পাননি। এখন নিয়মিত রোগী দেখা শুরু করেছি।

এত দিন চাঁদপুরে নিয়মিত বসতে পারেননি কেন?

ডা. শাহ মো. ইফতে খায়রুল আলম: মূলত পড়াশোনা, প্রশিক্ষণ ও পরীক্ষার কারণে সময় দিতে পারিনি। আমার স্ত্রীও চিকিৎসক। তিনি এমডি (শিশুরোগ) করছিলেন। আমাদের দুজনেরই পড়াশোনা চলছিল। এর মধ্যে দ্বিতীয় সন্তানের জন্ম হয়। পরিবার, সন্তান ও পড়াশোনাÑসব মিলিয়ে চাঁদপুরে নিয়মিত চেম্বার করা সম্ভব হয়নি।

চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্নটা কবে থেকে?

ডা. শাহ মো. ইফতে খায়রুল আলম: ছোটবেলায় চিকিৎসক হওয়ার নির্দিষ্ট কোনো স্বপ্ন ছিল না। এইচএসসির পর পরিস্থিতির কারণে চিকিৎসাবিদ্যায় আসা। আমার বোনও চিকিৎসক। আমরা দুজনই একসঙ্গে গণস্বাস্থ্য মেডিকেল কলেজে ভর্তি হই। তখন সেটিই আমাদের জন্য সবচেয়ে বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত ছিল।

প্রথমবার রোগী দেখার অনুভূতি কেমন ছিল?

ডা. শাহ মো. ইফতে খায়রুল আলম: এমবিবিএস শেষ করে ইন্টার্নশিপে রোগী দেখা শুরু করার অনুভূতি ছিল অন্য রকম। পাঁচ বছরের কঠিন পড়াশোনা, নিয়মিত পরীক্ষা আর চাপের পর নিজেকে একজন চিকিৎসক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার আনন্দ ছিল। তখন বুঝতে শুরু করি, বইয়ের পড়া আর বাস্তব চিকিৎসা এক জিনিস নয়। একজন রোগীর সুস্থতা তখন আপনার সিদ্ধান্ত ও চিকিৎসার ওপর নির্ভর করে। সেই দায়িত্ববোধই সবচেয়ে বেশি অনুভব করেছি।

এমন কোনো রোগীর কথা কি মনে পড়ে, যেটি আজও আপনাকে আবেগাপ্লুত করে?

ডা. শাহ মো. ইফতে খায়রুল আলম: ঢাকা মেডিকেলে প্রশিক্ষণের সময়ের একটি ঘটনা আজও মনে আছে। এক তরুণের হাতের একটি আঙুল কেটে গিয়েছিল। আমার থিসিসের বিষয় ছিল আঙুল পুনর্গঠন। প্রায় চার ঘণ্টা ধরে অপারেশন করি। কয়েক দিন পর ফলোআপে এসে সে আমার জন্য এক ঝুড়ি মাছ নিয়ে আসে। আমরা তো রোগীর কাছ থেকে কখনো কিছু প্রত্যাশা করি না। কিন্তু তার সেই ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতা আমাকে খুব স্পর্শ করেছিল। চিকিৎসকের জন্য এ ধরনের আন্তরিকতা অনেক বড় প্রাপ্তি।

এমন কোনো ঘটনা কি আছে, যা এখনো কষ্ট দেয়?

ডা. শাহ মো. ইফতে খায়রুল আলম: আছে। ঢাকা মেডিকেলের একটি ঘটনা কখনো ভুলতে পারি না। একজন গুরুতর দগ্ধ রোগীকে অনেক দিন ধরে অপারেশনের জন্য প্রস্তুত করছিলাম। অপারেশনের আগের দিন তার রক্তস্বল্পতার কারণে রক্ত দিতে হয়। দুর্ভাগ্যজনকভাবে রক্ত দেওয়ার পর তীব্র প্রতিক্রিয়া হয় এবং রোগীকে আর বাঁচানো যায়নি। রোগীটি আমাদের ওয়ার্ডের দায়িত্বে ছিল। তার স্বজনদের সঙ্গে নিয়মিত কথা হতো। অপারেশনের ঠিক আগের দিন এমন একটি ঘটনা ঘটায় খুব কষ্ট পেয়েছিলাম। চিকিৎসাবিজ্ঞানে সবকিছু আমাদের নিয়ন্ত্রণে থাকে না। তবু একজন চিকিৎসক হিসেবে এমন মৃত্যু সহজে মেনে নেওয়া যায় না।

প্লাস্টিক সার্জারিতে কাজ করতে গিয়ে মানুষের মধ্যে কী ধরনের ভুল ধারণা বেশি দেখেন?

ডা. শাহ মো. ইফতে খায়রুল আলম: সবচেয়ে বেশি দেখি আগুনে পোড়ার পর মানুষ ডিম, টুথপেস্ট, তেল বা নানা ধরনের পদার্থ লাগিয়ে দেয়। এগুলোর কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। বরং ক্ষতি হতে পারে। কোনো ব্যক্তি পুড়ে গেলে আক্রান্ত স্থান যত দ্রুত সম্ভব স্বাভাবিক বা কলের প্রবাহমান পানির নিচে রাখতে হবে। বরফ ব্যবহার করা উচিত নয়। এরপর দ্রুত নিকটস্থ হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে।

পোড়া রোগীর ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় কী?

ডা. শাহ মো. ইফতে খায়রুল আলম: অনেকেই শুধু ড্রেসিং নিয়ে ব্যস্ত থাকেন। কিন্তু প্রথম ২৪ ঘণ্টায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো শরীরের তরল বা ফ্লুইডের ঘাটতি পূরণ করা। প্রয়োজনে স্যালাইন দিতে হবে। রোগী মুখে খেতে পারলে ওরাল ফ্লুইডও দেওয়া যেতে পারে। প্রথম ২৪ ঘণ্টার সঠিক চিকিৎসাই পরবর্তী ফলাফলে সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলে। এই সময়ে পানিশূন্যতা পূরণ করা না গেলে পরে জটিলতা বেড়ে যায়। পরে সংক্রমণসহ নানা সমস্যা দেখা দিতে পারে।

বর্তমানে কী ধরনের রোগী বেশি দেখেন?

ডা. শাহ মো. ইফতে খায়রুল আলম: বর্তমানে দুর্ঘটনায় আহত রোগী বেশি আসে। অর্থোপেডিক সার্জনরা হাড়ের চিকিৎসা করেন। কিন্তু চামড়া, মাংসপেশি বা সফট টিস্যুর পুনর্গঠনের কাজ আমরা করি। এ ছাড়া জন্মগত ত্রুটিযুক্ত শিশু, পোড়া রোগীর কনট্র্যাকচার, দুর্ঘটনার পর পুনর্গঠন, দীর্ঘদিন শয্যাশায়ী রোগীর প্রেসার সোরÑএ ধরনের রোগীও নিয়মিত আসে।

রোগী ও স্বজনদের প্রতি আপনার প্রত্যাশা কী?

ডা. শাহ মো. ইফতে খায়রুল আলম: সচেতনতা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে শিশুদের জন্মগত হাতের ত্রুটির ক্ষেত্রে যত দ্রুত চিকিৎসা শুরু করা যায়, তত ভালো ফল পাওয়া যায়। সাধারণভাবে আমরা চাই দুই বছরের মধ্যেই প্রয়োজনীয় অপারেশন সম্পন্ন হোক। অনেক অভিভাবক বিষয়টি জানেন না। ফলে ১০-১২ বছর বয়সে সন্তানকে নিয়ে আসেন। তখন অপারেশন করা গেলেও কাক্সিক্ষত কার্যকারিতা পাওয়া কঠিন হয়ে যায়। জন্মগত ঠোঁটকাটা, তালুকাটা বা হাতের ত্রুটিকে কুসংস্কারের বিষয় মনে করার কোনো কারণ নেই। এগুলোর আধুনিক চিকিৎসা রয়েছে। যত দ্রুত চিকিৎসা শুরু হবে, তত ভালো ফল মিলবে।

অনেক ব্যস্ততার মধ্যেও নিশ্চয় কিছুটা অবসর পান। সেই সময় কীভাবে কাটান?

ডা. শাহ মো. ইফতে খায়রুল আলম: অবসর সময়ের বেশির ভাগই পরিবারকে দিই। বাসায় গেলে সন্তানদের সঙ্গে সময় কাটাই। মাঝে মধ্যে সিনেমা দেখি। চিকিৎসাবিজ্ঞানের বই নিয়মিত পড়ি। তবে গল্প বা সাহিত্য পড়ার জন্য আলাদা সময় খুব একটা পাই না।

চাঁদপুর জেলার মানুষের জন্য আপনার পরামর্শ কী?

ডা. শাহ মো. ইফতে খায়রুল আলম: সচেতনতার বিকল্প নেই। আগুনে পোড়া, জন্মগত ত্রুটি কিংবা দুর্ঘটনাজনিত আঘাতÑএসব বিষয়ে মানুষকে আরও সচেতন হতে হবে। অনেক সময় গ্যাসের চুলা বা সিলিন্ডার ব্যবহারের সময় ঘরের সব দরজা-জানালা বন্ধ রাখা হয়। গ্যাস লিকেজ হলে এটি বড় দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে। তাই পর্যাপ্ত বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা রাখতে হবে। আরেকটি বিষয় হলো, জন্মগত ত্রুটি নিয়ে বসে থাকার সুযোগ নেই। যত দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যাওয়া যাবে, তত ভালো ফল পাওয়া যাবে।

গ্রামে এখনো জন্মগত ত্রুটি নিয়ে নানা কুসংস্কার রয়েছে।

ডা. শাহ মো. ইফতে খায়রুল আলম: ঠিক তাই। অনেকেই মনে করেন ঠোঁটকাটা, তালুকাটা বা জন্মগত হাতের ত্রুটি কোনো অভিশাপ বা কুসংস্কারের ফল। এটি সম্পূর্ণ ভুল ধারণা। এগুলোর আধুনিক চিকিৎসা রয়েছে। সময়মতো চিকিৎসা নিলে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই ভালো ফল পাওয়া সম্ভব।

ডায়াবেটিক ফুট নিয়ে কী বলবেন?

ডা. শাহ মো. ইফতে খায়রুল আলম: এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আগে চিকিৎসাশিক্ষার্থী থাকা অবস্থায় অনেক রোগীর পা কেটে ফেলতে দেখেছি। তখন খুব খারাপ লাগত। এখন প্লাস্টিক সার্জারিতে কাজ করতে গিয়ে আমরা যতটা সম্ভব অঙ্গ সংরক্ষণের চেষ্টা করি। কোনো আঙুল বা পা কেটে ফেলা আমাদের শেষ বিকল্প। অনেক রোগী অবহেলার কারণে দেরিতে আসেন। ফলে ক্ষত জটিল হয়ে যায়। অথচ সময়মতো চিকিৎসা নিলে অনেক ক্ষেত্রেই অঙ্গ রক্ষা করা সম্ভব।

ডায়াবেটিস রোগীদের মধ্যে সবচেয়ে বড় ভুল কোথায় দেখেন?

ডা. শাহ মো. ইফতে খায়রুল আলম: অনেকেই পায়ের ছোট ক্ষতকে গুরুত্ব দেন না। আবার কেউ কেউ নিজের মতো করে ড্রেসিং করান। এতে ক্ষত আরও জটিল হয়।আরেকটি বড় ভুল ধারণা হলো, সব ক্ষতে প্রতিদিন ড্রেসিং করতে হবে। বিষয়টি এমন নয়। কোনো ক্ষতে প্রতিদিন, কোনো ক্ষতে দুই দিন পর, আবার কোনো ক্ষতে তিন বা চার দিন পর ড্রেসিং করতে হয়। এটি রোগীর ক্ষতের অবস্থা, সংক্রমণ ও চিকিৎসার ধাপ অনুযায়ী চিকিৎসক নির্ধারণ করবেন। অযথা প্রতিদিন ড্রেসিং করলে অনেক সময় ক্ষত দ্রুত শুকানোর স্বাভাবিক প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হয়।

রোগীদের জন্য আপনার আর কোনো পরামর্শ?

ডা. শাহ মো. ইফতে খায়রুল আলম: বড় সমস্যা হওয়ার আগেই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। অনেকেই দেরি করে আসেন। তখন চিকিৎসা জটিল হয়ে যায়। আমার কাছে সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, একজন মানুষের হাত, পা বা শরীরের কোনো অঙ্গ যদি সংরক্ষণ করা যায়, সেটিই সবচেয়ে বড় সাফল্য। শুধু অস্ত্রোপচার করাই উদ্দেশ্য নয়; রোগীকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনা আমাদের লক্ষ্য।

অনেক সময় দুর্ঘটনার কারণে অঙ্গ শরীর থেকে আলাদা হতে পারে, বিশেষ করে হাতÑপা, হাত, পায়ের আঙ্গুল এবং পুরুষাঙ্গ। যথাসময়ে তা সংরক্ষণ করে নির্দিষ্ট হাসপাতালে গেলে তার পুনঃস্থাপন করা সম্ভব। মেডিকেল ভাষায় একে আমরা রিপ্লান্টেশন বলি।

চাঁদপুরে চিকিৎসাসেবার বিষয়ে আপনার কোনো পরিকল্পনা আছে?

ডা. শাহ মো. ইফতে খায়রুল আলম: অবশ্যই। চাঁদপুরে ট্রমা ও পুনর্গঠনমূলক চিকিৎসা নিয়ে একটি সমন্বিত টিম গড়ে তোলার ইচ্ছা রয়েছে। অর্থোপেডিক সার্জনরা হাড়ের চিকিৎসা করবেন, আর প্লাস্টিক সার্জনরা সফট টিস্যু ও পুনর্গঠনের কাজ করবেন। এতে রোগীরা একই জেলায় পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসা পেতে পারবেন। আমার ঢাকার কয়েকজন সহকর্মীও প্রয়োজনে চাঁদপুরে এসে অপারেশন করার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। এমন ব্যবস্থা হলে অনেক রোগীকেই আর চিকিৎসার জন্য ঢাকায় যেতে হবে না। এতে সময়, অর্থ ও ভোগান্তিÑসবই কমবে।

এখন চাঁদপুর শহরের স্টেডিয়াম রোডের লাইফ কেয়ার হাসপাতাল অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টারে প্রতি বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার নিয়মিত রোগী দেখছি।

প্লাস্টিক সার্জারি সম্পর্কে সাধারণ মানুষের ধারণা এখনো সীমিত। আসলে এই বিভাগের কাজের পরিধি কতটা বিস্তৃত?

ডা. শাহ মো. ইফতে খায়রুল আলম: অনেকেই মনে করেন, প্লাস্টিক সার্জারি মানেই শুধু সৌন্দর্যবর্ধনের অস্ত্রোপচার। বাস্তবে বিষয়টি অনেক বিস্তৃত। আমরা দগ্ধ রোগীর চিকিৎসা, দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত অঙ্গ পুনর্গঠন, জন্মগত ত্রুটির সংশোধন, কেটে যাওয়া আঙুল বা অঙ্গ পুনঃসংযোজন, বিভিন্ন ধরনের রিকনস্ট্রাকটিভ সার্জারিসহ বহু ধরনের চিকিৎসা করি। এ ছাড়া কান পুনর্গঠন, নাকের অস্ত্রোপচার (রাইনোপ্লাস্টি), দাগ বা স্কারের সংশোধন, মুখমণ্ডলের পুনর্গঠনÑএসবও প্লাস্টিক সার্জারির আওতায় পড়ে।

নান্দনিক বা অ্যাস্থেটিক সার্জারিও কি প্লাস্টিক সার্জারির অংশ?

ডা. শাহ মো. ইফতে খায়রুল আলম: অবশ্যই। অ্যাস্থেটিক সার্জারি প্লাস্টিক সার্জারিরই একটি অংশ। যেমন লাইপোসাকশন, অ্যাবডোমিনোপ্লাস্টি (টামি টাক), ফেসলিফট, রাইনোপ্লাস্টিÑএসব আমরা করি। তবে আমাদের কাজ শুধু সৌন্দর্য বাড়ানো নয়, কার্যকারিতা ফিরিয়ে আনা এবং রোগীর স্বাভাবিক জীবন নিশ্চিত করাও।

স্তনের বিভিন্ন সমস্যার চিকিৎসাও কি প্লাস্টিক সার্জারির মাধ্যমে হয়?

ডা. শাহ মো. ইফতে খায়রুল আলম: হ্যাঁ। কারও স্তন জন্মগতভাবে ছোট বা বড় হতে পারে, আবার দুই পাশের আকারে পার্থক্যও থাকতে পারে। কারণ অনুযায়ী চিকিৎসা নির্ধারণ করা হয়। অনেক নারীর ক্ষেত্রে অতিরিক্ত বড় স্তনের কারণে দৈনন্দিন কাজে সমস্যা হয়। তখন অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে তা ছোট করা যায়। আবার প্রয়োজন হলে ইমপ্লান্টের মাধ্যমে স্তনের আকারও বাড়ানো যায়। স্তন ক্যানসারের কারণে কারও স্তন অপসারণ করতে হলে পুনর্গঠনমূলক অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে নতুন স্তন তৈরি করা সম্ভব। প্রয়োজনে নিপল ও এরিয়োলাও পুনর্গঠন করা যায়। এছাড়া, পুরুষের স্তন বড় হওয়াকে মেডিকেলের ভাষায় গাইনেকোমাস্টিয়া বলে। এই অপারেশনও আমরা করি।

জন্মগতভাবে যোনিপথ না থাকা বা এ ধরনের জটিল সমস্যার চিকিৎসাও কি আপনারা করেন?

ডা. শাহ মো. ইফতে খায়রুল আলম: হ্যাঁ। জন্মগতভাবে যোনিপথ না থাকা বা অপরিণত থাকা কিছু রোগী আমাদের কাছে আসেন। এসব ক্ষেত্রে পুনর্গঠনমূলক অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে যোনিপথ তৈরি করা যায়। এটি রোগীর স্বাভাবিক সামাজিক ও দাম্পত্য জীবন গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

সবশেষে চাঁদপুরের মানুষের উদ্দেশে কিছু বলতে চান?

ডা. শাহ মো. ইফতে খায়রুল আলম: আমি শুধু একটি কথাই বলতে চাইÑসমস্যা লুকিয়ে রাখবেন না, অবহেলাও করবেন না। দুর্ঘটনা, আগুনে পোড়া, ডায়াবেটিক ফুট বা জন্মগত ত্রুটিÑযে সমস্যাই হোক, দ্রুত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। আমাদের দেশে এখন অনেক জটিল রোগেরও আধুনিক চিকিৎসা সম্ভব। আগে যেসব ক্ষেত্রে অঙ্গ কেটে ফেলতে হতো, এখন অনেক ক্ষেত্রেই তা সংরক্ষণ করা যায়। সময়মতো চিকিৎসা নিলে রোগীর কষ্ট যেমন কমে, তেমনি ভালো ফল পাওয়ার সম্ভাবনাও অনেক বেড়ে যায়। আমার ইচ্ছা, চাঁদপুরের মানুষ যেন নিজ জেলায়ই উন্নত চিকিৎসাসেবা পান। এ লক্ষ্যেই আমি কাজ করতে চাই।

সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।

ডা. শাহ মো. ইফতে খায়রুল আলম: আপনাকেও ধন্যবাদ।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়