প্রকাশ : ২১ নভেম্বর ২০২৩, ০০:০০

প্রায় ৯ বছর পর শুরু হতে যাচ্ছে চাঁদপুর স্টেডিয়ামে ২য় বিভাগ ক্রিকেট লীগ। যদি এ বছর লীগটি মাঠে গড়ায়, তাহলে জেলা ক্রীড়া সংস্থার কার্যকরী কমিটির ২ মেয়াদ (অর্থাৎ ৮ বছর) পর লীগটির আয়োজন হবে। জেলা ক্রীড়া সংস্থা সূত্রে জানা গেছে, প্রাকৃতিক পরিবেশ ও সকল কিছু স্থিতিশীল থাকলে চলতি মাসে কিংবা ডিসেম্বরে লীগটি অনুষ্ঠিত হবে।
চাঁদপুর স্টেডিয়ামে একসময় নিয়মিতভাবেই ২য় বিভাগ ক্রিকেট লীগ হতো। ওই ক্রিকেট লীগ থেকেই অনেক উদীয়মান ক্রিকেটার পরবর্তীতে প্রথম বিভাগ ক্রিকেট লীগ ও জেলা দলসহ ঢাকার অনেক ক্লাবে ক্রিকেট খেলার সুযোগ পেয়েছিলেন। দীর্ঘদিন ধরেই এ লীগ না হওয়ার কারণে উদীয়মান ক্রিকেটাররা খেলার সুযোগ পাচ্ছেন না এবং জেলা থেকেও ভালো মানের ক্রিকেটার সৃষ্টি হচ্ছে না।
চাঁদপুর জেলা ক্রীড়া সংস্থার কার্যকরী কমিটির অনেক সদস্য অনেক ক্লাবের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক কিংবা আহ্বায়ক ও সদস্য সচিবের দায়িত্বে থেকে এই কার্যকরী কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন। আবার কোনো কোনো সদস্য তার দল ২য় বিভাগ ক্রিকেট লীগ থেকে প্রথম বিভাগ ক্রিকেট লীগে খেলার সুযোগ পাওয়ার কারণে সে সুযোগটি নিয়ে নিয়েছেন। বতর্মানে জেলা ক্রীড়া সংস্থার কার্যকরী কমিটিতে এমন সদস্যও রয়েছেন, যারা ক্রিকেট কিংবা ফুটবলও খেলেননি কোনোদিন কোনো মাঠে। ওই সদস্যদেরকে যদি খেলাধুলার বিষয়ে প্রশ্ন করা হয়, তাহলে উত্তর দিতেও অনেকের কষ্ট হবে। এ ধরনের কথাগুলো এখন স্টেডিয়াম পাড়ায় গেলে অনেক দক্ষ ক্রীড়া সংগঠকের মুখ থেকে শোনা যায়।
জেলা ক্রীড়া সংস্থা সূত্রে জানা যায় যে, ইত্যিমধ্যে ২য় বিভাগ ক্রিকেট লীগে খেলার জন্যে জেলা শহর ও উপজেলার ক্রিকেট দলসহ ৮টি দল অংশ নিয়েছে। দলগুলো হলো : মাতৃছায়া ক্রিকেটার্স, টিম ডাকাতিয়া, ক্রিকেট কোচিং সেন্টার, শেখ কামাল স্পোর্টস্ একাডেমী (লাল দল), শাহরাস্তি ক্রিকেট একাডেমী, ক্রিকেট একাডেমী জুনিয়র, শেখ কামাল স্পোর্টস একাডেমী (সবুজ দল) ও অঙ্গীকার ক্রীড়া চক্র।
ক্রিকেট লীগ নিয়ে জেলা ক্রীড়া সংস্থার সাধারণ সম্পাদক গোলাম মোস্তফা বাবুর সাথে এ প্রতিবেদকের আলাপকালে তিনি জানান, আমরা ক্রিকেট খেলার জন্যে মাঠের ক্রিকেট পিচ প্রস্তুত করেছি। মাঠের পিচ অনেকটা প্রস্তুত খেলার জন্যে। দলগুলোও আমাদের সাথে যোগাযোগ রেখেছে। এ লীগটি হবে ২০ ওভার করে। আমাদের চেষ্টা রয়েছে প্রতিদিন ২টি করে ম্যাচ চালানোর জন্যে। লীগটিতে সাদা বলে রঙ্গিন ড্রেসে খেলতে পারবে অংশ নেয়া দলের খেলোয়াড়রা। এ লীগে যে দলটি চ্যাম্পিয়ন হবে সেই দলটিই পরবর্তীতে জেলা ক্রীড়া সংস্থার আয়োজিত প্রথম বিভাগ ক্রিকেট লীগে সরাসরি খেলার সুযোগ পাবে। আশা করছি সহসাই লীগটি শুরু করার। এজন্যে ক্রিকেট খেলোয়াড় ও অংশ নেয়া দলসহ ক্রীড়া সংগঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করছি।
চাঁদপুর স্টেডিয়ামে বিভিন্ন ক্লাবের হয়ে অংশ নেয়া প্রথম বিভাগ ক্রিকেট লীগের সাবেক ক'জন ক্রিকেটারের সাথে আলাপকালে তারা এ প্রতিবেদককে জানান, আমাদের সময় ২য় বিভাগ ক্রিকেট লীগ থেকে শুরু করে স্টেডিয়ামে নিয়মিত ক্রিকেট খেলা থাকতো। দিন দিন খেলাধুলা যতো উন্নতির দিক এগিয়ে যাচ্ছে, চাঁদপুর জেলা ক্রীড়া সংস্থা যেনো খেলাধুলা চালানোর ক্ষেত্রে অনেকটা পিছিয়ে যাচ্ছে। ঢাকাতে কিন্তু নিয়মিত ৩য় বিভাগ, ২য় বিভাগ ক্রিকেট লীগ হচ্ছে। সেখানে অনেক ক্রিকেটার খেলার সুযোগ পাচ্ছে। আর সেই সুযোগেই উঠতি বয়সী বিশেষ কেরে বয়সভিত্তিক ক্রিকেটাররা তাদের খেলার মাধ্যমে অনেক দূর এগিয়ে যাচ্ছে। সেখানে ইলিশের নগরী চাঁদপুরে আমরা অনেক পিছিয়ে। চাঁদপুর জেলা শহরসহ আমাদের জানা মতে, মতলব দক্ষিণ ও শাহরাস্তি সহ ৪টি ক্রিকেট একাডেমী রয়েছে। প্রত্যেকটি একাডেমীতে তো অনেক ক্রিকেটার নিয়মিত অনুশীলন করছে। এ সমস্ত ক্রিকেটার যেনো নিয়মিত অনুশীলন করে সেজন্যে তাদের পরিবারের সদস্যরা নিয়মিত তাদের সাথেও মাঠে আসছে।
চাঁদপুর আউটার স্টেডিয়ামে গেলে দেখা যাবে, কিন্ডারগার্টেন থেকে শুরু করে প্রাইমারি, হাইস্কুলে পড়ুয়া বিভিন্ন বয়সী ছেলেমেয়েরা ক্লেমন চাঁদপুর ক্রিকেট একাডেমীর মাধ্যমে অনুশীলন করছেন। আর এই একাডেমী থেকেই বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের দুই ক্রিকেটার খেলছেন। শামিম পাটওয়ারী ও মাহমুদুল হাসান জয়ের শুরুটা এ একাডেমীর প্রতিষ্ঠাতা ও চাঁদপুরের ক্রিকেটের কর্ণধার এবং জেলার অনেক একাডেমীর কোচের কোচ শামিম ফারুকীর মাধ্যমেই শুরু হয়েছিলো। পরবর্তীতে তারা ঢাকাতে বিভিন্ন ক্রিকেট লীগ ও চট্টগ্রাম বিভাগে জেলা পর্যায় থেকে ভালো খেলা নির্বাচকদের চোখে পড়াতে তারা এখন টি-২০ ও টেস্ট ক্রিকেট দলের নিয়মিত সদস্য। ঢাকা ও চট্টগ্রামে বিপিএল মাতানো ফার্স্ট বোলার মেহেদী হাসান রানারও সৃষ্টি ক্লেমন একাডেমীতে। এছাড়া চাঁদপুর স্টেডিয়ামের ভিতরে শেখ কামাল স্পোর্টস্ একাডেমীর কোচ এইচ এম বাবুর মাধ্যমে বিভিন্ন বয়সী ক্রিকেটার নিয়মিত অনুশীলন করছে। মতলব দক্ষিণে ক্রিকেটার মোদ্দাচ্ছের ও শাহরাস্তিতে সাদ্দাম হোসেন মিঠুর মাধ্যমে বিভিন্ন বয়সী বয়সভিত্তিক ক্রিকেটাররা অনুশীলন করছেন। জেলা স্টেডিয়ামে বয়সভিত্তিক প্রায় দেড় শতাধিক ক্রিকেটার মেডিকেলে উত্তীর্ণ হয়ে আছেন। কিন্তু তারা ক্রিকেট খেলার সুযোগ পাচ্ছেন না। মাঝে মধ্যে ক্রিকেট লীগ ও বঙ্গবন্ধু টি-২০ কিংবা ভাষাবীর এম এ ওয়াদুদ ক্রিকেট লীগ চালু হলেও এই বয়সভিত্তিক ক্রিকেটাররা বড় বয়সী সিন্ডিকেট ক্রিকেটারদের কারণে খেলার সুযোগ পায় না। আমাদের মূল কথা হলো, জেলা সদরে স্টেডিয়াম ও সুন্দর আউটার স্টেডিয়াম রয়েছে। এই মাঠগুলোতে নিয়মিত বিভিন্ন বয়সী ক্রিকেটারদের নিয়ে ক্রিকেট লীগ চালু করা হলে ক্রিকেটাররা তাদের খেলার ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে পারবে। সাবেক ক্রিকেটাররা ও বেশ ক'জন ক্রীড়া সংগঠক এ প্রতিবেদককে বলেন, আগে জেলাতে বিভিন্ন খেলাধুলা একটি নিয়মে চললেও বর্তমানে তার অনেক কিছুরই পরিবর্তন হয়ে গেছে। ক্ষমতাসীন দলের লোক কিংবা স্টেডিয়ামের বড় বড় কর্মকর্তার কাছের লোক তারা এখন বিভিন্ন বয়সভিত্তিক দলের বড় বড় দায়িত্ব নিয়ে বিভিন্ন স্থানে যাচ্ছেন। সাবেক ক্রিকেটারদের দিয়ে দলগুলোকে পরিচালনা করা গেলে তারা খেলার এবং খেলোয়াড়দের সকল কিছু বুঝতে পারতেন। যে ক'টি একাডেমীর কথা বললেন সাবেক ক্রিকেটাররা, তাদের দাবি অনুযায়ী, অনূর্ধ্ব ১২, ১৪, ১৫, ১৬, ১৭, ১৮ ও ১৯ বয়সী প্রায় ৫ শতাধিক ক্রিকেটার রয়েছে। তাদেরকে নিয়ে নিয়মিত বয়সভিত্তিক ক্রিকেট লীগগুলো যদি জেলা পর্যায়ে শুরু করা হয় তাহলে আগামীতে শামিম, জয়দের মতো অনেক ক্রিকেটারই জাতীয় পর্যায়ে খেলার সুযোগ পাবে। আর ওই সমস্ত ক্রিকেটার যদি খেলার সুযোগ না পায়, তাহলে এক সময় তারা খেলাধুলা থেকে হারিয়ে যাবে অনেক দূরে।
লীগে অংশ নেয়া দলগুলোর কর্মকর্তাদের সাথে আলাপকালে তারা জানান, আয়োজকরা যদি লীগটি চালু করে, তাহলে আমরা দল রেখেছি, আমরা খেলতে প্রস্তুত । ক'জনের সাথে আলাপকালে তারা এ প্রতিবেদককে নানা কথা জানান। মাতৃছায়া ক্রিকেটার্সের কর্ণধার সাবেক ক্রিকেটার মোঃ ফজলে রাব্বি জানান, লীগে অংশ নেয়ার লক্ষ্যে আমরা দলের বিভিন্ন খেলোয়াড়ের সাথে কথা বলে রেখেছি। জেলার বয়সভিত্তিক ক্রিকেটারদের নিয়ে আমরা দল গঠন করবো। আমরা লীগে ভালো কিছু করতে চাই।
ক্রিকেট কোচিং সেন্টারের কোচ পলাশ কুমার সোমের সাথে আলাপকালে তিনি বলেন, আমরা অনেক আগে থেকেই প্রস্তুত খেলার জন্যে। দলের অনেক খেলোয়াড়ই নিয়মিত অনুশীলন করে যাচ্ছেন। যদি আগামী মাসে খেলাটি শুরু করা হয়, তাহলে আমাদের দুটি একাডেমীর দলই এ লীগে অংশগ্রহণ করবে। আমরা চাই, এ লীগের মাধ্যমে উঠতি বয়সী ক্রিকেটারগণ খেলার সুযোগ পাক।
শেখ কামাল স্পোর্টস্ একাডেমী চাঁদপুরের উপ-ক্রীড়া সম্পাদক সাবেক ক্রিকেটার মাইনুদ্দিনের সাথে আলাপকালে তিনি বলেন, আমাদের একাডেমী থেকে দুটি দল রাখা হয়েছে। আমরা আমাদের একাডেমীর ক্রিকেটারদেরকে নিয়েই এবারের লীগে খেলতে চাই। আমরা চাই, বয়সভিত্তিক ক্রিকেটারদের নিয়ে নিয়মিত খেলাধুলার আয়োজন করা হোক।
অঙ্গীকার ক্রীড়া চক্রের প্রতিষ্ঠাতা ও ক্রিকেটার সাংবাদিক কামরুল ইসলাম এ প্রতিবেদককের সাথে আলাপকালে বলেন, অনেকদিন আগে থেকেই লীগটি শুরু হওয়ার কথা। আমরা ইতিমধ্যে দলের ক্রিকেটারদের নিয়ে বেশ ক'দিন অনুশীলন করেছি। আমাদের দল এর আগেও অংশ নিয়েছিলো। আমরা লীগে নিয়মিত খেলতে চাই। আমাদের দলটি যেনো লীগে ভালো কিছু করতে পারে সেজন্যে সকলের সহযোগিতা ও প্রত্যাশাসহ দোয়া চাই।
শাহরাস্তি ক্রিকেট একাডেমীর প্রতিষ্ঠাতা ও ক্রীড়া সংগঠক সাদ্দাম হোসেন মিঠুর সাথে আলাপকালে তিনি বলেন, আমিও ২য় বিভাগ ক্রিকেট লীগ খেলেছি একসময়। আমি আমার এলাকার উঠতি বয়সী ক্রিকেটারদেরকে নিয়ে এবারের ক্রিকেট লীগে খেলতে চাই। আমিই আমার উপজেলার খেলোয়াড়দের নিয়ে উপজেলা থেকে দল গঠন করেছি। যখনই খেলা শুরু হবে, আশা করি আমার দলের খেলোয়াড়রা অংশ নিবে।
চাঁদপুর আউটার স্টেডিয়ামে দুটি একাডেমীতে অনুশীলনরত বয়সভিত্তিক ক্রিকেটাররা এ প্রতিবেদকের সাথে আলাপকালে জানান, আমরা ২য় বিভাগ ক্রিকেট লীগসহ বয়সভিত্তিক ক্রিকেট লীগে নিয়মিত খেলতে চাই। জেলা পর্যায়ে চাঁদপুরের কৃতী সন্তান শিক্ষামন্ত্রী ডাঃ দীপু মনি এমপি, জেলা ক্রীড়া সংস্থার সভাপতি ও জেলা প্রশাসক কামরুল হাসানসহ জেলা ক্রীড়া সংস্থা দায়িত্বরত সবাই যদি আমাদের ছোটদের কথা চিন্তা করে বয়স ভিত্তিক ক্রিকেট খেলার আয়োজন করেন, তাহলে আমরা যে নিয়মিত অনুশীলন করি, আমরা কে কী রকম খেলা শিখেছি সেটা ম্যাচের মাধ্যমে ফুটিয়ে তুলতে পারবো। এছাড়া আমরা আমাদের ভুল-ত্রুটিগুলো শোধরাতে পারবো বড় বড় ম্যাচের জন্যে।