প্রকাশ : ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ০০:০০
বিতর্ক হচ্ছে কথা বলা ও যুক্তিপ্রধান উঁচু মাপের শিল্প

বিতর্ক হচ্ছে মূলত কথা বলার শিল্প। কথা বলার মাধ্যমে ভাষার সুষ্ঠু প্রয়োগ। বিতর্কের জন্যে ভাষা তাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলা বিতর্কে প্রমিত বাংলা ভাষার ব্যবহারই করা অত্যাবশ্যক। সাত-আট শব্দের একটি বাংলা বাক্য বলতে ৩-৪টি ইংরেজি মিশিয়ে বলার যে প্রচলন আজকাল দেখা যায়, বিতর্কে তেমনটা গ্রহণযোগ্য নয়। বিতর্কের ভাষা হবে স্পষ্ট, প্রাণচঞ্চল ও তথ্যনির্ভর। অপ্রয়োজনীয় অলংকার দিয়ে বক্তব্যকে অতি কাব্যিক করে ফেলা উচিত নয়। বিতর্ক হচ্ছে যুক্তিপ্রধান শিল্প। তাই কাব্য করে বা রূপকের আড়ালে লুকিয়ে না বলে সরাসরি কথা বলার চর্চাই এখানে বেশি প্রাসঙ্গিক হওয়া আবশ্যক।
আমরা তর্ক করি কেন? নিজের মত বা ইচ্ছাকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্যে। অর্থাৎ আমি যা পছন্দ করি, আমি যা চাই, তা পাওয়ার জন্যে যে শব্দ, বাক্য আমরা উচ্চারণ করি সেটাই তর্ক। তর্ক তো সবাই করি। মা-বাবা, ভাই-বোন, বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-স্বজন সবার সঙ্গে সবাই তর্ক করি। সমবয়সীদের সঙ্গে তর্ক করতে করতে মাঝে মধ্যে মারামারিতে আমরা জড়িয়ে পড়ি। সেই মারামারিতে কখনো কখনো রক্তপাতের মতোও ঘটনা ঘটে। তর্ক থেকে রক্তপাত ঘটার এমন দুর্ভাগ্যজনক উদাহরণ কিন্তু সব বয়সী মানুষের মধ্যেই রয়েছে। শুধু ছোটদের দোষ দিয়ে লাভ নেই। তর্কের এমন দুঃখজনক পরিণতি কেন হয়? এসব তর্কে জেদ, রাগ আর একগুঁয়েমি থাকে। রাগ কিন্তু আমাদের পরাজিত করে। জ্ঞানী ব্যক্তিরা তাই বলেন, রেগে গেলেন তো হেরে গেলেন। বিতর্ক এসবের ঊর্ধ্বে থেকে যুক্তির মাধ্যমে নিজের মতকে প্রকাশ করা।
শিল্প মানে তো সৌন্দর্যের বহিঃপ্রকাশ। কাজেই বুঝতে হবে, তর্কে কোনো সৌন্দর্য নেই। তাই তর্ক কোনো শিল্প নয়। বিতর্ক হচ্ছে শিল্প। সৌন্দর্যমণ্ডিত, পরিশীলিত, যুক্তিপূর্ণ তর্কই হচ্ছে বিতর্ক। সুন্দর করে গুছিয়ে, যুক্তি দিয়ে বুঝিয়ে যখন কেউ কথা বলে, শুনতে নিশ্চয়ই আমাদের ভালো লাগে। সেই ব্যক্তির কথা নিশ্চয়ই মন দিয়ে শুনতে ইচ্ছা করে। যিনি সুন্দর করে কথা বলতে পারেন, তিনিই সবার মন জয় করে নিতে পারেন। সুন্দরভাবে, গুছিয়ে কথা বলা একটি উল্লেখযোগ্য যোগ্যতা। এই যোগ্যতা অর্জনে সবচেয়ে কার্যকর মাধ্যম বিতর্কচর্চা। বিতর্ক তাই খুব উঁচুমাপের শিল্প।
বির্তক শুধুমাত্র শিল্প নয়, জ্ঞানচর্চার একটি অসাধারণ মাধ্যম বিতর্ক। বিতর্কচর্চার মধ্য দিয়ে অন্যের কথা ও যুক্তি শোনার মানসিকতা তৈরি হয়। পরমতের প্রতি শ্রদ্ধা ও সহিষ্ণুতার মানসিকতা গড়ে উঠে। আধুনিক সভ্যতার অন্যতম বৈশিষ্ট্য মতপ্রকাশের স্বাধীনতা। বিতর্ক বড় একটি শিল্প। এই শিল্পে যদি নিজেদের দীক্ষিত করা সম্ভব হয়, তাহলে একই সঙ্গে ভেতরে জন্ম নেবে জ্ঞানতৃষ্ণা, যুক্তিবোধ, পরমতসহিষ্ণুতা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, সর্বোপরি গণতান্ত্রিক চিন্তা-চেতনা। এই বৈশিষ্ট্যগুলো যে মানুষ নিজের মধ্যে ধারণ করতে পারে সে মানুষই আলোকিত মানুষ। তাই, বিতর্কের মাধ্যমেই আলোকিত মানুষ হওয়া সম্ভব।
রোটারিয়ান রেদওয়ান আহমেদ জাকির : মতলব ব্যুরো ইনচার্জ ও সহ-সম্পাদক (অন-লাইন), দৈনিক চাঁদপুর কণ্ঠ ও সাধারণ সম্পাদক, চাঁদপুর কণ্ঠ বিতর্ক ফাউন্ডেশন, মতলব দক্ষিণ, চাঁদপুর।