প্রকাশ : ০৭ অক্টোবর ২০২৩, ০০:০০

দিনশেষে কোনো একটা মাইলফলক অতিক্রমের ঘটনাকে হয়তো সহজ মনে হয়। পেছনের বন্ধুর পথ পেরোনোর ক্লান্তি-শ্রান্তি উবে গিয়ে সাফল্যের প্রাপ্তি মন ভরিয়ে দেয়। কিন্তু তবুও অভিযাত্রী মাত্রেই জানেন চূড়ায় আরোহনের স্বপ্ন পূরণে জীবন হতে যা গিয়েছে তা দিয়ে সাজানো যেত আরেক জীবন। পাঞ্জেরী-চাঁদপুর কণ্ঠ বিতর্ক প্রতিযোগিতা আজ সগৌরবে তার ধারাবাহিক যুগপূর্তির যে স্বর্ণদ্বারে আপন মহিমায় দাঁড়িয়ে, তার পেছনের গল্পও ঐ দুর্গম গিরি অভিযাত্রীর দুঃসাহসের মতো রোমাঞ্চকর। বিতর্কের মতো একটা কঠিন ও মেধানির্ভর শিল্পকে জেলার আনাচে-কানাচে তৃণমূলের দ্বারে দ্বারে পৌঁছে দিতে যে শ্রমণ্ডঘামণ্ডঅর্থ-আয়াস-উদ্যমণ্ডসময় আর জনবলের সম্মিলন ঘটাতে হয়েছে তাতে দক্ষযজ্ঞের চেয়ে তা কোনো অংশেই কম নয় বলে প্রতীয়মান। একই মান বজায় রাখার দৃঢ় অঙ্গীকারে প্রতিবারই আগের মানকে অতিক্রম করে একটানা বারো বছর বিতর্ককে নগর থেকে গ্রামে, আলো থেকে অন্ধকারে টেনে নিয়ে যাওয়া, এ যেন এক ব্রতঋদ্ধ হার্কিউলিসেরই কাজ। দধীচী মুনির মতো নিবেদন ও মগ্নতা না থাকলে ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়িয়ে এমন সময়গ্রাসী আন্দোলনকে জীবনদান করা কোনো সাধারণ মানুষের কাজ নয়। একদিনের উৎসব কিংবা একদিনের কর্মশালা আয়োজন অনেকটা সহজ হলেও কমপক্ষে তিনমাসব্যাপী একটা বিতর্ক প্রতিযোগিতাকে প্রান্তিক পর্ব থেকে তুলে এনে ধীরে ধীরে তাকে চূড়ান্ত পর্বে টেনে আনা অনেকটাই ডিঙ্গি বেয়ে সমুদ্র পাড়ি দেওয়ারই শামিল। বিশেষত জেলায় যখন বিতার্কিক জোগাড়ের চেয়ে মানসম্পন্ন বিচারকের সন্ধান পাওয়াটাই ছিল গুপ্তধন খুঁজে পাওয়ার মতো আনন্দময়। আয়োজক জনাব কাজী শাহাদাতের যে কয়েকঘন্টা ঘুমই কেবল উৎসর্গ করা হয়েছে এই প্রতিযোগিতার জন্যে, তার ফিরিস্তি দিতে গেলে তা হয়ে যেতে পারে নতুন যুগের এক মহাভারতের মতো। উত্তেজনা-উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠায় তার রাতগুলো রাত ছিলো না, হয়ে উঠতো দুঃস্বপ্ন আর চ্যালেঞ্জে ভরা অগম্য পারাবার। কিন্তু অন্তর্জগতে তাড়িয়ে বেড়ানো স্বপ্নে তিনি আবিষ্ট হয়ে ফেরি করে বেড়িয়েছেন আলোর ফুলকি, যে আলোর ফুলকিতে মানুষ-কুসুম হয়ে ওঠে মানস-কুসুম, শিশুরা-কিশোররা হয়ে ওঠে সভ্যতার মালঞ্চণ্ডমুকুল।
করোনার কোপানলে পুড়ে কয়লা না হয়ে কনককান্তি অর্জন করেছে বিতর্ক-শ্রমিকের সাধনা। ফলে কয়েক বছর বিরতিতেও মহান ব্রতের এতোটুকু ব্যত্যয় ঘটেনি। দুহাজার কুড়ি সালে যে যুগপূর্তি হওয়ার কথা ছিল তা অনিবার্য কারণে দুহাজার তেইশে ঠিকানা গাঁড়লেও উৎসাহ ও আয়োজনে ভাটা পড়েনি একটুও। 'বিতর্কে আজ নতুন জোয়ার / যুক্তিতে যুগ খুললো দুয়ার' এই স্লোগান তিন বছর আগে নির্ধারিত হলেও আজও তার আবেদন কমেনি এতোটুকু। কেননা, টানা এগার বছর পার করে বারো বছরের দ্বারে দাঁড়িয়ে যে উৎসব বাজিয়েছিল মাদলবাদ্য, তা আজ দুহাজার তেইশের স্রোতস্বিনীতে এসে স্রোত তো হারায়ইনি, বরং সেই স্রোতে যুক্ত হয়েছে নব আনন্দে জেগে ওঠার কল্লোল। আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার জগৎকে পাশ কাটিয়ে নিজ মেধায় শাণিয়ে তোলা যুক্তির জোয়ারে আজ দূর হতে চলেছে সকল সংশয়। যারা নতুন প্রজন্মকে নিয়ে আস্থাহীনতায় ভুগছিলেন, তাদের জন্যে পাঞ্জেরী-চাঁদপুর কণ্ঠ বিতর্ক প্রতিযোগিতা নিঃসন্দেহে একটি জুতসই জবাব।
আগামীদিনের কর্ণধারদের মস্তিষ্কে যুক্তির বীজতলা তৈরি করা কোনো চাট্টিখানি কথা নয়। এ যে কেবল জ্ঞানের চর্চা তা নয়। বরং এই প্রতিযোগিতার মাধ্যমে বিশৃঙ্খল জীবনকে শৃঙ্খলার পংক্তিতে আনার প্রয়াস লক্ষ্যণীয়। কেবল যে যুক্তিকেই এখানে শাণানো হয় তা নয় মোটেই। এর মাধ্যমে সময়ানুবর্তী হওয়ার যে শিক্ষণ প্রতিযোগীরা অর্জন করে তা অসামান্য। বাঙালির কাছে আবহমানকালের একটা প্রশ্ন প্রতিনিয়ত ঘুরপাক খায়, তা হলো, 'নয়টার ট্রেন কয়টায় ছাড়ে।' কিন্তু পাঞ্জেরী-চাঁদপুর কণ্ঠ বিতর্ক প্রতিযোগিতায় নয়টার ট্রেন সব সময় নয়টাতেই ছেড়েছে এবং ক্ষেত্র বিশেষে তা দুয়েক মিনিট আগেও ছেড়েছে। অর্থাৎ এই প্রতিযোগিতায় কেবল ভালো বক্তা বা ভালো যুক্তিবাদী পরমতসহিষ্ণু মানুষই তৈরি করা হচ্ছে না, তার পাশাপাশি সময়নিষ্ঠ বাঙালিও নির্মাণ করা হচ্ছে। সুতরাং এই একটি বিতর্ক প্রতিযোগিতা আসলে আদর্শ নাগরিক গঠনের সূতিকাগার হিসেবেই কাজ করে চলেছে। চাঁদপুরের জীবনবাদী দার্শনিক স্বামী স্বরূপানন্দ যে মূল্যবোধ তৈরির স্বপ্ন দেখেছিলেন আগামী প্রজন্মের মধ্যে, এই প্রতিযোগিতা বারো বছর ধরে সেই মূল্যবোধকে লালন করে এসেছে। অসাম্প্রদায়িক ও দেশপ্রেমিক মানুষ তৈরিতে পাঞ্জেরী-চাঁদপুর কণ্ঠ বিতর্ক প্রতিযোগিতা একটা পাঠশালায় পরিণত হয়ে গেছে। এই পাঠশালা হতে যারা স্নাতক হয়ে বের হচ্ছে তারাই তো আজ মাতিয়ে বেড়াচ্ছে স্ব-স্ব ক্ষেত্র।
বিতর্ক একটা ব্যয়-সাশ্রয়ী প্রজন্মণ্ডনির্মাণ ক্ষেত্র। অন্য সকল ক্ষেত্রে আমরা দেখতে পাই, ভালো মাঠ লাগে, দামি ঘাসের গালিচা লাগে, দামি দামি ব্যাট লাগে। কখনও কখনও কোটি টাকা দামের সুইমিং পুল থেকে শুরু করে অত্যাধুনিক টেনিস লন লাগে। এমনকি কিছু কিছু প্রজন্ম নির্মাণ-প্রক্রিয়ায় অনেক ব্যয়বহুল শব্দ নিরোধক মিলনায়তন এবং স্টুডিও লাগে। কিন্তু বিতর্ক হলো এমনই এক স্বল্প ব্যয়ের প্রজন্ম নির্মাণ-ক্ষেত্র, যেখানে বিনিয়োগের চেয়ে প্রাপ্তি অধিক। জগতে যারা মানবসেবায় নিবেদিত হয়ে নিজেকে নিমগ্ন রেখেছেন, তারা সবাই সেবাকে স্বার্থের ঊর্ধ্বে রেখে এগিয়ে এসেছেন। পাঞ্জেরী-চাঁদপুর কণ্ঠ বিতর্ক প্রতিযোগিতার আয়োজকবৃন্দ ঠিক এই মূলমন্ত্র বুকে ধারণ করেই গন্তব্যের দিকে ছুটে চলেছেন। সমাজকে নির্মাণ করতে গেলে প্রজন্মকে তার সঠিক পথের দিশা দেখিয়ে দিতে হবে। এই দিশা তৈরিতে বিতর্কের চর্চাই হলো কার্যকর হাতিয়ার। এ কারণেই যুক্তিতে নতুন যুগের সূচনা করে পাঞ্জেরী-চাঁদপুর কণ্ঠ বিতর্ক প্রতিযোগিতা আজ করোনা-উত্তর পৃথিবীকে জাগরণে বিভাবরী কাটিয়ে দেওয়ার পথ বাৎলে দিচ্ছে।
প্রজন্মের মুখের আগল খুলে দিয়ে আপন মত প্রকাশের ব্যবস্থা করতে পারাটা এক অসাধ্য সাধনের মতো। সেই অসাধ্যকে যারা করতল আমলকবৎ সহজ করে তোলেন নিজেদের অলাভজনক শ্রমে-ঘামে, তখন বলতেই হয়, যার সেবা যতো সঠিক, তার লাভ ততো অধিক। অর্থাৎ স্বার্থ ভুলে যিনি সেবায় মগ্ন থাকেন, তার সেবা ফলবতী হয়ে ওঠে প্রত্যাশার চেয়ে অধিক। যুগপূর্তির এই বিতর্ক আয়োজন আমাদের জন্যে সমুদ্র সেঁচে অমৃত মন্থনের মতো কঠিন হলেও তা হয়ে উঠুক সর্বাঙ্গীণ সফল ও সার্থক।
বিতর্কের জয় হোক।
যে আসে বিতর্কে সে হারে না।
যে আসে বিতর্কে সে হাল ছাড়ে না।
লেখক : উপদেষ্টা, দৈনিক চাঁদপুর কণ্ঠ ও চাঁদপুর কণ্ঠ বিতর্ক ফাউন্ডেশন; অধ্যক্ষ, চাঁদপুর বিতর্ক একাডেমি।