বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য

প্রকাশ : ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:০১

ঋতুপ্রিয় বাঙালি

তৃপ্তি সাহা
ঋতুপ্রিয় বাঙালি

নিজের ছোট্ট বারান্দায় বসে আছি। আমার কপালটা খুব ভালো। বড় আকাশটা দেখা যায় বারান্দা থেকে। ভোরের সূর্য এবং পূর্ণিমার রাতে চাঁদ দেখার সৌভাগ্য এখন পর্যন্ত হয়। জানি না কতদিন এভাবে আকাশ, সূর্য আর চাঁদ দেখতে পারব।

প্রকৃতির দিকে তাকিয়েই বুঝতে পারলাম, এটি বাঙালির শরৎকাল। বাঙালির ছয় ঋতুর একটি ঋতু। তৃতীয় ঋতু। এই ষড়ঋতুর প্রভাব বাঙালির জীবনে অনেক বেশি। যদিও সময়ের পরিবর্তনে অনেক ঋতুকে আমরা ফিকে করে দিয়েছি।

আমরা ছয়টি ঋতুর মধ্যে বসন্তকে, শীতকে, বর্ষাকে খুব বেশি জানি। খুব ভালোবাসি। অন্য ঋতুকে ভালোবাসি না, তা নয়। তবে আমরা, অর্থাৎ বাঙালিকে রচনা লিখতে বললে অথবা জিজ্ঞেস করলে, খুব ঝটপট উত্তর দেবে—হয় বসন্ত, না হয় বর্ষা, না হয় শীত। কিন্তু এটা তো ঠিক—বাংলার প্রত্যেকটি ঋতু বাঙালির জীবনকে উদ্যাপনের মধ্যে নিয়ে গেছে।

প্রথম ঋতু গ্রীষ্মকাল। গ্রীষ্মের আম, কাঁঠাল, জাম, লিচু। আ-হা, ভোজনবিলাসী বাঙালির কতটা আয়োজন। কোনটা রেখে কোনটা খাবেন? পৃথিবীর আর কোথাও এত টাটকা, এত সুস্বাদু, সুমিষ্ট এত ফল পাবেন না। সতেরো কোটি মানুষের দেশে, জমি শুধু কমছে, তারপরও ফলের অভাব নেই। আহা, পলিমাটির দেশ বাংলাদেশ, আমার দেশ, আমার মা। মাটির মায়া, দেশের মায়া। শুধু দিয়েই যান যে মাটি সে তো আমার মা।

চতুর্থ ঋতু হেমন্তকাল। হেমন্ত—এই ঋতুতে মাঠের ধান পেকে সোনালি হয়। কৃষকের হৃদয় আনন্দে ভরে যায়। কৃষক মাঠের ধান কেটে ঘরে তোলে। ঘরে ঘরে নতুন ধানের চাল দিয়ে পিঠা-পায়েস তৈরির ধুম পড়ে যায়। আচার-অনুষ্ঠানের মধ্যে এই নতুন খাওয়ার উৎসব পালিত হয়। ভুলে গেলে চলবে না, বাঙালি উৎসবপ্রিয় জাতি। তার বারো মাসে তেরো পার্বণ। জীবনকে তারা আনন্দে, উদ্যাপনের মধ্যে ভরিয়ে তুলতে অভ্যস্ত। আতিথেয়তা, আন্তরিকতা বাঙালির নাম ভুবনজোড়া। একে ‘নবান্ন উৎসব’ বলে। কৃষকের তথা বাঙালির মুখে অনাবিল আনন্দ ফুটে ওঠে। তবে আর যে যাই বলুন, অন্য সব ঋতুর মতো শরৎ ঋতুর বৈশিষ্ট্য, সৌন্দর্য একটু বেশি বৈ কম নয়। না না, আমি তর্কে যাচ্ছি না। আচ্ছা, আপনার কোন ঋতু প্রিয়? আমি জানি, একশ’জনের মধ্যে পঞ্চাশজনই বলবেন—কেন ঋতুরাজ বসন্ত ঋতু। কিন্তু! জানেন তো, কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন—

‘বসন্তে কি শুধু কেবল ফোটা ফুলের মেলা রে।

দেখিস নে কি শুকনো পাতা ঝরা ফুলের খেলা রে॥’

ত্রিশজন বলবেন— ‘বর্ষা ঋতু’। আমারও প্রিয়। সত্যিই তো, এ ঋতুতে জেগে ওঠে কবিমন, লেখকমন। আ-হা, চারদিকের এতটাই সবুজ, এতটাই সতেজতা, মন এমনিতেই জেগে ওঠে। ভালোবাসা জড়িয়ে রাখে নীরবে, নিভৃতে। আমি নিজেও এই বর্ষাতেই বাংলা মায়ের রূপ দেখতে, বেড়াতে যেতে পছন্দ করি। কিন্তু কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন—

‘নীল নবঘনে আষাঢ় গগনে

তিল ঠাঁই আর নাহি রে।

ওগো, আজ তোরা যাস নে ঘরের বাহিরে।

বাদলের ধারা ঝরে ঝরঝর,

আউশের খেত জলে ভরভর,

কালি মাখা মেঘে ওপারে আঁধার

ঘনিছে দেখ্ চাহি রে।

ওগো, আজ তোরা যাস নে ঘরের বাহিরে।’

সত্যিই তো, এই বর্ষায় যারা দিন এনে দিন খায়, যারা একদিন কাজে না গেলে খাওয়ার জোটে না, তাদের কী অবস্থা একবার ভাবুন। অধিক বৃষ্টিতে ফসলের জমি পানির নিচে তলিয়ে যায়, কী একটা অবস্থা! কৃষক, শ্রমিক, মজুর শুধু নয়—সাধারণ মানুষেরও দুর্ভোগ। আর পাখিগুলো বৃষ্টির ঝাপটা সইতে না পেরে গুটিয়ে নেয় নিজেদের। লুকিয়ে রাখে ঝোপের আড়ালে।

আচ্ছা, সত্তরজনের হিসাব পেলাম। বাকি ত্রিশজন? জানি, বিশজন বলবেন শীতকাল। কিন্তু কবিগুরু লিখেছেন—

‘কেন শীতের হাওয়া হঠাৎ ছুটে এলো

গানের বেলা শেষ না হ’তে হ’তে?

আমার মনের কথা ছড়িয়ে এলোমেলো

ভাসিয়ে দিলো শুক্নো পাতার স্রোতে।

আমার মনের কথা যত

তা’রা উজান তরীর মতো;

পালে যখন হাওয়ার বলে

মরণ-পারে নিয়ে চলে,

চোখের জলের স্রোত যে তাদের টানে

পিছু ঘাটের পানে—’

সত্যিই, শীত বিলাসিতা করার ঋতু। হাড় কাঁপনধরা শীতে বাঙালি গরিবের জীবনে বড় কষ্ট। চারদিকে বড় শুষ্কতা। গাছের পাতাগুলোয় ধূলোময়লা জমে। পাতার সবুজ রং ঢেকে যায় ধূলোয়। গাছগুলো রুক্ষ্ম হয়ে ওঠে। প্রকৃতির মধ্যে শূন্যতা আর হাহাকার ভাব ফুটে ওঠে। বাকি দশ জন এদিক-সেদিক হবেন। কিন্তু আমাকে যদি বলেন, আমি একবাক্যে বলব, ‘শরৎ অনন্য’। এই ঋতু শুধু সৃষ্টির প্রতীক। এই ঋতু সম্ভার আর সম্ভাবনার ঋতু। প্রকৃতি তার উপচেপড়া সৌন্দর্য ঢেলে দেয় এই ঋতুতে। নিজেকে উজাড় করে সৃষ্টির নেশায় মেতে ওঠে। প্রকৃতি সেজে ওঠে নতুন আলোয়। এই সময়ে বাঙালি বিভিন্ন রঙের ঘুড়ি ছেড়ে দেয় আকাশে।

বাংলার আকাশ থাকে পরিষ্কার নীল। আকাশে পেঁজা তুলার মতো সাদা মেঘ ভেসে বেড়ায়। কবি গেয়ে ওঠেন— ‘নীল আকাশে কে ভাসালে সাদা মেঘের ভেলা রে ভাই সাদা মেঘের ভেলা’

এই ঋতুতে বর্ষার আর্দ্রতা কেটে গিয়ে আবহাওয়ায় এক ধরনের শান্ত, কোমল ও ঠাণ্ডা আমেজ তৈরি হয়। মাঝে মাঝে হালকা রোদ ও ক্ষণিকের বৃষ্টির দেখা মেলে। প্রকৃতি স্নিগ্ধ হয়ে ওঠে। বর্ষার মাতম কাটিয়ে পাখিরা প্রকৃতিতে কিচিরমিচির, কুহুকাকলিতে চারপাশ জাগিয়ে তোলে। নদীর ধার বা ফাঁকা মাঠ সাদা কাশফুলে ভরে ওঠে, যা শরতের সবচেয়ে বড় রূপ। না না, আমরা এখনো কাশফুলের চাষ নিয়ে ভাবিনি। প্রকৃতি তার খেয়ালে মেলে ধরে তার ডানা, তার সৌন্দর্য।

ভোরে গাছের নিচে থরে থরে শিউলি ঝরে পড়ে। এর মিষ্টি সুবাস চারপাশ মাতিয়ে রাখে। এ ছাড়া বেলি, টগর, ছাতিম ও কামিনী ফুল ফোটে। চারপাশ ফুলের গন্ধে মৌ মৌ করে। শরতের চাঁদের বিশালতা, চাঁদের আলোর স্নিগ্ধতা বাঙালির মনে অনন্য স্থান করে নিয়েছে বহুকাল আগেই।

বিলে ও পুকুরে বিভিন্ন রঙের শাপলা-শালুক ফোটে। আকাশে সাদা বকের সারি উড়ে চলে। রঙিন প্রজাপতিগুলো আর ফড়িং উড়ে উড়ে প্রকৃতির সৌন্দর্য দেখে, মধু খায় আর গাছের পরাগায়ণ ঘটায়। এতে প্রকৃতি আরও অনন্য হয়ে ওঠে। আর মাঝি নৌকায় পাল তুলে বৈঠা বায় আর গলায় গান ধরে মনের সুখে।

আচ্ছা, এবার দেখি রবীন্দ্রনাথ কী লিখেছেন শরৎকে নিয়ে—

‘আজি কি তোমার মধুর মূরতি

হেরিনু শারদ প্রভাতে!

হে মাত বঙ্গ, শ্যামল অঙ্গ

ঝলিছে অমল শোভাতে।

পারে না বহিতে নদী জলধার,

মাঠে মাঠে ধান ধরে নাকো আর—

ডাকিছে দোয়েল গাহিছে কোয়েল

তোমার কাননসভাতে!

মাঝখানে তুমি দাঁড়ায়ে জননী,

শরৎকালের প্রভাতে।’

এছাড়াও গেয়েছেন—

‘মানিক গাঁথা ওই যে তোমার কঙ্কণে

ঝিলিক লাগায় তোমার শ্যামল অঙ্গনে

কুঞ্জছায়া গুঞ্জরণের সঙ্গীতে

ওড়না ওড়ায় একি নাচের ভঙ্গীতে

শিউলিবনের বুক যে ওঠে আন্দোলি

শরৎ, তোমার অরুণ আলোর অঞ্জলি

ছড়িয়ে গেল, ছড়িয়ে গেল

ছড়িয়ে গেল ছাপিয়ে মোহন অঙ্গুলি’

এই রকম প্রায় পঞ্চাশখানা গান-কবিতা লেখা আছে শরৎকে নিয়ে। কৃষক মাঠের ফসল ঘরে তুলেছে। বিক্রিও হয়েছে। আনন্দ ফুটে উঠেছে চোখে-মুখে। কৃষিপ্রধান বাংলায় কৃষকের হাতে আসে কাঁচা পয়সা। খাওয়া-দাওয়া, উৎসব আর অনুষ্ঠানে মেতে ওঠে কৃষিপ্রধান এই বাংলার মানুষেরা।

কাশফুল আর শরতের শিউলি বাঙালির মন উদ্বেলিত করে। সকল শ্রেণি-পেশার মানুষ নবআনন্দে জেগে ওঠে। প্রকৃতির সাথে মানুষ এতটাই সম্পৃক্ত যে, সে নিজেকে জাগিয়ে তোলে সৃষ্টির নেশায়। সৃষ্টির নেশায় বুঁদ হয়ে ওঠে। সৃষ্টির নেশায় কুমোর, কামার, ঢাকি, জেলে, ময়রা, শিল্পী, কবি, গায়ক, লেখক সকলে জেগে ওঠে নবআনন্দে। একত্রিত হয় এক মঞ্চে। হুম, বলছি বাঙালির সার্বজনীন উৎসব দুর্গোৎসবের কথা। শরতের শিউলি, কাশফুলের সৌন্দর্য শুধু শিল্পীর মন নয়, ঢাকির ঢাক বেজে ওঠে। ঢাকির ঢাকের তালের মধ্যেই সার্বজনীন দুর্গোৎসবের সূচনা হয়। আমার মনে পড়ে যায় সত্তর-আশির দশকের চাঁদপুরের দুর্গোৎসবের কথা, আর মনে পড়ে যায় ষাটের দশকের রাজশাহীর দুর্গোৎসবের কথা। (চলবে)

তৃপ্তি সাহা : লাইব্রেরি উন্নয়ন কর্মকর্তা (প্রাক্তন), মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর, বাংলাদেশ, ঢাকা।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়