প্রকাশ : ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:৫৯
আশ্বিন মাসে যেসব কৃষিকাজে লাভবান হতে পারেন কৃষক

শরতের শুভ্র কাশফুল, দিগন্তজোড়া সবুজ আর সুনীল আকাশে ভেসে বেড়ানো সাদা মেঘ জানান দিচ্ছে বর্ষার বিদায় ও শরতের আগমন। কৃষকের জন্য আশ্বিন মাসটি একদিকে চলতি আমন মৌসুমের পরিচর্যার গুরুত্বপূর্ণ সময়, অন্যদিকে রবি মৌসুমের বিভিন্ন ফসল ও ফলদ গাছের চাষাবাদের প্রস্তুতির সময়। বর্ষা মৌসুমের ক্ষতি পুষিয়ে নিয়ে কৃষি উৎপাদন বাড়াতে এ সময় পরিকল্পিতভাবে বিভিন্ন কৃষিকাজ করা প্রয়োজন।
কৃষিবিদ মোহাম্মদ মঞ্জুর হোসেনের মতে, আশ্বিন মাসে আমন ধানের পরিচর্যা, নাবি আমন রোপণ, আখের চারা তৈরি, কলার চারা রোপণ, বৃক্ষের পরিচর্যা, গবাদিপশু ও হাঁস-মুরগির স্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং মাছের পুকুর ব্যবস্থাপনায় বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া উচিত।
আমন ধানের পরিচর্যা
আশ্বিন মাসে আমন ধানের বয়স ৪০ থেকে ৫০ দিন হলে ইউরিয়ার শেষ কিস্তি প্রয়োগ করতে হবে। সার প্রয়োগের আগে জমির আগাছা পরিষ্কার করে নিতে হবে এবং জমিতে ছিপছিপে পানি রাখতে হবে।
বৃষ্টির অভাবে এ সময় খরা দেখা দিতে পারে। তাই প্রয়োজন অনুযায়ী সম্পূরক সেচের ব্যবস্থা করতে হবে। ফিতা পাইপের মাধ্যমে সেচ দিলে পানির অপচয় অনেক কমানো সম্ভব।
নিচু এলাকায় আশ্বিন মাসের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত স্থানীয় উন্নত জাতের শাইল ধানের চারা রোপণ করা যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে প্রতি গোছায় ৫ থেকে ৭টি চারা দিয়ে কিছুটা ঘন করে রোপণ করতে হবে।
এ সময় আমন ধানে শিষকাটা লেদা পোকা, মাজরা, পামরি, চুঙ্গি ও গলমাছি পোকার আক্রমণ হতে পারে। প্রতি বর্গমিটার জমিতে ২ থেকে ৫টি লেদা পোকার উপস্থিতি দেখা গেলে সতর্ক হতে হবে। নিয়মিত জমি পরিদর্শন, খুঁটি স্থাপন, আলোর ফাঁদ ও হাতজাল ব্যবহারের মাধ্যমে পোকার আক্রমণ নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ নিতে হবে।
এ ছাড়া খোলপোড়া ও পাতায় দাগ পড়া রোগ দেখা দিতে পারে। রোগ ও পোকার আক্রমণ বেশি হলে কৃষি কর্মকর্তার পরামর্শ নিয়ে অনুমোদিত বালাইনাশক সঠিক মাত্রায় ও সঠিক নিয়মে ব্যবহার করতে হবে।
নাবি আমন রোপণ
কোনো কারণে সময়মতো আমন ধান রোপণ করা সম্ভব না হলে আশ্বিন মাসের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত বিআর-২২, বিআর-২৩, বিনাশাইল বা স্থানীয় জাতের চারা রোপণ করা যেতে পারে। প্রতি গোছায় ৫ থেকে ৭টি চারা দিতে হবে।
আখের চারা তৈরির সময়
আশ্বিন মাস আখের চারা উৎপাদনের উপযুক্ত সময়। সাধারণত বীজতলা ও পলিব্যাগ পদ্ধতিতে আখের চারা তৈরি করা যায়। পলিব্যাগ পদ্ধতিতে চারা উৎপাদন করলে তুলনামূলক কম বীজ আখ প্রয়োজন হয় এবং চারার মৃত্যুহারও কমে।
চারা তৈরি করে বাড়ির আঙিনার সুবিধাজনক স্থানে সারিবদ্ধভাবে রেখে খড় বা শুকনো আখের পাতা দিয়ে ঢেকে রাখতে হবে। চারার বয়স ১ থেকে ২ মাস হলে মূল জমিতে রোপণ করা যায়। কাটুইসহ বিভিন্ন পোকার আক্রমণ থেকে চারা রক্ষায় সতর্ক থাকতে হবে।
কলার চারা রোপণে গুরুত্ব
অন্যান্য সময়ের তুলনায় আশ্বিন মাসে কলার চারা রোপণ লাভজনক হতে পারে। এ সময়ে চারা রোপণ করলে প্রায় ১০ থেকে ১১ মাসের মধ্যে কলার ছড়া সংগ্রহ করা সম্ভব।
ভালো উৎস বা বিশ্বস্ত চাষির কাছ থেকে সুস্থ-সবল অসি চারা সংগ্রহ করে রোপণ করতে হবে। চারা রোপণের জন্য ২ থেকে ২.৫ মিটার দূরত্বে ৬০ সেন্টিমিটার চওড়া ও ৬০ সেন্টিমিটার গভীর গর্ত করতে হবে।
প্রতিটি গর্তে ৫ থেকে ৭ কেজি গোবর, ১২৫ গ্রাম করে ইউরিয়া, টিএসপি ও এমওপি সার এবং ৫ গ্রাম বরিক অ্যাসিড ভালোভাবে মিশিয়ে ৫ থেকে ৭ দিন পর চারা রোপণ করতে হবে। কলাবাগানে সাথি ফসল হিসেবে ধান, গম ও ভুট্টা ছাড়া বিভিন্ন রবি ফসল চাষ করা যেতে পারে।
গাছপালার পরিচর্যা
বর্ষায় রোপণ করা কোনো চারা মারা গেলে সেখানে নতুন চারা রোপণের উদ্যোগ নিতে হবে। রোপণ করা চারার নিয়মিত পরিচর্যাও জরুরি।
বড় হয়ে যাওয়া চারার সঙ্গে বাঁধা খুঁটি সরিয়ে দিতে হবে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী চারার চারপাশের বেড়া বড় করে দিতে হবে। মরা ও রোগাক্রান্ত ডালপালা ছেঁটে ফেলতে হবে।
চারা গাছসহ অন্যান্য গাছে সার প্রয়োগেরও উপযুক্ত সময় এটি। গাছের গোড়ার মাটি ভালোভাবে কুপিয়ে সার প্রয়োগ করতে হবে। দুপুরে গাছের ছায়া যতটুকু এলাকায় পড়ে, সাধারণত সেই এলাকার মাটি কুপিয়ে জৈব ও প্রয়োজনীয় রাসায়নিক সার ভালোভাবে মিশিয়ে দিতে হবে।
হাঁস-মুরগি ও গবাদিপশুর যত্ন
আশ্বিন মাসে হাঁস-মুরগির কলেরা, ককসিডিওসিস ও রানীক্ষেত রোগের ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে। প্রাথমিকভাবে টিকা প্রদান, প্রয়োজনীয় ওষুধ এবং অন্যান্য ব্যবস্থা নিতে প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তার পরামর্শ অনুসরণ করা জরুরি।
এ মাসে হাঁস-মুরগির বাচ্চা ফোটানোর ব্যবস্থাও নেওয়া যেতে পারে। বাচ্চা ফোটানোর জন্য অতিরিক্ত ডিম দেওয়া উচিত নয়। ডিমে তা দেওয়া মুরগির জন্য প্রয়োজনীয় বিশেষ খাবারের ব্যবস্থা করতে হবে।
গবাদিপশুকে এ সময় কৃমিনাশক ওষুধ খাওয়ানো দরকার। রাতে গবাদিপশুকে খোলা জায়গায় না রেখে ঘরের ভেতরে রাখার ব্যবস্থা করতে হবে।
পানিতে জন্মানো কাঁচা পশুখাদ্য এককভাবে না খাইয়ে শুকিয়ে খড়ের সঙ্গে মিশিয়ে খাওয়ানো ভালো। এ সময় ভুট্টা, মাসকলাই, খেসারি ও বিভিন্ন জাতের ঘাস উৎপাদন করে গবাদিপশুকে খাওয়ানো যেতে পারে।
গর্ভবতী গাভী, সদ্য ভূমিষ্ঠ বাছুর ও দুধালো গাভীর বিশেষ যত্ন নিতে হবে। এ সময় গবাদিপশুর তড়কা, গলাফুলা ও ওলানফুলাসহ বিভিন্ন রোগের প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন।
মাছের পুকুরের পরিচর্যা
বর্ষায় পুকুরে জন্মানো আগাছা পরিষ্কার করে পুকুরের পাড় ভালোভাবে বাঁধতে হবে। মাছকে নিয়মিত পুষ্টিকর সম্পূরক খাবার দিতে হবে। পুকুরের প্রাকৃতিক খাদ্য উৎপাদন বাড়াতে প্রয়োজন অনুযায়ী সার প্রয়োগ করা যেতে পারে।
এ ছাড়া জাল টেনে মাছের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করতে হবে এবং রোগের লক্ষণ দেখা দিলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। এ সময় সরকারি-বেসরকারি নির্ভরযোগ্য মাছের খামার থেকে জিওল মাছের পোনা সংগ্রহ করে পুকুরে ছাড়ার উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।
আশ্বিনে ইঁদুর দমনে সমন্বিত উদ্যোগ
আশ্বিন মাসে সারা দেশে ইঁদুর নিধন অভিযান শুরু হয়। আমন ধানসহ অন্যান্য ফসলকে ইঁদুরের ক্ষতি থেকে রক্ষা করতে এ অভিযান গুরুত্বপূর্ণ।
তবে এককভাবে কোনো কৃষক বা নির্দিষ্ট এলাকায় ইঁদুর দমন করলে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন। এজন্য সমন্বিতভাবে ইঁদুর দমন কার্যক্রম পরিচালনা করা প্রয়োজন।
ইঁদুর দমনে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ও আধুনিক চাষাবাদ, গর্তে ধোঁয়া দেওয়া, ফাঁদ পাতা, পেঁচা, গুইসাপ ও বিড়ালের মতো উপকারী প্রাণীর মাধ্যমে ইঁদুর নিয়ন্ত্রণ, বিষটোপ ও অনুমোদিত পদ্ধতি ব্যবহার করা যেতে পারে। পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি বিবেচনায় রাসায়নিক বা বিষজাতীয় উপকরণ ব্যবহারে অবশ্যই সংশ্লিষ্ট কৃষি কর্মকর্তার পরামর্শ ও অনুমোদিত নির্দেশনা অনুসরণ করতে হবে।
কৃষকের পরামর্শ
কৃষির যে কোনো সমস্যা সমাধানে কৃষকরা নিকটস্থ উপজেলা কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ অফিসে যোগাযোগ করতে পারেন। কৃষিবিষয়ক বিশেষজ্ঞ পরামর্শের জন্য জাতীয় কৃষি কল সেন্টারের ১৬১২৩ নম্বরে যে কোনো মোবাইল অপারেটর থেকে কল করা যায়।
আশ্বিন মাসের কৃষিকাজে সময়মতো ও পরিকল্পিত পরিচর্যা, রোগ-পোকা দমন, সঠিক সার ও সেচ ব্যবস্থাপনা এবং সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করতে পারলে কৃষক চলতি মৌসুমের সম্ভাব্য ক্ষতি কমিয়ে উৎপাদন ও আয় বাড়ানোর সুযোগ পাবেন।
লেখক : কৃষিবিদ মোহাম্মদ মঞ্জুর হোসেন, তথ্য অফিসার (কৃষি), খামারবাড়ি, ফার্মগেট, ঢাকা।







