সোমবার, ৩১ আগস্ট, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য

প্রকাশ : ৩১ আগস্ট ২০২৬, ০৯:৪১

সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার

ছায়াশিকারি

মিজানুর রহমান রানা
ছায়াশিকারি

(পূর্বপ্রকাশিতের পর)

আট

ইরফান হোস্টেলে বসে ভাবতে থাকে। প্রতিদিনই একটি করে খুন, তার চারপাশের ক্লাসমেটরা মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু আততায়ী কেÑতা শনাক্ত করা যাচ্ছে না। তাহলে কি আরাধই এসব করছে তাদেরকে বিভ্রান্ত করতে? নাকি এগুলো জামশেদেরই কাজ, তাদেরকে ভয় দেখিয়ে নিঃশব্দ করে দেওয়ার জন্য?

কখনো কখনো শব্দ আর নিঃশব্দতার দ্বন্দ্ব এক অনির্দিষ্ট শেষের দিকে গড়ায়; আর চরিত্রেরা শুধু ইতিহাসের অংশ নয়, হয়ে ওঠে তার নির্মাতা। একশ বছর আগের ইতিহাস পড়ে নীতিনির্ধারকরা একপ্রকার হতাশ। এই দেশে পশ্চিম পাকিস্তানিরা অনেক চেষ্টা করেছে বাঙালিদেরকে দমিয়ে রাখতে। কিন্তু সে সময়, ১৯৫২ সালে, শুধু মাতৃভাষায় কথা বলার জন্য অদম্য সাহসীরা রাইফেলের গুলিকে নিজের বুকে গ্রহণ করে রক্তে ভেসে উঠে ইতিহাস গড়ে। তারপর ঊনসত্তর, একাত্তরের ২৫শে মার্চ। ঢাকা শহরে হত্যাযজ্ঞে মেতে ওঠে তারা।

এই হত্যাযজ্ঞ ও দমন-পীড়ন বাঙালিকে যে এক চেতনায় উদ্ভাসিত করেছে, সেই চেতনায় বাঙালি মরতে শিখেছে, কিন্তু ভাষাকে হারায়নি, স্বাধীনতা হারায়নি। তাহলে আজ কী হবে? এরা তো চুপটি মেরে বসে থাকে কিছুকাল। বাঙালি নির্যাতিত হতে হতে, মরতে মরতে জেগে ওঠে সাপের ফণা বিস্তার করে। সাপের বিষে শাসকদেরকে ধ্বংস করে দেয়। কারণ, প্রতিটি ক্রিয়ারই একটি বিপরীত ক্রিয়া আছে।

বাঙালি নীরবতাই পছন্দ করে; তবে কখনো কখনো নীরবতাই সবচেয়ে উচ্চস্বরের জবাব হয়ে দাঁড়ায়।

শহর ঘুমিয়ে আছে, কিন্তু বাতাস ঘুমায়নি। প্রত্যেক জানালার ওপারে জমে থাকা বাষ্পে কেউ যেন লিখে গেছে, “ভাষা হারালে মানুষ নিজেকেও হারায়।”

গভীর রাতে রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রকগোষ্ঠী এক গোপন সভায় বসে। তীব্র চাপে আবাল সিং একপ্রকার বিচলিত।

সুবোধ মিশ্র বলে, ‘আপনি শব্দ দমন করছেন, কিন্তু কেউ কাঁপন ছড়িয়ে দিচ্ছে। আপনি কি নিশ্চিত এই দমনই আপনাকে রক্ষা করবে? ছাত্ররা তো ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছে বিপ্লবের পথে। আমাদের গোয়েন্দারা সব খবরই দিচ্ছে।’

আবাল সিং চোখ বন্ধ করে বলে, ‘আমি নিশ্চিত, শব্দ থাকলে শাসন থাকবে না।’

ঠিক তখনই সভাকক্ষের দেয়ালে জ্বলজ্বলে একটি স্পন্দন ফুটে ওঠে। কোনো শব্দ নেই, কোনো স্ক্রিন নেই, তবুও সবাই অনুভব করেÑযেন কেউ বলছে, ‘শব্দের চেয়ে ভয়াবহ এক জিনিস আছে, যখন মানুষ অনুভব করতেও ভুলে যায়।’

আবাল সিং প্রশ্ন করে, ‘সুবোধ, এই স্পন্দন আসছে কোত্থেকে? কারা এই স্পন্দন তুলে আমাদেরকে বিরক্ত করছে?’

‘ওরা আহম্মকের দল, বিপ্লবী ছাত্র-জনতা। তারা একত্রিত হচ্ছে। ৫ দিন পর তারা নাকি আপনার প্রাসাদ আক্রমণ করবে,’ উত্তর দেয় সুবোধ মিশ্র।

‘একশ বছর আগের ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি? তাহলে ডিবিপ্রধান কারুণের কাজ কী হবে?’ চিৎকার করে আবাল সিং।

ভয়ে ভয়ে উত্তর দেয় সুবোধ, ‘সে তার বাহিনী নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়বে। এনএসআই, ডিজিএফআই সবাই গুলি করবে। প্রয়োজনে ওদেরকে রাস্তার সাথেই মিশিয়ে দেবে।’

‘আর আমার অন্য দুই বাহিনী? আকাশবাহিনী আর দেশরক্ষা বাহিনী কী করবে?’ প্রশ্ন করে আবাল সিং।

‘তারাও অ্যাকশনে যাবে, রক্তের বন্যা বইয়ে দেবে।’

‘আমার তো মনে হচ্ছে, তারা বিষয়টা মাথায় নিচ্ছে না। আগামীকাল সকালেই তাদেরকে ডাকো। আমি কথা বলব।’

পরদিন ডাকা হলো দুই বাহিনীপ্রধানকে। আকাশবাহিনী প্রধান কামুক সিং অভয় দিল, ‘না, তেমন সমস্যা হবে না। ওদেরকে আকাশ থেকে গুলি করে মুখ বন্ধ করে দেওয়া হবে চিরতরে।’

আর দেশরক্ষা বাহিনী প্রধান চাবুক সিং চুপচাপ। তাকে আবাল সিং প্রশ্ন করল, ‘তোমার বাহিনীর খবর কী?’

দেশরক্ষা বাহিনীর প্রধান চাবুক সিং বেশ দৃঢ়চেতা মানুষ। কথা বলেন কম, কিন্তু যা বলেন, তার ওজন অনেক বেশি। তিনি আবাল সিংকে উত্তর দিলেন, ‘গত ১৬ বছর যাবত জনগণ কথা বলতে পারেনি, শব্দ করতে পারেনি। তাদের মুখ আর বেশিদিন বন্ধ করে রাখা যাবে না। তারা হয়তো বিস্ফোরিত হতে পারে। এরই মধ্যে বহু লোককে শব্দ-পুলিশ হত্যা করেছে। তারা ফুঁসে উঠেছে। হয়তো ৫ তারিখে তাদেরকে আর ঠেকিয়ে রাখা যাবে না।’

‘তুমি একটা নির্বোধ, অকর্মণ্য, গাধা! তোমার মাথা মোটা। তুমি আমার আত্মীয় বলে তোমাকে আমি দেশরক্ষা বাহিনীর প্রধান করেছিলাম; এখন মনে হচ্ছে তুমিও ওদের ভাষায় কথা বলছ!’ আবাল সিং উত্তেজিত, তার রক্ত টগবগ করে ফুটছে।

এই ছায়াপথে বৃষ্টি আজ নিঃশব্দে হাঁটছে, হাতে শুধু ইরফানের খাতা। তাতে লেখা : “ভবিষ্যতের ইতিহাস এখন লেখা হচ্ছে শব্দহীন সুরে। যারা শুনতে পারবে, তারাই বাঁচবে। বাকিরা শুধু চলবে নকল আলোয়, নকল জীবনে।”

সে জানে, ইরফান এই শহরে আর নেই, কিংবা হয়তো আছে সবার মাঝেইÑকণ্ঠহীন জাগরণ হয়ে।

আরাধ ধীরে হেঁটে এসে দাঁড়ায় শহরের এক পুরোনো জলাশয়ের ধারে; যেখানে জলও কথা বলে না, কিন্তু তার ঢেউয়ে জমে থাকে প্রাচীন প্রতিচ্ছবি।

আরাধ আকাশের দিকে তাকায়, মনে মনে ভাবেন : আমি অস্ত্র ছিলাম, কিন্তু এখন আমি উপলব্ধি। আমি প্রতিশোধ ছিলাম, এখন আমি প্রশ্ন। আমি ছিন্ন কণ্ঠ থেকে জন্মেছি, কিন্তু আজ আমি নিজেই এক উচ্চারণ।

ঠিক তখনই দূরে এক শিশু ফিসফিস করে বলে, ‘তুমি কি শব্দ হতে চাও?’

আরাধ তাকায়। এবার তার ভেতরে কোনো দ্বিধা নেই। সে ধীরে ধীরে বলে, “না, আমি অনুভব হতে চাই। কারণ অনুভব হারায় না, সময়কেও হার মানায়।”

ভাবতে ভাবতে আরাধের বাহুর স্পিকারে ঝংকার দেয়। নিয়ন্ত্রকগোষ্ঠীর প্রধান আবাল সিংয়ের কথা তার মস্তিষ্কের ভেতরে প্রবেশ করে, ‘তুমি কোথায় আরাধ? এখনই আমাদের গোপন মিটিংয়ে চলে এসো।’

আরাধ আর দেরি করে না, সে নিয়ন্ত্রকগোষ্ঠীর সভায় হাজির হয়। তাকে দেখেই আবাল সিং প্রশ্ন করে, ‘তোমাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিলÑএই নিঃশব্দের শহরে কারা শব্দের ঝংকার বাজায়, কারা বিপ্লবের সুর তোলে তা গোপনীয়ভাবে আমাদেরকে জানানোর জন্য। আমরা তোমার মাধ্যমে সব কটাকে ধরে ধরে আয়নাঘরের কারাগারে বন্দী করতে চাই। কিন্তু তুমি ব্যর্থ হয়েছ আরাধ। তবে তুমি ছাড়াও আমাদের আরও চর ছড়িয়ে আছে তোমাদেরই চারপাশে; তারা নিশ্চয়ই জানাবে কারা কারা রাষ্ট্রের গোপন শত্রু। শীঘ্রই জানা যাবে। তবে তোমাকে আমরা ছাড়ছি না।’

নিয়ন্ত্রকগোষ্ঠীর ইশারায় সাথে সাথে আরাধকে বন্দী করা হলো। তারপর তাকে কারাগারের প্রকোষ্ঠে নিক্ষেপ করা হলো। আরাধ কারাগারে বসে বসে ভাবেন, ‘কখনোই নয়! মানুষের মুখের ভাষা যে স্রষ্টা দিয়েছেন, তাকে কেড়ে নেওয়ার অধিকার কারও নেই। মানুষ অবশ্যই কথা বলবেÑএকযোগে।’ সে সেই সময়টার অপেক্ষায় আছে।

তারপর কারাগারের প্রকোষ্ঠে বসে আরাধ অনুভব করে, এই নীরবতা আর নিঃসঙ্গতা কোনো শাস্তি নয়, বরং প্রস্তুতি। তার ভেতরে জমে থাকা প্রতিটি অনুভব, প্রতিটি প্রশ্ন, প্রতিটি স্মৃতি যেন একেকটি আগ্নেয়গিরির মতো ধীরে ধীরে জেগে উঠছে। কারাগারের দেয়ালে সে আঙুল দিয়ে লিখে রাখে : ‘আমি বন্দী নই, আমি প্রতীক্ষা। আমি কণ্ঠ নই, আমি প্রতিধ্বনি। আমি শব্দ নই, আমি অনুভব।’

শহরের বাইরে জনতার ভেতরে এক অদ্ভুত আলোড়ন। কেউ কিছু বলে না, তবুও সবাই জানে, কাল ভোরে কিছু একটা ঘটবে। তরঙ্গফলকে ছড়িয়ে পড়ছে একটিই বার্তা : ‘ভাষা কেড়ে নেওয়া যায়, কিন্তু অনুভব নয়। প্রস্তুত হও।’

বৃষ্টি, তাসফিয়া, ইমতিয়াজ, অনন্যাÑসবাই ছড়িয়ে গেছে শহরের নানা প্রান্তে। তাদের হাতে কোনো অস্ত্র নেই, কেবল সাদা কাগজে আঁকা রেখা, কেবল চোখে এক অদম্য দীপ্তি। হঠাৎ এক রাতে কারাগারের দেয়ালে ভেসে ওঠে সেই পুরোনো স্পন্দন; কেউ যেন বলছে, ‘তুমি একা নও।’

আরাধ চোখ বন্ধ করে, গভীরভাবে শ্বাস নেয়। তার মনে পড়ে সেই শিশুর কথা, সেই প্রশ্ন ‘তুমি কি শব্দ হতে চাও?’ আরাধ এবার নিজের ভেতরেই উত্তর খুঁজে পায় : আমি হতে চাই সেই নিঃশব্দ ঢেউ, যা একদিন পাহাড় ভেঙে দেয়।

হঠাৎ করে হোস্টেলে কোলাহল জেগে ওঠে। বেরিয়ে আসে সবাই। দেখতে পায় আরও একটা খুন হয়েছে, মেয়েটির নাম সোহাগী। আগের মতোই জামশেদকে কাছেই পাওয়া যায়। সে এবার নির্লিপ্ত কণ্ঠে ঘোষণা করে, ‘এই খুন তোমাদের মধ্যেই কেউ করছে। রাতে হোস্টেলের গেট তালাবন্ধ থাকে, কেউ প্রবেশ করতে পারে না। তাহলে তোমরাই খুনগুলো করছ। কে করছে? জবাব দাও।’ (চলবে)

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়