সোমবার, ১৭ আগস্ট, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য

প্রকাশ : ১৭ আগস্ট ২০২৬, ০৮:৪৪

খণ্ডে খণ্ডে অখণ্ড জীবন

পীযূষ কান্তি বড়ুয়া
খণ্ডে খণ্ডে অখণ্ড জীবন

(ছাপ্পান্নতম পর্ব)

অতিশয়োক্তি

অতিশয়োক্তি বাঙালির এক অসাধারণ শিল্প। কোনো কথা সাদামাটাভাবে না বলে তাতে কথার অলংকার যোগ করে তুলনামূলক মাধুরী মিশিয়ে বলতে পারাতেই যেন বাঙালির স্বস্তি। শৈশব থেকে মধ্য-পঞ্চাশের জীবনে নানা বিষয়ে এরকম অসংখ্য অতিশয়োক্তি শুনে এসেছি এবং শুনে যাচ্ছি। জীবনের এই খণ্ড খণ্ড প্রাপ্তিকে যোগ করলে অখণ্ড এক প্রাপ্তি তৈরি হয়, যাতে এসব শোনা অতিশয়োক্তি এক বিশেষ স্থান দখল করে আছে।

আমাদের ভিটেতে এক বৌদি ছিলেন। আমার জন্মের আগেই তিনি আমাদের গ্রামের কুলবধূ। তাঁকে তাঁর গাত্রবর্ণের জন্য সবাই আড়ালে-আবডালে ‘জামগুলা সুন্দরী’ নামেই ডাকতো। জামগুলা মানে কালো জাম। কিন্তু আমি বোধবুদ্ধিসম্পন্ন হওয়ার পর বুঝলাম, এটা একটা অতিশয়োক্তি। তিনি শ্যামাঙ্গিনী, কিন্তু ‘জামাঙ্গিনী’ নন।

আমার ছোটবোনকে একবার প্রতিবেশী এক বাড়ি থেকে রান্না করে বুনো কাঁকরোল খেতে দিয়েছিলো। দিনশেষে বিকেলে তাঁর কাছে প্রতিবেশী ফিডব্যাক জানতে চাইলো— তরকারি কেমন হয়েছে? ছোটবোন জবাবে বললো, “কী তরকারি দিলা কাকিমা, কুকুরেরও অরুচি!” অথচ ঐ তরকারি আমিও খেয়েছি; অত স্বাদ হয়নি, তবে অরুচিকর নয় মোটেই।

দখিন পাড়ার এক জেঠিমা ছিলেন। তাঁকে সবাই ‘মন্টুর মা’ বলে ডাকতো। তাঁকে যদি কেউ জিজ্ঞেস করতো, “ও মন্টুর মা, আজ কী তরকারি রাঁধলে?” তিনি জবাবে বলতেন, “আজ কচুর ছড়া দিয়ে পুঁইশাক রেঁধেছি। খুব স্বাদ হয়েছে।” অথচ পরক্ষণে তাঁর ছেলের বউ পাড়ায় বেড়াতে এসে বলে গেলো, “আজ ঘরে পুঁইশাকের তরকারিটা একেবারে যাচ্ছেতাই হয়েছে!” বলা বাহুল্য, শাশুড়ি আর পুত্রবধূর অভিব্যক্তি দুরকমের হলেও উভয়েরই অতিশয়োক্তির বাতিক ছিলো।

গ্রামের আড্ডা কিংবা খেজুরে আলাপের আসরে অনেকেরই হাসতে হাসতে নাকি পেট ফেটে যেতো! কিন্তু আমি কখনো কাউকে ফাটা পেট নিয়ে ডাক্তারের কাছে যেতে দেখিনি।

মাঝে মাঝে বাড়িতে অসময়ে কেউ বেড়াতে এলে মা ভাত খাওয়ার জন্য জোরাজুরি করতেন। কিন্তু অভ্যাগত ব্যক্তি সসম্ভ্রমে মাকে বলতেন, “ও কাকিমা, আজ কিছু খাবো না। অমুকদের বাড়িতে দাওয়াত ছিলো, একেবারে গলা পর্যন্ত ভরে গেছে খেয়ে!” আমি তখন কৌতূহলী হয়ে দেখতাম, এই বুঝি কথা বলতে গিয়ে তাঁর পেটের খাবার বেরিয়ে গেলো!

আমাদের পাড়ায় দু-একজন মানুষ ছিলো, যারা সবসময় তিলকে তাল করে বেড়াতো। তাদের একজন পুব পাড়ায় সদ্যোজাত এক শিশুর জন্মসংবাদ দিতে গিয়ে বলছে, “জানো তো! ওদের ঘরে একটা ছেলেশিশু হয়েছে, কোকিলের মতো কালো!” মা শুনে হেসে উঠে বললেন, “তা তুমি চোখে ঠিকঠাক দেখতে পেয়েছিলে তো ঘরের অন্ধকারে?”

পুকুরঘাটে ছোটবেলায় আমাদের স্নান করানোর দায়িত্ব ছিলো বড়দির। তাঁর হাতে একটা শুকনো ধুন্দুলের জালি থাকতো। তাতে সাবান মাখিয়ে তিনি ইচ্ছেমতো শক্তি দিয়ে ঘষা দিতেন। এতে গায়ের চামড়া জ্বলে উঠতো। আর বড়দি সন্তুষ্টি নিয়ে বলতেন, “দেখছিস! আধমণ আধ-আড়ি ময়লা উঠেছে!” কথাটা যে কতোটুকু অতিশয়োক্তি, তা আমরা ছাড়া আর কেই-বা জানতো! খেলেধুলে ময়লা কিছু গায়ে লাগতো, তবে তাতে আধমণ আধ-আড়ির মতো ময়লা হতো না নিশ্চয়ই।

পড়াশোনার ক্ষেত্রে কতো যে অতিশয়োক্তি শুনতে হয়েছে! মাকে বলতে শুনতাম, “জানিস! অমুক গ্রামে তোর বাপের বন্ধুর ছেলেমেয়ে দুটোই বারুদ!” আমরা জিজ্ঞেস করতাম, “কেন মা, কী হয়েছে?” “আরে, ওরা কখনো ক্লাসে সেকেন্ড হয়নি!” মায়ের কথা শুনে ভাবতাম, ক্লাসে প্রথম হওয়ার সাথে বারুদের কী সম্পর্ক?

মেজদা এসএসসি পরীক্ষা দিয়েছিলেন দোহাজারি থেকে। তখন আমার বড় মামা সেখানে পোস্টেড ছিলেন কর্মসূত্রে। মেজদা বাড়ি এলে শুনতাম, তাঁদের স্কুলে নাকি একটা কিংবদন্তি প্রচলিত আছে— তাঁদের বেশ কয়েকটা আগের ব্যাচে দেবাশিস নামে একজন ছাত্র ছিলেন, এসএসসির টেস্ট পরীক্ষায় স্কুলের স্যারেরা নাকি তাঁর খাতায় কোনো কলম বসাতে পারেননি! এবং স্বয়ং হেডস্যারকে নাকি তাঁর ইংরেজি খাতা দেখতে হয়েছে ডিকশনারি দেখে দেখে! শুনে তো আমার আক্কেল গুড়ুম!

আমার এসএসসি পরীক্ষার পর নোটখাতাগুলো সের দরে বিক্রি করতে গিয়েছিলাম মোটাবাবুর দোকানে। তাঁদের মুদিদোকানের নাম ছিলো ‘মেসার্স বিদ্যাময়ী স্টোর’। কিন্তু এ নামে কেউ চিনতো না; সবাই চিনতো ‘মোটাবাবুর দোকান’ বলে। কারণ তাঁরা দুভাই প্রদীপ ও প্রবীর স্বাস্থ্যবান ছিলেন, তবে ‘মোটা’ বলার মতো অতো মোটা ছিলেন না। তাঁরা দুজনেই স্নাতক পাস করা, তাও আবার বিএসসি। কিন্তু তাঁদের স্বাস্থ্য দেখে গ্রাহকরা দোকানের নামকরণ করলো ‘মোটাবাবুর দোকান’ বলে। বড়জন অর্থাৎ প্রদীপদা আমার খাতা দেখে বলে উঠলেন, “তোমার লেখা তো বেশ মুক্তোর মতো!” আমি হেসে উঠলাম, কারণ তাঁর এ অতিশয়োক্তিতে আমার লজ্জা লেগে গেলো। তিনি অবশ্য খাতাগুলো সের দরে কিনলেও তাঁর ছেলের জন্য ঘরে নিয়ে গিয়েছিলেন; ওগুলো আর সদাই বাঁধার কাজে ব্যবহার করেননি।

কৈশোরে বেশ সরল-সিধে ছিলাম বলে অনেক বকা খেতাম মা-দিদিদের কাছে। তাঁরা আমার সমবয়সী কোনো কোনো ছেলের উদাহরণ দিয়ে বলতেন, “অমুকের একদাঁতের বুদ্ধি কি তোর আছে?” আমি তো এ কথা শুনে বেমক্কা থ! দাঁতে আবার কারও বুদ্ধি থাকে কীভাবে? বুদ্ধি তো মাথায়, ব্রেনে থাকে!

পাশের ভবনে একটা ছেলে থাকতো ‘যিশু’ নামে। তার মা তাকে পান থেকে চুন খসলেই বকতেন। তাঁর বকাগুলো ছিলো অদ্ভুত! কথায় কথায় নিজের পেটের ছেলেকে ডাকতেন ‘ধলা পাঁঠা’ বলে। অসন্তুষ্ট হলে বলতেন, “তোর মতো ধলা পাঁঠাকে দিয়ে কিচ্ছু হবে না!” রাগ একটু বেড়ে গেলে বলতেন, “ধলা পাঁঠাটা কী করছে দেখো না! আজ বিয়ে করালে কাল বাচ্চা হবে, আর সে কিনা বাজার থেকে পয়সা দিয়ে পচা মাছ এনেছে!” যিশুর মায়ের গালাগাল শুনে আমি অবাক হতাম— তাহলে নয় মাস গর্ভে ধারণ করার বিষয়টা ভুল?

আমার এক দূরসম্পর্কীয় কাকা ছিলেন, মহিম কাকা। তিনি খেতে খুব ভালোবাসতেন। আমার বন্ধু কিরণ্ময়ের বাবা তাঁর পেশাগত জীবনের বন্ধু। একবার তাঁদের বাসায় নিমন্ত্রণ খেয়ে তার মাসছয়েক পর মাকে এসে বলছিলেন, “ও বৌদি, কিরণদের বাসায় যে ঘি-ভাত খেলাম, তার ঘ্রাণ এখনো হাতে লেগে আছে!” কাকার কথায় আমার দুষ্টু ছোটবোন বলে উঠলো, “চাপা মারা স্বভাব আর কাকার গেলো না!”

খ্রিস্টান বাড়িওয়ালা পেরেরাদের বাসায় থাকতে ওপরতলায় এক ভাড়াটে থাকতো। তাঁদের বাসায় কেউ একজন সংগীত সাধনা করতো। তা শুনে পেরেরার মেয়ের জামাই মনুকে বলতে শুনতাম, “উনি গান গাইলে একটা সুবিধা হয়, কোনো কাক আর এ পাড়ায় থাকে না!” অবশ্য তাঁর এ কথা কখনো সংগীতশিল্পীর কানে পৌঁছায়নি।

আমাদের বিল্ডিংয়ের উল্টোদিকে হাবিব নামের একজন থাকতো। রাতবিরাতে তাকে নিয়ে হৈ-হুল্লোড় হতো, কারণ সে তাদের বাড়িসংলগ্ন গাছের আগায় উঠে বসে থাকতো। আমরা সেই গাছকে ‘ভাদি গাছ’ বলতাম। এ গাছের কষে আঠা হয়, একে ‘ভাদির আঠা’ বলতো সবাই। গাছে কেন উঠতো? কারণ তাকে নাকি জিনে নিয়ে গেছে! এটা বেশ ক’দিন পরপরই ঘটতো। তো একদিন হাবিবের বড় ভাবীর মুখে শুনলাম, “হাবিবের নাকি এমন স্ট্রং ডায়রিয়া যে, সে টয়লেটে যেতে যেতে লম্বা হয়ে গেছে!” আমার শুনে বুঝে উঠতে বেশ কষ্ট হলো, পরে খুশি হলাম। কারণ হাবিব এমনিতেই খাটো ছিলো, বেশ খাটো। পাতলা পায়খানা হলে যদি সে লম্বা হয়ে যায়, তাহলে তো তার জন্যে সুসংবাদ! আমার কথা শুনে মা হেসে কুটি কুটি!

আমাদের স্কুলে রয় ডায়াস নামে এক টিচার ছিলেন, বেশ কড়া। সহপাঠী দুষ্টু বনফুলকে একদিন তিনি গণিত ক্লাসে বেঞ্চের ওপর দাঁড় করিয়ে বললেন, “ফের যদি কথা বলতে দেখি ক্লাসে, তবে পিটিয়ে তক্তা বানিয়ে দেবো!” ওনার চেয়ে এক কাঠি সরেস ছিলেন এন. পাঁড়ে টিচার, মানে নিরুপমা পাঁড়ে। তিনি বনফুলকে প্রায়শই বলতেন, “তোমাকে আমি পিটিয়ে লম্বা করে ছাড়বো!” বনফুল এসব অতিশয়োক্তি এক কানে নিয়ে অন্য কানে ছেড়ে দিতো, কিন্তু দুষ্টুমি সে ছাড়েনি।

ছাত্রজীবনে কিশলয় স্যারকে বলতে শুনতাম, তাঁর ছাত্ররা তাঁর সহকর্মীকে পড়াতে পারবে! পরে খবর নিলাম, তাঁর ছাত্রদের মধ্যে অনেকেই গণিত-বিজ্ঞানের জন্যে তাঁর অন্য সহকর্মীর কাছে প্রাইভেট পড়ে। বলার আর অপেক্ষা রাখে না, কিশলয় স্যার ছিলেন বাংলা-ইংরেজির শিক্ষক।

পেশাগত জীবনে রোগীদের অভিযোগ শুনতে গিয়ে বেশ কিছু অতিশয়োক্তির অভিজ্ঞতা হয়েছে। কেউ কেউ অভিযোগ করেন, এক সপ্তাহ যাবৎ তাঁর কোনো নাওয়া-খাওয়া নেই; অথচ তিনিই পরে বলেন, কয়েক লোকমা ভাত মুখে দেওয়ার পর আর রুচি হয় না! সারাদিন ঘুমিয়ে কাটানো এক প্রবীণ রোগী এসে জানান, গত মাসখানেক ধরে তাঁর চোখে একফোঁটা ঘুমও নেই। বললাম, “তাহলে আপনি চলছেন কেমনে?” বললেন, “ঘুমের ওষুধ খেয়ে।”

আমার এক যুগের পুরোনো রোগী যখন আসেন, তিনি আমাকে না হাসিয়ে ছাড়েন না তাঁর কথায়। তো তিনি একদিন গম্ভীর মুখে বললেন, “ডাক্তার ভাই, গত সাতদিন আমার কোনো বাথরুম হয় না।” “বলেন কী?”— আমি শুধাই। জবাবে বললেন, “হয়, তবে তা ছাগলের নাদির মতো।”

মাঝে মাঝে কোনো কোনো রোগীর মা রোগীকে বলেন, “ডাক্তারকে সবকিছু খুলে বল।” রোগী তখন ফ্যালফ্যাল করে মায়ের দিকে চেয়ে থাকে। কখনো কখনো ‘শুকিয়ে কাঠ’ হওয়ারও অভিযোগ শুনতে হয়; তখন মনে পড়ে বন্ধুর মায়ের কথা, অনেকদিন না দেখলে যার চোখে তার নাদুস-নুদুস ছেলেটিও রোগা-পাতলা হয়ে যায়!

চর অঞ্চলের এক বুড়ো চাচা আমার রোগীর চেয়েও আত্মীয় হয়ে গেছেন বেশি। মাঝে মাঝে তিনি আমার জন্যে তাঁর এলাকা থেকে কষ্ট করে আউশ চাল বহন করে আনেন পরম মমতায়। একদিন তিনি এসে বললেন, “কাকু, আমার খাওয়া-দাওয়া উঠে গেছে!” আমি বললাম, “কেমন?” বললেন, “এক পোয়া চালের ভাতও এখন খাইতে পারি না!” তাঁর কথা শুনে আমার চোখ কপালে ওঠার জোগাড়! এক পোয়া চালের ভাত খাওয়ার পরও যদি কারও খাওয়া-দাওয়া উঠে যায়, তাহলে তো আমি অনাহারেই থাকি সে তুলনায়!

বাজারে মিষ্টতার অতিশয়োক্তি করে আজকাল তরমুজকে বলা হচ্ছে ‘মধু মধু’। আমি ভাবি, তাহলে মধুকে কী বলে বিক্রি করছে? বাজার করতে গেলে আম কেনার সময় বলে, “চুনচুইন্যা মিঠা!” আর ঘরে এনে খেতে গেলে তা টক-মিষ্টি। তার মানে অতিশয়োক্তি কেবল কথার অলংকার নয়, বাণিজ্যেরও কৌশল। (চলবে)

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়