প্রকাশ : ০৫ আগস্ট ২০২৬, ০৯:৫২
মনোবিশ্লেষক নাট্যক্রিয়া অনুশীলনের ক্ষেত্র হোক সহজতর

স্বাস্থ্যবান মানব আত্মাই পারে মানবিক সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে; যার পূর্বশর্ত হচ্ছে এমন এক সমাজবাস্তবতা, যেখানে প্রতিটি মানুষ পারস্পরিক সহনশীলতার মধ্য দিয়ে জাতিসংঘ ঘোষিত সব মানবাধিকার ভোগ করতে সমর্থ হবে । কিন্তু বাস্তবিক অর্থে সেই প্রত্যাশা পূরণ আজও সুদূরপরাহত। তবে স্বপ্নের সেই পৃথিবী গড়ে তুলতে দুনিয়াময় চলছে নানামুখী প্রচেষ্টা। বিশেষত, শারীরিক স্বাস্থ্যের পাশাপাশি মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় দেশে দেশে নেওয়া হচ্ছে বহুমুখী উদ্যোগ। মন ও মননের সুসামঞ্জস্য আনয়নে এবং চাপমুক্ত মানস গঠনে চিকিৎসাবিজ্ঞান করছে বহুবিধ গবেষণা।
মনোবিশ্লেষক জেকব লেভি মোরেনো চিকিৎসাবিজ্ঞানের এই পথপরিক্রমায় নাট্যবিজ্ঞানের ক্রিয়াত্মক কলাকৌশলের সংযোজন ঘটিয়েছেন। তিনি উদ্ভাবন করেছেন এমন এক মনোচিকিৎসা বা প্রতিবিধানমূলক তথা থেরাপিউটিক নাট্যশৈলী, যা মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় যুগান্তকারী উদাহরণ সৃষ্টি করছে। উন্নয়নমূলক মনোবিজ্ঞানের দৃষ্টিভঙ্গি বিনির্মাণে ‘স্বতঃস্ফূর্ততা’ বা ‘ইমপ্রম্পটু’কে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে জেকব লেভি মোরেনো তঁার অন্যতম রচনা ‘থিয়েটার অব স্পনট্যানেইটি’ গ্রন্থে বলেছেন— ‘জীবন হলো আত্মার নিঃশ্বাস, স্বতঃস্ফূর্ততা হলো তার প্রশ্বাস; নিঃশ্বাসের মাধ্যমে বিষের (সংঘাতের) জন্ম হয়, আর প্রশ্বাসের মাধ্যমে তা অবমুক্ত হয়’।
এ পর্যায়ে স্বতঃস্ফূর্ততা অবচেতনকে চেতনার সাহায্যে নিরাপদে বেরিয়ে আসতে দেয়। বাইরের কোনো হস্তক্ষেপ ছাড়াই এই প্রক্রিয়া সংগঠিত হয়; চিকিৎসা হিসেবে এর গুরুত্ব এখানেই । মানুষের মধ্যে সৃষ্টিশীল সক্রিয়তা পুনঃআবিষ্কারের প্রত্যয়ে মোরেনো নাট্যবিজ্ঞানের শক্তিকে ব্যবহারের যে প্রচেষ্টা ১৯২১ সালে ভিয়েনায় সূচনা করেছিলেন, তা বর্তমানে বিশ্বের ১০০টিরও বেশি দেশে সফল ও কার্যকরভাবে চর্চিত হচ্ছে।
এই প্রক্রিয়ার মূল কথা হলো ‘ক্যাথার্সিস’। ‘ক্যাথার্সিস’কে মোরেনো অ্যারিস্টটলীয় ধারণার বাইরে গিয়ে যেভাবে ব্যাখ্যা করেছেন তা হলো—যাপিত জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে মানুষের মধ্যে যে অনুভূতির জন্ম হয়, তা ব্যক্তিক ও সামষ্টিক উপলব্ধির মধ্য দিয়ে জমাটবদ্ধ অচল সামাজিক কাঠামোকে সজীব করে তোলে। এক্ষেত্রে স্থবির হয়ে যাওয়া অনুভূতিকে জাগ্রত করতে ‘ক্যাথার্সিস’ প্রধানতম নিয়ামকের ভূমিকা পালন করে। মোরেনো ক্যাথার্সিসকে তিনটি প্রধান পর্যায়ে বিশ্লেষণ করেছেন : ১. অ্যাকশন ক্যাথার্সিস : এ পর্যায়ে চিকিৎসাপ্রত্যাশী ব্যক্তি বা সমষ্টি মূল ভূমিকায় অভিনয় করার সময় নিজ ক্রিয়া বা অ্যাকশনের মাধ্যমে গভীর আত্মজ্ঞান লাভ করে । ফলে আবেগজনিত বাধাগুলো বিলীন হয়ে যায় এবং ব্যক্তি তার স্বাভাবিক আচরণ ক্ষমতা ফিরে পায়। ফলস্বরূপ তার মধ্যে ইতিবাচক সক্রিয়তা উন্মোচিত হয়। ২. দর্শক ক্যাথার্সিস : এই পর্যায়কে তিনি অবলোকনকারীদের ক্যাথার্সিস হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। নাট্যক্রিয়া পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে দর্শকও এমন এক অভিজ্ঞতা লাভ করেন, যার মধ্য দিয়ে তিনি বা তারা অভিন্ন প্রশান্তি অর্জন করেন। ৩. নান্দনিক ক্যাথার্সিস : এ পর্যায়ে থেরাপিউটিক থিয়েটার সেশনে অংশগ্রহণকারী প্রোটাগনিস্ট, পর্যবেক্ষক (দর্শক), সেশন সঞ্চালক, থিয়েটার থেরাপিস্ট এবং অভ্যাগতরা এক নান্দনিক অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যান, যা সব পক্ষের সামগ্রিক সৃজনশীলতার উন্মেষ ঘটায়।
থেরাপিউটিক থিয়েটার সেশনে পরিচালিত সাইকোড্রামা (ব্যক্তি পর্যায়ে) এবং সোসিওড্রামা (সামাজিক পর্যায়ে) থেকে অতীত আনন্দ-বেদনার যে উপলব্ধি অর্জিত হয়, তার ইতিবাচক ও নেতিবাচক মাত্রা বিশ্লেষণ করা সম্ভব। এখানে ভূমিকা গ্রহণ ও অভিনয়ের মাধ্যমে ব্যক্তি বা সমষ্টির প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির হিসাব কষা হয়, যার মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠে ‘থেরাপিউটিক সমাজ’। আন্তঃব্যক্তিক ও আন্তঃসামাজিক সম্পর্কগুলো সন্তোষজনক পর্যায়ে উন্নীত হলেই কেবল একটি মানবিক ও সুসামঞ্জস্যপূর্ণ সমাজ প্রতিষ্ঠা সম্ভব। মোরেনো বিশ্বাস করতেন, চিকিৎসা এবং সামাজিক সক্রিয়তার আন্তঃপ্রক্রিয়াগত সম্ভাবনা সীমাহীন; এর অনুশীলন যত বাড়বে, সমাজ তত বেশি মানবিক হবে।
‘সারপ্লাস রিয়েলিটি’র মাধ্যমে অতীত, বর্তমান বা ভবিষ্যতের যে কোনো সংঘাতময় অবস্থাকে উপস্থাপনের ফলে অভিনেতা ও দর্শক—উভয়ের দৃষ্টিভঙ্গিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আসে। মোরেনোর মতে, থেরাপিউটিক সমাজ হলো এমন এক সমাজ, যেখানে প্রতিটি মানুষ মানবিক মর্যাদা ও সুসংগঠিত মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে জীবন অতিবাহিত করতে সক্ষম। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) ২০০১ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, উন্নত বিশ্বের ৫০ শতাংশ মানুষ মানসিক স্বাস্থ্যসেবা পেলেও উন্নয়নশীল দেশগুলোর চিত্র অত্যন্ত হতাশাব্যঞ্জক। ২০০৮ সালের এক প্রতিবেদনে জানানো হয়, রাষ্ট্রীয় নীতিমালার দুর্বলতা, দক্ষ জনবলের অভাব ও পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দের অভাবই এর প্রধান কারণ।
বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে ব্যক্তিগত মনো-সামাজিক বিপর্যয় প্রতিরোধে মনোবিশ্লেষক নাট্যক্রিয়া অনুশীলন অত্যন্ত জরুরি। সহিংসতাপূর্ণ পরিবেশে পেশাদার সেবা পাওয়ার সুযোগ সীমিত হয়ে পড়লে ব্যক্তিগতভাবে মানসিক চাপ ব্যবস্থাপনা করতে না পারলে ব্যক্তি দীর্ঘমেয়াদী ট্রমা বা মনোরোগে আক্রান্ত হতে পারেন। তাই বৃহত্তর স্বার্থে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি ও তাদের পরিবারের জন্যে এই অনুশীলনের ক্ষেত্রকে আরও সহজতর ও প্রশস্ত করতে হবে।
মানবসৃষ্ট দুর্যোগে উদ্ভূত পরিস্থিতি মন ও মননের ওপর যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে, তা মনোবৈজ্ঞানিকভাবে মোকাবিলা করা অতীব জরুরি। সৃজনশীল ক্রিয়াকলাপ ও ভূমিকাভিনয় অনুশীলন ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির মানসিক শক্তি বৃদ্ধিতে এবং নেতিবাচক মনস্তত্ত্বকে ইতিবাচক খাতে প্রবাহিত করতে কার্যকর ভূমিকা রাখে। অভিনয় কলা হলো নাচ, গান, চিত্রাঙ্কন ও সুসামঞ্জস্যপূর্ণ অঙ্গভঙ্গির এক সুসংগঠিত রূপ । শিল্পকলার এই বহুমাত্রিক অনুশীলন মানসিক প্রশান্তি আনয়নে সহায়ক ।
আসুন, আমরা যে যার অবস্থান থেকে একটি থেরাপিউটিক সমাজ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে সচেষ্ট হই। মনোবিশ্লেষক নাট্যবিজ্ঞানের নিয়মিত চর্চা ও অনুশীলনের মাধ্যমেই কেবল বর্তমান অস্থিতিশীল পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ এবং একটি মানবিক সমাজ প্রতিষ্ঠা সম্ভব। আশা করি, নীতিনির্ধারক মহল মানবিক কারণে এই নাট্যক্রিয়া অনুশীলনে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন।
লেখক : নির্বাহী পরিচালক, উৎস (টঞঝঅ)।








