শনিবার, ২০ জুন, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য

প্রকাশ : ২০ জুন ২০২৬, ০৯:২৩

রাজপুত্রের বিয়ে

মাইনুল তোহা
রাজপুত্রের বিয়ে

রাজ্যজুড়ে উদ্বেগ। আসন্ন যুদ্ধের ভয়াবহতা ভেবে শঙ্কিত। কারও চোখে ঘুম নেই। জনমনে উৎকণ্ঠা, এই বুঝি ডামাডোল বেজে উঠলো। রাজা উদয়পাণ্ডে অমাত্যবর্গ নিয়ে সভাগৃহে, উপায় বের করতে হবে আজকের মধ্যে।

উদয়পুর করদ রাজ্য, সিংহপুরের মহারাজ ধনপালের অনুগ্রহপ্রার্থী। সৈন্য-সামন্ত নেই বললেই চলে। অধীনতামূলক মিত্রতা নীতি গ্রহণ করেছে। নিরাপত্তাব্যবস্থা কেন্দ্র থেকে পরিচালিত। প্রজারা দ্বিধা-বিভক্ত, হিন্দু-মুসলমানের দ্বন্দ্ব। নিজেরা জাত-পাত, শিয়া-সুন্নি, মাযহাব নিয়ে মারামারিতে ব্যস্ত থাকে। রাজকর্মচারীরা মহারাজের লোক, প্রজাদের উপর নির্যাতন চালায়। সব দায়ভার রাজা উদয়পাণ্ডের ঘাড়ে চাপিয়ে দেয়। রাজন্যদের চোখে আনুগত্য নেই, যেনো প্রাণহীন পুতুল। সবকিছু যে একদিনে সম্ভব হয়েছে, এমন নয়। মহারাজ ধনপালের আছে আধুনিক অস্ত্র-শস্ত্র, সাগর-মহাসাগরের দখল নেওয়া চৌকস বাহিনী। আছে অভিজ্ঞ ডাক্তার, শক্তিশালী আইন প্রণেতা, আর দুঃসাহসিক বণিক সম্প্রদায়। সেবা দিয়ে মানুষের বিশ্বাস অর্জন করে, ধীরে ধীরে জনবল বাড়ায়। নিরাপত্তার জন্য আনে সামরিক বাহিনী, শিক্ষার জন্য গড়ে বিদ্যালয়, স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে হাসপাতাল, যোগাযোগের জন্য রাস্তাঘাট। চাকচিক্যে ভুলে মরণফাঁদে পা দিয়েছিল।

সিংহপুরের ব্যবসায়ীরা উদয়পুর থেকে কাঁচামাল নিয়ে যায়। সেখানে রয়েছে বড় বড় শিল্পকারখানা। প্রক্রিয়াজাত করে সেগুলো আবার উদয়পুরে নিয়ে আসে। দামে কম, মানে ভালো। স্থানীয় কারখানাগুলো চিরতরে বন্ধ হয়ে গেছে। সিংহপুর এখন পুরো অর্থনীতির নিয়ন্ত্রা, চাইলেও উপেক্ষা করা যাবে না। স্বেচ্ছায় দাসত্ব বরণ করেছে।

প্রতিবছর যথাসময়ে খাজনা প্রদান করে। অনাবৃষ্টির কারণে এবার ফসল ভালো হয়নি। রাজ্যে অভাব-অনটন লেগেই আছে। রাজা উদয়পাণ্ডে প্রচুর দান করে, রাজকোষ ফাঁকা। শাসক হিসেবেও ন্যায়পরায়ণ। প্রজাদের উপর বাড়তি কর চাপালে অবিচার হবে।

মন্ত্রীমশাই বললো, ‘মহারাজকে আমাদের সমস্যার কথা খুলে বললে হয় না?’

সেনাপতি তখন, ‘তা হয়তো হতো, কিন্তু ঝামেলা অন্য জায়গায়। পাশের রাজ্য বিদ্রোহ করেছে, আর সিংহপুরের অধীন থাকবে না, উপঢৌকন পাঠায়নি। সাথে আরও অনেকে যোগ দেবে বলে মনে হচ্ছে, ভয়ে এখনও মুখ খুলেনি। মহারাজ সু-সজ্জিত বাহিনী প্রস্তুত করছেন, খবরটা আমার এক বিশ্বস্ত বন্ধুর মাধ্যমে পাওয়া। ডাক আসতে পারে। গরিমসি করলে, কী থেকে কী হয়ে যায়!’

সময়মতো খাজনা পরিশোধ করতে হবে। শত্রুর সাথে শত্রুতা, বন্ধুর সাথে বন্ধুত্ব। যুদ্ধে গেলে, কিংবা নিজ অঙ্গরাজ্যে অভিযান পরিচালনা করলে, বিনা বাক্যব্যয়ে অংশ নিতে হবে, প্রশ্ন তোলা যাবে না­Ñ মহারাজ ধনপালের এ নিয়ম অলঙ্গনীয়।

‘সর্বনাশ! তাহলেতো মহাবিপদ। এমনিতেই তিনি খুব রাগী মানুষ’, রাজা উদয়পাণ্ডে বললো।

মহারাজ ধনপাল বিশাল সাম্রাজ্যের অধিপতি। যেমন ক্ষমতাধর, তেমনি অত্যাচারী। তার প্রাসাদের প্রতিটি ইট মানুষের রক্তে গড়া। সিংহপুরের আভিজাত্যের পেছনে লুকিয়ে আছে আশেপাশের রাজ্যগুলোর ক্ষুধা, যন্ত্রণা আর কষ্টের ইতিহাস। অন্যের সম্পদ লুট করে সমৃদ্ধ। নিজেকে দাবি করে সভ্যতার মুকুটমণি। পূর্বপুরুষের ছোটো রাজ্যকে দিয়েছে বিশালতা। আপন ভাইকে হত্যা করেছে সিংহাসন নিষ্কণ্টক রাখতে, পিতাকে করেছে গৃহবন্দি।

ক্ষমতা লাভের পর রাজ্য জয়ের নেশা পেয়ে বসে। একে একে দখল করে ছোটো-বড়ো অসংখ্য রাজ্য। প্রতিটির জন্য নিয়োগ দিয়েছে আলাদা শাসক। বিনা যুদ্ধে যারা আনুগত্য দেখিয়েছে, ফিরিয়ে দিয়েছে শাসনদণ্ড। এখনও চেষ্টা অব্যাহত, তবে কৌশল ভিন্ন। প্রথমে নিজেদের শিক্ষা, সংস্কৃতি, বিশ্বাস, মূল্যবোধ ছড়িয়ে দেয়। তারপর তৈরি করে নির্ভরশীল এক জাতি।

গতবছর চুক্তির কথা ভুলে এক রাজা অন্য রাজ্যের সাথে সম্পর্ক স্থাপন করেছিল, নিজেদের মধ্যে বাণিজ্য করবে। মহারাজ ধনপাল নিজের জন্য তা হুমকিস্বরূপ জ্ঞান করে, আক্রমণ চালায়। ভয়ে সে রাজ্যের পশু-পাখিসুদ্ধ পালিয়েছে। পরাজিত রাজাকে জনসম্মুখে ফাঁসিকাষ্ঠে ঝুলানো হয়েছে, ভাবলে এখনও গা কাঁটা দিয়ে উঠে।

রাজপুত্র প্রাসাদে ফিরেছে, শিকারে গিয়েছিল। মহারাজ ধনপাল চিত্তবিনোদনের জন্য শঙ্খমালা দ্বীপকে অভয়াশ্রম ঘোষণা করেছে। বিশাল জঙ্গল, রঙ-বেরঙের পাখি, প্রাচীন বৃক্ষরাজি। ভেতরে ছোটো-বড়ো অসংখ্য নদী। অবিরাম ঝর্ণাধারা। রয়েছে হাতি, কুমির, জলহস্তীর মতো বিশালাকার প্রাণী। গহীন অরণ্যে বাঘ, ভাল্লুক, সিংহ। রাতে আরও হিংস্র হয়ে উঠে, মাংসাশী পশুরা উল্লাস করে যা বাড়তি উন্মাদনা বয়ে আনে। শক্তি ও বুদ্ধিমত্তা পরীক্ষার জন্য উপযুক্ত। শেষপ্রান্ত অজানা। লোকমুখে প্রচলিত, সেখানে দৈত্য-দানবের বাস।

পুত্র রাজকাজে অংশ নেয় না, কেমন যেনো উদাস। অকারণে হাসে, গান গায়। বহু তপস্যার ফল। রাজ্য পরিচালনা বিদ্যা, শাস্ত্রবিদ্যা রাজা উদয়পাণ্ডে নিজ হাতে শিখিয়েছে। একটা আফসোসের জায়গা মনের গহীনে, মানুষের মতো মানুষ করতে পারলো না। ক্ষমতার লোভে কবে জানি পিতার বুকে ছুরি বসায়, এরকম ঘটনা অহরহ ঘটছে। সন্তানের হাতে শাসনদণ্ড দিয়ে মুক্তি চায়। বিকল্প কোনো পথ নেই, উত্তরাধিকার ছাড়া অন্য কাউকে রাজ-দায়িত্ব দেওয়া যাবে না। নিঃসন্তান রাজার রাজ্য মহারাজের হয়ে যায়, তার সৃষ্ট আইন বলে। শেষজীবন না­Ñহয় ধর্ম-কর্ম করে কাটিয়ে দেবে।

প্রাসাদের বাইরে মহারাজ ধনপালের দূত দাঁড়িয়ে আছে। প্রবেশের অনুমতি চাইছে।

‘খাজনা প্রদানের সময় এখনও পেরিয়ে যায়নি। হঠাৎ দূত?’ রাজা উদয়পাণ্ডে মনে মনে বললো। তার ইচ্ছে করছে পেছনের দরজা দিয়ে পালিয়ে যেতে। কিন্তু রাজ্যবাসীর কী হবে?

সভাসদগণ একে অন্যের মুখ চাওয়া-চাহি করলো। মৃদু গুঞ্জনে বাতাস ভারি হয়ে উঠছে, ‘আবার অনুমতি কীসের?’

অন্দরে কথাটা পৌঁছতেই রানি কান্নায় ভেঙে পড়লো। ‘এ বয়সে পথে নামতে হবে, আর যদি সবাইকে হত্যা করে?’

দূত মহারাজ ধনপালের প্রিয়পাত্র, মহারানির ভাই। বিশেষ কাজ ছাড়া তাকে কোথাও পাঠায় না। নিজেকে এ রাজ্যের রাজা ঘোষণা করার সাথে সাথে সভাসদ মেনে নেবে।

সামনে দাঁড়িয়ে হাসিমুখে রাজা উদয়পাণ্ডেকে কুর্নিশ করলো। এটা কাক্সিক্ষত আচরণ নয়, মহারাজের বাবুর্চিও অঙ্গরাজ্যের রাজার থেকে বেশি সম্মানিত।

‘মহারাজের পক্ষ থেকে বার্তা নিয়ে এসেছি, সাথে দিয়েছেন উপহার সামগ্রী। গ্রহণ করে ধন্য করুন। তার একমাত্র কন্যা ফুলকুমারীর সাথে আপনার পুত্রের বিবাহকার্য সম্পন্ন করতে চান। অতিসত্বর দিনক্ষণ ঠিক করার জন্য অনুরোধ জানিয়েছেন।’

আগের চেয়ে বেশি অবাক। রাজা উদয়পাণ্ডে আসন ছেড়ে সোজা অন্দরমহলের দিকে ছুটলো। স্বপ্নেও এরকম কিছু চিন্তা করা যায় না।

চারদিকে জয়ধ্বনি বেজে উঠলো।

দুই.

সিংহপুরে মহাসমারোহে আয়োজন চলছে। ফুলকুমারী মহারাজ ধনপালের একমাত্র কন্যা। মাসব্যাপী ব্রাহ্মণ ভোজ, গরিব-দুঃখীদের মাঝে খাদ্য-বস্ত্র বিতরণ। সপরিবারে আসতে শুরু করেছে পাশের রাজ্যের রাজা-বাদশারা। এÑবছর খাজনা মওকুফ। যাদের সাথে বৈরী সম্পর্ক, তাদেরও দাওয়াত করেছে। মেয়ে সবকিছুর ঊর্ধ্বে।

রাজা উদয়পাণ্ডে দিন-তারিখ ধার্য করে গেছে কিছুদিন আগে, সে থেকে উৎসব শুরু। বর কোথায় বসবে, কী খাবে, থাকার ঘর, সব পরিপাটি হওয়া চাই। জেলেরা টাটকা মাছ দিয়ে যায়, চাষারা নিয়ে আসে শাক-সবজি, ফল-মূল। প্রজাদের মনে আনন্দ, এই প্রথম ধনী-দরিদ্র্য এক সারিতে। আশীর্বাদ করে রাজকুমারীকে। মহারাজের প্রতি শত অভিযোগ থাকলেও রাজকুমারীকে ভালোবাসে।

সব আয়োজন সম্পন্ন হলো।

রাজকুমার যখন শিকারে আসে, তখন-ই পরিচয় ঘটে দু’জনের। রাজকুমারীকে ফাঁদ পেতে বিপদে ফেলে, আবার নিজেই উদ্ধার করে। রাজকুমারী এরকম শৌর্য-বীর্যবান একজনকে মনে মনে কামনা করতো। মহারাজ ধনপালের চাই উপযুক্ত কর্ণধার।

গ্রীষ্মকাল, যাত্রা শুরু করলো। সময় লাগবে একমাস। রানি বধুবরণের আয়োজনে ব্যস্ত। স্থলপথে যাওয়ার মতো পর্যাপ্ত যানবাহন নেই। রাজা উদয়পাণ্ডে রাজন্য ও আত্মীয়দের নিয়ে জাহাজে, রাজপুত্র বন্ধু-বান্ধবের সাথে বজরায়, সবাই মজমাস্তি করছে।

গভীর রাত, ঘুটঘুটে অন্ধকার। নদী পেরিয়ে সাগরে নামতেই কালবৈশাখী আঘাত হানে। প্রতিবছর গ্রীষ্মের মাঝামাঝি এমনটা ঘটে, এবার শুরুতে। ভোর হতেই চারদিক নিস্তব্ধ।

সকালবেলা জেলের দল আসে। জাহাজের তেমন ক্ষতি হয়নি, বজরাটি ডুবে গেছে। রাজপুত্র দরজা বন্ধ করে ঘুমাচ্ছিল, তাকে জাগানো যায়নি। বন্ধুরা সাগরে ঝাঁপ দিয়ে রক্ষা পেয়েছে। পানির নিচ থেকে প্রাণহীন দেহটা উদ্ধার করে। রাজা উদয়পাণ্ডে বেহুশ। চরের ধূ-ধূ বালিতে দু’জনকে পাশাপাশি শোয়ালো। একজনের জ্ঞান ফিরবে, আরেকজন অন্য ভুবনে।

‘এখানেই দাহকার্য সম্পন্ন হোক।’ রাজা উদয়পাণ্ডে সাথে আনা পুরোহিতকে নির্দেশ দিলো।

তিন.

শোকাতুর রানি সারাক্ষণ কাঁদে, ঘুমের ঘোরে প্রলাপ বকে। রাজা উদয়পাণ্ডে বাগানে পায়চারি করছে, মনে অস্থিরতা। সকালবেলা পিণ্ডদান করতে গঙ্গায় যাবে।

‘মা।’

এক ডাকেই ঘুম ভাঙলো। হয়তো অর্ধঘুমে ছিলো বা চোখে বুজে কিংবা জাগ্রত।

‘খোকা, আমার খোকা’, বলেই রানি চিৎকার করে উঠলো।

পাহারাদাররা ঝিমোচ্ছিল, এ’Ñক’দিন ভালো ঘুম হয়নি। সবাই দৌড়ে আসলো। এÑযে রাজকুমার! কীভাবে সম্ভব? নিজ হতে যাকে দাহ করেছে। ‘ভূত ভূত’ বলে রব তোলে, দাসীরা উলু দিতে শুরু করলো।

সাদা পিনানে আবৃত, মুণ্ডিত মাথা। চেহারায় পবিত্রভাব, নির্মল হাসি, দীর্ঘ তপস্যার ফলে মেদহীন শরীর। বলিষ্ঠ অথচ শান্ত চাহনি, মায়ের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে, যেনো দেবশিশু, আশীর্বাদ করতে নেমে এসেছে।

গড় হয়ে প্রণাম করে বললো, ‘মা, আমি এসেছি। গুরুজি মারা যাওয়ার আগে সব বলে গেছেন।’

রানি দীর্ঘ এক যুগ নিঃসন্তান ছিলো। মা ডাক শোনার আশায় এমন কোনো কাজ নেই, যা করেনি। ওঝা, বৈদ্য, কবিরাজ, তীর্থ সব করেছে। একদিন হিমালয় থেকে এক সাধু আসে, রাজগৃহে অতিথি হয়। রানি সেবা দিয়ে তুষ্ট করে, বর মাগে।

‘আমি আশীর্বাদ করে যাচ্ছিÑ তোর কোলে জমজ সন্তান আসবে। মনে রাখবি, দুই সন্তানের কথা কাউকে বলবি না। আমি আসবো, বড়ো সন্তানকে নিয়ে যাবো। আমার শিক্ষায় মানুষের মতো মানুষ করবো; যে হবে সকল মোহ-মায়ার ঊর্ধ্বে, মুক্তির দূত, সাধারণের মাঝে অসাধারণ।’

‘সেনাপতি?’

‘আদেশ করুন, জাঁহাপনা।’

‘আর কতদিন বাকি?’

‘সাতদিন।’

‘বরযাত্রা প্রস্তুত করো।’

‘যথা আজ্ঞা, মহারাজ।’

[কৃতঋণ : মো. জাকির হোসেন, অধ্যক্ষ, লুধুয়া হাই স্কুল এন্ড কলেজ, মতলব উত্তর, চাঁদপুর।]

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়