প্রকাশ : ১৩ জুন ২০২৬, ১০:৩০
ধারাবাহিক উপন্যাস-৪৫
নিকুঞ্জ নিকেতন

(পূর্ব প্রকাশের পর)
২৬.
জীবনের ধারাবাহিকতা থেমে থাকেনি কারণ নরেন্দ্রদা বেঁচে থাকার মূল মন্ত্রটা শিখিয়ে যেতে পেরেছিলেন। কোনো প্রতিকূলতাই যেন থামাতে না পারে একমাত্র মৃত্যু ছাড়া। এখন আমাদের একটাই লক্ষ্য দাদার অসম্পূর্ণ ইচ্ছাগুলোকে পূর্ণ করা। আমার খেয়াল আছে একদিন বিকেলে চায়ের চুমুকে বেশ আড্ডা জমে যায় আমাদের তারপর কথার মাঝে দাদা বলে উঠেনÑ
‘এসো আমরা আজ একটা অঙ্গীকার করি। আমাদের আশ-পাশে যারাই আছে আমাদের মতো আমরা তাদের বাঁচতে শিখাব। বার্ধক্য যে জীবনের অভিশাপ নয় এটা মানতে শিখাব। মানুষ চাইলেই তার ইচ্ছাশক্তির মাধ্যমে অনেক কিছু করতে পারে আর এজন্যই সে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ জীব এটা বোঝাব। অন্যের জন্য কিছু করতে পারা সত্যি ভাগ্যের বিষয়। তারপর বলেনÑআমাদের মধ্যে কোনো একজন যদি হারিয়ে যাই তাহলে নিকুঞ্জ নিকেতনের এই যাত্রা যেন থেমে না যায়। আমরা সকলে নিজেদের পেনশন দিয়ে এই পরিবার চালিয়ে যাচ্ছি পরবর্তীতেও চলবে যতদিন চলে। কথা দাও আমি নিজেও যদি না থাকি এ যাত্রা ফুরিয়ে যাবে না। আমাদের মাঝে কোনো একজনও যদি বেঁচে থাকি তাহলেও নিকুঞ্জ নিকেতন পরিবারকে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা থাকবে?’
আমরা সেদিন একে অপরে কথা দিয়েছিলাম আর সেটার সফলতায় এখন কাজ করে যাচ্ছি নিঃস্বার্থ চিত্তে। দিনগুলো কেটে যাচ্ছিল একপ্রকার কোনো সমস্যা ছিল না। নিকুঞ্জ নিকেতনে এখন তের জনের বসবাস তাদের মধ্যে নারী চারজন। থাকার জায়গার স্বল্পতা হলেও কোনোপ্রকার ম্যানেজ করে নিয়েছে সকলে। নরেন্দ্রদার রুমটা এখন বন্ধ থাকে এবং সেখানে কাউকে থাকার জন্য দেওয়া হয়নি। উনার রুমের প্রতিটি জিনিসকে অক্ষত অবস্থায় রাখা হয়েছে। যেটা যেখানে ছিল সেটা সেখানেই রয়েছে। মাঝে মধ্যে মনমোহন এসে রুম ঝাড় দিয়ে যায়। উনার রুমে কাউকে অ্যালাউ করা হয় না। এভাবেই কাটতে থাকে বেশ কিছুদিন তারপর একদিন বারান্দায় বসে সারোয়ার আর আমি আলোচনা করছি এমন সময় হঠাৎ ডাকহরকরা এসে একটা বড় খাম ধরিয়ে দিয়ে গেল। খাম খুলতেই দেখি উকিল নোটিশ। যেখানে বলা আছে নিকুঞ্জ নিকেতনের মালিক পক্ষ না থাকায় আমরা কতিপয় লোক এসে এটাকে দখল করে নিয়েছি। বিষয়টা দেখে চমকে উঠি প্রথমে। নরেন্দ্রদা এই সম্পত্তিতে আমাদের রেখে গেছেন আর বলে গেছেন নিজ হাতে গড়া তার এ পরিবার যেন বিলীন না হয়ে যায়। এখন এই মুহূর্তে উকিল নোটিশ কেন? যার সমস্যা সে তো এসেই আমাদের সাথে কথা বলতে পারে। দাদাকে কথা দিয়েছিলাম তার এ পরিবারকে নষ্ট হতে দেব না। গেইটের কাছ দিয়ে বিশাখা যাচ্ছিল কোথাও আমাদের বাইরে দেখে এদিকে আসতে থাকে।
‘অনিমেষ আংকেল, আপনারা সকলে একসাথে জড়ো হয়েছেন কেন? কোনো সমস্যা?
‘আদালত থেকে আমাদের নামে সমন জারি করেছে আমরা নাকি এখানকার অবৈধ দখলদার। মালিকপক্ষ না থাকায় এ বাড়ি জোর করে দখল করে আছি।’
‘তাহলে তো ঝামেলা হয়ে গেল বেশ।’
‘আমাদের শোনানীর দিন ধার্য করেছেন আগামী চব্বিশ তারিখে। তারমানে আরও বিশ দিন বাকি। নোটিশে বলা আছে আমাদের কাছে উত্তরের সপক্ষে দলিলাদি থাকলে পেশ করার জন্য। কোনো ভুয়া বা বানোয়াট কিছু প্রমাণিত হলে আইনি প্রক্রিয়ায় শাস্তির আওতাধীন থাকিবে।’
‘অনিমেষ আমার মনে হয় একজন ভালো উকিলের সহযোগীতা নেওয়া প্রয়োজন। আইনি মারপ্যাচ আমরা বুঝব না সেটা উকিলই সামলে নিবে।’
‘পিটার আংকেলের সাথে আমি একমত। আপনাদের বরং একটা ভালো উকিলের সাজেশন নেওয়া প্রয়োজন।’
বিশাখা বয়সে তরুনী হলেও বুদ্ধি-জ্ঞান আর চিন্তাধারায় বেশ পরিপক্ক। নরেন্দ্রদা কেন তাকে এতটা পছন্দ করতেন এখন বুঝি। তার মতো একটা দায়িত্বশীল ও গোছালো মেয়েকে অনায়াসে যেকোনো বিষয়ে ভরসা করা যায়। উকিল নোটিশের বিষয়টা কেমন যেন বিরক্তিকর করে তুলেছে আমাদের গতানুগতিক জীবনটাকে। বয়সের যে প্রান্তে আমরা দাঁড়িয়ে সেখানে সকলে চায় একটা নির্ভেজাল সরল জীবনপ্রণালি। এই বয়সে যেখানে নতুন করে বাঁচা মুশকিল সেখানে নতুন করে প্রতিবাদী হয়ে সমস্যার মোকাবিলা করা বেশ সাহসীকতার প্রয়োজন। অনিমেষকে বলা হয়েছে একজন ভালো মানের উকিল ধরতে সে বলেছে আমি খোঁজ নিয়ে দেখি। এরই মধ্যে বেশ কয়েকটা দিন চলে গেল। নিকুঞ্জ নিকেতনে এখন ভরন পোষনে আর্থিক অস্বচ্ছলতা দেখা দিয়েছে। বৃদ্ধ বয়সের মানুষগুলো এক এক করে নিজেকে গুটিয়ে নিচ্ছে তাছাড়া এদের নতুন করে বাঁচতে শেখানো একটা চ্যালেঞ্জ আর তার মধ্যে যুক্ত হয়েছে এই নুতন সমস্যা।
‘অনিমেষ তোমার উকিলের কী হলো। কিছু একটা করতে পারলে?’
‘আমাদের বর্তমান অবস্থা তো তুমি বোঝ সারোয়ার, বর্তমানে দ্রব্যমূল্যের যে উর্দ্ধগতি তাতে সকলের ওষুধ ও আনুষাঙ্গিক চাহিদা মিটিয়ে চারবেলার ভরন পোষণ এখন টানটান অবস্থায় চলে তাতে করে একজন উকিল নিযুক্ত করে তার ফিস দিয়ে আমরা কতদিন কোর্ট মোকাবিলা করতে পারব।’
‘তুমি ঠিকই বলেছ কিন্তু আমাদের যদি নিকুঞ্জ নিকেতন ছাড়তে হয় তাহলে এই মানুষগুলোকে নিয়ে যাব কোথায়? কোথায় হবে আবাসন যেখানে পরিবার ত্যাগ করে এরা এখন এভাবে এক ছাদের নিচে এসে জড়ো হয়েছে, কে দেবে আশ্রয়?’
‘ভাবনাগুলো আমাদেরও পিটার। আমি বলছি কী আমরা যদি একবার রাজীবের সাথে কথা বলি তাহলে কেমন হয়?’
‘বিষয়টা যেহেতু নিকুঞ্জ নিকেতনের তাহলে রাজীব আদালতে অবশ্যি আসবে। দেখি না বিষয়টা তারপর না হয় আলাপ-আলোচনা করে দেখা যাবে।’
পরবর্তী সপ্তাহে আমাদের কোটে হাজিরা দেওয়ার পালা। আদালতে এটার স্বপক্ষে কোনো দলিলাদি পেশ করব সেরকম কিছুই আমাদের কাছে নেই। দাদার মৃত্যুর সময় আমাদের তেমন কিছু বলেও যাননি। উনার অপূর্ণ বাসনা পূর্ণ করতে গিয়ে এখন আমরা সকলে অপরাধীর কাঠগড়ায়। যাই হোক সমস্যা যেখানে সমাধান কোথাও না কোথাও খুঁজে পাওয়া যাবে। আইনি মারপ্যাঁচ যদিও জটিল তবে এগুলো মানুষের সুবিধার জন্যই নিহিত। সত্যতাকে সামনে তুলে ধরে এগিয়ে যেতে হবে। আমাদের উদ্দেশ্য সৎ তাই সততার সাথে পরিস্থিতি মোকাবিলা করলে পরাস্থ হয়েও আফসোস থাকবে না। আমরা জানি বিষয়টা আমাদের পক্ষে না কারণ এই সম্পত্তির মালিক আমরা কেহই না। যিনি মালিক তিনি মারা গেছেন আর তার উত্তরাধিকারী এখন আমেরিকা প্রবাসী। শহরের প্রায় প্রাণকেন্দ্রের এই বাড়িটি অনেক মূল্যবান তাই যে কারো চোখ এর উপর পড়া অস্বাভাবিক না। আমরা এখানে আছি বলেই কেহ এটাকে জোরপূর্বক দখল করার সাহসটুকু পায়নি। আবার অন্যভাবে ভাবলে দেশে এখন নতুন করে আইন পাশ হয়েছে যেখানে জায়গার যথাযথ নথিপত্র যার নামে থাকছে জায়গার মালিক উনি তাহলে সেভাবেও আমাদের এই বাড়িতে উচ্ছেদ করাটা মুহূর্তের বিষয়। অবশেষে চব্বিশ তারিখ আমাদের দরজায় কড়া নাড়ল। আমরা তিনজন যথারীতি কোর্টের দরজায় হাজির হই। কোর্টে মামলা উঠে যথারীতি আমাদের ডাক পড়ে। জজ এসে বসার পর আমাদের মামলার নথিপত্র পেশ করেন বিপক্ষের উকিল। জজ সাহেব আমাদের পরিচয় জানতে চাইলে আমরা তিনজন এক এক করে নিজের পরিচয় দিলাম পেশা ও পরিবার উল্লেখ করে। বিপক্ষের উকিল জেরা করবেন তার আগেই জজ সাহেব তাকে থামিয়ে দেয়। [পরের পর্ব আগামী সংখ্যায় ছাপা হবে]







