প্রকাশ : ০৯ মে ২০২৬, ০৮:৩৫
প্রজাপতি

শহরের ব্যস্ততার মাঝে এক চিলতে বারান্দা। সেখানে একটা পুরোনো আরামকেদারা আর থরে থরে সাজানো কিছু ক্যাকটাস। অর্পার পৃথিবীটা এই বারান্দা আর ওর হুইলচেয়ারের চারপাশেই সীমাবদ্ধ। আট বছর বয়সে এক ভয়াবহ দুর্ঘটনায় অর্পা তার চলার শক্তি হারায়। সেই একই দুর্ঘটনায় ও হারিয়েছিল তার মা-কেও। আজ দশ বছর পর, আঠারো বছরের অর্পা ডায়েরির পাতায় জলরঙে শুধু একঝাঁক প্রজাপতি আঁকে।
ওর বাবা, শফিক সাহেব, মেয়ের এই নিরব একাকিত্ব খুব ভালো করেই বুঝতেন। তিনি চাইতেন অর্পা যেন আবার হাসতে শেখে, কিন্তু অর্পার মনের ভেতরটা যেন এক শক্ত খোলসের মতো হয়ে গিয়েছিল ভেতরটা যেনো ধুমরে-মুচড়ে যার তার নিজের এই অবস্থার কথা ভাবলে।
অর্পার আঠারোতম জন্মদিনের সকালে শফিক সাহেব একটা কাঁচের ছোট বাক্স নিয়ে এলেন। ভেতরে সবুজ পাতার ওপর একটা ধুসর রঙের অদ্ভুত ‘গুটি’ বা পিউপা। অর্পা অবাক হয়ে তাকাল। বাবা বললেন, “মা, আমার এটা তোর জন্য এক বিশেষ বন্ধু। কয়েকদিন পর দেখিস কী সুন্দর এক পরিবর্তন ঘটে।”
পরের কয়েকটি দিন অর্পার সময় কাটত ওই বাক্সটার দিকে তাকিয়ে। ও দেখত, গুটিটা মাঝে মাঝে নড়ে ওঠে। ওর মনে হতো, ভেতরে কোনো এক সত্তা ছটফট করছে বাইরে আসার জন্য ঠিক ওর মতো সেও চায় বাইরের জগৎ টাকে দেখতে নিজে উপভোগ করতে। কিন্তু তেতে সে অক্ষম।
পরদিন ভোরবেলা। আকাশ পরিষ্কার। অর্পা ক্লান্ত হয়ে ওর হুইলচেয়ারেই ঘুমিয়ে পড়েছিল। ভোরের প্রথম আলো যখন ওর মুখের ওপর পড়ল, ও দেখল ওর ডায়েরির ওপর বসে আছে অপূর্ব সুন্দর এক নীল প্রজাপতি। ডানাগুলো এখনো একটু ভেজা, কিন্তু তাতে রেশমের মতো ঝলক।
প্রজাপতিটা একবার ডানা ঝাপটে শূন্যে ভাসল। তারপর অর্পার হাতের ওপর একবার বসে আবার উড়ে গিয়ে বারান্দার টবে বসল। অর্পা মুগ্ধ হয়ে দেখল, কালকের সেই তুচ্ছ ধুসর গুটিটা আজ আকাশের মালিক।
শফিক সাহেব দরজায় এসে দাঁড়ালেন। অর্পা ডানা মেলতে থাকা প্রজাপতিটার দিকে তাকিয়ে বলল, “বাবা, আমি ভুল ছিলাম। আমি ভাবতাম আমার কষ্টগুলোই আমার শেষ। কিন্তু এখন বুঝছি, এই লড়াইটাই আসলে আমার ডানাগুলোকে শক্ত করছিল।আমাকে আসল জীবন টা চিনতে সাহায্য করছিলো।”
অর্পা সেদিন থেকে আর ডায়েরিতে শুধু প্রজাপতির ছবি আঁকল না। ও আবার পড়াশোনা শুরু করার সিদ্ধান্ত নিল। ও বুঝল, পা দুটো অকেজো হতে পারে, কিন্তু ওর মেধা আর স্বপ্নের তো ডানা আছে। ওর মনের তো ইচ্ছা আছে স্বপ্ন আছে।
কয়েক মাস পর, অর্পা যখন তার প্রথম বড় কোনো অর্জনের জন্য মঞ্চে উঠবে, তখন ওর শাড়ির আঁচলে একটা নীল প্রজাপতির ব্রোচ ঝকঝক করছিল। ও এখন জানে, খাঁচার ভেতর থেকেও আকাশ ছোঁয়া যায়— যদি মনের ভেতরে প্রজাপতির মতো ডানা মেলার সাহস থাকে। প্রজাপতির মতো ইচ্ছা থাকে।








