শনিবার, ০৯ মে, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য

প্রকাশ : ০৯ মে ২০২৬, ০৮:৩২

ধারাবাহিক উপন্যাস-৪১

নিকুঞ্জ নিকেতন

রাজীব কুমার দাস
নিকুঞ্জ নিকেতন

(পূর্ব প্রকাশের পর)

‘সারোয়ার-অনিমেষ তোমাদের না বলেছি আমায় এভাবে একা ফেলে যাবে না। তোমাদের না দেখলে আমার মনটা যে কেমন করে।’

‘সরি দাদা, আপনাকে আর কখনো একা থাকতে হবে না এবার থেকে আমরা কেউ না কেউ আপনার সাথে থাকব সারাক্ষণ।’

‘হরিপদ-মৃণ¥য়ী তোমাদের কাছে কিছু চাইব আমাকে দিবে?’

‘কী দাদা?’

‘বিশাখাকে আমায় দিয়ে দাও।’

‘এটায় চাওয়ার কী আছে ও তো আপনারই মেয়ে।’

‘সত্যি বলছ! তাহলে রাজীবের জন্য তোমার বিশাখাকে চেয়ে নিলাম।’

‘দাদা আপনি সুস্থ্য হয়ে উঠুন তারপর আপনার মেয়েকে আপনি নিয়ে যাবেন এতে আমাদের কোনো সমস্যা নেই।’

অনিমেষ ও সারোয়ার আংকেল বেশ উৎসাহ নিয়ে এগিয়ে এসে আমায় আশীর্বাদ করলেন আর বাবা-মা তাদের চোখে-মুখেও সন্তুষ্টি কিন্তু আমি কিছুতেই কথাটায় খুশি হতে পারছি না। মনের মধ্যে একটা শংকা কাজ করছে তাহলে কী কাকাবাবু নিজের বিষয়ে কিছু আঁচ করতে পারছেন! নাকি এটা একপ্রকার ভ্রম। ছেলের জন্য উনার মনটা ব্যকুল হয়ে আছে এটা বুঝতে আমাদের কারো বাকি নেই। অনিমেষ আংকেল আমাকে আড়ালে ডেকে নিয়ে বিষয়টা জানার চেষ্টা করে এবং সাথে এসে যুক্ত হয় সারোয়ার ও পিটার আংকেল। আমি সবকিছুই বর্ণনা করেছি এক এক করে।

‘রাজীবকে আমাদের জানানো প্রয়োজন। দাদার অবস্থা আমার কাছে ভালো ঠেকছে না তাছাড়া সন্তানের জন্য উনার যে আকুতি তাতে বাপের রুহের কষ্ট ছেলেরও অমঙ্গল ডেকে আনবে।’

‘আমারও তেমনটাই মনে হয় সারোয়ার। এক কাজ করলে কেমন হয় আমরা না হয় ফোন করে রাজীবকে বিস্তারিত জানাই, তাকে আসতে বলি।’

‘অনিমেষ আংকেল আমি তাকে জানিয়েছি সে আগামী কাল দেশে এসে পৌঁছাবে। আমাদের যেটা করতে হবে সেটা হলো রাজীবকে সামলানো কারণ কাকাবাবুর এ অবস্থার কথা বলার পর সে উন্মাদের মতো আচরণ করল আর আমায় বলল আমি যেভাবেই হোক দেশে আসব।’

রাত আনুমানিক নয়টা ডাক্তার সন্ধ্যায় কিছু টেষ্ট করেছিলেন যার রিপোর্ট এখন নিয়ে এসেছেন। রুমে আমরা সকলেই তখন উপস্থিত। আমি বাবা-মায়ের সাথে বাসায় চলে আসব আর অনিমেষ আংকেলরা সকলে আজ থাকছে কাকাবাবুর সাথে যদিও সেখানে একজন থাকার অনুমতি দেয় তারপরও তাদের বয়সের বিবেচনায় ও অনুরোধে উনারা নিয়ম শীথিল করেছেন। ডাক্তার সহ নার্স যখন রুমে ঢুকলেন তখন আমরা সকলে তাক করে আছি ডাক্তার কী বলে রিপোর্ট সম্পর্কে। বিকেলে যে স্যালাইন লাগানো হয়েছে সেটা এখন শেষ হয়েছে তাই ওটা খুলে দিয়েছে নার্স। ডাক্তার কাছে এসে জানতে চাইলেন উনার পরিবারের লোকজন কোথায়। সকলে এগিয়ে গিয়ে বলি আমরাই উনার পরিবার এখন বলুন আমাদের। ডাক্তার সেখানে না বলে তার কেবিনে আসতে বললেন। বাবা, সারোয়ার, পিটার ও অনিমেষ আংকেল সহ চারজন গেলেন ডাক্তারের রুমে।

‘উনার শারীরিক অবস্থার তেমন কোনো উন্নতি নেই। আমি কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছিলাম তাতে দেখা যায় উনার হার্টে সামান্য স্পট দেখা যাচ্ছে। এদিকে শরীরে হিমগ্লোবিনের মাত্রা এতটাই কমেছে যে আলাদাভাবে রক্ত না দিলে যেকোনো কিছুই হতে পারে। আমরা প্রথমে উনার রক্তের ব্যবস্থা করি কিন্তু এখন রাত সাড়ে নয়টা এ সময় তো কোনো ব্লাড ব্যাংকও খোলা পাব না তাছাড়া আমাদের এখানের ব্লাড ব্যাংকে ও-পজিটিভ ব্লাড আজ শেষ হয়েছে। রক্তের ব্যবস্থা কীভাবে করা যায় সেটা দেখুন।’

‘ডাক্তার আমার রক্তের গ্রুপ ও পজিটিভ।’

‘আমারও একই গ্রুপ। তাহলে আমরা যদি রক্ত দেই।’

‘আরে বলেন কী আপনারা কীভাবে দিবেন! আপানাদের যে বয়স তাতে নিজের শরীরেই তো রক্তের পর্যাপ্ততা থাকবে না আর এতে করে এক ব্যাগ রক্ত দিলে তো বিপদে পড়বেন।’

‘আমরা দুজনেই যদি এক ব্যাগ দেই তাহলে তো সমস্যা হওয়ার কথা না ডাক্তার।’

‘তারপরও রিক্স হয়ে যায়।’

‘আল্লাহ ভরসা ডাক্তার কিছু হবে না আমাদের। আমি আর অনিমেষ তাহলে রক্ত দিচ্ছি আপনার এখানে ব্যবস্থা করুন প্লিজ। নরেন্দ্রদা আমাদের সকলকে নতুন করে বাঁচার পথ দেখিয়েছেন আর উনার জন্য এতটুকু করতে পারলে নিজেকে ধন্য মনে করব।’

‘ঠিক আছে আমি নার্সকে বলে দিচ্ছি আপনারা তৈরি হয়ে নিন আর আরেকটা কথা রক্ত দেওয়ার পর কিছুক্ষণ শুয়ে থাকবেন এবং আজ রাতে এখানে অর্ঘুমা থাকার প্রয়োজন নেই। আপনারা বাসায় গিয়ে রেস্ট নিবেন। যদি এটা করতে পারেন তাহলে রক্ত দিতে যাবেন।’

‘ঠিক আছে।’

হরিপদ বাবুসহ আমরা চলে আসি পাশের একটা কেবিনে যেখানে নার্স এসে আমাদের দুজনের কাছ থেকে রক্ত সংগ্রহ করছে। বিশাখা ও তার মা নরেন্দ্রদার কাছে এবং পিটার আমাদের পাশে বসা। অর্ধেক ব্যাগ রক্ত দেওয়ার পর মাথাটা কেমন যেন ঝিমঝিম করছে। বেশ কিছুক্ষণ শুয়ে থাকি তারপর উঠে জল খাই। পিটারকে বললামÑ

‘আজ তুমি থাকবে নরেন্দ্রদার সাথে। আমরা যেহেতু রক্ত দিয়েছি তাই অর্ঘুমা করতে ডাক্তার বারণ করেছে।’

‘সমস্যা নেই আমি থাকব দাদার সাথে।’

‘এককাজ করি আমিও না হয় থেকে যাই অনিমেষ বাবু। মৃণ¥য়ী আর বিশাখাকে আপনাদের সাথে বাসায় পাঠিয়ে দেই।’

‘হরিপদ বাবু আপনি এখানে থাকলে বাসায় সমস্যা হবে না?’

‘না। ওরা একা থাকতে পারবে।’

বিশাখা ও তার মাকে বাসায় পৌঁছে দিয়ে আমরা চলে আসি নিকুঞ্জ নিকেতনে। শরীরটা বেশ ক্লান্ত লাগছে তাই রাতে একপ্রকার খেয়ে বিছানায় ঢলে পড়ি অথচ ঘুম নেই। নরেন্দ্রদার অসুস্থ্যতায় মনের দ্বিধা কোনোভাবেই কাটছে না। কী হতে চলেছে আগামীতে? কাল ভোরের সূর্যটা কী নরেন্দ্রদা দেখতে পাবেন? আবার ভাবছি তিনি কী এই যাত্রায় বেঁচে ফিরবেন? আমরা আবার আগের মতো পার্কে ফিরে যাব। এক রাউন্ড-দুই রাউন্ড তারপর ডাব খাওয়া, আড্ডাবাজি, হাসতে চেষ্টা করা ইত্যাদি সবকিছু। বেঁচে থাকতে জানতে হয়, যদি বাঁচতে হয় তাহলে বাঁচার মূলমন্ত্র শিখে নাওÑকথাগুলো কে বলবে আমাদের আর কে উৎসাহ দিবে। জীবনের শেষ প্রান্তে ঝড়ে পড়া এই আমাদের কুড়িয়ে নিয়ে হাত ধরে চলতে শেখানো মানুষটা আজ হাত ছেড়ে চলে যাবে ভাবলে কেঁদে ওঠে। কখনো হার না মানতে শেখানো লোকটা আজ নিজে হেরে যাবে জীবনের নিয়মে এটা দেখতে পারা একটা বেদনা, যেন জিতে গিয়েও হেরে যাওয়ার অনুভূতি।

২৪.

মনমোহন এসে যখন ডাক দেয় তখন সকাল সাড়ে আটটা। রাতে দেরি করে ঘুম আসাতে ভোরে আর জাগা হয়নি। ঝটপট উঠে তৈরি হয়ে নেই। ইতিমধ্যে নাশতার টেবিলে নাশতা সাজানো হয়ে গেছে। পিটার আর আমি চটজলদি নাশতাটা সেরে বের হব এমন সময় রওশন আরা এসে উপস্থিতÑদাদা আমরাও যাব আপনাদের সাথে। আমরা সকলে দল বেঁধে হাসপাতালে আসি এবং হাসপাতালে এভাবে সকলে এসে ভীড় জমানোয় নার্স বলেÑডাক্তার এসে এভাবে ভীড় দেখলে ক্ষেপে যাবেন। রোগীর কাছে এভাবে ভীড় করবেন না প্লিজ। আমাদের প্রায় ঘণ্টা খানেক কাটানোর পর আশরাফ ও রওশন আরা চলে আসে বাসায়। সারাদিন যেমনÑতেমন একভাবে কাটিয়ে দিলাম, দুপুরের পর দাদার অস্থিরতা বাড়ছে। ডাক্তার এসে দেখে যান তারপর বলে শারিরীক দুর্বলতা আছে তাই এভাবে অস্থির করছেন। সুগারের মাত্রা এখন নরমাল আর ব্লাড প্রেশারও কন্ট্রোলে আছে কিছুটা রেস্ট নিতে পারলে স্বাভাবিক হয়ে যাবেন। দুপুর

গড়িয়ে বিকেল এদিকে বিশাখা সর্বক্ষণ দাদার পাশে বসে আছে এবং সাথে আমরাও। আমরা সকলে রাজীবের অপেক্ষায় আছি কারণ গত রাত থেকে দাদা রাজীবের জন্য অস্থিরতায় কাটাচ্ছেন। কিছুক্ষণ পর পর তার ছেলের নাম মুখে আনেন তারপর নিজেই বলেন ওকে ডাকা যাবে না ওর এখন অনেক কাজ। আমাদের মনের মধ্যেও চলছে ঝড় তুফান, কিছু একটা হারিয়ে যাওয়ার ভয়, সংকোচ ইত্যাদি। বিকেল চারটে নাগাদ দাদার অস্থিরতা কিছুটা কমেছে তিনি এবার স্বাভাবিক হয়ে খুব ধীর সুরে আমাদের সাথে কথা বলছেন।

[পরের পর্ব আগামী সংখ্যায় ছাপা হবে]

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়