প্রকাশ : ২০ এপ্রিল ২০২৬, ০৯:১০
খণ্ডে খণ্ডে অখণ্ড জীবন

বাহান্নতম পর্ব
ছেলেদের শৈশব : প্রত্ন-পর্ব
রবীন্দ্রনাথের ছেলেবেলা পড়ে নিজের শৈশব নিয়ে ভাবেনি বা নস্টালজিক হয়নি এমন মানুষ বিরল। রবীন্দ্রনাথের ‘আমার ছেলেবেলা’ আমার সামনে বালক রবীন্দ্রনাথকে জীবন্ত করে তোলে প্রতিনিয়ত। নিজের শৈশবকে নিজের চোখে দেখার স্মৃতি খুব একটা মনে না থাকলেও আমার দু ছেলেকে তাদের মাতৃগর্ভ হতে ভূমিষ্ঠ হয়ে বড়ো হতে দেখে শৈশব সম্পর্কে একটা ধারণা আমার তৈরি হয়েছে বটে। তারও আগে ভাগ্নে ও ভ্রাতুষ্পুত্রীদের শৈশবও মোটামুটি কাছ থেকে দেখেছি। তবে পূর্ণাঙ্গ শৈশব দেখা হয়েছে দু ছেলের ধূলির ধরণীতে আগমনের পর থেকে।
চাঁদপুর স্টেডিয়াম সড়কে অবস্থিত সিটি হাসপাতালে জন্ম হয় বড়োজনের। স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় নয়, বরং অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে তার প্রথম জন্মনাদের ধ্বনি শুনেছে পৃথিবী। তার নাম রাখা হলো প্রত্ন পীযূষ। বড়ুয়া তার পারিবারিক পদবী। প্রত্ন শব্দটা অমূল্য সুদূর অতীতের নিদর্শন হিসেবে কিছুকে বোঝাতে ব্যবহৃত হয়। আমার বাবার বংশলতিকার শোণিতধারায় সে হলো আমাদের চার ভাইয়ের প্রথম পুত্র। তাই তার মাঝে লুকিয়ে আছে আমাদের হাজার বছরের বংশানুক্রমের ধারা। এজন্যেই সে প্রত্ন। সে কেবল প্রত্ন নয়, সে প্রত্ন পীযূষ। কারণ তার মাঝে বহমান শেকড়ের অমৃত নহর। মাতৃগর্ভের ঘন নীর সংকটে সে হয়েছে ক্ষীণকায়া। তাই তার শিরায় দিতে হলো আলগা তরল। কিন্তু জন্মক্রন্দনের শব্দ ক্ষীণ হলেও দৃঢ়। মায়ের মমতার কড়াকড়ি তাকে সহ্য করতে হয়েছে বেশ। জিভে আহার গ্রহণে বিলম্ব হওয়ার কারণে মা তাকে ব্লেন্ডারে ব্লেন্ড করে গিলতে শেখায়। ফলে খাদ্যরুচি তৈরি হতে তার সময় লেগেছে বেশ। হামাগুড়ি শৈশবে ওর মা তাকে বাটিতে মুড়ি দিয়ে বসাতে শেখায়নি, কারণ ছেলে মুড়ি খাবে এই খুশির চেয়ে বরং মুড়ি ছড়ালে পিঁপড়ে আসবে এই ভয়ে তাকে ভীত থাকতে দেখেছি। কাছ থেকে বড়ো ছেলেকে দেখেই বুঝলাম, সন্তানের সর্বভুক খাদ্যরুচি তৈরি করতে হলে তার জীবনের প্রথম খাবারগুলো মজাদার করার চেয়ে পুষ্টিকর করাটাই শ্রেয়। কেননা একবার যদি কোনো একটা খাবার শিশুর জিভে মজাদার স্বাদের অনুভূতি তৈরি করে তাহলে পরে সে একই খাবার বার বার খেতে চায়। অন্য কেনো খাবারে তার আর অভিরুচি তৈরি হয় না। প্রত্নের ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটে। মা তার শিশুকে অতি স্নেহের কারণে বিরিয়ানি রান্না করে দেয়। এটাই পরে তার মাকে চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন করে। অর্থাৎ নিজের খাদ্য রন্ধনশিল্পে দক্ষতাই তাকে বিরুদ্ধ চাপে ভোগায়। এরপর থেকে মার হাতে বিরিয়ানি ছাড়া আর কোনো কিছুই সে সহজে খেতো না। তার যখন চার বছর বয়স, তখন দুহাজার দশ সালে চাঁদপুরে দেড়শো মেগাওয়াটের বিদ্যুৎ প্রকল্পের উদ্বোধন হয়। তৎকালীন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এর উদ্বোধন করেন। আমিও ঐ উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে পেশাজীবী সংগঠনের পক্ষ থেকে আমন্ত্রিত হই। আসার সময় সবাইকে একটা করে বিরিয়ানির বক্স ধরিয়ে দেওয়া হয়। দুপুরের আগে আগে অনুষ্ঠান শেষে আমি বাসায় ফিরলে প্রত্ন তার আধো আধো বোলে জিজ্ঞেস করে, প্রধানমন্ত্রী তার জন্যে কী পাঠিয়েছেন। আমি বললাম, এই তো, তিনি তোমার জন্যে বিরিয়ানি পাঠিয়েছেন। বিরিয়ানি খাওয়ার পর স্বাদ বুঝতে পেরে সে ঐদিন থেকে বিরিয়ানিকে নাম দেয় শেখ হাসিনার ভাত বলে। কী খাবে জিজ্ঞেস করলেই বলতো, আমি শেখ হাসিনার ভাত খাবো।
সব শিশুর মধ্যেই একজন সম্ভাবনাময় চিত্রকর লুকিয়ে থাকে। প্রত্নের ক্ষেত্রেও তা-ই দেখা গিয়েছিলো। হাতে পেন্সিল পেলেই সে দরোজার আড়ালে থাকা দেওয়ালে এঁকে চলতো নানা প্রতিমা। তার প্রিয় ছবি ছিলো গণেশের। একই ঘটনা সে করতে গিয়েছিলো স্কুলের প্লে ক্লাসের দেওয়ালে। শম্পা ম্যামের গর্জন তাকে সে দক্ষতা প্রদর্শন থেকে ভীতি সহযোগে দূরে রেখেছিলো। খুব চঞ্চল ছেলেটা শুধু সারা স্কুল দৌড়ে বেড়ায়। তার দুরন্তপনায় একবার চেয়ার থেকে পড়ে গিয়ে জিভ কেটে যায়। তার কান্নার চেয়ে মায়ের কান্নার গতিবেগ তখন বেশি হয়ে যায়। আমার অনুপস্থিতিতে ডা. ইকরাম সেবার ব্যবস্থা দিয়ে রক্তক্ষরণ বন্ধ করেন। জিভ বলেই সেলাই লাগেনি, আপনা আপনিই জোড়া লেগে গেছে। ওদের মায়ের একটা বড়ো বাতিক হলো ছেলেদের চুল একটু বেড়ে উঠলেই কাটাতে নিয়ে যাওয়া। সে রকমই একবার তাকে নিয়ে যাওয়া হলো রিল্যাক্স হেয়ার সেলুনে। এই চঞ্চল শিশুকে তার মা দেখে রাখতে পারবে কীভাবে? মাকে ফাঁকি দিয়ে ছেলে কখন ক্ষুর নিয়ে নিজেই নিজের ক্ষৌরকার হয়ে গেলো টেরই পেলো না কেউ। টের পেলো কেবল যখন নিজের আঘাতে নিজেই আহত হলো তখন। ডান জুলপির পাশে লম্বালম্বি একটা নির্মল পোঁচ তার জন্যে হয়ে গেলো একটা বড় দাগ। যত প্রত্ন বড়ো হয় তত দাগ লম্বা হয়। কলেজে উঠেও এ দাগ নিয়ে বন্ধুদের কৌতূহলী প্রশ্ন তাকে বিব্রত করে আজও।
দুরন্ত হলেও বন্ধুদের প্রতি প্রত্নের টান ছিলো আলাদা। তার মধ্যে সকলকে নিয়ে সমন্বয়ের একটা সুস্থ প্রবণতা আমি লক্ষ্য করি। স্কুলের স্পোর্টসে একশো মিটার দৌড়ে সে এগিয়ে থেকেও তার গতি শ্লথ করে দেয় যাতে পিছিয়ে থাকা বন্ধুটি তার সমান আসতে পারে। কেউ ক্লাসে পানি চাইলে নিজের ওয়াটার বটল সে উজাড় করে দেয়। প্রাণী বিষয়ে তার অনুভূতি খুবই কোমল। বেড়াল ছানা, কুকুর ছানারা তার সহজেই মন কেড়ে নিতো। আখতার মনজিলের বাসায় থাকাকালীন রান্নাঘরের জানালায় বসা শালিকেরা তার মনোযোগ কেড়ে নিতো বেশ। একবার একটা শালিক ছানা ফিজিওথেরাপি ভবনের ছাদে জলের ট্যাংকিতে পড়ে গেলে তার উদ্বেগ ছিলো মর্মস্পর্শী। তারই পীড়াপীড়িতে ওর মা আউয়ালকে কুড়ি টাকা বখশিশ দিয়ে ছানাটাকে উদ্ধার করিয়েছিলো। অমিতাভের ভূতনাথ, রামায়ণ-মহাভারতের অ্যানিমেটেড ফিল্ম, মাই ফ্রেন্ড গণেশা, ডোরিমন এগুলো ছিলো তার শৈশবের সবচেয়ে প্রিয় বিনোদন। একটু বড়ো হলে সিরিয়ালের বামা হয়ে যায় তার প্রিয় চরিত্র। ভাত কী দিয়ে খেয়েছে তা বলতে না পারলেও সিরিয়ালে বামা কী করেছে তা সে ঠিকই বলতে পারতো। চাঁদপুর রামকৃষ্ণ আশ্রমে একবার সে কালীপূজার প্রতিমা দেখে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন করে বসে নরেশ মহারাজকে। প্রশ্নটা ছিলো, মা কালী তো আর এখন রাগ করে নেই। তাহলে এখনও তাঁর জিভে রক্ত কেন? তার প্রশ্নে অভিভূত হয়ে পরে মহারাজ মায়ের প্রতিমায় জিভের রঙ গোলাপি করে ফেলেছিলেন। মহারাজ তখন বুঝলেন, শিশুদের কাছে মা তো কোমল, মমতাময়ীই বটেন।
প্রশ্ন করে কৌতূহল মেটানো শিশুদের একটা ধর্ম। সব শিশুই তা করে। প্রত্নের ক্ষেত্রেও তা ঘটেছিলো। তবে তার প্রশ্নগুলো কেমন যেন দার্শনিক স্তরের ছিলো। তার শৈশবের দুরন্তপনায় যোগ হয়েছিলো নিজের কানে নিজেই পুঁথি অনুপ্রবেশ করানো। পরে নাক-কান-গলার ডা. জামান ভাইয়ের কাছে নিয়েই তার একটা সুরাহা করতে হয়। এখনও তার মায়ের কাছে সে সেই খোঁটাটা শোনে। মায়ের ডাকে উত্তর দিতে বিলম্ব হলেই শুনতে হয়, সবই পুঁথির ইফেক্ট। দাঁত ওঠার বয়সে তার তীব্র ডায়রিয়া হয়। এতে তাকে মতলবেও নিতে হয়। কিন্তু মতলব আইসিডিডিআরবির পরিবেশ দেখে ওর মায়ের আর ওখানে থাকার অভিপ্রায় হয়নি। ওখানকার বিশেষ স্যালাইন নিয়ে এসে বাসাতেই চিকিৎসা হয়। এ সমস্যা নিয়ে সিটি হাসপাতালেও একরাত থাকতে হয় তারা মা-ছেলের।
প্রয়াত পীযূষ কান্তি রায় চৌধুরী দাদার পরিবার আমাদের আপনজন। তাঁর বাড়িতে যে উঠোন সে উঠোনে ঝরাপাতা পোড়ানো ছিলো তার একটা বিনোদন। এ কাজে উৎসাহ দিতেন রায় চৌধুরী দাদার সহধর্মিণী মীরা রায় চৌধুরী। তিনি নিজেই ঝাড়ু দিয়ে ঝরাপাতা স্তূপ করে রাখতেন। প্রত্ন গেলে তাতে অগ্নি সংযোগ করাতেন মহাসমারোহে। এ যেন মাসি-বোনপোর জাগ-উৎসব। পরে এতে প্রখরও তাদের সঙ্গী হয়। ঝরাপাতা পোড়ানোর উৎসবে তাদের নানীও শামিল হতেন নানাবাড়ি গেলে। মীরা দিদির নিত্যকৃত্যের পূজাআর্চায় ঠাকুরের অর্ঘ্য উপকরণ ঘাঁটাঘাঁটি করা ছিলো প্রত্নের শৈশবের আরেক উৎপাত। দিদি অবশ্য কখনোই একে উৎপাত হিসেবে দেখেননি। তিনিই বরং দুষ্টুমি করতে করতে মনে করতেন, এ হয়তো নন্দদুলালেরই আরেক অবতার। প্রয়াত দাদা এতে প্রশ্রয় দিতেন সর্বাধিক। তাঁদের প্রশ্রয় এমনই ছিলো, যেদিন রীতি মোতাবেক তাঁদের নিরামিষ ভোজনের কথা সেদিন তাঁরা তাঁদের চর্চা ঠিক রেখেও প্রত্নের জন্যে চিকেন কারি করে দিয়েছিলেন ভালোবেসে।
শৈশবের প্রত্ন বড়ো হয়েছে রামকৃষ্ণ আশ্রমের অন্তেবাসী শিক্ষার্থীদের সাথে খেলাধুলা করে। আশ্রমের মাঠ ছিলো তার বিচরণের অভয়াশ্রম। এ মাথা থেকে ও মাথা দৌড়ুতে দৌড়ুতে তার দৈহিক বিকাশ ও বৃদ্ধি পূর্ণতা পায়। পুকুরের পাড়, শিউলিতলা হতে শুরু করে ঠাকুর নিবাস অব্দি তার শৈশবপনায় তার চেয়ে বেশি প্রাণবন্ত হয়ে উঠতো আশ্রমের মাঠ। পুজোর ঢাকের বাদন কিংবা বাজি পোড়ানোর উৎসবে তার যেন আনন্দের সীমা মানতো না। সরস্বতীর আবাহনে সে-ই হতো সর্বাগ্রণী। তার মীরা মাসিও ছোট শিশুর হাত ধরে নিজেকে ফিরে পেতেন জগতের অসীম আনন্দযজ্ঞে। শারদীয়ার উৎসবে খিচুড়ি কিংবা বুরিন্দা প্রসাদের আকাঙ্ক্ষায় সে উদগ্রীব থাকতো অপরিমেয় উৎসাহে। মাঝে মাঝে আমি ক্লান্তির কারণে না চাইলেও তার জন্যে যেতে হতো মণ্ডপ থেকে মণ্ডপে।
ওর শৈশবকে মুখ্য করে দিনে দিনে অল্প অল্প করে আমি লিখতে থাকি ‘তারা মাসী চাঁদ মামা’র ছড়াগুলো। বইটি তার শৈশবকেই নিবেদিত। আমাদের ভবনের কেয়ারটেকার শহিদের সাথে তার দুষ্টুমি, আমাদের দুধ সরবরাহকারী কলন্তর খাঁয়ের কাছে চকলেটের জন্যে বসে থাকা, আউয়ালের প্রতি তার আগ্রহ ইত্যাদি নিয়েই ছড়াগ্রন্থটা পূর্ণতা পেয়েছে। ছড়ার মধ্যে লুকিয়ে আছে প্রত্নের শৈশব আর তার চারপাশের তখনকার জগৎ। স্কুলের মাঠ থেকে আশ্রমের অঙ্গন, মুক্তিযুদ্ধের বিজয় মেলার মাঠ থেকে বড় স্টেশন ঠোঁডায় ত্রিনদীর মিলনউৎসের অববাহিকায়, ডাকাতিয়ার পাড় কিংবা পুরানবাজার কলেজের নিসর্গশোভায় প্রত্নের শৈশব মিশে আছে হিরণ্ময় দ্যুতি মেখে। (চলবে)








