প্রকাশ : ২০ এপ্রিল ২০২৬, ০৯:০৯
চির স্মরণীয় সাহিত্য প্রতিভা অদ্বৈত মল্লবর্মণ

‘তিতাস একটি নদীর নাম’ উপন্যাসের কথা বললেই যার কথা মনে পড়ে তিনি অদ্বৈত মল্লবর্মণ। বাঙালি ঔপন্যাসিক ও সাংবাদিক। তৎকালীন কুমিল্লা জেলার অধীনে ব্রাহ্মণবাড়িয়া মহকুমার গোকর্ণঘাট গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন ১৯১৪ সালের ১ জানুয়ারি। ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ শিরোনামের একটিমাত্র উপন্যাস লিখে তিনি বাংলা সাহিত্যের চিরস্মরণীয় প্রতিভা হিসেবে নিজের আসন পাকাপোক্ত করেন। এই উপন্যাসটি সর্বপ্রথম মাসিক মোহাম্মদী পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। এক দরিদ্র জেলে পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছিলেন অদ্বৈত মল্লবর্মণ। তাঁর পিতার নাম ছিলো অধরচন্দ্র। শৈশবেই পিতৃ-মাতৃহীন হন তিনি। গ্রামের মালোদের চাঁদার টাকায় তাঁর লেখাপড়ার খরচ নির্বাহ হতো। ১৯৩৩ সালে বর্তমান ব্রাহ্মণবাড়ীয়া জেলা সদরে অবস্থিত অন্নদা উচ্চ ইংরেজি বিদ্যালয় থেকে ১ম বিভাগে ম্যাট্রিকুলেশন ডিগ্রি অর্জন করেন। এরপর কুমিল্লা জেলার ভিক্টোরিয়া কলেজে কিছুদিন আইএ ক্লাসে অধ্যয়ন করেন। কিন্তু মেধাবী ছাত্র হওয়া সত্ত্বেও আর্থিক সঙ্কটের কারণে তাঁর পড়ালেখা শেষ হয়ে যায়। ১৯৩৪ সালে কলেজের পড়া ছেড়ে দিয়ে শুধুমাত্র অর্থ উপার্জন ও জীবিকা নির্বাহের উদ্দেশ্যে কলকাতা গমন করেন। সেখানে মাসিক ‘ত্রিপুরা’ পত্রিকার সাংবাদিক হিসেবে শুরু করেন কর্মজীবন। এরপর ১৯৩৬ সালে ক্যাপ্টেন নরেন দত্ত পরিচালিত ‘নবশক্তি’ পত্রিকায় যোগ দেন তিনি। পত্রিকাটির সম্পাদক কবি প্রেমেন্দ্র মিত্রের সহকারী হিসেবে সহ-সম্পাদক পদে দায়িত্ব পালন করেন। ‘নবশক্তি’র প্রকাশনা বন্ধ হয়ে গেলে তিনি মওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁ’র ‘মাসিক মোহাম্মদী’ পত্রিকার সম্পাদকের সহকারী হিসেবে যোগদান করেন। তিন বছর একাধিক্রমে এ পদে দায়িত্ব পালন করেন অদ্বৈত মল্লবর্মণ। এ সময়ে একই সঙ্গে দৈনিক আজাদ পত্রিকায় সাংবাদিকতা করেছিলেন তিনি। এছাড়াও নবযুগ, কৃষক ও যুগান্তর পত্রিকায় সহকারী সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। আমৃত্যু তিনি এ পদে বহাল ছিলেন। আয় বৃদ্ধির জন্য বিশ্বভারতীর প্রকাশনা শাখায় খণ্ডকালীন চাকুরিও গ্রহণ করেন তিনি। অদ্বৈত মল্লবর্মণের সমগ্র সাহিত্যিক জীবনে ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ উপন্যাসটি অমর কীর্তি হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। প্রতিকূল সংঘাতে ক্রমশ মুছে-আসা মৎস্যজীবী যে মানুষদের কাহিনী এই উপন্যাসে বর্ণিত হয়েছে তিনি সেই ‘মালো’ সম্প্রদায়েরই লোক ছিলেন। তিনি তাঁর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও সুগভীর অন্তর্দৃষ্টির কারণেই উপন্যাসটিতে জেলে সমাজের নিষ্ঠুর জীবনসংগ্রামের সাধারণ কাহিনীকে দিয়েছেন অবিনশ্বর ও অসাধারণ। তাঁর এ বিখ্যাত উপন্যাসটি প্রথমে মাসিক পত্রিকা মোহাম্মদীতে প্রকাশিত হয়েছিলো। কয়েকটি অধ্যায় মোহাম্মদীতে মুদ্রিত হবার পর উপন্যাসটির মূল পাণ্ডুলিপি রাস্তায় খোয়া যায়। বন্ধু-বান্ধব ও অতি আগ্রহী পাঠকদের আন্তরিক অনুরোধে তিনি পুনরায় কাহিনীটি লেখেন। কাঁচড়াপাড়া যক্ষ্মা হাসপাতালে যাবার আগে এই গ্রন্থের পাণ্ডুলিপি বন্ধু-বান্ধবকে দিয়ে যান। অদ্বৈত মল্লবর্মণের মৃত্যুর কয়েক বছর পর ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ শিরোনামের এই উপন্যাসটি গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়। এই একটি মাত্র উপন্যাস লিখেই তিনি বাংলা সাহিত্যের অন্যতম স্মরণীয় প্রতিভা হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেন। উপন্যাসের কাহিনীকে উপজীব্য করে চলচ্চিত্রস্রষ্টা ঋত্বিক কুমার ঘটক ১৯৭৩ সালে ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ শিরোনামে চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন। স্বল্পকালীন জীবনে অদ্বৈত মল্লবর্মণ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ রচনা করে গেছেন। এছাড়াও তিনি বহু শিশুপাঠ্য কবিতাও রচনা করেছেন। বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় তাঁর লেখা বেরোলেও চল্লিশের দশকে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমুখের পাশাপাশি বুদ্ধদেব বসু সম্পাদিত ‘এক পয়সায় একটি’ গ্রন্থ সিরিজ আকারে লিখে তিনি বিশেষভাবে সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। তিতাস একটি নদীর নাম তাঁর স্মরণীয় উপন্যাস।
সমাজ সংস্কারক অকৃতদার নিঃসঙ্গ অদ্বৈত মল্লবর্মণ বহু কৃচ্ছ্বসাধন ও উদয়াস্ত হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রম করে যতোটুকু আয়-উপার্জন করতেন তার অধিকাংশই ব্যয় করতেন দুঃস্থ পরিচিতজনদের মধ্যে। তাঁর গ্রন্থপ্রীতি ছিলো অসাধারণ। নিদারুণ অর্থকষ্টের মধ্যেও যথাসম্ভব বই কিনেছেন তিনি। আর্থিক সঙ্গতি কম থাকা সত্ত্বেও কলকাতার মালোপাড়ার শিশু-কিশোরদের ঘরোয়া বিদ্যালয় পরিচালনায় নিয়োজিত উপেন্দ্রবাবুর স্বল্পশিক্ষিত বিধবা প্রফুল্লকে নিয়মিতভাবে আর্থিক সাহায্য করতেন। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার গোকর্ণঘাটে অদ্বৈত মল্লবর্মণের পৈতৃক বাড়িতে আবক্ষ মূর্তি নির্মাণ করা হয়েছে তাঁর। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জেলা প্রশাসকের উদ্যোগে এবং জেলা পরিষদের অর্থায়নে এটি নির্মিত হয়েছে। তাঁর মৃত্যুর পর ঘনিষ্ঠ বন্ধুরা রামমোহন লাইব্রেরী কর্তৃপক্ষের কাছে যাবতীয় গ্রন্থরাজি তুলে দেন সদ্ব্যবহারের জন্যে। সাহিত্য, দর্শন ও চারুকলাবিষয়ক এমন সুচিন্তিত ও সুনির্বাচিত সংগ্রহশালা ছিলো দুর্লভ। লাইব্রেরী কর্তৃপক্ষ এই সহস্রাধিক গ্রন্থ সংগ্রহশালা নিয়ে পৃথক একটি বিভাগ সৃষ্টি করে সযত্নে সংরক্ষণ করে চলেছেন। গদ্যকার এবং কবির বাইরে অদ্বৈত মল্লবর্মণ ছিলেন অনুসন্ধানী এক গবেষকও। তাঁর লেখা ২৪টি প্রবন্ধ-নিবন্ধ আছে। তাঁর লেখায় এসেছে অপ্রকাশিত পল্লী গীতি, ত্রিপুরার বারোমাসি গান থেকে সীতার বারোমাসি পল্লী সঙ্গীতে পালা গান। অপ্রকাশিত পুতুল বিয়ের ছড়া সংগ্রহের মাধ্যমে অদ্বৈত নানা গ্রাম্য পালা ও সঙ্গীতকে পরম মমতায় তুলে এনেছেন পত্রিকা ও পাণ্ডুলিপির পাতায়। ঐতিহ্য, সঙ্গীত, আর লোকগীতির এক স্বর্ণভাণ্ডারকে তিনি উপস্থাপন করেছেন নিখুঁত বয়ানে। অদ্বৈতের ‘বর্ষা মঙ্গল’, ‘আম্রতত্ত্ব’ লেখাগুলো
স্থান-কাল-পাত্র ভেদে হয়ে উঠেছিলো অনন্য।অদ্বৈত মল্লবর্মণ উঠে এসেছেন ধীবর সম্প্রদায় থেকে, দরিদ্রতার নির্মমতম অভিযাত্রা পাড়ি দিয়ে। পরবর্তী জীবনে আপন সম্প্রদায়ের মানুষের জীবনচর্চা, সংগ্রামী জীবনকে পরম যত্নে সাহিত্যের পাতায় তুলে এনেছেন তিনি। যার সবচেয়ে বড়ো প্রমাণ তার ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ উপন্যাসটি। উপন্যাসটিতে উঠে এসেছে মৎস্যজীবী মানুষের কাহিনী, যারা অদ্বৈত মল্লবর্মণের আত্মার আত্মীয়। অদ্বৈত তাঁর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও সুগভীর অন্তর্দৃষ্টিতে উপন্যাসটিতে ধীবর সমাজের নিষ্ঠুর জীবন সংগ্রামের সাধারণ কাহিনীকে দিয়েছেন অবিনশ্বর এক মাত্রা।উপন্যাসটির ভূমিকাংশে অদ্বৈত লিখেছিলেন, ‘তিতাস একটি নদীর নাম। তার কূলজোড়া জল, বুকভরা ঢেউ, প্রাণভরা উচ্ছ্বাস। স্বপ্নের ছন্দে সে বহিয়া যায়। ভোরের হাওয়ায় তার তন্দ্রা ভাঙে, দিনের সূর্য তাকে তাতায়; রাতে চাঁদ ও তারারা তাকে নিয়া ঘুম পাড়াইতে বসে, কিন্তু পারে না।’ অদ্বৈত মল্লবর্মণের মননবিশ্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো তাঁর সংস্কৃতিচিন্তা। অদ্বৈত ‘সংস্কৃতিচিন্তা’ নামে কিংবা সংস্কৃতি নামে অথবা সংস্কৃতির নানাভেদ নামেও কোনো প্রবন্ধ রচনা করেননি। কিন্তু তাঁর একাধিক রচনায় রয়েছে সংস্কৃতিবিষয়ক স্বকীয় চিন্তার মর্মবাণী। অদ্বৈত মল্লবর্মণের সংস্কৃতিচেতনার সঙ্গে গভীরভাবে প্রোথিত হয়েছে ‘শ্রম’সংশ্লিষ্ট বিষয়টি। অদ্বৈতের কাছে শ্রমবিচ্ছিন্ন সংস্কৃতি কোনো অর্থেই সংস্কৃতির মধ্যে পড়ে না। তিনি শ্রমবিচ্ছিন্ন নিষ্ক্রিয়তাকে প্রবলভাবে ঘৃণাও করতেন। তাঁর ‘এদেশের ভিখারী সম্প্রদায়’, ‘সাগরতীর্থে’ ও ‘আম্রতত্ত্ব’ নামক প্রবন্ধে গভীর ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের মাধ্যমে উপস্থাপন করেছেন। ‘এদেশে ভিখারী সম্প্রদায়’ নামক প্রবন্ধে অদ্বৈত ভিক্ষাবৃত্তিকে ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেছেন। তাঁর মনে হয়েছে অলস, কর্মবিমুখ, সেবার আদর্শ, অতিথিপরায়ণতার আদর্শ ভিক্ষাবৃত্তিকে সমর্থন করে।
অদ্বৈত মল্লবর্মণের সাড়া জাগানো উপন্যাস ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ । এছাড়া তাঁর অন্যান্য বই সমূহ হলো : শাদা হাওয়া, রাঙামাটি, জীবন-তৃষা ,দল বেঁধে, সন্তানিকা, স্পর্শ দোষ, বন্দী বিহঙ্গ, কান্না , এক পয়সায় একটি (গ্রন্থ), সাগরতীর্থে, নাটকীয় কাহিনী , বিদেশি নায়িকা, শুশুক, যোহার গান, ধারা শ্রাবণ, মোদের রাজা মোদের রাণী, ত্রিপুরালক্ষ্মী ইত্যাদি। অদ্বৈত মল্লবর্মণ স্মৃতি গ্রন্থাগার ও গবেষণা কেন্দ্র কর্তৃক প্রবর্তিত ‘অদ্বৈত মল্লবর্মণ সাহিত্য পুরস্কার’ বাংলা সাহিত্যে বিশেষ অবদানের জন্যে প্রবীণ সাহিত্যিকদের প্রদান করা হয় । মাত্র ৩৭ বছর বয়সে যক্ষ্মা রোগে আক্রান্ত হয়ে কলকাতার নারকেলডাঙ্গার ষষ্ঠীপাড়ার নিজ বাড়িতে অদ্বৈত মল্লবর্মণ মৃত্যুবরণ করেন।
লেখক : কবি ও প্রাবন্ধিক, সুনামগঞ্জ।








