সোমবার, ২০ এপ্রিল, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য

প্রকাশ : ২০ এপ্রিল ২০২৬, ০৯:০৮

হৃদয়বতী

মিজানুর রহমান রানা
হৃদয়বতী

(পূব প্রকাশিতের পর)

বাইশ.

দুটি দলই শেষ। বিশাল আর্মি ফোর্স তন্ন তন্ন করে খুঁজছে তাদের প্রধানদেরকে। কিন্তু তাদেরকে পাওয়া যাচ্ছে না। তুষার আহমেদ প্রশ্ন করলো, মেজর ইরফান। দলের সদস্যদেরকে তো শেষ করলেন, এখন তাদের মাথাগুলোকে পাবেন কীভাবে?’

নাথান বম বললো, সেটা আমাদের কাজ। আমরাই খুঁজে নিবো। দু দলের সদস্যরা শেষ হয়েছে তোমাদের জন্যে এটাই যথেষ্ট। এখন তোমাদের পালা। মেজর ইরফানসহ সবাই অস্ত্র জমা দিন। আপনাদেরকে মেহমানদারি করা হবে।’

‘মেজর ইরফান একটু চমকালেন না। তিনি জানতেন এটা একটা চক্রান্তের খেলা, শেষ পর্যায়ে নাথান বম এমনই করবে। তাই সে নাথান বমকে একটু ঘুড়ির সুতোর মতো ছেড়ে দিয়ে আকাশে উড়তে দিতে চাচ্ছে। সে সমস্ত সৈনিককে অস্ত্র জমা দিতে বললো। এ সময় রহস্যময় হাসি হাসলো নাথান। তারপর বললো, ‘তুষার আহমেদ, নাথান আবারও ধীরে ধীরে হাসলো। ‘তুমি কি ভেবেছো, তোমরা সত্যের জন্যে লড়ছো? তোমরা শুধু দাবার গুঁটি, আর আমি এই খেলার নিয়ম তৈরি করি। আসো আজ তোমাদেরকে আমাদের নিজস্ব ডেরায় আপ্যায়ন করাবো।’

পাহাড়ি পথ চলতে চলতে এমন একটা স্থানে তাদেরকে নিয়ে এলো যেখানে সূর্যকিরণও প্রবেশ করে না। সুন্দর একটা ডেরায় নিয়ে এলো সবাইকে। দেখলো সেখানে কুকি চিনের কয়েকশ’ সদস্য অস্ত্র তাক করে দাঁড়িয়ে আছে। নাথান তাদেরকে বললো, ‘এদের সবাইকে শুট করে ফেলে দাও গহীন অরণ্যে।’

‘কিন্তু মৃত্যু সব সমস্যার সমাধান নয়, নাথান। কেউ না কেউ তোমার খেলা উল্টে দেবে।’ একদম নির্ভীক কণ্ঠে বললো মেজর ইরফান।

সে সময় নাদের সাহেবসহ ঋতাভরী জঙ্গল থেকে বেরিয়ে এলো। তাদেরকে দেখে নাথান বিস্মিত হলো। ঋতাভরীকে প্রশ্ন করলে ‘তোমরা আবার আসলে কোত্থেকে?’

রহস্যময়ী হাসি বেরিয়ে এলো ঋতাভরীর মুখে। তারপর ধীরে ধীরে নাথানের কানে কানে ফিস ফিস করে বললো, দুটি পক্ষ শেষ হয়েছে, এবার তোমাদের পালা মি. নাথান। তুমি যাদেরকে তোমার সদস্য মনে করেছো আসলে তারা তোমার নয়। নাদের সাহেব আগেই এসে তোমার লোকদেরকে শেষ করে দিয়ে তাদের পোশাকে আর্মি সৈন্যদেরকে দাঁড় করিয়ে রেখেছেন। এখন তুমি শেষ।’

‘তুমি কি জানো, ঋতাভরী? নাথান ধীরে হেসে উঠলো। ‘প্রতিটি যুদ্ধের শেষ মুহূর্তেই সত্যিকারের খেলাটি শুরু হয়। এটা আমি জানতাম। তাই তোমাদের খেলার চেয়ে আমার খেলাটি দেখে খুবই মজা পাবে।’

কথাটি বলার সাথে সাথে নাথান যে অংশে দাঁড়িয়ে ছিলো সেই অংশটি হঠাৎ করে নিচের দিকে তলিয়ে যায়। সৈনিকরা মুহূর্তেই অস্ত্র দিয়ে ফায়ার করে। কিন্তু নাথান বম মুহূর্তেই হাওয়া হয়ে যায়। যেনো কোনোকালে সে এখানে ছিলোই না।

দিনের শেষ, রাতের অধ্যায় শুরু। এই রাত শেষে আবার দিন হবে, আবার অন্ধকার ঘনাবে। এভাবেই চক্রাকারে বিশ্বের মানুষদের জীবনে আলো আর অন্ধকারের খেলা শেষ হবে।

অনন্যা ও রুবিনা দু’জনের স্বামীর বাসায়। নাদের সাহেব, স্ত্রী মেরি ও কন্যা তাসফিয়া নিজেদের বাসায় বসে চা পান করছেন। এ সময় কলিংবেলের আওয়াজ। দরজা খুলতেই চমকে গেলেন তিনি। সামনেই নাথাম বম সহ তার কয়েকজন অস্ত্রধারী অনুসারী দাঁড়িয়ে আছে।

‘তুমি এখনও বেঁচে আছো নাথাম?’ প্রশ্ন করলেন নাদের।

‘আমাদেরকে বেঁচে থাকতে হয়, কারণ আমরা বিশ্বাস করি আমাদের পাহাড়িদের জন্যে নতুন একটি সুন্দর আবাস তৈরি করে যেতে হবে। আমাদেরকে আমাদের অধিকার ফিরে পেতে হবে।’

‘তাই। তাহলে আমার সাথে তোমার কাজ কি?’

নাথাম বম তার অনুসারীদের সাথে নিয়ে বাসার ভেতরে প্রবেশ করলো, তারপর সোফায় নাদের সাহেবের সাথে পাশাপাশি বসলো।

নাদের প্রশ্ন করলো, ‘আমার সাথে কি তোমার বিশেষ কোনো কাজ আছে?’

‘আছে। তুমি তো সেদিন আমার অনেক অনুসারীকে মেরে ফেলেছো। আমাকেও হয়তো শেষ করে দিতে। তাই তোমার সাথে আমি কথা বলতে এলাম। চাইলে তোমার পুরো পরিবার শেষ করে দিতে পারি। কিন্তু তার আগে আমার কথাগুলো তোমাকে শোনাতে চাই।’

‘তুমি কি সত্যিই ক্ষমতার জন্যে মানুষ হত্যা করবে, নাকি তুমি আমার কথা শুনবে?’ নাথাম বমের কথা শোনার আগেই প্রশ্ন করলো নাদের।

‘নাদের, আমি জানি তুমিও একজন মুক্তিযোদ্ধা। ঠিক যেমন আমি আমার গোষ্ঠীর জন্যে করছি। তাই তুমি বিষয়টা অনুধাবন করতে পারো। তুমি চাইলে আমাকে সহযোগিতা করতে পারো অথবা তোমাদের জীবনকে সঙ্কটাপন্ন করতে পারো। দুটোর একটি বেছে নাও। সময় খুবই কম। কারণ মেজর ইরফান তোমার সিসি ক্যামেরায় তার মোবাইলে আমাদেরকে পর্যবেক্ষণ করছে। সে ইতোমধ্যে তার বাহিনী নিয়ে কাছাকাছি চলে এসেছে।’

হাসলেন নাদের। তারপর হাসতে হাসতে বললেন, ‘তুমি চারুকলার ছাত্র ছিলে। তোমার মধ্যে যে মেধা ছিলো সেটা যদি তুমি দেশের কাজে খরচ করতে তাহলে দেশের উপকার হতো। একাত্তরে আমি দেশের জন্যে লড়েছি, এখনও তাই। আর তুমি তোমার গোষ্ঠীর জন্যে লড়ছো, তুমি তাদের নেতা হবার জন্যে কাজ করছো। আমি কিন্তু ক্ষুদ্র স্বার্থ নিয়ে কাজ করিনি। যেটা তুমি করছো।’

নাথাম বম বুঝতে পারছে নাদেরকে বুঝিয়ে কোনো লাভ নেই। তাই সে তার অনুসারীদেরকে বললো, ‘ঘরের সবাইকে ফায়ার করে মেরে ফেলো।’

মুহূর্তেই নাদেরের পকেট থেকে ছোট্ট রিভলভারটি হাতে চলে এলো। নাথাম বম সোফার অন্য পাশে ড্রাইভ দিয়ে পড়ে গেলো। আর নাদেরের রিভলবারের এক লহমায় নাথাম বমের পাঁচ সদস্য বুকে তাজা রক্তের ফুলকি নিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়লো। ঠিক সেই মুহূর্তেই নাথাম বম উঠে গুলি করলো নাদেরকে। বুকে গুলি নিয়েও নাদের নাথাম বমকে গুলি করতে চাইলে কিন্তু তার রিভলবারে আর গুলি ছিলো না। সে পড়ে গেলো মাটিতে। নাথাম বম আরেকটি গুলি করলো তারপর দ্রুত বাইরে বেরিয়ে গেলো।

গুলির শব্দে অন্য রুম থেকে ছুটে এলেন তাসফিয়া ও তার মা মেরি মরিয়াম। নাদের সাহেবের বুকের তাজা রক্তে ভেসে গেছে ঘরের ফ্লোর। রক্তের ছিটা দেওয়ালেও এসে লেগেছে। এসব দেখে দুজনেই চিৎকার করে উঠলো।

এ সময়ই বাসায় প্রবেশ করলো ইরফান ও অনন্যা।

দ্রুতই নাদের সাহেবকে হাসপাতালে নেওয়া হলো। খবর পেয়ে সেখানে দ্রুত ছুটে এলেন তুষার, রুবিনা ও ইমতিয়াজ।

ইমতিয়াজ তাসফিয়ার কাছে সবকিছু শুনলো। তারপর বললো, ‘যুদ্ধটা মনে হচ্ছে এখনও শেষ হয়নি। আমাকে আবারও মাঠে নামতে হবে দেশের শত্রুদের বিরুদ্ধে। ওদেরকে শেষ না করে মাজারে ফিরবো না।’

হাসপাতালের উত্তেজনাপূর্ণ পরিবেশ, নাদেরের চিকিৎসার চেষ্টার দৃশ্য, অনন্যা, রুবিনা ও তাসফিয়ার চোখের জল—এগুলো মা মরিয়ম মেরিকে আরও ভাবিয়ে তুলছে। মোচড় দিয়ে উঠছে বুকের ভেতর।

কান্নারত তাসফিয়ার হাত ধরলো ইমতিয়াজ। তারপর তার চোখে চোখ রেখে বললো, ‘বাকি সময়টা তোমাকে পাশে নিয়ে যুদ্ধটা শেষ করতে চাই। তুমি কি আমার পাশে থাকবে?’

‘শাবাশ, এই তো বীরের মতো কথা।’ মেজর ইরফান ও তুষার কাছে এগিয়ে এসে ইমতিয়াজকে বুকে জড়িয়ে নিলো। তারপর বললো, ‘আমরা দুজন আছি তো ভাই। তিনজন মিলে এমন একটা পরিকল্পনা করবো, যাতে নাথাম বম ও তার গোষ্ঠীর পরাজয় ডেকে আনবে।’

এ সময় একজন ডিউটি নার্স এসে বাইরে সবাইকে বললো, ‘নাদের সাহেবের অস্ত্রোপচার সম্পন্ন হয়েছে। তিনি চোখ খুলেছেন। আপনাদের সবাইকে দেখতে চান।’

কান্না ভুলে সবাই ছুটলো নাদের সাহেবের কামরায়। চোখ মেলে তাকিয়ে আছেন নাদের সাহেব। পাশাপাশি ইমতিয়াজ-তাসফিয়া ও সবাইকে দেখেই তার সেই চোখে অশ্রু গড়িয়ে পড়লো।

মরিয়ম মেরি সেদিকে তাকিয়ে মনে মনে চিন্তা করলেন, তার স্বামীর চোখে যে অশ্রু গড়িয়ে পড়লো, তা কি আনন্দের, না একটি অনিশ্চিত ভবিষ্যতের ইঙ্গিত? (শেষ)

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়