সোমবার, ১৯ জানুয়ারি, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য

প্রকাশ : ১৯ জানুয়ারি ২০২৬, ০৯:৫০

হৃদয়বতী

মিজানুর রহমান রানা
হৃদয়বতী

(পূর্ব প্রকাশিতের পর)

সতেরো.

৫ আগস্ট, ২০২৪। ঢাকার রাজপথ উত্তপ্ত। সারাদেশ থেকে জনগণ ঢাকায় চলে এসেছে। ধীরে ধীরে তারা গণভবনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। সেনাবাহিনী, বিজিবি কোনো বাধা দিচ্ছে না। জুলাই মাসের ছাত্র-জনতার আন্দোলনে অনেক ছাত্র-জনতা পুলিশের গুলিতে শাহদাতবরণ করেছেন। এখন তাদের ভয় কেটে গেছে। তারা এখন মৃত্যুকে ভয় পায় না। তাদের লক্ষ্য গণভবন। প্রধানমন্ত্রীকে যে কোনো মূল্যে হটাতেই হবে।

এগুতে এগুতে তারা খবর পায় প্রধানমন্ত্রী বিমানযোগে ভারতে পালিয়ে গেছেন। এ খবরে চারদিকে ছাত্র-জনতার উল্লাস। তারা গণভবনে ঢুকেই লুটতরাজ শুরু করে। গণভবনের চেয়ার-টেবিল থেকে এসি-ফ্রিজ সবই এক এক করে নিয়ে যাচ্ছে আর আনন্দের সাগরে ভাসছে।

জামশেদ টিভিতে এসব দেখছিলো। তার মুখে ক্রুর হাসি। সে জানে বাঙালি স্বাধীনতা অর্জন করতে সময় নেয় না, তবে তারা এক সময় ভুলে যায় কে তাদের শত্রু আর মিত্র। তারপর তাদের ওপর নির্যাাতনের খড়গ নেমে আসে। করের বোঝা, জিনিসপত্রের লাগামহীন মূল্যস্ফীতি চাপিয়ে দেওয়া হয়। তারা শোষিত হতে থাকে, বড়ো বড়ো কোম্পানিগুলো সবক্ষেত্রে মুনাফা অর্জন করে আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ হয়ে যায়। শুধু এক হাত থেকে অন্য হাতে ক্ষমতা বদল হয়। জনতার সুখ দীর্ঘস্থায়ী হয় না।

জামশেদ ভাবে, এটাই মাফিয়াদের খেলা। যে সরকার পতনের দিকে যাবে, তার পতন আরও ত্বরান্বিত করতে হয়, তারপর মাফিয়াদের সাম্রাজ্যের শুভ সূচনা হয়। জনগণকে নিয়ে রাজনীতিবিদ, মাফিয়াচক্র খেলতে খেলতে টাকার পাহাড় গড়ে তোলে। জনগণ যখন টের পায় তখন আবার নতুন সরকার আসে, তারাও এক সময় মাফিয়াদের জালে বন্দি হয়। এভাবেই চলতে থাকে... এটার আর শেষ নেই।

এই আনন্দের মাঝেই জামশেদের কাছে খবর আসে তাদের দলের লোকগুলোকে কারা যেনো মেরে ফেলেছে। সে ইমতিয়াজকে তলব করে প্রশ্ন করে, ‘ইমতিয়াজ আমার বাহিনীর সব লোককে খতম করলো কে?’

ইমতিয়াজ জবাব দেয়, ‘আমি। আমিই সবাইকে খতম করেছি, আর অনন্যাসহ তাদের লোকজনকে নিরাপদে দেশে পৌঁছে দিয়েছি।

হতভম্ব হয়ে পড়লো জামশেদ। ‘এ তুমি কী করলে ইমতিয়াজ! তোমার উদ্দেশ্য কী?’

‘এবার তোমার পালা বস। তোমাকেও মরতে হবে।’ শীতল কণ্ঠে উত্তর দেয় ইমতিয়াজ।

‘ত্বরিৎ গতিতে দুই পকেট থেকে দুটি রিভলভার বের করে জামশেদ। কিন্তু তার আগেই ইমতিয়াজের একটা রিভলভার হাতে উঠে আসে। পরপর ছয়টা গুলি করে জামশেদের শরীরে। মৃত্যুর আগে জামশেদ জানতে চায়, ‘ইমতিয়াজ এটা তুমি কেনো করলে?’

‘এই জীবন আর ভালো লাগে না বস। রাস্তা থেকে কুড়িয়ে এনে আমাকে আপনার সেকেন্ড ইন কমান্ড পর্যন্ত আসার সুযোগ দিয়েছেন, আমাকে আপন করেছেন, স্নেহ করেছেন। ভালোবাসায় সিক্ত করেছেন। তাই আপনার জীবনের শেষ মুহূর্তটাও আমার ভালোবাসায় রঙ্গিন হোক, এটাই আমি চেয়েছিলাম। গুড বাই।’

ধীরে ধীরে সিংহাসন থেকে পড়ে যাচ্ছে জামশেদ। তাকে ধরে ফেললো ইমতিয়াজ। তারপর ফ্লোরে শুইয়ে দিলো। মৃত্যু যন্ত্রণায় ছটফট করছে জামশেদ, ধীরে ধীরে ইমতিয়াজকে বললো, আমার গলাটা শুকিয়ে আসছে আমাকে একটু পানি দাও প্লিজ।’

ত্বরিৎ গতিতে এক গ্লাস পানি নিয়ে এলো ইমতিয়াজ। তারপর পরম মমতায় জামশেদকে সেই পানি পান করিয়ে দিলো। পানি পান করার পরই ধীরে ধীরে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়লো মাফিয়া সম্রাট জামশেদ।

ইমতিয়াজের চোখে দু ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়লো। তারপর সে আবেগ সংবরণ করে ধীরে ধীরে বাইরের দিকে পা বাড়ালো। সে জানে এখন সে বাংলাদেশে যাবে, তারপর স্বপ্নে দেখা সুফি সাধকদের কথাগুলো বাস্তবায়ন করবে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত। পাপের জগতে আর থাকতে চায় না সে।

অনন্যাকে নিয়ে সুখী হোক ইরফান। একটা মেয়ে মানুষের পেছনে পড়ে থেকে সত্যটা থেকে পিছপা হতে চায় না সে। যে সত্য তাকে স্বপ্নে দেখানো হয়েছে ধীরে ধীরে সে সে সত্যের সন্ধানে বেরিয়ে পড়লো। আর মায়াবতী রাজকন্যা অনন্যাকে ভুলে গেলো।

আজকের দিনটা বেশ সুখের। তুষারের সাথে বিয়ে হয়েছে রুবিনার আর অনন্যার সাথে বিয়ে হলো ইরফানের। ওরা চারজন মিলে সিদ্ধান্ত নিয়েছে হানিমুনটা সেই স্বর্গীয় পাহাড়, নদী, সাগরের দেশ মরিশাসেই হবে।

এ সময় ওদের কাছে এলো তাসফিয়া। তারপর চারজনকে একসাথে দেখেই ‘ওয়াও’ বলে চিৎকার করে উঠলো। বললো, ‘আপুরা তোমরা এবার সুখী তো?’

কোথা থেকে বেরিয়ে এলো নাদের ও চেঙ্গিস খান। তাদের চেহারায় খুশির বিন্দু চিকচিক করে উঠছে। চেঙ্গিস বললো, ‘আসলে মাফিয়া সেকেন্ড ইন কমান্ড ইমতিয়াজ শেষ পর্যন্ত আমাদেরকে নিরাপদেই পৌছে দিয়েছিলো। তা না হলে জামশেদের কবল থেকে আমরা কেউই মুক্তি পেতাম না।

‘আচ্ছা, শেষ পর্যন্ত ইমতিয়াজ এমন করলো কেনো? অনন্যাকে ছেড়ে দিলো কেনো?’ প্রশ্ন করলো নাদের। কিন্তু কেউই এই কথার জবাব দিতে পারলো না।

অনন্যা কথা বললো, ‘ইমতিয়াজ একটা স্বপ্ন দেখছিলো, তাকে সত্যের পথে যাবার কথা তিনজন সুফি-সাধক নির্দেশ দিয়েছিলো। আর সেটা তার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিলো। সে তা-ই করেছে, যা মিথ্যাকে আড়াল করে চিরসূর্যের মতো সত্যের আলোয় আলোকিত হয়।’ (চলবে)

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়