বুধবার, ১৪ জানুয়ারি, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য

প্রকাশ : ১৪ জানুয়ারি ২০২৬, ০৯:২৬

এআই নিয়ন্ত্রিত ক্যানসার চিকিৎসা পদ্ধতি

ড. এম মেসবাহউদ্দিন সরকার
এআই নিয়ন্ত্রিত ক্যানসার চিকিৎসা পদ্ধতি

ক্যান্সার চিকিৎসা সহজ, সাশ্রয়ী ও নির্ভুল করার জন্য ভবিষ্যতে মানুষের শরীরে চিকিৎসকের ভূমিকায় আবির্ভূত হতে যাচ্ছে ন্যানোরোবট। এগুলো হচ্ছে ন্যানো স্কেলের অতি ক্ষুদ্র রোবট, যাদের আকার মানুষের কোষের চেয়ে হাজারগুণ ছোট (মানুষের চুলের প্রস্থের হাজার ভাগের এক ভাগেরও ছোট)। ম্যাগনেটিক ফিল্ডের প্রভাবে এই ক্ষুদ্র রোবটগুলো রক্তনালীর ভেতর দিয়ে চলাচল করবে এআই এর নির্দেশে এবং শনাক্ত করবে নির্দিষ্ট রোগের স্থান। ক্যান্সার সেল ধ্বংস করা, রক্তে জমা থাকা ক্ষতিকর টক্সিন বা ভারী ধাতু শনাক্ত করে ধীরে ধীরে পরিষ্কার করা, বন্ধ ধমনী খুলে দেওয়া সবই করবে ভেতর থেকে।

একই সঙ্গে এই ন্যানোরোবটগুলো রক্তনালীর মাধ্যমে শরীরের নির্দিষ্ট স্থানে পৌঁছে ক্যান্সার ক্ষতিগ্রস্ত কোষ মেরামত করতে পারবে কিংবা নির্দিষ্ট স্থানে ওষুধ পৌঁছে দিতে পারবে। ফলে পুরো শরীরে ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া কমবে এবং চিকিৎসা হবে আরও লক্ষ্যভিত্তিক। আর এই প্রযুক্তির কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে একটি ‘স্মার্ট ইনজেকশন’, যার মাধ্যমে কোটি কোটি এআই-নিয়ন্ত্রিত ন্যানোরোবট মানুষের শরীরে প্রবেশ করবে। আকারে অতি ক্ষুদ্র হলেও এসব ন্যানোরোবট হবে অত্যন্ত বুদ্ধিমান, তারা মানুষের রক্তপ্রবাহ, কোষের গঠন ও রোগের উৎস সম্পর্কে তাৎক্ষণিক তথ্য বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্ত নিতে পারবে।

ফলে চিকিৎসা আর শুধু বাহ্যিক যন্ত্রের ওপর নির্ভরশীল থাকবে না, বরং শরীরের ভেতরেই গড়ে উঠবে একটি স্বয়ংক্রিয় চিকিৎসা ব্যবস্থা। প্রচলিত কেমোথেরাপিতে যেমন সুস্থ কোষও ক্ষতিগ্রস্ত হয়, ন্যানোরোবট সেখানে এআই অ্যালগরিদমের মাধ্যমে ক্যান্সার কোষের জিনগত বৈশিষ্ট্য চিনে নেবে এবং নির্দিষ্ট এনজাইম বা শক্তি ব্যবহার করে সেগুলো ধ্বংস করবে।

এআই ন্যানোরোবটের আরেকটি বড় সাফল্য হতে পারে বন্ধ ধমনী খুলে দেওয়া। হৃদরোগ বা স্ট্রোকের মূল কারণ অনেক সময় ধমনীর ভেতরে জমে থাকা চর্বি বা প্লাক। স্মার্ট ইনজেকশনের মাধ্যমে প্রবেশ করা ন্যানোরোবটগুলো রক্তনালীর ভেতর দিয়ে চলাচল করে ওই জমাট অংশ শনাক্ত করবে এবং ধীরে ধীরে ভেঙে রক্তপ্রবাহ স্বাভাবিক করে তুলবে। এতে বড় ধরনের অস্ত্রোপচার বা ঝুঁকিপূর্ণ স্টেন্ট বসানোর প্রয়োজন অনেক ক্ষেত্রে কমে আসবে। রোগী স্বাভাবিক জীবনযাপনে দ্রুত ফিরে যেতে পারবে। এই ন্যানোরোবটগুলো শরীরের ভেতর থেকেই গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্যতথ্য সংগ্রহ করবে। যেমনÑ রক্তচাপ, গ্লুকোজের মাত্রা, কোষের পরিবর্তন ইত্যাদি।

প্রয়োজনে সেই ডাটা নিরাপদভাবে বাহ্যিক ডিভাইস বা চিকিৎসকের কাছে পাঠানো যাবে। ফলে প্রতিটি মানুষ নিজের শরীরের ভেতরেই বহন করবে একটি জীবন্ত ‘ডিজিটাল হেলথ সিস্টেম’। এআই ন্যানোরোবটভিত্তিক স্মার্ট ইনজেকশন তাই শুধু চিকিৎসা নয়, বরং মানবস্বাস্থ্যের ভবিষ্যৎ রূপকেই নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করবে। তবে মানুষের শরীরে এআই রোবট ব্যবহার করে চিকিৎসা এখন আর কল্পবিজ্ঞান নয়। বরং বাস্তবতার কাছাকাছি একটি উন্নত প্রযুক্তি। এই প্রযুক্তির মাধ্যমে রোগ নির্ণয়, অস্ত্রোপচার, ওষুধ প্রয়োগ এবং রোগীর পরিচর্যা আগের চেয়ে অনেক বেশি নির্ভুল ও কার্যকর হচ্ছে।

জটিল অস্ত্রোপচারে রোবটিক সার্জারির মাধ্যমে খুব সূক্ষ্ম ও নিখুঁতভাবে অপারেশন করা সম্ভব হচ্ছে, যেখানে মানুষের হাতের সামান্য ভুল বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। এআই নিয়ন্ত্রিত রোবট রোগীর শরীরের ভেতরে ক্যামেরা ও সেন্সরের সাহায্যে সঠিক স্থানে অস্ত্রোপচার চালায়। এতে রক্তক্ষরণ কম হয়, ব্যথা কম লাগে এবং রোগী দ্রুত সুস্থ হয়ে ওঠে। হৃদরোগ, ক্যান্সার, নিউরোসার্জারি ও অর্থোপেডিক চিকিৎসায় এই প্রযুক্তি ইতোমধ্যেই সফলভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

বর্তমানে ক্যান্সার চিকিৎসায় কেমোথেরাপি, রেডিওথেরাপি ও অস্ত্রোপচারের মতো পদ্ধতি ব্যবহৃত হলেও এসব পদ্ধতির পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া অত্যন্ত মারাত্মক। ন্যানোরোবট প্রযুক্তি এই সমস্যার সমাধান দিতে পারে। কারণ এটি শরীরের সুস্থ কোষ ক্ষতিগ্রস্ত না করে শুধু আক্রান্ত কোষকে লক্ষ্যবস্তু বানাতে সক্ষম। ভবিষ্যতের চিকিৎসা ব্যবস্থায় ন্যানোরোবট শুধু একটি প্রযুক্তি নয়, বরং মানবজীবন রক্ষার এক নতুন দিগন্ত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

ন্যানোরোবট প্রযুক্তির মূল ভিত্তি হলো ন্যানোটেকনোলজি, যা পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, জীববিজ্ঞান ও প্রকৌশলের সমন্বয়ে গঠিত একটি আধুনিক বিজ্ঞানশাখা। ন্যানোরোবটকে এমনভাবে ডিজাইন করা হয় যে তারা মানবদেহের রক্তনালী দিয়ে চলাচল করতে পারে এবং নির্দিষ্ট কোষ বা টিস্যু শনাক্ত করতে পারে। ক্যান্সারের ক্ষেত্রে, ন্যানোরোবটকে প্রোগ্রাম করা যায় যেন তারা ক্যান্সার কোষের বিশেষ বৈশিষ্ট্য যেমন অস্বাভাবিক প্রোটিন বা রাসায়নিক সংকেত চিহ্নিত করতে পারে। একবার লক্ষ্যবস্তু শনাক্ত হলে ন্যানোরোবট সেখানে ওষুধ সরাসরি পৌঁছে দেয় অথবা ক্যান্সার কোষকে ধ্বংস করার জন্য নির্দিষ্ট রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটায়।

ফলে চিকিৎসা হয় অনেক বেশি নির্ভুল ও কার্যকর। শুধু ক্যান্সার নয়, ডায়াবেটিস, হৃদরোগ, স্নায়ুরোগসহ বিভিন্ন জটিল রোগের ক্ষেত্রেও ন্যানোরোবট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। ভবিষ্যতে এমন ন্যানোরোবট কল্পনা করা হচ্ছে, যা রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করবে, রক্তনালী পরিষ্কার রাখবে কিংবা ক্ষতস্থানে দ্রুত কোষ পুনর্গঠন ঘটাবে। এই প্রযুক্তি চিকিৎসাকে প্রতিরোধমূলক পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারে, যেখানে রোগ হওয়ার আগেই ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হবে।

গবেষণায় দেখা গেছে, ন্যানোবটের মাধ্যমে ওষুধ প্রয়োগ করলে প্রচলিত কেমোথেরাপির তুলনায় অনেক কম ডোজেই ভালো ফল পাওয়া সম্ভব, যা রোগীর শরীরে বিষক্রিয়ার ঝুঁকি কমায়। এভাবে ন্যানোরোবট চিকিৎসাবিজ্ঞানে ‘টার্গেটেড থেরাপি’-র ধারণাকে আরও শক্তিশালী করে তুলছে। তবে ন্যানোরোবট প্রযুক্তির সম্ভাবনার পাশাপাশি কিছু চ্যালেঞ্জ ও নৈতিক প্রশ্নও রয়েছে। প্রথমত, ন্যানোরোবট মানবদেহে দীর্ঘমেয়াদে কী ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে, তা এখনো পুরোপুরি জানা যায়নি। অত্যন্ত ক্ষুদ্র হওয়ায় এগুলো শরীর থেকে পুরোপুরি বেরিয়ে যাবে কিনা অথবা কোনো অপ্রত্যাশিত পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করবে কিনা এসব বিষয়ে আরও গবেষণা প্রয়োজন।

দ্বিতীয়ত, ন্যানোরোবট তৈরির খরচ অত্যন্ত বেশি হওয়ায় এটি প্রাথমিকভাবে ধনী দেশ ও ধনী শ্রেণির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকতে পারে, যা চিকিৎসাক্ষেত্রে বৈষম্য বাড়াতে পারে। তৃতীয়ত, ন্যানোবটের অপব্যবহারের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। যদি এই প্রযুক্তি সঠিক নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, তবে তা মানবস্বাস্থ্যের জন্য হুমকি হয়ে উঠতে পারে। পাশাপাশি এই প্রযুক্তি অত্যন্ত ব্যয়বহুল হওয়ায় উন্নয়নশীল দেশগুলোতে এর ব্যবহার এখনো সীমিত। পাশাপাশি তথ্য নিরাপত্তা, যন্ত্রের ত্রুটি এবং মানবিক স্পর্শের অভাব নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। রোগীর মানসিক সান্ত্বনা ও সহমর্মিতা দেওয়ার ক্ষেত্রে এখনো মানুষের বিকল্প হতে পারেনি রোবট।

বিশ্বব্যাপী এই পদ্ধতির গবেষণা চলছে পুরোদমে। মিশিগান ইউনিভার্সিটি এবং পেনসিলভানিয়া ইউনিভার্সিটির গবেষকদের মতে এই রোবটগুলো চলবে লোর রশ্মি বা চৌম্বক ক্ষেত্র দিয়ে। রোবটের গায়ে প্ল্যাটিনাম ও টাইটেনিয়ামের সেন্সর থাকবে, যা বাইরে থেকে নিয়ন্ত্রণ করা যাবে। অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্নের আরএমআইটি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক দলও ক্যান্সার কোষ ধ্বংস করতে সক্ষম এমন রোবট ‘ন্যানো ডট’ আবিষ্কার করেছেন। তাদের ভাষ্যমতে ‘ন্যানো ডট’ এর চাপে ক্যান্সার কোষ নিজেই নিজেকে ধ্বংস করবে। সুইডেনের ক্যারোলিনস্কা ইনস্টিটিউটের গবেষক দলও এই কাজে সাফল্য পেয়েছে, যা ইতোমধ্যেই বিশ্বখ্যাত ‘ন্যাচার ন্যানোটেকনোলজি’ জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে।

তারা বলছেন ন্যানোরোবট শরীরের ভেতরে ‘গোপন অস্ত্র’ হিসেবে কাজ করবে। এই রোবটগুলো তৈরি হয়েছে উঘঅ অরিগামি নামে এক অত্যাধুনিক প্রযুক্তি দিয়ে, যেখানে উঘঅ-কে ভাঁজ করে তৈরি করা হয় ক্ষুদ্র এক গঠন। এর ভেতরে লুকানো আছে এক ধরনের ক্ষতিকর প্রোটিন (পেপটাইড), যা মূলত সব ধরনের ক্যান্সার কোষ ধ্বংস করতে সক্ষম। তারা এটাকে ‘কিলিং সুইচ’ হিসেবে অভিহিত করছেন।

যাহোক, এসব গবেষণা এখনো প্রি-ক্লিনিক্যাল পর্যায়ে রয়েছে, অর্থাৎ এখনো পশুর দেহে পরীক্ষাধীন। তবে গবেষকরা আশা করছেন, পরবর্তী ধাপে মানুষের ওপর ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল শুরু করা হবে এবং সফল হলেই তবে এটি ক্যান্সার চিকিৎসায় এক নতুন দিগন্ত খুলে যাবে। অবশ্য ন্যানোরোবট প্রযুক্তির উন্নয়নের পাশাপাশি এর ব্যবহারবিধি, আন্তর্জাতিক আইন, নৈতিক মানদ- ও নিরাপত্তা কাঠামো গড়ে তুলতে হবে।

লেখক : অধ্যাপক ও আইটি গবেষক, আইআইটি, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়