রবিবার, ১১ জানুয়ারি, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য

প্রকাশ : ১০ জানুয়ারি ২০২৬, ১০:০০

ধারাবাহিক উপন্যাস-২৭

নিকুঞ্জ নিকেতন

রাজীব কুমার দাস
নিকুঞ্জ নিকেতন

(পূর্ব প্রকাশের পর)

‘আরে পিটার ট্রাভলিং ব্যাগটা কেন নিচ্ছ?’

‘প্রয়োজন আছে দাদা। আপনাদের শীতবস্ত্রগুলো এটায় দিয়ে দিতে পারেন এখন না পড়লে।’

‘আমরা একটু রিলেক্স হয়ে হাঁটি ব্যাগ নিলে অস্বস্তি লাগবে না তোমার?’

‘দাদা ওকে সেটা নিতে দিন। সমস্যা নেই আমরা সকলে এটা শেয়ার করে ক্যারি করব না হয়।’

‘ঠিক আছে নিয়ে নাও।’

শীতের নিরাপত্তা বেষ্টনী নিয়ে বের হয়েছি ঠান্ডা লেগে যাওয়ার আর কোনো ভয় নেই। পিটার সারোয়ার জুটি এবার মেতেছে স্মৃতিচারণে আমরা দুজন তাদের পিছে পিছে। আসার সময় রাস্তাটা চেনা হয়ে গেছে অনেকটা। সোজা সরল পথ কিছুদূর গেলেই পড়ে বাজার। বাজারে বসে চারজনে চায়ের পর্বটা সেরে নেই এতে ক্লান্তিও দূর হলো আর কিছুক্ষণ জিরিয়ে নেওয়া গেল। আমরা যেখানে এসে নেমেছি এখন সেই টার্মিনালের কাছে চলে এসেছি। রাস্তার দুধারেই রেস্টুরেন্ট আছে অতঃপর একটা বড়সড় রেস্টুরেন্ট দেখে সেটায় ঢুকে পড়ি আর হালকা নাশতার জন্য বয়কে অর্ডার করি। আমাদের দেখে ম্যানেজার নিজে এসে সালাম ঠুকে দাঁড়ায়Ñ

‘স্যার যদি মনে কিছু না করেন তাইলে একটা কথা কমু।’

‘জি বলেন।’

‘আপনারা কী কোনো নাটক বা সিনেমার লোক।’

‘আপনার হঠাৎ এমনটা কেন মনে হলো বলুন তো?’

‘না স্যার আপনাগো দেইখা মনে হইল আপনাগো নাটকে দেখসি। এই যে এই স্যারেরে মনে হয় কোনো একটা নাটকে দেখসি নায়িকার বাপের চরিত্র করসিল। আমি কী ঠিক-ঠাক কই নাই স্যার?’

লোকটা কী বলছে বুঝে উঠতে পারছি না, একে অপরের মুখের দিকে তাকাচ্ছি শুধু। আমি যেই তাকে সত্যিটা বলতে যাব অমনি সারোয়ার আমাকে চিমটি কেটে থামিয়ে দেয়। তারপর সে বলতে থাকে।

‘আপনি তাহলে ধরে ফেলেছেন তবে কোন নাটকটায় দেখেছেন সেটা বলুন তো?’

‘আমি তো স্যার নাটকের নামডা ভুইল্লা গেছি তবে দেখসি এটা ঠিক।’

‘হুম বুঝতে পেরেছি কোন নাটক। আসলে সেটায় নায়িকার বাপ না ও ছিল নায়কের বাপ এবার মনে পড়েছে।

‘জি জি স্যার হইতে পারে। অনেক দিন আগের কথা তো তাই ভুইল্লা গেসি তয় দেহেন আমি কিন্তু চিনতে ভুল করি নাই। আমাগো এহানে অনেক নাটক সিনেমার লোক আসে আর সক্কলে আইসা আমার এই রেস্টুরেন্টেই খাওয়া-দাওয়া করে।’

আমাদের স্বীকার করার ফলে রেস্টুরেন্টের বয় থেকে শুরু করে বাবুর্চি পর্যন্ত কিছুক্ষণ পর পর এসে তাকিয়ে থেকে দেখে যায়। বিষয়টা বেশ অস্বাভাবিক তবুও সারোয়ারের জন্য সবকিছু সহ্য করতে হচ্ছে। সহজ সরল মানুষগুলোকে এভাবে মিথ্যে বলাটা বোধ হয় ঠিক হচ্ছে না। আমরা যে টেবিলে বসেছি সে টেবিলটায় হোটেলের লোকজন অন্য কাউকে বসতে দিচ্ছে না আবার নাশতার পরিবেশনটাও হয়েছে ঝটপট। নাশতা দিয়ে যাওয়ার সময় চার-পাঁচজন একসাথে আসে আর তাদের একজন পরিচয় দিল রেস্তোরাঁর বাবুর্চি হিসেবে। অনিমেষ মুখ লুকিয়ে হাসছে সারোয়ারের কাণ্ড দেখে আর নরেন্দ্রদা রেগেছে এটাতে কোনো ভুল নেই। সারোয়ার এভাবে ঝটপট সিকোয়েন্স তৈরি করে ফেলতে পারেও বটে। আমরা নাশতা করছি আর হোটেলে বয়দের আমাদের আশপাশে ঘুরঘুর করতে থাকাটা বিরক্তির সাথে উপলব্ধি করছি। আমি নিশ্চিত সারোয়ার বাইরে বের হলে অনিমেষ ও নরেন্দ্রদার ঝাড়ি খাবে। টাকা দেওয়ার জন্য বিলটা আনতে বললে ম্যানেজার কাচুমাচু করে বিল না নিতে। নরেন্দ্র দা বলে উঠেÑআপনি যদি বিল না নেন তাহলে আমরা আরও দুদিন আছি এখানে কিন্তু আপনার রেস্তোরাঁয় অন্তত খাব না। অবশেষে লোকটা বিল রাখল।

‘আচ্ছা একটা কথা বলুন তো আপনাদের এখানে অনেক রকমের মাছ দেখছি তা এই মাছগুলো কী সবই ফ্রাই করেন।’

‘জি না স্যার, আমাদের এখানে মাছের বার-বি-কিউ হয়। এই যেমন ধরুন টোনা, কোরাল, স্যামন ইত্যাদি যত বড় পদের মাছ আছে সবগুলোর বার-বি-কিউ হয়। আপনার কোনটা খেতে ইচ্ছে হয় সেটা বলুন স্যার।’

‘এই কোরাল মাছটার ওজন কতটুকু হয় একটু দেখুন তো।’

‘প্রায় এক কেজি হবে স্যার।’

‘এটাকে বার-বি-কিউ করলে কতটুকু সময় লাগবে।’

‘এখন সাড়ে সাতটা বাজে আপনারা নয়টার মইধ্যে খাইতে পারবেন স্যার। মাছটা ম্যারিনেট কইরে না রাখলে মশলাগুলো মাছে ভালোভাবে ঢুকে না তাই আর কী ঘণ্টাখানেক সময় লাগে। ম্যারিনেট হইলে তহন কয়লার চুলায় এটারে পোড়াইতে আরও পনেরো-বিশ মিনিট সময় লাগে।’

‘ঠিক আছে...এই মাছটা আপনারা বার-বি-কিউ করে দিবেন।’

‘সাথে কী খাবেন স্যার ভাত না রুটি।’

‘পছন্দ কোনটা বলে দাও তোমরা, ভাত না রুটি।’

‘ভাত দিয়ে মাছ তো হরহামেশাই খাই তাহলে রুটি চলুক। দেখি খেয়ে কেমন লাগে! ভালো না লাগলে ভাত অর্ডার করব।’

‘বেশ...ম্যানেজার সাহেব আপনি এটা তৈরি করুন আমরা ঠিক নয়টায় আপনার দরবারে হাজির হব আর এটার সাথে থাকবে রুটি। ভালো না লাগলে ভাতও খেতে পারি।’

‘জি স্যার আমার এহানে দুটারই ব্যবস্থা আছে আপনেরা চিন্তা কইরেন না।’

বাইরে আসার পর আমরা এবার আসি টার্মিনাল জেটিতে। সারোয়ারের দিকে সকলের নজর তাক করা আর সে নয় দশ বছরের শিশুরা যেমন অপরাধ করলে ধরা পড়ার পর যেভাবে ভয়ে ভয়ে মুচকি হাসে সারোয়ারও ঠিক তেমনি করছে। অনিমেষ শুধু হেসেই যাচ্ছে সাথে আমিও আর নরেন্দ্র দা গম্ভীর হয়ে তাকিয়ে আছে। তারপর বিষ্ফোরিত হলোÑ

‘তুমি এমনটা করতে পারলে? কেন করলে সারোয়ার? তুমি বুঝতে পারছ না এই মানুষগুলো কত সহজ-সরল। ওদের সরলতা নিয়ে মজা করাটা কী ঠিক হয়েছে তোমার? দেখনি কতটুকু সরল হলে সে বিলটুকু নিতে চায়নি।’

‘ওহে দাদা ঠিক আছে আমার অন্যায় হয়েছে, মেনে নিচ্ছি কিন্তু এটা কী দেখেছেন ওদের চোখে মুখে কত আনন্দ কত উৎফুল্লতা। ওরা যাদের টিভিতে দেখেছে এবার চোখের সামনে দেখছে এটাতো স্বপ্ন পূরনের মতো। তা এই আনন্দটা কী অন্যভাবে আপনি বা আমরা কেহ দিতে পারতাম? পারতাম না। আপনি ওকে এক লক্ষ টাকা দিলেও সে অতটা খুশি হতো না যতটা এখন হয়েছিল।’

‘তারপরও সারোয়ার আমার বিষয়টা ভালো লাগেনি। সহজ সরল মানুষগুলোর ইমোশন নিয়ে খেলাটা আমাদের বোধ হয় উচিত হয়নি।’

‘দাদা উচিত-অনুচিত নয় আপনি ওদের আনন্দ দেখুন।’

‘তুমি এমন কেন? সত্যি তোমাকে নিয়ে পারা যায় না।’

‘দোয়া করবেন ভবিষ্যতে যেন আরও ভালো করতে পারি।’

‘হা হা হা...’

১৫.

অনিমেষের এভাবে সিগারেটের অভ্যেস আছে জানা ছিল না। সেই বিকেল থেকে সে ক্রমশ সিগারেট টেনে যাচ্ছে। অবশ্য একজন সিগারেটে আসক্ত লোককে হুটহাট ছাড়িয়ে নেওয়া যায় না। এটা এমন এক আসক্তি যার অভাবে মানুষ উন্মাদের মতো আচরণ করে। পার্কে ওকে দেখে কখনো বুঝা যায়নি যে সে সিগারেটে আসক্ত। যাইহোক এটা যদি এসময় তার বিনোদনের একটা অংশ হয় তাহলে সেটাই শ্রেয়। আমরা আড্ডা শেষে যথারীতি নয়টায় রেস্টুরেন্টে আসি। বেয়ারা বলে উঠে স্যার আপনাদের আইটেমটা ওখানে বার-বি-কিউ মেকারে বসানো আছে। আমরা দাঁড়িয়ে অন্য মাছগুলো মেরিনেটের সিস্টেমটা দেখছি। ওরা সম্পূর্ণ মাছটার আঁশ ও নাড়ি-ভুঁড়ি বের করে ছুরি দিয়ে ওটাকে ভালোভাবে কেঁচা দিয়ে দেয় যেন মাছের মধ্যে মশলা ঢুকতে পারে তারপর ওটাকে বেশ কয়েক ধরনের মশলায় বানানো একটা রেসিপিতে ডুবিয়ে রাখা হয়। প্রায় ঘণ্টা খানেক সময়ের পর এটাকে বার-বি-কিউ মেকারে বসিয়ে দেওয়া হয়। নিচে কয়লার ধোঁয়াটে তাপে তার চামড়াটা পুড়ে আসে আর এরই মাঝে ব্রাশ দিয়ে পুরো মাছটাতে ঘি মাখা হয়। টেবিলে বসতেই কিছুক্ষণের মধ্যে শুকনা পরোটা আর বার-বি-কিউ করা মাছ চলে আসেÑআমরা এবার খাওয়া শুরু করলাম একে একে। মাছের ভাজা বা তরকারীর ঝোলে ডুবানো মাছ খেয়েছি কিন্তু মাছের বার-বি-কিউ এই প্রথম খাওয়া হচ্ছে তাছাড়া মাছ দিয়ে রুটি এটাও একপ্রকার নতুনত্ব এনেছে। খাবার আগে ভেবেছিলাম প্রায় এক কেজির মতো মাছটা সম্পূর্ণটা খেতে পারব কী না অথচ পোড়া মাছের ধোঁয়াটে স্বাদ যে এত সুস্বাদু আগে বুঝিনি। খেতে খেতে মনে হলো মাছ আরেকটা হলে মন্দ হতো না। খাওয়াটা বেশ হয়েছে তাই শরীরও ক্লান্ত হয়ে আছে এখন।

[পরের পর্ব আগামী সংখ্যায় প্রকাশিত হবে]

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়